আমি অতীত পছন্দ করি না, বর্তমানকেই উপভোগ করি—জাংকুক
· Prothom Alo

বাধ্যতামূলক মিলিটারি সার্ভিসের পর আবার গানে ফিরেছে জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটিএস। ব্যান্ডের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য জাংকুক। সম্প্রতি রোলিং স্টোন পত্রিকাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে জাংকুক তাঁর জীবনের বেশ কিছু দিক তুলে ধরেছেন। দলের সবচেয়ে ছোট সদস্য থেকে একক শিল্পী হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার দীর্ঘ যাত্রা নিয়ে কথা বলেছেন তিনি। জানিয়েছেন ভালো থাকার জন্য কীভাবে তিনি নিজের যত্ন নেন। আরও জানিয়েছেন, সংগীত থেকে দূরে থাকাটা কীভাবে সংগীতের প্রতি তাঁর ভালোবাসাকে নতুনভাবে জাগিয়ে তুলেছে। রোলিং স্টোন পত্রিকার হয়ে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ক্রিস্টাল বেল। তোমাদের জন্য তা অনুবাদ করেছেন আলিয়া রিফাত।
জাংকুককে নিয়ে প্রশ্নের শেষ নেই। নিঃসন্দেহে তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় পপশিল্পীদের একজন। প্রায় ১৮ মাস সামরিক বাহিনীতে ছিলেন তিনি। লোকচক্ষুর আড়ালে, সামরিক বাহিনীর রাঁধুনি হিসেবে রান্নাঘরেই কেটেছে বেশির ভাগ সময়। সময়টা কেমন কেটেছে? আবার গানের জগতে ফিরে এসে কেমন লাগছে তাঁর? লস অ্যাঞ্জেলেসে বিটিএসের নতুন অ্যালবামের কাজই বা কেমন হলো? এমন অনেক প্রশ্নই করার ছিল তাঁকে। নিউইয়র্কের ওয়েস্ট সাইডে অবস্থিত সানলিট স্টুডিওতে আমাদের দেখা হলো। আজ তাঁর গ্লোবাল কভারের ফটোশুট। জাংকুক এখন প্রতিদিনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর প্রতি আগের চেয়েও মনোযোগী। যেমন খাওয়াদাওয়া। জাংকুক বলেন, ‘আমি এখন ডায়েট করছি। দিনে একবারই খাই। খাবারটার জন্য খুব ধৈর্য আর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করি আমি। ভাবি—“আজকে কী খাব?” শেষমেশ যখন খাই, মনে হয় বড় কিছু একটা অর্জন করে ফেলেছি।’
Visit asg-reflektory.pl for more information.
আজকের খাবারটা এখনো জাংকুকের সামনেই রয়েছে। এক বন্ধুর পরামর্শে একটি লোকাল কোরিয়ান ফিউশন রেস্টুরেন্ট থেকে আনা। লেট লাঞ্চ, আর্লি ডিনার-ব্রেকফাস্ট, একসঙ্গেই সবকিছু। জাংকুকের শিডিউল এতই ব্যস্ত যে খাওয়ার জন্য আলাদা কোনো সময় ঠিক করা নেই। যখন পারেন, খেয়ে নেন। ২০২৩ থেকেই কেলভিন ক্লেইনের গ্লোবাল ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর জাংকুক। লোয়ার ম্যানহাটানে তাঁদের স্প্রিং-সামার শোতে অংশ নিয়েই তিনি চলে এসেছেন।
বর্তমান নিয়ে ভাবতেই পছন্দ করেন জাংকুক। অতীত বা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে তাঁর ভালো লাগে না। পুরোনো রোলিং স্টোন ম্যাগাজিনের স্তূপগুলোর একটিতে তাঁর বেশ কয়েক বছর আগের একটি ছবি ছিল। আরও কয়েক বছরের ছোট নিজেকে ম্যাগাজিনের স্তূপ থেকে উঁকি মারতে দেখে মজার ছলে ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলেন, ‘কে এটা? আপনারা এ রকম একটা কভার কেন বেছে নিয়েছিলেন?’ নিজের পুরোনো ছবি দেখে বিশেষ কোনো আবেগ তাঁর চেহারায় ফুটে উঠল না। শুধু মাথা নাড়িয়ে একটু হাসলেন। যে তিনি এখন আর নেই, তাঁকে নিয়ে যেন ভাবতেই চাইলেন না। নিজেই বললেন, ‘আমি অতীত পছন্দ করি না। বর্তমানকেই উপভোগ করি।’
জেনারেশনের পর জেনারেশন আমাদের গান শুনছে—ওয়ারফেজযখন তোমার কিশোর বয়স, তরুণ বয়স, পুরো জীবনটাই লাখ লাখ মানুষের সামনে দেখানো হয়, তখন হয়তো জীবন নিয়ে এ রকমটা ভাবাই স্বাভাবিক। প্রতিটি ছবি, ভিডিও, পারফরম্যান্স—সবকিছুই তোমার একেকটি রূপ তুলে ধরে, যেগুলোকে ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। জাংকুকের সব বয়সের, সব কটি রূপই কোথাও না কোথাও বেঁচে আছে। পর্দায়, গানে, ম্যাগাজিনের কভারে, অপরিচিত ব্যক্তিদের স্মৃতিতে।
কারও কারও কাছে তিনি এখনো বিটিএসের শিশুসুলভ ম্যাকনে (কোরিয়ান ব্যান্ড দলগুলোর সর্বকনিষ্ঠ সদস্যদের ম্যাকনে বলা হয়), সারাক্ষণই যাঁর মুখে দাঁত বের করা হাসি। অন্যদের কাছে তিনি ২৮ বছরের এক আত্মবিশ্বাসী যুবক। জাংকুক নিজেকে বাস্তববাদী হিসেবে দাবি করেন। অতীতের সবকিছুই যখন রেকর্ড করা আর সংরক্ষিত, তখন আসলে শুধু বর্তমান ছাড়া অন্য কোনো কিছুর ওপরেই নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সোশ্যাল মিডিয়াতেও কম আসেন জাংকুক।
২০২৩ সালে তিনি নিজের ব্যক্তিগত ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট ডিলেট করে দিয়েছিলেন। কোটি কোটি ফলোয়ার একমুহূর্তে উধাও। কারণ হিসেবে জানিয়েছিলেন, তিনি ইনস্টাগ্রাম খুব একটা ব্যবহার করেন না। ২০২৫ সালে আবার ফিরে এলেন নীরবেই। এতগুলো মাস পরও সেই নতুন অ্যাকাউন্ট শূন্য। কোনো পোস্ট নেই, ক্যাপশন নেই। ১৪ মিলিয়ন ফলোয়ার অপেক্ষা করছেন শুধু একটি পোস্টের জন্য, যা হয়তো কখনোই আসবে না। অথচ নিজের প্রিয় পোষা কুকুর ব্যামের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট তিনি নিয়মিত আপডেট করেন। মাসে দুই-তিনবার তিনি উইভার্সে আসেন। মুহূর্তেই জয়েন করেন কোটি কোটি দর্শক। ভক্তদের সামনেই তিনি খাবার খান, মুভি দেখেন কিংবা চুপচাপ বসে থাকেন। এমনই এক লাইভে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ছয় মিলিয়ন দর্শক নিঃশব্দে সেই লাইভ দেখেছিলেন।
পাখির ভাষা বোঝেন যিনিঅতিরিক্ত চিন্তা করা জাংকুক পছন্দ করেন না। তিন বলেন, ‘যখন আমি স্টেজে থাকি, তখন মাথা একদম খালি করে ফেলি, বাজে চিন্তা সরিয়ে রাখি। যখন নতুন অ্যালবামের কাজ করি কিংবা পারফরম্যান্সের প্রস্তুতি নিই, তখন পুরো উদ্দীপনা ঢেলে দিই। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের সবকিছু করি খুব সাধারণভাবে। সরলভাবে চিন্তা করি।’
১৫ বছর বয়সে জাংকুক বিটিএসের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। পাঁচ বছরের মাথায়ই দলটি বিশ্বজোড়া খ্যাতি লাভ করে। এক যুগ ধরে পুরো পৃথিবী চোখের সামনেই তাঁকে বেড়ে উঠতে দেখেছে। আজকের পরিণত জাংকুক আগের চেয়ে কঠোরভাবে নিয়মশৃঙ্খলা মেনে চলেন। তিনি বলেন, ‘আমি এখন নিজের স্বাস্থ্যের দিকে বেশি নজর দেওয়ার চেষ্টা করছি। ব্যাডমিন্টন খেলি। বোলিং, জগিংসহ যেসব কাজ করলে শরীর ভালো থাকে, সেগুলো বেশি করি।’ ব্যায়াম করার সময় তিনি গানও শোনেন না। ‘আমার সব মনোযোগ থাকে শুধু আমার দিকেই,’ বললেন জাংকুক। তিনি আরও বলেন, ‘মিলিটারি সার্ভিসের পর আমি আগের চেয়েও গভীরভাবে চিন্তা করতে শিখেছি। সময়ের ব্যাপারেও আগের চেয়ে সচেতন থাকি। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো এখন এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। আমি এখন সময়ের মূল্য বুঝি এবং নিজের সময়গুলো আরও অর্থপূর্ণ কাজে ব্যয় করতে চাই।’
ব্যস্ততার মধ্যেও ছোট ছোট কিছু কাজ নিয়মিত করার মাধ্যমে তিনি মানসিকভাবে স্থির থাকেন। জাংকুক বলেন, ‘এক দিনেই অনেক বেশি পরিশ্রম করার চেয়ে ছোট ছোট কাজ নিয়মিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি প্রতিদিন গোসলের আগে এবং ঘুমাতে যাওয়ার আগে কার্ডিও করি। এই রুটিন আমার অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে। আগে যেভাবে অন্যদের সঙ্গে মিশতাম, খাওয়াদাওয়া করতাম, সবই এখন পাল্টে গেছে। সারা দিন রুটিন মেনে চলা আমার মধ্যে সাফল্য এবং আত্মবিশ্বাসের অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।’
আমার কাজটাই হলো যেটা তুঙ্গে ওঠে, সেটা ছেড়ে দেওয়া— রকিব হাসানদীর্ঘ বিরতির পর ফিরেছে বিটিএসজাংকুকের কাছে শৃঙ্খলা মানে শুধু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা নয়; বরং নিজের জীবনকে স্পষ্টভাবে বোঝা। জানতে চাইলাম, এখন কি তিনি নিজেকে আগের চেয়ে বেশি কাছ থেকে অনুভব করেন? তিনি একটু থামলেন। সোজাসাপটাভাবে বললেন, ‘সত্যি বলতে, আমি এখনো নিজেকে পুরোপুরি কাছ থেকে চিনি বলে মনে করি না। তবে প্রশ্নটা আমাকে বুঝতে সাহায্য করেছে যে আমার নিজের প্রতি আরও যত্ন আর ভালোবাসার প্রয়োজন। নিয়মিত ব্যায়াম করা আর স্বাস্থ্যকর অভ্যাস বজায় রাখা, এগুলোই নিজেকে ভালোবাসার অংশ।’
জানতে চাইলাম, এখন তাঁকে কী অনুপ্রেরণা দেয়। তিনি বললেন, ‘আমি যেকোনো জায়গা থেকে সহজে অনুপ্রেরণা পাওয়ার মানুষ নই। কোনো শিল্পকর্ম আমাকে নাড়া দিলে, আমি সাধারণত সেই অনুভূতিটা অন্য কিছুতে না নিয়ে গিয়ে একই ক্ষেত্রের ভেতরেই কাজে লাগাতে চাই।’
অনুভূতিকে কীভাবে সহজভাবে প্রকাশ করা যায়, সেটাই জাংকুকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘কেউ যখন জিজ্ঞেস করে, “শিল্প কী?” তখন আমি মনে করি না যে শিল্প মানেই বিশাল বা চোখধাঁধানো কিছু হতে হবে। আমার মনে হয়, শিল্প হলো এমন কিছু, যা কেউ বানাতে চেয়েছে বলেই তৈরি করেছে। সেই তৈরি করার প্রক্রিয়ার ফলই শিল্প, যেটা উপভোগ করা যায়।’
দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৮ থেকে ২৩ বছর বয়সী পুরুষদের সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়া বাধ্যতামূলক। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে পুরো ১৮ মাস জাংকুককে সামরিক বাহিনীতে কাজ করতে হয়েছে। ক্যামেরা, গান, মঞ্চ—সবকিছু থেকেই থাকতে হয়েছে দূরে। ‘মিলিটারির দিনগুলোতে চাইলেও গান নিয়ে কোনো কাজ করতে পারিনি। এ ব্যাপারটা আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হয়। আমি এখন আরও ভালো করতে চাই, চমৎকার কিছু করতে চাই,’ বলেন জাংকুক।
বর্তমানে জাংকুক বিটিএসের নতুন অ্যালবাম নিয়ে ব্যস্ত। তিনি বলেন, ‘নতুন অ্যালবামের জন্য আমি অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি। ব্যান্ডের অন্য মেম্বারদের সঙ্গে অ্যালবামের প্রচার চালাব, আর্মিদের (বিটিএস ফ্যান) সঙ্গে দেখা হবে, এসব ভাবতেই ভালো লাগছে। আর আমার ইচ্ছা আছে নাচটা আরও ভালোভাবে শেখার। বিশেষ করে স্ট্রিট ড্যান্স।’
কাজের মাঝখানে যখন একটু বিরতি পান তখনো জাংকুক অলস বসে থাকেন না। রিহার্সাল, রেকর্ডিং, নতুন কোনো অভিজ্ঞতা অর্জন কিংবা পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সময় কাটে তাঁর। তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় পরিবর্তন খুঁজি।’ তাঁর এই তাড়না অস্থির নয়, স্থির ও লক্ষ্যকেন্দ্রিক। তিনি শিখেছেন সচেতনভাবে এগোতে, প্রচলিত স্রোতে ভেসে না গিয়ে নিজের ছন্দ নিজে তৈরি করতে। জাংকুক বলেন, ‘আমি এমন একজন শিল্পী হতে চাই, যে স্রোতের টানে ভেসে যায় না, বরং নিজেই স্রোত তৈরি করে। আমি সীমার মধ্যে আটকে থাকতে চাই না। আমি এমন একজন শিল্পী হতে চাই, যার কোনো সীমা নেই।’
(রোলিং স্টোন থেকে সংক্ষেপিত)
বিটিএস কি ভক্তদের মানসিক সুস্থতায় অবদান রাখে? গবেষণা কী বলছে