ইউরোপের স্মৃতিময় ভ্রমণগাথা ২

· Prothom Alo

ইউরোপের রাজনৈতিক কেন্দ্র ব্রাসেলস ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির অনন্য মেলবন্ধন। স্বল্প সময়েও শহরের সৌন্দর্য, ইতিহাস ও জীবন্ত পরিবেশ ভ্রমণকে করে তোলে স্মরণীয় ও উপভোগ্য। অভিজ্ঞতাকে করে সমৃদ্ধ।

Visit esporist.org for more information.

ব্রাসেলস: ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

ইউরোপ সফরের দ্বিতীয় দেশ হিসেবে বেছে নিই বেলজিয়ামকে। আমস্টারডাম থেকে সকালে আমরা বাসে করে প্রায় তিন ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাই বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে। ব্রাসেলসে আমাদের রাত্রিযাপনের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। নেদারল্যান্ডের পার্শ্ববর্তী দেশ এটা। এখানে আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থা আছে, তাই স্বল্প সময়ের জন্য হলেও ভ্রমণের লোভ সামলাতে পরিনি। আমরা বেলা ১১টার মধ্যে ব্রাসেলসে পৌঁছে যাই। ব্রাসেলসে ছিলাম ছয় ঘণ্টার মতো।

ব্রাসেলস সেন্ট্রালে সবাই

বলে রাখা ভালো, ইউরোপে আন্তদেশে চলাচল করা বাসের শিডিউল কিন্তু ঠিক থাকে না। প্রথম দিনই বাসভ্রমণে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়। নির্ধারিত সময় থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টা দেরিতে আমস্টারডাম থেকে বাস ছাড়ে। যদিও চলার পথে কোনো বিলম্ব হয়নি। বরং ইউরোপের রাস্তায় এত আরামে বাসভ্রমণ করা যায় যে সেটা কল্পনাতীত।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক কেন্দ্র বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস। এ শহর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অসাধারণ মেলবন্ধন যেন। শহরটি যেমন সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ধারণ করে, তেমন প্রাচীন এবং আধুনিক স্থাপত্যশৈলী মুগ্ধ করে। ব্রাসেলস শুধু বেলজিয়ামের রাজধানী নয়, এটি পুরো ইউরোপের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংস্থার একটি বড় কেন্দ্র। একে ‘ইউরোপের হৃদয়’ও বলা হয়।

ব্রাসেলসের রাস্তায় লেখক

আমরা বাসে করে ব্রাসেলসের নর্থ স্টেশনে নামি। সেখানকার বাসস্টপেজগুলো গতানুগতিক নয়। একটি ছোট সাইনবোর্ড থাকে এবং পাশেই বাস থামার জন্য আলাদা লেন করা থাকে। সেখানে নামতেই চোখে পড়ে, রাস্তার দুধারে সারি সারি গাছের হলুদ রঙের পাতা শহরকে অপরূপ করে তুলেছে। দুদিকে ছড়িয়ে পড়া রাস্তার মাঝখানেই ছোট পার্ক, বসার জায়গা; ক্লান্ত কোনো পথচারীকেই নিমেষেই দেবে প্রশান্তি। আমরাও সেখানে তাই কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে ক্লান্তি দূর করি। এরপর কিছুটা সামনে এগিয়ে বাসস্টেশন ও মেট্রো স্টেশনে খোঁজ করতে থাকি লকারের।

বলে রাখা ভালো, সব শহর সম্পর্কে আমাদের মোটামুটি গবেষণা হয়ে গিয়েছিল, তাই আমাদের আর ট্যুর গাইডের প্রয়োজন পড়েনি। আর এখন যেহেতু তথ্যপ্রযুক্তির যুগ, তাই গুগল আর এআইয়ের কারণে অচেনা শহর বলে কিছু থাকে না এবং কোনো কিছু খুঁজতে বা দিকনির্দেশনা পেতেও বেগ পেতে হয়নি অতটা। মাঝেমধ্যে যে বেগ পেতে হয়েছে, সেটাতে বস্তুত ছিল অজানাকে জানার অপার আনন্দ।

সবুজ পাতায় ভরা গাছ

ব্রাসেলসে আমাদের হোটেল বুক করা ছিল না। আমাদের রাত্রিযাপনের পরিকল্পনাও ছিল না। তাই আমাদের তাড়া ছিল অল্প সময়ের মধ্যে যতটা সম্ভব মূল স্পটগুলো ঘুরে দেখা। আমরা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদর দপ্তরসহ কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যালয় ঘুরে দেখি প্রথমেই। ব্রাসেলসের মূল রাস্তার পাশে সাজানো বাগানগুলো পরিপাটি, পরিচ্ছন্ন। ব্রাসেলসে নেমে আমরা ইচ্ছা করেই ব্রাসেলসের বিভিন্ন রাস্তায় হেঁটে বেড়াই। এরপর আমরা ব্রাসেলসের নর্থ স্টেশন থেকে ডে পাস কেটে নিই, যাতে যেকোনো পরিবহনে ওঠা যায়।

নর্থ স্টেশন থেকে মেট্রোতে চড়ে আমরা চলে যাই সাউথ স্টেশনে। সেখানে নেমেই  ব্রাসেলস সেন্ট্রালে কিছুটা সময় কাটাই। ব্রাসেলস সেন্ট্রাল হলো ব্রাসেলসের প্রধান কেন্দ্র এবং দ্বিতীয় বৃহত্তম মেট্রো রেলস্টেশন। সেখান থেকে চারদিকে ব্রাসেলসের বিভিন্ন দিকে রাস্তাগুলো ছড়িয়ে পড়েছে।

গ্র্যান্ড প্লেসে স্কয়ারে লেখক

আমরা সেন্ট্রাল থেকে হেঁটে রওনা দিই বিখ্যাত গ্র্যান্ড প্লেসে স্কয়ারের দিকে। যেতে যেতে পথের দুপাশে অসাধারণ সব ক্যাফে, কফি শপ আর বিখ্যাত চকলেটের দোকান চোখে পড়ে। এ যেন চকলেটের এক আশ্চর্য শহর। পথে যেতে যেতে চকলেট আর কফির ঘ্রাণে মাতোয়ারা হয়ে যাচ্ছিলাম। কয়েকটি দোকোনে ঢুকে আমরা বিখ্যাত কিছু চকলেটের স্বাদ নিই। পথের দুধারে সারি সারি কফির টেবিল ও চেয়ার পেতে পর্যটকদের বসার জায়গা করে রাখা। প্রতিটি দোকানের সামনে শত শত পর্যটকের আড্ডা আর কফির পেয়ালা অনন্য এক অনুভূতি জোগায়।

আমরা হেঁটে চলে যাই বিখ্যাত গ্রান্ড প্লেস স্কয়ারে। এত অপূর্ব স্থাপনা এই গ্র্যান্ড প্লেস যে চোখ দুটোকে বিশ্বাসই করাতে পারছিলাম না। একাদশ থেকে সপ্তদশ শতকে গড়ে ওঠা গিল্ডহাউস ও রাজকীয় ভবনগুলো দিয়ে ঘেরা এই স্কয়ার  ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে। আমরা সেখানে অনেকটা সময় কাটাই, ছবি তুলি এবং ভবনগুলোর ইতিহাস জানার চেষ্টা করি। টাউন হল এখানকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সুন্দর ভবনগুলোর একটি।

ব্রোঞ্জের ভাষ্কর্য

আমরা এখান থেকে ফেরার পথে যাই চকলেট মিউজিয়ামসহ আরও দুটি মিউজিয়ামে। রাস্তার মাঝখানে ছোট্ট একটি পার্কের ভেতর ব্রাসেলসের সাবেক মেয়র চার্লস বুলসের ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য যেন এক অপার বিস্ময়। দেখা হলো বিখ্যাত ভাস্কর্য মেনকেন পিস ও জানেকান পিস। পথিমধ্যে দেখতে পেলাম আরেক বিখ্যাত স্থাপনা অ্যাটোমিয়াম। এটি ব্রাসেলসের একটি মাইলফলক স্থাপত্য। ১৯৫৮ সালের ওয়ার্ল্ড এক্সপোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এতে ৯টি বিশাল বলকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

আমরা গ্র্যান্ড প্লেস স্কয়ার থেকে হেঁটে চলে যাই শহরের অন্য স্থানে, যেটা শহরের পশ্চিম দিকে অবস্থিত। সেখান থেকে বিভিন্ন রাস্তায় হেঁটে উপভোগ করতে থাকি ব্রাসেলসের মানুষের জীবনযাপন, আবাসস্থল প্রভৃতি। মেট্রো স্টেশনে আমরা কিছু স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিই। সেই সঙ্গে অসাধারণ স্বাদের কফি।

জাদুঘরে লেখক

ব্রাসেলসে কয়েক ঘণ্টা সময়ের পুরোটাই আমরা যতটা সম্ভব কাজে লাগিয়েছি। যেহেতু সেপ্টেম্বরে গিয়েছিলাম, সে সময় আবহাওয়া ছিল দারুণ উপভোগ্য। বিভিন্ন রাস্তায় বেড়ে ওঠা গাছগুলো থেকে ঝরে পড়া হলুদ হয়ে যাওয়া পাতাগুলো হলুদ প্রলেপে ঢেকে দেয় শহরের কালো পিচের রাস্তাগুলো।
ব্রাসেলস থেকে আমাদের বাস সন্ধ্যা ছয়টায় ছেড়ে যায় ফ্রান্সের প্যারিসের উদ্দেশে। পরের পর্বে থাকবে প্যারিসের গল্প।

লেখক: আইনজীবী,বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

ছবি: লেখক

Read full story at source