চিকিৎসা করানোর টাকা নেই, কিশোর ছেলেকে শিকলবন্দী করে রাখছেন মা

· Prothom Alo

লেখাপড়া, খেলাধুলা আর দুরন্তপনায় সমবয়সীদের সময় কাটলেও কিশোর জিহাদ আহমদকে (১৬) দিন-রাত শিকলবন্দী অবস্থায় থাকতে হয়। সে মানসিক রোগে আক্রান্ত। মাঝেমধ্যে মেজাজ হারিয়ে ফেলে; কিন্তু তার চিকিৎসা করানোর টাকা নেই হতদরিদ্র মায়ের। এমন অবস্থায় তিনি ছেলেকে শিকলবন্দী করে রাখছেন। বলছেন, ‘কেউর যদি ক্ষতি করে এই ডরে ছেলেরে শিকল পরাই রাখি।’

Visit arroznegro.club for more information.

কিশোর জিহাদের মা নাজু বেগম যেন দুঃখের আরেক উপাখ্যান। স্বামী জামাল মিয়ার নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে দুই মেয়ে আর জিহাদকে নিয়ে ঘর ছাড়েন তিনি। পরে গৃহকর্মীর কাজ নেন। একটি কলোনিতে ভাড়া বাসায় সন্তানদের নিয়ে থাকেন। যা উপার্জন হয় তা দিয়ে সংসার আর দুই মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাতেই হিমশিম অবস্থা। এ পরিস্থিতিতে টাকার অভাবে চালিয়ে নিতে পারছেন না অসুস্থ ছেলের চিকিৎসা।

পরিবারটির বসবাস মৌলভীবাজারের কুলাউড়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নতুনপাড়া এলাকায় ময়না মিয়া নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির কলোনিতে। গত বুধবার দুপুরের দিকে ওই কলোনিতে গিয়ে দেখা যায়, নাজু বেগম কাজ থেকে মাত্র ফিরেছেন। ঘরের বারান্দার মেঝেতে ছেলে জিহাদ কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। লোহার শিকলের এক প্রান্ত দিয়ে তার দুই পা বেঁধে রাখা, শিকলের অপর প্রান্ত বারান্দার গ্রিলের সঙ্গে বাঁধা। পাশে পানির জগ ও গ্লাস রাখা। একপর্যায়ে নাজু ছেলেকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে জড়িয়ে ধরেন। কিছু খাবে কি না, জানতে চান। জিহাদ মাথা নেড়ে ‘না’ বলে।

নাজু বেগম, কিশোর জিহাদ আহমদের মাকেউর যদি ক্ষতি করে এই ডরে ছেলেরে শিকল পরাই রাখি। দিনে বারান্দায় রাখি। কাজ শেষ করি আইয়া তারে গোসল করাই, খাওয়াদাওয়া করাই। রাইতে ঘরে থাকে।

আলাপচারিতায় নাজু বলতে লাগলেন, তাঁর বাবার বাড়ি পাশের উত্তর কুলাউড়া এলাকায়। শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লায়। স্বামী জামাল মিয়া রেস্তোঁরায় কাজ করতেন। বিয়ের পর থেকে সংসারে পারিবারিক কলহ লেগে থাকত। জামাল প্রায়ই তাঁর ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালাতেন। এতে অতিষ্ঠ হয়ে সাত-আট বছর আগে তিন সন্তানকে নিয়ে কুলাউড়ায় চলে আসেন। পরে আর জামাল তাঁদের খোঁজ নেননি।

নাজু বেগমের তিন সন্তানের মধ্যে সবার বড় মেয়ে মীম আক্তার কুলাউড়া সরকারি কলেজে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষে পড়ছেন। ছেলে জিহাদ মেজ। তাকে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলেন; কিন্তু লেখাপড়ায় মন টেকেনি। সবার ছোট মেয়ে জুনাইসা বেগম স্থানীয় রাবেয়া আদর্শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে।

ঘরের বারান্দায় শিকলবন্দী করে রাখা কিশোর জিহাদকে জড়িয়ে ধরে রয়েছেন তার মা নাজু বেগম।

জিহাদের অসুস্থতার বিষয়ে নাজু জানান, ছয়-সাত বছর বয়সে ছেলেকে মাদ্রাসায় ভর্তি করেন তিনি। বছরখানেক ভালোই চলছিল। এর পর মাদ্রাসায় যেতে চাইত না। জোরাজুরি করলে রেগে যেত। ঘরের সব জিনিস তছনছ করত। অন্য মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিলেও কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরে মানসিক রোগের এক চিকিৎসককে দেখান। জিহাদের রোগটি মানসিক বলে জানান ওই চিকিৎসক। তিনি প্রাথমিক কিছু ওষুধ দিয়ে তা নিয়মিত খাওয়াতে বলেন। মাসে তিন-চার হাজার টাকার ওষুধ লাগত। স্থানীয় এক সচ্ছল ব্যক্তি কয়েক মাসের ওষুধ কিনে দেন। সম্প্রতি ওই ব্যক্তি মারা গেছেন। অর্থসংকটে আর ওষুধ কিনতে পারেননি। ওষুধ বন্ধের পর রোগ আবারও বেড়ে যায়। এ অবস্থায় শিকলে বেঁধে ছেলেকে আটকে রাখা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।

ছেলে জিহাদের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা নাজু বেগম। তিনি বলেন, ‘কেউর যদি ক্ষতি করে এই ডরে ছেলেরে শিকল পরাই রাখি। দিনে বারান্দায় রাখি। কাজ শেষ করি আইয়া তারে গোসল করাই, খাওয়াদাওয়া করাই। রাইতে ঘরে থাকে।’

অর্থনৈতিক দুর্দশার কথা তুলে ধরে নাজু বেগম বলেন, ‘মানুষের বাসাবাড়িতে কাজ করি, কোনোমতে সংসারটা চালাই। দুই মেয়ের লেখাপড়ার খরচও চালানি লাগে। ডাক্তার প্রতিদিন সকাল-বিকাল দুইটা করি ইনজেকশন দিতে বলছেন। আর সিটিস্ক্যান পরীক্ষা করাইতে বলছেন। সিটিস্ক্যান করাইতে শুনছি সাত-আট হাজার টাকা লাগে। এত টাকা কই পাইমু। কিছু মানুষের সাহায্যে ইনজেকশনের টাকার ব্যবস্থা করছি। ইনজেকশন দিলে খালি ঘুমায়।’

শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে নাজু বেগম বলেন, ‘এই বয়সে ছেলেটারে কি এইভাবে আটকাইয়া রাখার কথা। নিজের অনেক কষ্ট হয়। তার মতো ছেলেরা স্কুলে যায়, খেলাধুলা করে; আর সে বন্দী। আমার ছেলেটা যে কোন দিন সুস্থ হইব আল্লাহই জানেন।’

সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাঈদ এনাম জিহাদের চিকিৎসা করছেন। তিনি জানান, প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কিশোর জিহাদের ‘নিউরো-সাইকিয়াট্রিক’ সমস্যা দেখা গেছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত ওষুধ ব্যবহারে সে সেরে উঠবে বলে আশাবাদী চিকিৎসক। ছেলেটিকে এখন শিকলবন্দী করে রাখার প্রয়োজন নেই বলে তিনি জানান।

Read full story at source