চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে টিকে থাকতে কোয়ান্টাম দক্ষতা, বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত

· Prothom Alo

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের কেন্দ্রে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও বিগ ডেটার পাশাপাশি দ্রুত উঠে আসছে আরেকটি শক্তিশালী প্রযুক্তি—কোয়ান্টাম কম্পিউটিং। একসময় যা ছিল তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ, আজ তা পরিণত হচ্ছে কৌশলগত রাষ্ট্রনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই পরিবর্তনের ঢেউয়ে বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত?

কোয়ান্টাম কম্পিউটিং কী এবং কেন তা গুরুত্বপূর্ণ

প্রচলিত কম্পিউটার তথ্য সংরক্ষণ করে বিটে, ০ বা ১। কিন্তু কোয়ান্টাম কম্পিউটার ব্যবহার করে কিউবিট, যা একই সঙ্গে একাধিক অবস্থায় থাকতে পারে (সুপারপজিশন) এবং একে অপরের সঙ্গে জটিলভাবে সংযুক্ত হতে পারে (এনট্যাঙ্গলমেন্ট)। এর ফলে নির্দিষ্ট সমস্যায় তারা বিপুল সমান্তরাল গণনা করতে সক্ষম।

Visit librea.one for more information.

এই প্রযুক্তি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে তিন কারণে—

১. ক্রিপ্টোগ্রাফি ও সাইবার নিরাপত্তা: ভবিষ্যতের শক্তিশালী কোয়ান্টাম কম্পিউটার বর্তমানের বহু এনক্রিপশন পদ্ধতি ভেঙে দিতে পারে। ফলে ‘পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি’ এখন বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

২. ওষুধ ও উপাদান আবিষ্কার: জটিল অণুর আচরণ সিমুলেট করতে কোয়ান্টাম কম্পিউটার বিপ্লব ঘটাতে পারে।

৩. অপটিমাইজেশন ও ফিন্যান্স: সরবরাহব্যবস্থা, ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, ঝুঁকি বিশ্লেষণ—এসব ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ব্যবহারের কথা বলা হচ্ছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, কোয়ান্টাম প্রযুক্তি আগামী দশকে বহু শিল্প খাতে মৌলিক রূপান্তর আনতে পারে। একই সঙ্গে এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত সক্ষমতার বিষয়েও পরিণত হয়েছে।

বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও দক্ষতার চাহিদা

কোয়ান্টাম প্রযুক্তিতে বৈশ্বিক বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২০ সালের পর থেকে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে কোয়ান্টাম খাতে বিনিয়োগ কয়েক হাজার কোটি মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও জাপান এ খাতে জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৮ সালে ন্যাশনাল কোয়ান্টাম ইনিশিয়েটিভ আইনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও জনবল উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের কোয়ান্টাম ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচিতে বহু বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ দিয়েছে। চীনও কোয়ান্টাম যোগাযোগ ও কম্পিউটিং অবকাঠামোয় বড় বিনিয়োগ করেছে।

কিন্তু বিনিয়োগের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি। বিভিন্ন শিল্পসমীক্ষা বলছে, কোয়ান্টাম প্রযুক্তিসম্পর্কিত চাকরির ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থীর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। অনেক ক্ষেত্রে ৩: ১ অনুপাতে শূন্য পদ ও দক্ষ প্রার্থীর ঘাটতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ, তিনটি পদে একজন যোগ্য আবেদনকারী পাওয়া যাচ্ছে।

২০২৬ সালের মধ্যে কোয়ান্টাম প্রযুক্তিসংক্রান্ত চাকরির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে, অথচ প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরির গতি সে তুলনায় ধীর। এই বৈষম্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি সুযোগও, যদি তারা এখনই প্রস্তুতি নেয়।

শিক্ষা ও গবেষণায় বিশ্বপ্রবণতা

উন্নত দেশগুলো কোয়ান্টাম দক্ষতা তৈরিতে তিনটি স্তরে কাজ করছে—

১. বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশেষায়িত ডিগ্রি ও কোর্স। কোয়ান্টাম ইনফরমেশন সায়েন্স, কোয়ান্টাম অ্যালগরিদম, কোয়ান্টাম হার্ডওয়্যার—এসব বিষয়ে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি প্রোগ্রাম চালু হচ্ছে।

২. শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় অংশীদারত্ব
প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো গবেষণাগারে অর্থায়ন করছে এবং শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের সুযোগ দিচ্ছে।

৩. স্কুল পর্যায়ে স্টেম (এসটিইএম) জোরদার করা দরকার। পদার্থবিজ্ঞান, গণিত ও কম্পিউটারবিজ্ঞানে ভিত্তি মজবুত না হলে কোয়ান্টাম দক্ষতা সম্ভব নয়, এ উপলব্ধি থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেও পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন করা হচ্ছে।

এই প্রস্তুতি শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এটি কৌশলগত। কারণ, ভবিষ্যতে যেসব দেশ কোয়ান্টাম-নির্ভর সাইবার নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, আর্থিক বিশ্লেষণ বা ওষুধ উন্নয়নে এগিয়ে থাকবে, তারাই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সুবিধা পাবে।

বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশ গত এক দশকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। সফটওয়্যার রপ্তানি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্সের কোর্সও চালু হয়েছে।

তবে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এখনো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সীমিত। কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান বা উন্নত গণিতের কোর্সে কোয়ান্টাম ধারণা পড়ানো হলেও আলাদা করে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং বা কোয়ান্টাম ইনফরমেশন সায়েন্সে পূর্ণাঙ্গ প্রোগ্রাম চোখে পড়েনি এখনো। গবেষণা অবকাঠামো, বিশেষায়িত ল্যাব ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে।

আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তবিষয়ক দক্ষতা। কোয়ান্টাম প্রযুক্তি শুধু পদার্থবিজ্ঞান নয়; এতে লাগে গণিত, কম্পিউটারবিজ্ঞান, ইলেকট্রনিকস, এমনকি প্রকৌশল দক্ষতা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো বিষয়ভিত্তিক বিচ্ছিন্নতা বেশি, সমন্বিত গবেষণার সুযোগ তুলনামূলক কম।

কেন এখনই প্রস্তুতি জরুরি

কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে প্রযুক্তি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে, সেটির জন্য এত তাড়াহুড়া কেন? কারণ, প্রযুক্তিগত বিপ্লব কখনো একদিনে আসে না, প্রস্তুতি নিতে সময় লাগে। যদি কোয়ান্টাম কম্পিউটিং আগামী ১০–১৫ বছরে শিল্পে বড় প্রভাব ফেলে, তবে আজ যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন, তাঁরাই তখন কর্মবাজারে প্রবেশ করবেন। এখন থেকেই দক্ষতা না গড়ে তুললে আমরা কেবল ব্যবহারকারী থাকব, উদ্ভাবক হতে পারব না।

এ ছাড়া সাইবার নিরাপত্তার দিক থেকেও প্রস্তুতি জরুরি। ভবিষ্যতে কোয়ান্টাম কম্পিউটার বর্তমান এনক্রিপশন ভাঙতে সক্ষম হলে ব্যাংকিং, প্রতিরক্ষা ও সরকারি তথ্যব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তাই ‘পোস্ট-কোয়ান্টাম’ নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার চিন্তা এখন থেকেই করা প্রয়োজন।

কী করা যেতে পারে

১. জাতীয় রোডম্যাপ প্রণয়ন: কোয়ান্টাম প্রযুক্তি নিয়ে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন; যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প ও নিরাপত্তা—সবদিক বিবেচনায় থাকবে।

২. বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্স ও গবেষণাকেন্দ্র: শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও কোয়ান্টাম ইনফরমেশন সায়েন্সে বিশেষায়িত কোর্স চালু করা যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে তাত্ত্বিক ও সফটওয়্যারভিত্তিক গবেষণায় জোর দেওয়া যেতে পারে। কারণ, হার্ডওয়্যার অবকাঠামো ব্যয়বহুল।

৩. আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: উন্নত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা, ফেলোশিপ ও প্রশিক্ষণ বিনিময় কর্মসূচি চালু করা জরুরি।

৪. স্টেম শিক্ষায় জোর: গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও কম্পিউটারবিজ্ঞানে শিক্ষার মানোন্নয়ন ছাড়া কোয়ান্টাম দক্ষতা সম্ভব নয়। মাধ্যমিক স্তর থেকেই বিশ্লেষণধর্মী ও গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন।

৫. পোস্ট-কোয়ান্টাম সাইবার নিরাপত্তা প্রস্তুতি: সরকারি ও আর্থিক খাতে ক্রিপ্টোগ্রাফি অবকাঠামো ধীরে ধীরে আপডেটের পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।

কোয়ান্টাম কম্পিউটিং হয়তো আগামীকাল আমাদের ঘরে পৌঁছে যাবে না। কিন্তু এটি যে কৌশলগত প্রযুক্তি হিসেবে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দিতে পারে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

বাংলাদেশ যদি কেবল প্রযুক্তি আমদানিকারক দেশ হয়ে থাকতে না চায়, বরং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে এগোতে চায়, তবে কোয়ান্টাম দক্ষতা তৈরির দিকে এখনই নজর দিতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রতিযোগিতা শুধু যন্ত্রের নয়, মানবসম্পদের। আর সেই মানবসম্পদ গড়ে তোলার কাজ শুরু করতে হয় আজ থেকেই।

ড. তৌহিদ ভূঁইয়া, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ এবং ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক

Read full story at source