দাবাড়ু রানী হামিদের শৈশবের এক জামার ঈদ আর বদলে যাওয়া আধুনিক ঈদের কথা
· Prothom Alo
শৈশবের এক জামার ঈদ আর চার প্রজন্মের ব্যবধানে বদলে যাওয়া আধুনিক ঈদ, ৮২ বছরের জীবনে কত ধরনের ঈদই না দেখেছেন রানী হামিদ। জীবনের গল্পের পাশাপাশি তেমন কিছু ঈদস্মৃতিই বর্ণিল ঈদ–এর পাঠকের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিলেন দাবার এই কিংবদন্তি।
ছেলে ফুটবলার কায়সার হামিদ এবং নাতি–নাতবউয়ের সঙ্গে দাবাড়ু রানী হামিদনদীর মতো জীবনও অনেক বাঁক বদল করেছে। কখনো স্থির, কখনো উত্তাল। আজ জানালার পাশে যখন বসি, স্মৃতির পাতায় ধুলাজমা ছবিগুলোও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ৮২ বছর বয়সেও আমার ভেতরের মানুষটি সেই ছোট্ট মেয়ে হয়ে ঘুরে বেড়ায় কুমিল্লা বা চট্টগ্রামের মেঠো পথে। বিশেষ করে ঈদের কথা ভাবলে মনে হয়, একটি জীবনে কয়েক প্রজন্মের সঙ্গে ঈদের দিনটি কাটিয়েছি। আমাদের সেই ছোটবেলার ঈদ আর এখনকার ঈদে আসমান-জমিন তফাত।
Visit chinesewhispers.club for more information.
এক জামার ঈদ
এখনকার ছেলেমেয়েদের দেখলে অবাক হই। ঈদে তারা এখন জামা–ই পায় গোটা দশেক। সকালে একটা পরে, দুপুরে একটা, রাতে একটা। আর আমাদের সময়? একটা জামা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে কী টেনশন! শেষ পর্যন্ত যখন জামাটা হাতে পেতাম, ঈদের আনন্দ বেড়ে যেত কয়েক গুণ। ছোটবেলার ঈদে মূল আনন্দই ছিল একটা নতুন জামা। সেই জামাটা বালিশের পাশে নিয়ে ঘুমানো, ভাঁজ খুলে বারবার দেখা—সে এক অন্য রকম উত্তেজনাময় রাত।
আমার বাবা মমতাজ আলী পুলিশে চাকরি করতেন। বদলির চাকরি, তাই শৈশবটা এক জায়গায় স্থির ছিল না। জন্ম সিলেটের রাখাইলের জালালপুর নামক একটি জায়গায়। ছোটবেলায় কুমিল্লায় চার বছর আর চট্টগ্রামে কেটেছে দুই বছর। চট্টগ্রামের নন্দনকানন গার্লস স্কুল আর কুমিল্লার নবাব ফয়জুন্নেসা গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলের দিনগুলো খুব মনে পড়ে। এক বছর মিশনারি কনভেন্টেও পড়েছি, ক্লাস ফোরে।
দাবার চালে মগ্ন রানী হামিদআমার স্কুলজীবন ছিল খুব ছোট। সারদায় পুলিশ ট্রেনিং কলেজের ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে আব্বার যখন পোস্টিং হলো, আমাকে প্রাইভেটে ছেলেদের স্কুলে ভর্তি হতে হলো। সেখানে মেয়েদের স্কুল ছিল না। সব মিলিয়ে স্কুলের চেয়ে মাঠ আর প্রকৃতির সঙ্গেই আমার মিতালি ছিল বেশি।
আব্বা পেনশনের আগে শেষ পোস্টিং পেলেন নিজ জেলা শহর সিলেটে। সেখানেই সিলেট গভর্নমেন্ট গার্লস স্কুলের হেডমিস্ট্রেস যিনি ছিলেন, তিনি আমাকে আব্বার অনুরোধে সরাসরি ক্লাস টেনে ভর্তি করলেন। ফলে আমার কোনো শিক্ষাবর্ষ নষ্ট হয়নি।
সালামি ছিল না
শৈশবে আমি ছিলাম ‘টো টো কোম্পানির ম্যানেজার’। সারা দিন এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াতাম। আমাদের নিয়ন্ত্রণের শিকল ছিল মাত্র একটা—মাগরিবের আজান পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসায় ফিরতে হবে। এরপর অজু করে নামাজ, তারপরই গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে বসা—এ–ই ছিল রুটিন। তখনকার পরিবেশ এখনকার মতো এত অনিরাপদ ছিল না, মানুষ এত কিছু চিন্তা করত না। আমরা মনের আনন্দে খেলাধুলা করতাম। তার মধ্যেও ঈদের দিনটা ছিল বিশেষ।
ছোটবেলায় ঈদের দিন মানেই ছিল নতুন জামাটা পরে এ–বাড়ি থেকে ও–বাড়ি ঘুরে বেড়ানো। ঈদে বন্ধুবান্ধবের বাসায় যেতাম, কেউ কেউ আমাদের বাসায় আসত। ফোন ছিল না, টেলিভিশনও না। তাই মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগটা ছিল ভিন্ন রকম। আমরা চার বোন আর চার ভাইয়ের মধ্যে আমি ছিলাম ৩ নম্বর। সবাইকে ঈদের জামা দেখানো, ভাই-বোনদের সঙ্গে ঈদের দিন এখানে–ওখানে বেড়াতে যাওয়া ছিল আনন্দ প্রকাশের মাধ্যম। মাঝেমধ্যে ঈদের সময় মেলা বসত। সেখানে যাওয়ার জন্য কিছু হাতখরচ পেতাম, নিজের পছন্দের জিনিস কিনতাম। সালামি পাওয়ার রেওয়াজ তখন ছিল বলে মনে পড়ছে না; আর টাকাপয়সাও এত সহজলভ্য ছিল না।
বিয়ের পর নতুন ঈদ
স্বামী, শাশুড়ি, দুই সন্তানের সঙ্গে রানী হামিদপড়াশোনার মাঝপথেই জীবনের মোড় ঘুরে গেল। ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বরে, ক্লাস টেনে পড়া অবস্থায় সেনাবাহিনীর তরুণ অফিসার এম এ হামিদের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হলো। তিনি তখন ১৬ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন। সিলেটে আমাদের ধুমধাম করে বিয়ে হলো। আব্বা পুলিশে ছিলেন বলে পুরো পুলিশ বাহিনীকে খাওয়াতে হয়েছিল। আমার শ্বশুর ছিলেন ব্যবসায়ী, সাত দিন ধরে তিনি পার্টির আয়োজন করেন। একদিন ব্যবসায়ীদের দাওয়াত, একদিন আর্মি, একদিন আত্মীয়স্বজন ইত্যাদি। সেই সময় আর্মিদের জন্য বুফে ডিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। তখন বুফে কী মানুষ বুঝত না, প্লেট হাতে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নেওয়া নিয়ে সে কী হাসাহাসি!
বিয়ের পরের ঈদগুলোও ছিল একদম ভিন্ন। হামিদ সাহেবের সঙ্গে এখানে–ওখানে যেতে হতো। আর্মিতে দেখি, ঈদের দিনও নানা নিয়মরীতি। অফিসাররা সস্ত্রীক সিনিয়রদের বাসায় গিয়ে সালাম করতেন। আমরা তরুণ দম্পতি, তাই ঈদে আমাদের বেরোতেই হতো। এর বাইরে অবসরে ঘুড়ি ওড়াতাম, ব্যাডমিন্টন খেলতাম। ব্যাডমিন্টনে আমাদের হারিয়ে দেওয়ার মতো কেউ ছিল না। তখন দাবার চল ছিল না। দাবা কেউ বুঝতও না।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনেক টুর্নামেন্ট খেলে পুরস্কার জিতেছেন রানী হামিদউনসত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে আমরা করাচিতে ছিলাম। ঢাকায় পোস্টিং হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু হঠাৎ পাঠিয়ে দেওয়া হলো পাকিস্তানের শেষ প্রান্ত পেশোয়ারে। তখনো বুঝতে পারিনি দেশের পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। পেশোয়ারে গিয়ে আমরা কার্যত বন্দী হয়ে গেলাম। দীর্ঘ সময় সেখানে অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাতে হয়েছে। স্বাধীনতার পর জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়ল। সে সময়ের ঈদগুলোও ছিল একটু অন্য রকম। পাকিস্তান থেকে খাইবার পাস হয়ে আফগান সীমান্ত পাড়ি দেওয়া—যেন কোনো টান টান সিনেমার গল্প। ফিরে আসার সেই রোমাঞ্চকর অভিযানের কথা আজও আমাকে শিহরিত করে।
বিটিভির রঙিন ঈদ
তারুণ্যে রানী হামিদবাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন করে জীবন শুরু করলাম। তখনই দাবার জগতে আসা। পড়াশোনাটাও শেষ করলাম। প্রাইভেটে আইএ, বিএ পাস করলাম। অর্থনীতিতে এমএ করার ইচ্ছা ছিল, ফার্স্ট ডিভিশন মার্কসও ছিল; কিন্তু দাবা আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল। আশির দশকের শুরুর দিকের কথা। জোনাল টুর্নামেন্টের জন্য দুবাইতে একবার ঈদ করতে হয়েছে। ওখানকার মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতেন। ঈদের দিনও দাবার বোর্ড নিয়ে বসে আছেন কেন এই মহিলা!
সত্তরের দশকে ঈদ মানেই ছিল বিটিভি। ঈদের অনুষ্ঠান দেখার জন্য কী উদ্গ্রীব অপেক্ষা। আমার ছেলেদের বলতাম, ‘সাত দিনে মাত্র একটি নাটক দেয় কেন? রোজ দিলে কী হয়?’ শুনে ওরা হাসাহাসি করত। এখন তো নাটকের ছড়াছড়ি; কিন্তু সেই আবেদন আর খুঁজে পাই না। ১৯৮১ বা ’৮২ সালের দিকে দুবাই থেকে প্রথম একটা রঙিন টেলিভিশন নিয়ে আসি। তখন বনানীর ডিওএইচএসের বাড়িতে রঙিন টিভি দেখার জন্য পাড়া-প্রতিবেশীরা জড়ো হতো।
তুশা শিরনির ঘ্রাণ
আমার তিন ছেলে এক মেয়ে—কায়সার হামিদ, সোহেল হামিদ, ববি হামিদ আর মিতা হামিদ। ববি ঢাকা ফুটবল লিগে ওয়ারীতে খেলেছে। ২০২২ সালে মস্তিষ্কের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ৫৯ বছর বয়সে সে মারা যায়। ওর জন্য মনটা হু হু করে। একসময় মা থেকে দাদি হলাম, তারপর ‘বড়মা’। ববির মেয়ে সামাহা হামিদের ঘরে ছেলে হয়েছে, সে থাকে কানাডায়। সামাহা হামিদও স্পোর্টস গার্ল ছিল, জাতীয় দলে হ্যান্ডবল খেলেছে। ওর বাসায় গিয়ে দেখি, ট্রফিতে ট্রফিতে ভরা, আমাদের চেয়েও বেশি!
নাতনি কারিনা কায়সারের সঙ্গে রানী হামিদআগে ঈদ ছিল মানুষের সঙ্গে দেখা করার, গল্প করার, হাসি-আড্ডায় কাটানোর দিন। এখনকার জীবনযাপন একদম অন্য রকম। এক বাসায় থেকেও সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। ডিভাইসে আসক্তি বেড়েছে; কিন্তু একটা জায়গায় আমি এখনো ছাড় দিই না। সেটি হলো ঈদের সকালের নাশতা। হামিদ সাহেব যখন বেঁচে ছিলেন, তখন থেকেই নিয়ম—নামাজ পড়ে সব ছেলে, নাতি-নাতনি ও আত্মীয়স্বজন বাসায় আসবে। তাদের সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)–এর দরগাহর ময়দার বিখ্যাত হালুয়া ‘তুশা শিরনি’ দিয়ে আপ্যায়িত করব। নরম, তুলতুলে, গরম–গরম। ঈদের সকালবেলা সবাই এই হালুয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এখন আর রান্নাটা নিজে হাতে করতে পারি না; কিন্তু দাঁড়িয়ে থেকে তদারক করি।
ঈদের কিস্তিমাত–মুহূর্ত
ছবির অ্যালবামে রানী হামিদের ফেলে আসা দিন১৯৭৫ সাল থেকে বনানী ডিওএইচএসের এই বাড়িতে আছি, ৫০ বছর হয়ে গেল। এখানকার গাছপালা থেকে মানুষজন সবই আমার চেনা। ঈদের দিন স্বামী আর ববিকে খুব মিস করি, তাঁদের আত্মার শান্তির জন্য নফল নামাজ পড়ি।
মাঝেমধে৵ খুব মনে পড়ে সিলেটের সেই গ্রামের দিনগুলো। দাদির হাত ধরে পুকুরপাড়ে হাঁটতাম আর কচুর লতি খুঁজতাম। পুকুরপাড়ের সেই টাটকা লতি আমার খুব প্রিয় ছিল। রাতে দুধ–ভাতের জন্য ছোটবেলায় মাকে জ্বালিয়ে মারতাম। এখনো সাহ্রিতে আমার কলা-দুধ-ভাত চাই। আর ঝাল খাবারের কথা বললে সিলেটের ‘নাগা মরিচ’ ছাড়া একসময় আমার চলতই না।
নতুন প্রজন্মের নাতি-নাতনিদের এখন আর শাড়ি বা জামা কিনে দিই না। আমি জানি না তাদের কী পছন্দ। তাই নগদ টাকা দিয়ে দিই। ওরা তাতেই বেশি খুশি। ওদের হাসিমুখ দেখলে মনে হয়, ঈদ মানে তো আসলে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া। তা সে কিশোরীবেলায় একটি সুতির জামা পাওয়ার আনন্দই হোক, আর ২০২৬ সালে নাতনির সন্তানের মুখ দেখার আনন্দই হোক। ঈদের আনন্দটা সবকিছুর চেয়ে আলাদা।
জীবনটা দাবার বোর্ডের মতো। কখনো কিস্তিমাত, কখনো ড্র। তবে ঈদের এই মুহূর্তগুলো সব সময়ই আমার কাছে কিস্তিমাত। কয়েক প্রজন্মের সাক্ষী হয়ে আমি শুধু এটুকুই বুঝি, সময় বদলায়, ঈদের ধরন বদলায়; কিন্তু নাড়ির টান আর তুশা শিরনির সেই মিষ্টি ঘ্রাণ কখনো বদলায় না।
সবাইকে ঈদের আগাম শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক।
অনুলিখন: মাসুদ আলম
তানজিয়া জামান মিথিলা বললেন, ‘প্রায় প্রতিদিনই উপহার আসছে’