কিছু পরিবারে কেন ছেলে সন্তান বেশি হয়

· Prothom Alo

আপনার পরিচিত এমন কোনো পরিবার আছে কি, যেখানে সবাই ভাই, কোনো বোন নেই। এমনকি তার বাবারও কোনো বোন নেই! উল্টোটাও হতে পারে। মানে পরিবারের সবাই শুধু মেয়ে, কোনো ছেলে নেই। এমনটা দেখলে আমরা সাধারণত ভাবি, এটা স্রেফ কাকতালীয় ব্যাপার বা কপালের লিখন। অনেকেই না বুঝে এর জন্য মাকে দায়ী করেন। কিন্তু এখানে মায়ের সামান্যতম দোষও নেই। কিন্তু কেন এমন হয়?

Visit milkshake.it.com for more information.

সেই প্রশ্নের উত্তরে যাওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের একটি পরিবারের গল্প বলি। ১৭০০ সাল থেকে এই পরিবারের বংশলতিকা ঘেঁটে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, ওই পরিবারে শুধু ছেলেই জন্মায়। এর পেছনে থাকতে পারে একটি স্বার্থপর ওয়াই (Y) ক্রোমোজোম, যে কোনোভাবেই মেয়েসন্তান জন্মাতে দিতে চায় না!

এখন প্রশ্ন ওঠে, স্বার্থপর ক্রোমোজোম কী? আমরা জানি, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পুরুষদের কোষে একটি এক্স (X) এবং একটি ওয়াই (Y) ক্রোমোজোম থাকে। যখন পুরুষের শরীরে শুক্রাণু তৈরি হয়, তখন অর্ধেক শুক্রাণুতে যায় X ক্রোমোজোম এবং বাকি অর্ধেকে Y ক্রোমোজোম। নিয়ম অনুযায়ী, সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে হবে, তার সম্ভাবনা থাকে একদম ফিফটি-ফিফটি।

স্তন্যপায়ী প্রাণীদের পুরুষদের কোষে একটি এক্স (X) এবং একটি ওয়াই (Y) ক্রোমোজোম থাকে

কিন্তু কিছু ক্রোমোজোমের ভেতরে এমন কিছু জিনের ধরন থাকে, যারা এই নিয়মের তোয়াক্কা করে না! তারা চায় শুধু নিজেরাই টিকে থাকতে। এরাই হলো স্বার্থপর ক্রোমোজোম। এই স্বার্থপর ক্রোমোজোমগুলো নানাভাবে ছলচাতুরী করে। যেমন, ডিম্বাণুর দিকে যাওয়ার জন্য শুক্রাণুরা যে একধরনের গন্ধের পথ অনুসরণ করে, এরা অন্য শুক্রাণুদের সেই পথ গুলিয়ে দেয়! আবার কিছু স্বার্থপর ক্রোমোজোম সরাসরি তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী শুক্রাণুদের মেরেও ফেলে! তবে তারা ঠিক কীভাবে এই কাজটা করে, তা আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় রহস্য।

পুরুষেরা কেন নারীদের চেয়ে কম দিন বাঁচে
যখন পুরুষের শরীরে শুক্রাণু তৈরি হয়, তখন অর্ধেক শুক্রাণুতে যায় X ক্রোমোজোম এবং বাকি অর্ধেকে Y ক্রোমোজোম। নিয়ম অনুযায়ী, সন্তান ছেলে হবে নাকি মেয়ে, তার সম্ভাবনা থাকে ফিফটি-ফিফটি।

আমাদের শরীরের ভেতরেও কিন্তু স্বার্থপর X এবং Y ক্রোমোজোমের মধ্যে একধরনের পরিবর্তনের যুদ্ধ চলতে থাকে। একে অপরের প্রভাব নষ্ট করে নিজেদের সংখ্যা বাড়ানোর এই লড়াই প্রাণিজগতে খুব সাধারণ ব্যাপার। তাই মানুষের মধ্যেও যে এরা আছে, তা বলাই বাহুল্য।

কিন্তু মানুষের মধ্যে এদের খুঁজে পাওয়া এত কঠিন কেন? বল্ডউইন-ব্রাউন বলেন, ‘ধরুন, কোনো পরিবারে পরপর পাঁচ, ছয় বা সাতজন ছেলে হলো। এর মানে এই নয় যে সেখানে স্বার্থপর ক্রোমোজোম আছে। কারণ, সাধারণ ভাগ্যের জোরেও এমনটা হতে পারে।’

ভাগ্যের ওপর দোষ না চাপিয়ে আসল সত্য বের করার একটাই উপায়, কয়েকটি প্রজন্মের পুরো ইতিহাস খুঁটিয়ে দেখা। বল্ডউইন-ব্রাউন, নীতিন ফাদনিস এবং তাঁদের দল ঠিক এই কাজটাই করেছেন। তাঁরা উটাহর জনসংখ্যা ডাটাবেস থেকে ৭৬ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন।

দুটি আলাদা পরিসংখ্যান পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা একটি নির্দিষ্ট পরিবারকে খুঁজে পান। দেখা যায়, টানা সাতটি প্রজন্ম ধরে ৩৩ জন পুরুষ একই Y ক্রোমোজোম বহন করে আসছেন। এই ৩৩ জন পুরুষের মোট ৮৯ জন সন্তান হয়েছিল। অবাক করা ব্যাপার হলো, এই ৮৯ জনের মধ্যে ৬০ জনই ছিল ছেলে, আর মেয়ে ছিল মাত্র ২৯ জন!

পুরুষেরা কেন সাধারণত নারীর চেয়ে বেশি লম্বা হয়
বল্ডউইন-ব্রাউন বলেন, ‘ধরুন, কোনো পরিবারে পরপর পাঁচ, ছয় বা সাতজন ছেলে হলো। এর মানে এই নয় যে সেখানে স্বার্থপর ক্রোমোজোম আছে। কারণ, সাধারণ ভাগ্যের জোরেও এমনটা হতে পারে।’

যেহেতু এই ডাটাবেসের তথ্যগুলো গোপন রাখা হয়, তাই বিজ্ঞানীরা সরাসরি ওই পরিবারের কারও ডিএনএ পরীক্ষা করতে পারেননি। বল্ডউইন-ব্রাউন বলেন, ‘তাদের কাছে গিয়ে যদি বলা যেত, আপনার শুক্রাণুটা একটু পরীক্ষা করে দেখতে পারি? এখানে কী ঘটছে আমরা বুঝতে চাই, তবে দারুণ হতো! কিন্তু মানুষের পরিচয় বের করে এই পরীক্ষাগুলো করার জন্য অনেক আইনি কাগজপত্রের ঝামেলা এবং প্রচুর টাকার দরকার।’

যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরির স্টোয়ার্স ইনস্টিটিউট ফর মেডিকেল রিসার্চের বিজ্ঞানী সারাহ জ্যান্ডার্স অবশ্য এই গবেষণা নিয়ে একটু সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তিনি মনে করেন, সংখ্যাটা এখনো অনেক ছোট। অণুজীব নিয়ে কাজ করার সময় তিনিও এমন অনেক অদ্ভুত অনুপাত দেখেছিলেন, যা বড় পরীক্ষা করার পর আর টেকেনি।

সারাহ জ্যান্ডার্সের মতে, এখানে পরকীয়া বা পিতৃপরিচয়ের ভুলেরও একটা বিষয় থাকতে পারে। মজার ছলে তিনি বলেন, ‘আমি মানুষের ওপর বিশেষজ্ঞ নই ঠিকই, তবে টেলিভিশনে সস্তা সিরিয়াল দেখে আমার মনে হয়, দু-এক জায়গায় পিতৃপরিচয়ের ভুলও তো হতে পারে!’ তবে বল্ডউইন-ব্রাউন জানিয়েছেন, তাঁরা এই সম্ভাবনাগুলো মাথায় রেখেই কাজ করেছেন এবং তাঁদের কাছে থাকা ডেটা যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য।

পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের পেছনে স্বার্থপর Y ক্রোমোজোমের বড় হাত থাকতে পারে

স্বার্থপর Y ক্রোমোজোম খুঁজে বের করাটা শুধু বইয়ের পাতায় আটকে রাখার মতো কোনো বিষয় নয়। নীতিন ফাদনিস বলছেন, পুরুষদের বন্ধ্যাত্বের পেছনে এর বড় হাত থাকতে পারে। যে ক্রোমোজোম নিজের স্বার্থে শরীরের অর্ধেক শুক্রাণুকে মেরে ফেলে, তার কারণে ওই পুরুষের বাবা হওয়ার ক্ষমতা যে কমে যাবে, সেটাই তো স্বাভাবিক! প্রাণীদের ওপর করা গবেষণাতেও দেখা গেছে, স্বার্থপর ক্রোমোজোম বন্ধ্যাত্ব ডেকে আনতে পারে।

মানুষের বংশগত রোগ কি ক্রোমোজোম বহন করে?
ডিএনএর যেকোনো অংশ যদি ফিফটি-ফিফটি নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজেকে বেশি মাত্রায় বংশধরদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে, তবে বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে জিন ড্রাইভ বলে।

বিজ্ঞানীরা এখন শুক্রাণুর নমুনা সংগ্রহ করে X এবং Y ক্রোমোজোমের এই অনুপাত মাপার পরিকল্পনা করছেন। তারা মূলত Y ক্রোমোজোমের দিকেই নজর দিচ্ছেন। কারণ পুরুষদের বংশলতিকা ধরে এটি ট্র্যাক করা সহজ। তাছাড়া, মেয়েসন্তান বেশি হওয়ার পেছনে শুধু স্বার্থপর X ক্রোমোজোম নয়, বরং অন্য কোনো প্রাণঘাতী মিউটেশনও দায়ী থাকতে পারে।

শুধু X বা Y ক্রোমোজোম নয়, ডিএনএর যেকোনো অংশ যদি ফিফটি-ফিফটি নিয়মের বাইরে গিয়ে নিজেকে বেশি মাত্রায় বংশধরদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে, তবে বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে জিন ড্রাইভ বলে। বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত ক্রিসপার নামে জিন-এডিটিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন কৃত্রিম জিন ড্রাইভও তৈরি করা হচ্ছে। আর এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ম্যালেরিয়া ছড়ানো বন্ধ করা বা ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ ধ্বংস করার মতো দারুণ সব কাজ করার কথা ভাবছেন বিজ্ঞানীরা।

বুঝতে পারছেন, আমাদের শরীরের ভেতরের জিনগুলোও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য রীতিমতো যুদ্ধ করে চলেছে!

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চসূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট ক্রিসপার, না বেস এডিটর?

Read full story at source