‘আঁর বুক যারা হালি গইজ্যে, তারার ফাঁসি চাই’

· Prothom Alo

কক্সবাজার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়তলী এলাকার ঘনবসতিপূর্ণ গ্রাম ইউসুলুলঘোনা। সেখানে টিনশেডের একটি পাকা বাড়ির মেঝেতে বসে বিলাপ করছিলেন ছাবেকুন্নাহার (৪৯)। সামনে পড়ে আছে এক জোড়া জুতা আর রক্তমাখা প্যান্ট-গেঞ্জি। সেই জুতা আর রক্তমাখা পোশাক দেখিয়ে ছাবেকুন্নাহার বলতে থাকেন, ‘আঁর পোয়া খোরশেদরে ঘরত্তুন ডাকি লই যাই মারি ফেলাইয়ে দে। আঁর বুক হালি গরি দিয়ে যে। যারা আঁর বুক হালি গইজ্যে, আঁই তারার ফাঁসি চাই।’

Visit casino-promo.biz for more information.

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে ইউসুলুলঘোনা গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এ দৃশ্য। ছাবেকুন্নাহারের ছেলে খোরশেদ আলম (২৭) গত মঙ্গলবার রাতে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক এবং শহর ছাত্রদলের কর্মী ছিলেন। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত–সংলগ্ন ঝাউবাগানের ভেতরের কবিতা চত্বর এলাকায় তাঁকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ পরদিন বুধবার সকালে চকরিয়ার খুটাখালীর একটি বাড়ি থেকে মো. তারেক (২৭) নামের এক যুবককে আটক করে। তিনি রামুর খোন্দকারপাড়ার মোজাম্মেল হকের ছেলে।

এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ মঙ্গলবার রাতে তারিন সুলতানা নামের এক তরুণীকে হেফাজতে নেয়। তবে পরে পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় তারিনের সংশ্লিষ্টতা মেলেনি। তারিনও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক। ঘটনায় সময় তারিন কবিতা চত্বর এলাকায় খোরশেদ আলমের সঙ্গে ছিলেন। তাঁর বাড়ি শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে।

খোরশেদ আলমের মা ছাবেকুন্নাহার জানান, ঘটনার দিন (মঙ্গলবার) বিকেলে খোরশেদ বাড়িতে ছিলেন। শরীরে জ্বর ছিল তাঁর, বমিও করেছিলেন। বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায় তাঁর মুঠোফোনে কল আসতে থাকে। একপর্যায়ে রাত ৯টার দিকে বাড়ি থেকে বের হন খোরশেদ। অসুস্থ থাকায় খোরশেদ জুতা পরতে চাইছিলেন না, ছোট ভাই তাঁকে জুতা পরতে সহায়তা করেন।

ছাবেকুন্নাহার কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষায় বলেন, ‘রাত সাড়ে ১০টার দিকে ফোনে একজন জানান, খোরশেদ সদর হাসপাতালে। কথা শুনে দিশা হারিয়ে ফেলি, তাড়াহুড়া করে বোরকা পরে ঘর থেকে হাসপাতালে ছুটে গিয়েছি। সেখানে গিয়ে দেখি, লোকজনের হইচই, কান্নাকাটি। আমাকে জানানো হয়, খোরশেদ আহত হয়েছে, চিকিৎসা চলছে। কিন্তু ভিড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখি খোরশেদের রক্তমাখা নিথর দেহ।’

নিহত খোরশেদ আলম

বিলাপ করতে করতে ছাবেকুন্নাহার ঘটনার বিবরণ দিতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘তারিন নামের সেই মেয়েই সেদিন কল করে খোরশেদকে কবিতা চত্বরে নিয়ে গিয়েছিল। পরে সে খোরশেদের মোবাইল থেকে শাহজাহান নামের একজনকে কল দিয়ে ঘটনার কথা জানিয়েছে। এরপর শাহজাহানসহ চার-পাঁচজন ঘটনাস্থলে গিয়ে খোরশেদকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।’

ছাবেকুন্নাহারের চার ছেলের মধ্যে সবার বড় খোরশেদ আলম। ২০১৭ সালে শহরের বায়তুশশরফ জব্বারিয়া একাডেমি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পাস করে রাজধানীর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (নিট) টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা শেষ করেন। এরপর একই প্রতিষ্ঠানে একই বিষয়ে বিএসসিতে অধ্যয়নরত ছিলেন তিনি। খোরশেদের ছোট ভাইদের মধ্যে মোরশেদ আলম মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে ডিপ্লোমা অধ্যয়নরত, নওশেদ আলম রামু সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষার্থী এবং সবার ছোট দিদারুল আলম কক্সবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে।

খোরশেদের বাবা শাহ আলম ( ৫৯) বলেন, ‘আমার ছেলে ’২৪-এর জুলাই আন্দোলনে সক্রিয় ছিল। এলাকায় খুবই ভদ্রনম্র ছেলে হিসেবে সে পরিচিত। ছাত্রদল করত। আমি চাই, আমার মতো আর কোনো মা-বাবার বুক যেন খালি না হয়। একই সঙ্গে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’

পূর্ববিরোধের জেরে হত্যা

পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আরিফ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে খোরশেদের বিরোধ ছিল। সেই বিরোধের জেরেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। এ ঘটনায় পুলিশের অভিযানে আটক তারেক আরিফের সহযোগী। তবে ঘটনার পর থেকে আরিফ আত্মগোপনে রয়েছেন। আরিফের বাড়ি কক্সবাজার শহরের ঝাউতলায়।

বাসিন্দারা জানান, ৫ মার্চ রাতে শহরের কলাতলী এলাকায় মালামাল ছিনতাইয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরিফের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। খোরশেদের বিরুদ্ধে আরিফের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। তখন খোরশেদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ছিনতাইয়ের ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে কিশোর গ্যাং লিডার আরিফের সঙ্গে তাঁর তর্ক হয়। একপর্যায়ে আরিফ তাঁকে আঘাত করেছেন।

তারেককে আটকের পর বুধবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করের জেলা পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান। তিনি বলেন, খোরশেদ হত্যার মূল ঘাতক এই তারেক। তারেক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত দুজনের নাম প্রকাশ করেছেন। তাঁদের ধরতে পারলে হত্যার প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে। হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে পূর্বশত্রুতার জের, ছিনতাই ও রাজনৈতিক বিরোধ আছে কি না, অনুসন্ধান করা হচ্ছে।

খোরশেদের মামা কামাল হোসেন (৫০) বলেন, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে খোরশেদকে হত্যা করেছে। এ ঘটনার বিচার দাবি করেন তিনি।

খোরশেদ হত্যাকাণ্ডের পর তারিন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘কবিতা চত্বরে আমরা অবস্থানকালে হঠাৎ দুই যুবক এসে খোরশেদকে ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে। এরপর বলে, কী আছে দিয়ে দাও। একপর্যায়ে পেটে ছুরি মারতে মারতে খোরশেদকে বলে, আরিফকে কেন মেরেছিস?’

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত মামলা হয়নি। মামলার প্রস্তুতি চলছে জানিয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ছমি উদ্দিন বলেন, খোরশেদকে পেটে ও পায়ে ছুরিকাঘাত করা হয়। ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং হেফাজতে আনা চারজনের জিজ্ঞাসাবাদ ও অনুসন্ধানের মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

নিহত খোরশেদের মামা ও কক্সবাজার সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল মাবুদ বলেন, খোরশেদকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং শহরের কিশোর গ্যাং ও ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শহরে তিন থেকে চারটি কিশোর গ্যাং শনাক্ত করা হয়েছে। এসব গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আটকের চেষ্টা চলছে।

Read full story at source