অস্ট্রেলিয়ায় দরিদ্র কমিউনিটি এবং বাংলাদেশি অভিবাসীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান
· Prothom Alo

কিছুদিন আগে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে যে যুক্তরাজ্যে দারিদ্র্য ও সরকারি সহযোগিতা নেওয়ার শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশি অভিবাসীরা এবং যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি সহায়তা নেয় অর্ধেকের বেশি বাংলাদেশি পরিবার। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে, অস্ট্রেলিয়ার মতো উন্নত দেশে কারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছেন, সরকারি সহযোগিতা নেওয়া অভিবাসী কারা এবং বাংলাদেশিদের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অবস্থান প্রেক্ষাপট কেমন।
Visit sport-newz.biz for more information.
অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসীদের অর্থনৈতিক অবস্থান বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু জাতীয়তা নয়; বরং কোন ভিসা শ্রেণিতে তাঁরা এসেছেন—এই বিষয়টি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মানবিক ভিসায় (Humanitarian visa) আগত ব্যক্তিরাই দেশটির অভিবাসী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন।
অস্ট্রেলিয়ায় মানবিক ভিসাধারীরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে—
অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের (Australian Bureau of Statistics-ABS) মাইগ্র্যান্ট সেটেলমেন্ট-সংক্রান্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, মানবিক ভিসায় আসা ব্যক্তিদের গড় ব্যক্তিগত আয় জাতীয় গড়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২০২৫ সালের ABS Migrant Settlement Outcomes-এর তথ্য অনুসারে, মানবিক অভিবাসীদের বার্ষিক গড় ব্যক্তিগত আয় ৩৯ হাজার ৪২৩ ডলার, যা অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যা (৬১ হাজার ১৭১ ডলার) এবং দক্ষ অভিবাসীদের (৭৯ হাজার ৪৪২ ডলার) তুলনায় অনেক কম। দক্ষ ভিসাধারী অভিবাসীরা যেখানে তুলনামূলকভাবে দ্রুত কর্মসংস্থানে যুক্ত হন, সেখানে যুদ্ধবিধ্বস্ত বা সীমিত শিক্ষার সুযোগ থাকা দেশ থেকে আসা শরণার্থী পটভূমির মানুষদের শ্রমবাজারে স্থিতিশীল হতে বেশি সময় লাগে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
নতুন আগত মানবিক অভিবাসীদের বড় একটি অংশ বসবাস করে সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা এলাকায়। এসব এলাকা সাধারণত অস্ট্রেলিয়ার সেইফা (Socio-Economic Indexes for Areas, SEIFA), সূচকে সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করে, যেখানে বেকারত্ব, কম আয় ও সেবাপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা বেশি দেখা যায়।
কোন জাতীয়তাগুলো বেশি ঝুঁকিতে
বিশেষ করে আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া ও ইরাক থেকে মানবিক ভিসায় আগত অনেক পরিবার শুরুতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল থাকেন। প্রশান্ত মহাসাগরীয় ছোট দ্বীপদেশ, যেমন নাউরু, কিরিবাতি ও ভানুয়াতু থেকে আগত অভিবাসীদের মধ্যেও গড় আয় তুলনামূলকভাবে কম বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
আশ্রয়প্রার্থীদের পরিস্থিতি আরও কঠিন
আশ্রয়প্রার্থী (asylum seeker) এবং ব্রিজিং ভিসাধারীদের অবস্থা আরও অনিশ্চিত। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কাজের অনুমতি সীমিত থাকে এবং তারা পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পান না। ফলে তারা প্রায়ই দাতব্য সংস্থা বা কমিউনিটি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। সাধারণ নাগরিকদের জন্য যে সরকারি সহায়তা ব্যবস্থা যেমন Centrelink রয়েছে, তা সব সময় তাদের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হয় না।
কেন এই দারিদ্র্য?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানবিক অভিবাসীদের অর্থনৈতিক পিছিয়ে থাকার পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ রয়েছে-
1. ইংরেজি ভাষায় সীমিত দক্ষতা।
2. আগের শিক্ষা বা পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি না পাওয়া।
3. অস্ট্রেলিয়ান কাজের অভিজ্ঞতার অভাব।
4.আবাসনসংকট ও উচ্চ ভাড়ার চাপ।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই শ্রমবাজারে স্থিতিশীল হয়ে ওঠেন এবং সরকারি ভাতার ওপর নির্ভরশীলতা ধীরে ধীরে কমে।
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসীরা—
অস্ট্রেলিয়ায় তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশি অভিবাসীরা শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অভিবাসীদের সামগ্রিক চিত্র তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক।
শিক্ষা ও পেশায় এগিয়ে—
বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে উচ্চশিক্ষার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই সম্প্রদায়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (প্রায় ৪৭%) বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী, যা অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি। শিক্ষার ওপর এই গুরুত্বের কারণে উচ্চ বেতনের পেশাগুলোয় তাদের শক্তিশালী উপস্থিতি দেখা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীর অনুপাত জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি হওয়ায় তারা চিকিৎসা, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসা ও শিক্ষা ক্ষেত্রে দৃশ্যমান উপস্থিতি গড়ে তুলেছেন।
দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীলতা
বসতি স্থাপনের শুরুর দিকে চ্যালেঞ্জ থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশি অভিবাসীরা কর্মসংস্থান ও আয়ের ক্ষেত্রে ভালো অবস্থানে পৌঁছান। অনেকেই পূর্ণকালীন পেশায় যুক্ত এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে দ্রুত প্রবেশ করতে সক্ষম হন।
সম্প্রদায়ের প্রবৃদ্ধি
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষের সংখ্যা গত এক দশকে দ্রুত বেড়েছে। বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ৭৩ হাজার বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ বসবাস করছেন (২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী), যা একটি সফল এবং প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী সমাজের ইঙ্গিত দেয়। একটি সুসংগঠিত, শিক্ষানুরাগী এবং পেশাভিত্তিক কমিউনিটি হিসেবে তারা অস্ট্রেলিয়ার বহু সাংস্কৃতিক সমাজে দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে।
তবু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে-
তবে সবকিছুই মসৃণ নয়। বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যেও কিছু সাধারণ সমস্যা দেখা যায়-
1. বিদেশি ডিগ্রির পূর্ণ স্বীকৃতি না পাওয়া।
2. শুরুর দিকে যোগ্যতার তুলনায় নিচু পর্যায়ের কাজ করতে বাধ্য হওয়া।
3. ভাষাগত বা পেশাগত নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা।
4. নতুন দেশে আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামলানোর চাপ।
অস্ট্রেলিয়ায় দারিদ্র্যের প্রশ্নটি জাতীয়তার চেয়ে বেশি জড়িত ভিসা প্রকার, আগমনের পটভূমি এবং শিক্ষাগত সুযোগের সঙ্গে। মানবিক ভিসাধারী ও আশ্রয়প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠেন।
বাংলাদেশি অভিবাসীরা সামগ্রিকভাবে শিক্ষিত ও পেশাভিত্তিক একটি সফল সম্প্রদায় হিসেবে পরিচিতি পেলেও তাদেরও বসতি স্থাপনের প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু কাঠামোগত বাধার মুখোমুখি হতে হয়।
অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসী অভিজ্ঞতা একরকম নয়; বরং তা নির্ভর করে কোথা থেকে, কী পরিস্থিতিতে এবং কোনো ভিসায় কেউ এ দেশে এসেছে তার ওপর।
লেখক: শ্রাবন্তী কাজী, ডক্টরাল রিসার্চার, সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া
তথ্য সূত্র—
1) Australian Bureau of Statistics
2) ABS Migrant Settlement Outcom 2025
3) Australian Humanitarian Visa Stream Statistics.