এক ক্লিকেই তছনছ হয়ে গেল আমার জীবন!

· Prothom Alo

আমার দাদির বিছানার ঠিক ওপরে বাবার একটা সাদা-কালো ছবি বাঁধানো ছিল। ছোটবেলায় আমি মুগ্ধ হয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। কী সুন্দর মায়াবী চোখ, কালো চুল, মিষ্টি একটা হাসি! ছবিটার দিকে তাকালে মনে হতো, আত্মবিশ্বাসী ও সুদর্শন এক তরুণ যেন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছে।

Visit een-wit.pl for more information.

কিন্তু আরেকটু বড় হওয়ার পর জানলাম, ওই ছবিটা মোটেও আমার বাবার নয়! ওটা ছিল বিখ্যাত গায়ক এলভিস প্রিসলির ছবি! দাদি নাকি প্রিসলির অন্ধ ভক্ত ছিলেন। সত্যিটা জানার পর বাবা-মা হাসাহাসি করলেও অপমানে রীতিমতো আমার কান লাল হয়ে গিয়েছিল।

এর দশ বছর পর, একদিন পরিবারের সবাই মিলে সকালের নাশতা করছিলাম। কথার ফাঁকে হঠাৎ জানতে পারলাম, ওই দাদির সঙ্গে আমাদের আসলে রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই! আমাদের নামের শেষ অংশটা এক হলেও, আমাদের জিন এক নয়। কারণ, বাবা ছিলেন দত্তক নেওয়া সন্তান!

আমি তখন কমলালেবুর জুস খাচ্ছিলাম। কথাটা শুনে আমার চারপাশটা যেন কেমন চক্কর দিয়ে উঠল! পরিবারের সবাই এই সত্যিটা জানত, শুধু আমি ছাড়া। তারা ধরে নিয়েছিল, আমি হয়তো আগে থেকেই জানি।

বাবা দত্তক সন্তান ছিলেন, এ ব্যাপারটা আমার কাছে কোনো সমস্যা ছিল না। সমস্যা ছিল এই লুকোচুরি। ১৯৫০-এর দশকে অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের অনেক সময় বাধ্য হয়ে তাদের সদ্যোজাত বাচ্চা অন্যদের দিয়ে দিতে হতো। বাবাও ছিলেন সেই সময়ের এক ভুক্তভোগী। মা আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমার বাবা যাদের কাছে বড় হয়েছেন, তাদেরকেই নিজের আসল বাবা-মা মনে করেন। তাই সে নিজে থেকে কখনো তাঁর জন্মদাতা বাবা-মায়ের খোঁজ নিতে চায়নি।’

কিন্তু আমার মনে কৌতূহলের কোনো শেষ ছিল না। আমি বড় হয়ে সাংবাদিকতা ও ডকুমেন্টারি বানানোর পেশায় জড়িয়ে পড়লাম। আমার বাবার আসল শিকড় কোথায়, আমার ভাইবোনদেরই উৎস কী; এই প্রশ্নটা আমাকে সব সময় তাড়া করে ফিরত।

কিছু পরিবারে কেন ছেলে সন্তান বেশি হয়
১৯৫০-এর দশকে অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের অনেক সময় বাধ্য হয়ে তাদের সদ্যোজাত বাচ্চা অন্যদের দিয়ে দিতে হতো। বাবাও ছিলেন সেই সময়ের এক ভুক্তভোগী।

দুই

আরও এক দশক পার হয়ে গেল। ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে আমি ‘23andMe’ নামে একটি ডিএনএ টেস্ট ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন দেখলাম। ক্রিসমাসের অফার চলছিল। তাই আমি দেরি না করে রেজিস্ট্রেশন করে ফেললাম। আমার কাছে এটা দারুণ একটা সুযোগ মনে হলো! বাবাকে কিছু না জানিয়েই আমি তাঁর আসল পরিবারের ব্যাপারে জানতে পারব। কাজটাও খুব সোজা, কুরিয়ারে একটু থুতুর স্যাম্পল পাঠাতে হবে, আর ছয় সপ্তাহের মধ্যে পুরো বংশপরিচয় ও স্বাস্থ্যের ডাটাবেস আমার ফোনে চলে আসবে!

একদিন কথায় কথায় আমি মাকে টেস্টের ব্যাপারটা বললাম। মা একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি সত্যিই সব জানতে চাও?’ আমি যে বাবার দিককার পরিবারের খোঁজ নিতে এই টেস্ট করাচ্ছি, তা মাকে বলিনি।

‘হ্যাঁ, কেন নয়?’ আমি উত্তর দিলাম।

মা তখন বললেন, ‘হয়তো এমন কিছু জানতে পারবে, যা তুমি কখনো জানতে চাওনি!’

আমি ভেবেছিলাম, মা হয়তো আমার কোনো জেনেটিক রোগ বা ক্যানসারের ঝুঁকির কথা ভেবে ভয় পাচ্ছেন। এর বাইরে যে অন্য কিছু হতে পারে, তা ঘুণাক্ষরেও আমার মাথায় আসেনি।

ছয় সপ্তাহ পর রেজাল্ট এল। ‘ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত: ৯৫ শতাংশ যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ড থেকে’। খুব বোরিং রেজাল্ট! ওই ওয়েবসাইটে আমার কাছের কোনো ডিএনএ আত্মীয়ের নামও এল না। আমি পরিবারকে এই বোরিং রেজাল্টের ম্যাপ ও চার্ট দেখালাম। তারা শুধু বলল, ‘ওহ, দারুণ তো!’ ব্যস, এইটুকুই।

যে ডিএনএ টেস্ট ভিলেন বানিয়ে দিয়েছিল একজন মাকে
আমি ভেবেছিলাম, মা হয়তো আমার কোনো জেনেটিক রোগ বা ক্যানসারের ঝুঁকির কথা ভেবে ভয় পাচ্ছেন। এর বাইরে যে অন্য কিছু হতে পারে, তা ঘুণাক্ষরেও আমার মাথায় আসেনি।

তিন

তিন বছর পর আমি আবার ওই ওয়েবসাইটে লগইন করলাম। একটা বোতামে ক্লিক করলাম, আর মুহূর্তের মধ্যে আমার পুরো জীবনটা যেন ওলটপালট হয়ে গেল!

আমি ওই ডিএনএ ওয়েবসাইটে বাবার আদি পরিবারের খোঁজ নিতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওয়েবসাইট আমাকে জানাল, আমার বাবা আমার জন্মদাতা পিতাই নন!

ডিএনএ রিলেটিভস তালিকার একদম ওপরে নতুন একটা নাম জ্বলজ্বল করছে। ‘লুসি। সৎবোন। ২৭.৯ শতাংশ ডিএনএ মিল।’

আমি বোকার মতো স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এটা তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়! আমার তো কোনো সৎবোন নেই। নিশ্চয়ই কোনো ভুল হয়েছে। আমি গুগলে সার্চ করলাম, ‘রং ডিএনএ ম্যাচ’। গুগল উত্তর দিল ‘এমন ভুল খুবই বিরল’, ‘৯৯.৯ শতাংশ নিখুঁত’, ‘হতে পারে, কিন্তু সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।’

আমি লুসির প্রোফাইলে ক্লিক করলাম। জন্মসাল ১৯৯০। দেশ ইংল্যান্ড। আমি একটি টেস্টটিউব শিশু। নটিংহ্যাম কুইনস মেডিকেল সেন্টারে আমার জন্ম। আমি আমার আসল বাবাকে খুঁজে পেতে চাই।’

আমাদের দুজনের বয়সের পার্থক্য মাত্র ছয় মাস! আমি লেখাটা বারবার পড়লাম। আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল।

আমি শৈশব থেকেই জানতাম যে আমরা চার ভাইবোনই টেস্টটিউবের মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছি। আমরা চারজন মানে টিম, আমি, জো এবং রুথ। এর মধ্যে শেষের তিনজন, অর্থাৎ আমি, জো আর রুথ ট্রিপলেট যমজ; আমরা একই দিনে জন্মেছি।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? আমার বাবা কি আইভিএফ করার সময় তাঁর অতিরিক্ত শুক্রাণু অন্য কোনো পরিবারকে দান করেছিলেন? নাকি ল্যাবে কোনো গন্ডগোল হয়েছিল?

পুরুষেরা কেন নারীদের চেয়ে কম দিন বাঁচে
আমি বোকার মতো স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এটা তো কোনোভাবেই সম্ভব নয়! আমার তো কোনো সৎবোন নেই। নিশ্চয়ই কোনো ভুল হয়েছে। আমি গুগলে সার্চ করলাম, ‘রং ডিএনএ ম্যাচ’।

চার

ফেব্রুয়ারি মাসের কনকনে ঠান্ডার মধ্যে আমি বাইরে এসে মাকে ফোন করলাম। ‘হ্যালো মা, একটা খুব অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে’, আমি বললাম। ‘তোমার কি মনে আছে, আমি একটা ডিএনএ টেস্ট করিয়েছিলাম?’

‘হ্যাঁ,’ মা বললেন।

‘আমি ওয়েবসাইটে লগইন করে দেখলাম, আমার নাকি একটা সৎবোন আছে!’

‘কী?’ মা বেশ অবাক হলেন।

‘বলিস কী! তুই কি নিশ্চিত যে ওটা সৎবোনই?’

‘ওয়েবসাইট তো তা-ই বলছে। আমি আরেকটু খোঁজ নিয়ে দেখছি।’

ফোন রাখার পর আমি আবার ইন্টারনেটে ডুব দিলাম। জানলাম, আপন ভাইবোনদের মধ্যে সাধারণত ৫০ শতাংশ ডিএনএ মিল থাকে, আর সৎভাইবোনদের মধ্যে থাকে ২৫ শতাংশ। আরও কিছু আত্মীয়ের সঙ্গে ২৫ শতাংশ ডিএনএ মিল থাকতে পারে; যেমন দাদা-দাদি, খালা-ফুফু বা ভাতিজা-ভাতিজি। কিন্তু লুসি আমার চেয়ে মাত্র ছয় মাসের বড়!

আমি লুসিকে ওয়েবসাইটে একটা মেসেজ পাঠালাম: ‘হাই লুসি! এই ডিএনএ রেজাল্টটা আমাকে বেশ চমকে দিয়েছে। তুমি তোমার আসল বাবার ব্যাপারে কী জানো?’

লুসির উত্তর আসতে দেরি হলো না: ‘হ্যালো! আমার বাবা ছিলেন একজন স্পার্ম ডোনার। আমি যত দূর জানি, তিনি ছিলেন একজন তরুণ মেডিকেল ছাত্র, উচ্চতা ৬ ফুট ৩ ইঞ্চি, চোখের রং সবুজ। আমি জানি না এটা কতটুকু সত্যি, তবে আমার ও আমার যমজ বোনের চোখও সবুজ-ধূসর। তোমার বাবাও কি স্পার্ম ডোনার ছিলেন?’

আমি মেসেজটার স্ক্রিনশট নিয়ে মাকে পাঠালাম। লিখলাম, ‘মা, আমি তো এখন ভয় পাচ্ছি যে ওই মেডিকেল ছাত্রের শুক্রাণুর সঙ্গে বাবারটা মিশে গিয়েছিল কি না! নাকি...বাবার সঙ্গে আমার আসলে রক্তের কোনো সম্পর্কই নেই?’

মিনিট চারেক পর মায়ের উত্তর এল। ‘তোর বাবা আর আমার এটা নিয়ে ভাবতে একটু সময় লাগবে। আমরা কি উইকএন্ডে কথা বলতে পারি?’

মায়ের মেসেজের সুরটা কেমন যেন গম্ভীর। আমার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।

আপনি কি সচেতনভাবে স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান
আপন ভাইবোনদের মধ্যে সাধারণত ৫০ শতাংশ ডিএনএ মিল থাকে, আর সৎভাইবোনদের মধ্যে থাকে ২৫ শতাংশ। আরও কিছু আত্মীয়ের সঙ্গে ২৫ শতাংশ ডিএনএ মিল থাকতে পারে।

পাঁচ

তিন দিন পর আমি ট্রেন ধরে বাবা-মায়ের বাড়িতে গেলাম। রাতের বেলা পৌঁছানোয় সেদিন আর কোনো কথা হলো না। পরদিন সকালে মা-বাবাকে বসার ঘরে নিয়ে দরজা লক করে দিলাম।

‘দয়া করে আমাকে সত্যিটা বলবে?’ আমি জানতে চাইলাম।

বাবা সোফায় বসে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখলেন। মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলা শুরু করলেন।

‘আমার ফেলোপিয়ান টিউব ব্লক থাকায় ফার্টিলিটি চিকিৎসার জন্য গিয়ে চিকিৎসকদের কাছে জানতে পারলাম, তোর বাবার শুক্রাণুগুলোও কার্যকর নয়।’ মা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। ‘ক্লিনিক থেকে তখন আমাদের একজন স্পার্ম ডোনারের প্রস্তাব দেওয়া হয়।’

আমার বুকের ওপর থেকে যেন একটা ভারী পাথর নেমে গেল। অবশেষে আমি সত্যিটা জানতে পেরেছি। ‘এই কথাটা আমি, তোর বাবা আর হাসপাতালের স্টাফরা ছাড়া কেউ জানত না,’ মা বললেন। ‘ওরাই আমাদের বলেছিল ব্যাপারটা গোপন রাখতে।’

আমি বুঝতে পারছিলাম না কী বলব। আমি শুধু মাথা নাড়লাম।

মা চোখের ইশারায় বাবাকে দেখালেন। বাবা ততক্ষণে দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। আমি ছুটে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরলাম। আমার জীবনে বাবাকে আমি এর আগে মাত্র একবারই কাঁদতে দেখেছিলাম, ২০ বছর আগে যখন তাঁর মা মারা গিয়েছিলেন।

‘সব ঠিক আছে, বাবা,’ আমি তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললাম। ‘এতে কিছুই বদলাবে না।’

আমি নিজের এই বোকামি ও কৌতূহলের জন্য নিজেকেই অভিশাপ দিচ্ছিলাম। একটা অজানা মাইনফিল্ডে পা দিয়ে আমি সব তছনছ করে দিয়েছি!

‘তোমরা কি ক্যাটালগ দেখে ডোনার বেছে নিয়েছিলে?’ আমি নীরবতা ভাঙার জন্য জিজ্ঞেস করলাম।

‘না, হাসপাতাল থেকেই সব ঠিক করে দিয়েছিল,’ মা বললেন। ‘আমরা কখনো ভাবিনি তুই এসব জেনে যাবি। আমরা তো আর জানতাম না যে ভবিষ্যতে এমন ডিএনএ ওয়েবসাইট তৈরি হবে!’

বাবা ভেজা গলায় বললেন, ‘আমাদের এখন সবাইকে সত্যিটা বলতে হবে।’

‘না!’ আমি বাধা দিলাম। ‘আমাদের কাউকে কিচ্ছু জানানোর দরকার নেই।’ বাকি তিন ভাইবোনের মন ভাঙার কথা আমি চিন্তাও করতে পারছিলাম না।

মস্তিষ্কের নেটওয়ার্ক কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে
‘না, হাসপাতাল থেকেই সব ঠিক করে দিয়েছিল,’ মা বললেন। ‘আমরা কখনো ভাবিনি তুই এসব জেনে যাবি। আমরা তো আর জানতাম না যে ভবিষ্যতে এমন ডিএনএ ওয়েবসাইট তৈরি হবে!’

ছয়

এর মধ্যে সৎবোন লুসির সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ শুরু হয়ে গেল। ওর এক যমজ বোনও আছে, নাম লিবি। একদিন আমরা তিনজন মিলে পূর্ব লন্ডনের একটা পাবে খেতে গেলাম। দেখা গেল, আমরা তিনজনই দেখতে প্রায় একই রকম!

২০২০ সালের শুরুর দিকে লুসি ও লিবির মেসেজ পেয়ে আমি চমকে গেলাম। ‘আমরা তাকে খুঁজে পেয়েছি!’ সেই স্পার্ম ডোনারও ওই ডিএনএ ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন। লুসি তাঁকে মেসেজ দেওয়ার পর তিনি উত্তরও দিয়েছেন: ‘হাই লুসি, আমি বুঝতে পারছি আমি তোমার এবং তোমার যমজ বোন লিবির বায়োলজিক্যাল বাবা। আমি নটিংহ্যাম ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করেছি।’

লুসি ও লিবি মিলে তাঁর কাছ থেকে আরও অনেক তথ্য বের করে ফেলল। তাঁর নাম রডনি (ছদ্মনাম)। তাঁর নিজের ২০ বছরের একটা মেয়ে আছে। এমনকি রাশিয়ায় নাকি তাঁর আরও যমজ সন্তান আছে! আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল। আমি নিজের থেকে রডনির সঙ্গে যোগাযোগ করার সাহস পাচ্ছিলাম না।

করোনা মহামারির সময় আমার চাকরি চলে গেল, প্রেমিকের সঙ্গে ব্রেকআপ হলো এবং আমি আবার বাবা-মায়ের কাছে ফিরে এলাম। তখন আমার বয়স ২৮।

নিজের এই পারিবারিক গোপন সত্যিটা আমাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। এই মানসিক শান্তি ফিরে পেতে আমি এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি ঠিক করলাম, আমি আমার নিজের ডিম্বাণু কোনো অচেনা মানুষকে দান করব!

আমি ভাবলাম, এমনিতেও তো প্রতি মাসে আমার ডিম্বাণুগুলো নষ্ট হচ্ছে, তার চেয়ে এগুলো দিয়ে যদি অন্য কেউ সন্তানের মুখ দেখতে পারে, তবে ক্ষতি কী? আমি একটা এগ ডোনেশন এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করলাম।

ডিম্বাণু দান করার আগে আমাকে আমার বাবা-মা এবং দাদা-দাদির পরিবারের স্বাস্থ্যগত পুরো ইতিহাস জানাতে বলা হলো। বুঝলাম, এখন আমাকে রডনির সঙ্গে যোগাযোগ করতেই হবে! আমি মাকে আমার এই ডিম্বাণু দানের সিদ্ধান্তের কথা জানালাম। মা অবাক হলেও আমাকে বাধা দিলেন না।

মুখে ঘা হয় কেন, কী করলে ভালো হবে
লুসি ও লিবি মিলে তাঁর কাছ থেকে আরও অনেক তথ্য বের করে ফেলল। তাঁর নাম রডনি। তাঁর নিজের ২০ বছরের একটা মেয়ে আছে। এমনকি রাশিয়ায় নাকি তাঁর আরও যমজ সন্তান আছে!

সাত

রডনিকে আমি প্রথম ইমেইলে জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কবে থেকে শুক্রাণু দান করা শুরু করেছিলেন। কারণ আমি জানতে চাইছিলাম, আমার বড় ভাই টিমের বাবাও তিনি কি না।

রডনি জানালেন, টিমের জন্মের সময় তিনি কেবল নটিংহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন, তাই তিনি টিমের বাবা হতে পারেন না। শুনে আমার খুব মন খারাপ হলো। বুঝলাম, টিমও আসলে আমাদের আরেক সৎভাই!

আমি রডনির সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বললাম। জানতে চাইলাম, কেন তিনি এই শুক্রাণু দানের কাজ শুরু করেছিলেন।

‘অন্যকে সাহায্য করা, আর সেই সঙ্গে কিছু টাকা রোজগার করাটা আমার কাছে বেশ মজার মনে হয়েছিল,’ রডনি বললেন।

‘প্রতিবার ডোনেট করার জন্য আমাকে ১০ পাউন্ড করে দেওয়া হতো। ওই টাকা দিয়ে আমি ২০ গ্লাস বিয়ার খেতে পারতাম!’

শুনে আমার কেমন যেন ঘেন্না লাগল। আমি জানতে চাইলাম, তিনি কত দিন এই কাজ করেছেন। ‘সপ্তাহে দুই-তিনবার করে টানা চার-পাঁচ বছর,’ বললেন রডনি। ‘হিসেব করলে কয়েক লিটার শুক্রাণু হবে!’

আমি মনে মনে আফসোস করলাম, কেন এই প্রশ্নটা করতে গেলাম! ২০০৫ সালের আগে যুক্তরাজ্যে স্পার্ম ডোনারদের নাম-পরিচয় গোপন রাখার আইন ছিল। পরে সেই আইন বদলায়। রডনি নিজে থেকে ডিএনএ ওয়েবসাইটে নাম না দিলে আমি হয়তো জীবনেও তাঁর পরিচয় জানতে পারতাম না।

রডনি খুব ভালো মানুষ। তিনি আমাদের খোঁজখবর নেন, ক্রিসমাসে উইশ করেন। কিন্তু আমি তাঁকে মানতে পারি না। তাঁর মেসেজ এলে আমি বিরক্ত হই। মনে হয়, কেউ যেন আমার জীবনে জোর করে ঢুকে পড়েছে। আমার তো একজন বাবা আছেনই, আমার আরেকজন বাবার কোনো দরকার নেই!

স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চোখ জ্বলে? জানুন বাঁচার উপায়
শুনে আমার কেমন যেন ঘেন্না লাগল। আমি জানতে চাইলাম, তিনি কত দিন এই কাজ করেছেন। ‘সপ্তাহে দুই-তিনবার করে টানা চার-পাঁচ বছর,’ বললেন রডনি।

আট

২০২২ সালের ক্রিসমাসের পরদিন আমরা সব ভাইবোন মিলে বড় ভাই টিমের বাড়িতে আড্ডা দিচ্ছিলাম। আমি ঠিক করলাম, আজই সেই দিন। আজই সব সত্যি বলে দিতে হবে। আমি তাদের পুরো গল্পটা খুলে বললাম। আমি ভেবেছিলাম তারা হয়তো চিৎকার করবে, কাঁদবে বা রেগে যাবে। কিন্তু না, সবাই খুব মন দিয়ে পুরো ঘটনা শুনল।

আমার বোন রুথ বলল, ‘ব্রেক্স (আমার ডাকনাম), এত দিন ধরে তুই একা এত বড় একটা সত্যি নিজের ভেতরে লুকিয়ে রেখেছিস! তোর কত কষ্টই না হয়েছে!’ আমার ভাই টিম জানতে চাইল, ‘আমাদের সবার ডোনার কি একই ব্যক্তি?’ আমি জানালাম যে টিম বাদে আমাদের তিনজনের ডোনার হয়তো একই। টিম মাথা নিচু করে রইল।

সবশেষে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা যে এই সত্যিটা জেনে গেছি, সেটা বাবা-মাকেও জানিয়ে দেওয়া উচিত। আর কোনো লুকোচুরি নয়।

ডিম্বাণু দান করার তিন বছর পর, আমি ক্লিনিকে খোঁজ নিলাম আমার ডিম্বাণু থেকে কোনো বাচ্চার জন্ম হয়েছে কি না। ক্লিনিক জানাল, ২০২২ সালে একজন নারী আমার ডিম্বাণু ব্যবহার করে একটি ফুটফুটে কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছেন!

কোথাও না কোথাও একটি ছোট্ট মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যার সঙ্গে আমার রক্তের সম্পর্ক আছে, কিন্তু সে আমার কেউ নয়। মেয়েটি নিশ্চয়ই খুব আদরে বড় হচ্ছে। খবরটা শুনে আমি খুব খুশি হয়েছি, কিন্তু বুকের ভেতরে কেমন যেন একটা অদ্ভুত শূন্যতাও কাজ করছে।

জীবন যেন একটা গোল চক্রের মতো! কে জানে, ওই মেয়েটা বড় হয়ে হয়তো একদিন ঠিক আমার মতোই তার জন্মপরিচয় খুঁজতে শুরু করবে। কে জানে, হয়তো সে-ও একদিন আমাকে খুঁজে বের করবে!

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে শিউলী সুলতানাশিশুর মস্তিষ্কের ব্লুপ্রিন্ট

Read full story at source