প্রেম, শিল্প আর স্বপ্নের শহর প্যারিসে
· Prothom Alo

স্বপ্নের শহর প্যারিসে আলো, শিল্প আর ভালোবাসা মিশে তৈরি করে এক মোহময় আবহ; যেখানে প্রতিটি পথ, নদী আর স্থাপত্য হৃদয়ে আঁকে অনন্ত সৌন্দর্যের গভীর স্মৃতি।
ব্রাসেলস থেকে প্যারিসের উদ্দেশে আমাদের বাস ছাড়ে সন্ধ্যায়। ইউরোপ ভ্রমণের যে আনন্দ, কল্পনায় তার অনেকটা অংশ জুড়ে ছিল প্যারিস নিয়ে। তাই ব্রাসেলস থেকে যখন বাসে উঠলাম, তখন থেকেই চোখের সামনে ভেসে উঠছিল শিল্প, ইতিহাস আর রোমান্টিকতার শহরে পৌঁছানোর প্রতীক্ষা।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
লুভরের সামনে লেখকলভুরে প্রদর্শ ভাষ্কর্যপাঁচ ঘণ্টার কম সময়েই আমরা পৌঁছে যাই স্বপ্নের প্যারিসে। বাস টার্মিনালে নেমে উবারে আমরা আমাদের অগ্রিম বুক করা এয়ার বিএনবিতে চলে যাই। রাতে প্যারিসের নির্জন রাস্তা যেন বারবার রোমাঞ্চিত করছিল। রাস্তার দুপাশে সারি সারি গাছ, ল্যাম্পপোস্টের মৃদু নিয়ন আলোয় যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। আমরা এয়ার বিএনবিতে গিয়ে রাতে নিজেরাই রান্না করে ডিনার সারি; পরদিন সকালে আমরা মেট্রোতে করে চলে যাই বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়াম দেখতে।
হালকা শীতে সকালের নরম রোদ গায়ে মেখে যখন ল্যুভরের ভেতরে প্রবেশ করলাম, মনে হলো এই ল্যুভর দেখার জন্য কতই না স্বপ্নের জাল বুনেছি মনে মনে। আর বারবার অবচেতন মন অস্থির হয়ে যাচ্ছিল কখন সেই বিখ্যাত মোনালিসাকে দেখব। ল্যুভরের মূল প্রবশপথ দিয়ে যখন কাচের পিরামিডের সামনে দাঁড়ালাম, মনে হলো যেন ইতিহাস এসে ধরা দিয়েছে সামনে। ল্যুভরের ভেতরে প্রবেশের টিকিট অগ্রিম না কাটা আমাদের একটা বিরাট ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।
লুভরে প্রদর্শিত মমিযেহেতু ছুটির দিন ছিল, আমরা বেশ অনেকটা সময় ধরে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলাম। মূল প্রবেশপথ দিয়ে যেতেই গা শিউরে উঠছিল বিখ্যাত সব নিদর্শন দেখে, বিখ্যাত সব চিত্রকর্ম, ভাস্কর্য এসব দেখে মনে হচ্ছিল ল্যুভর শুধু একটা মিউজিয়াম নয়, এটা এক জীবন্ত ইতিহাস। প্যারিসের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যুভর মিউজিয়াম শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় মিউজিয়ামগুলোর একটি নয়, এটি মানবসভ্যতার শিল্প ও ইতিহাসের এক বিশাল ভান্ডার।
ল্যুভরের ইতিহাস শুরু হয়েছিল একটি দুর্গ হিসেবে। পরে রাজপ্রাসাদ, আর শেষে রূপ নেয় বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পভান্ডারে। ভেতরে প্রবেশ করলেই শুরু হয় বিস্ময়ের যাত্রা। এখানে রয়েছে হাজার হাজার শিল্পকর্মের সংগ্রহশালা। প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতা থেকে শুরু করে রেনেসাঁ যুগের অমূল্য চিত্রকলাও আছে এখানে। ভেনাস দ্য মিলো, উইংড ভিক্টরি অব সামোথ্রেসসহ অসংখ্য ছবি ও ভাস্কর্য দেখে শেষ করা যায় না। এখানে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, প্রতিটি শিল্পকর্মই যেন জীবন্ত কথা বলে যাচ্ছে ইতিহাস আর শিল্পের।
সেই মোনালিসা, এই মোনালিসাআমরা বিখ্যাত সব শিল্পীর চিত্রকর্মের গ্যালারি পার হয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যাই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সেই বিখ্যাত মোনালিসার সামনে। অনেক ভিড় ঠেলে নিরাপত্তাবেষ্টনীর খুব কাছে থেকেই প্রাণভরে দেখলাম মোনালিসার সেই রহস্যমাখা মুখ। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বিখ্যাত মোনালিসা দেখতে দেখতে শৈশবে পাঠ্যবইয়ে পড়া মোনালিসার মধ্যে যেন হারিয়ে গেলাম। মোনালিসার অপূর্ব রূপে মুগ্ধ হতেই হবে।
ল্যুভরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে গেল, তবু মন ভরল না। এক দিনে পুরো ল্যুভর দেখা সম্ভব নয়। ল্যুভর মিউজিয়াম দেখার পর মনে হয় মনটা থেকে যায় সেখানে।
পরদিন আমাদের গন্তব্য ছিল বিখ্যাত আইফেল টাওয়ার। ল্যুভর থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছাই সিন নদীর ধারে। নদীর জলে প্যারিসের আকাশ আর পুরোনো দালানগুলোর ছায়া মিলেমিশে এক স্বপ্নিল দৃশ্য তৈরি করেছে।
নদীর ধারে বসে থাকা মানুষগুলো—কেউ বই পড়ছে, কেউ ছবি আঁকছে, কেউ–বা প্রিয়জনের হাত ধরে নীরবে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। সিন নদী যেন প্যারিসের হৃৎস্পন্দন, ধীরে বয়ে চলা অথচ গভীর। নদীর পাশ ধরে হাঁটতে হাঁটতেই দূরে দেখা দেয় আইফেল টাওয়ার। যত কাছে যাচ্ছি, ততই বিস্ময় বাড়ছে। বিশাল লোহার কাঠামোটা আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে গর্বের সঙ্গে। সন্ধ্যার আলো নামতেই আইফেল টাওয়ারে জ্বলে ওঠে হাজারো বাতি—ঠিক যেন আকাশ থেকে নেমে আসা কোনো রূপকথার দুর্গ। নিচে দাঁড়িয়ে মনে হলো, এই শহর শুধু চোখে দেখার নয়, অনুভবেরও।
লোহার তৈরি এই বিশাল স্থাপত্য শুধু একটি টাওয়ার নয়, এটি ভালোবাসা, শিল্প আর আধুনিকতার প্রতীক। ১৮৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের শতবর্ষ উপলক্ষে নির্মিত এই টাওয়ারের নকশা করেছিলেন প্রকৌশলী গুস্তাভ আইফেল। সিন নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা নান্দনিক এ টাওয়ার যেন প্যারিসের প্রাণ। আমরা দিনের আলোতে কিছু সময় আইফেল টাওয়ারের পাশে থাকি, ছবি তুলি। যদিও আমরা অপেক্ষা করছিলাম সন্ধ্যার ঝলমলে আলোয় জ্বলজ্বলে আইফেল দেখার জন্য।
রাতে আইফেল টাওয়ারের সামনে লেখকআমাদের কেউ কেউ উঠে যাই আইফেলের চূড়ায়; এ জন্য কাটতে হয় টিকিট। ওপরে উঠে চোখের সামনে খুলে যায় পুরো প্যারিস শহর। ছোট ছোট বাড়ি, বাঁক নেওয়া সিন নদী, দূরে নটর ডেম ক্যাথেড্রাল—সব মিলিয়ে দৃশ্যটি যেন একটুকরা স্বপ্ন।
সন্ধ্যা নামার তখনো অনেকটা সময় বাকি ছিল; ফলে আমরা সিদ্ধান্ত নিই সিন নদীতে রিভার ক্রুজের। ক্রুজের জন্য টিকিট কেটে অপেক্ষা করছিলাম নির্দিষ্ট জাহাজের জন্য। নদীর পাশে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম প্যারিসের সৌন্দর্য আর কী করে সিন নদী আঁকড়ে ধরে আছে শহরটিকে। বিকেলের অস্তগামী সূর্যের আলো নদীর পানিতে পড়ে অপরূপ দৃশ্য তৈরি করছিল। কিছু নাম না–জানা পাখি ওড়াউড়ি করছিল। নদীর পাশে বসে থাকা যুগলদের দেখে বেশ অন্য রকম একটা আবহ তৈরি হয়েছিল। আহা প্রেম!
অবশেষে জাহাজে উঠে আমরা যাত্রা শুরু করলাম।
নৌকার ওপর বসে আলোঝলমলে প্যারিসকে দেখতে দেখতে বুঝলাম, কেন মানুষ এই শহরের প্রেমে পড়ে যায়। ল্যুভরের শিল্প, সিন নদীর শান্ত প্রবাহ আর আইফেল টাওয়ারের আলো—সব মিলিয়ে প্যারিস শুধু একটা শহর নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু।
নদীতে ভেসে দুপাশে দেখছিলাম প্যারিসের ইতিহাস আর ঐতিহ্য ধারণ করা সব ভবন। প্রাচীন আর আধুনিক সভ্যতার এক অপার মেলবন্ধন যেন। এই শহরের হৃদয় যেন এখানেই স্পন্দিত হচ্ছে বারবার। সিন নদীতে রিভার ক্রুজ মানে ইতিহাসের ভেতর দিয়ে ভেসে চলা।
এখান থেকে শুরু হয়েছিল নদীভ্রমণসিনের দুই তীরে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলোই বলে দেয় প্যারিসের গল্প—রাজতন্ত্রের গল্প, বিপ্লবের গল্প, শিল্পীদের কারুকার্য সংগ্রাম আর প্রেমিকদের ভালোবাসার কথা। নদীর বাঁকে বাঁকে রয়েছে কয়েকটি সেতু এবং প্রতিটি স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যে অতুলনীয়। ন্যুফ প্যারিসের সবচেয়ে পুরোনো সেতু, এখনো দাঁড়িয়ে আছে সময়ের সাক্ষী হয়ে। আলেকজান্ডার থ্রি ব্রিজটি ইউরোপের রাজকীয় ঐশ্বর্যের প্রতীক।
সন্ধ্যা নামলেই প্যারিস হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শহর। আলোঝলমলে এ শহর হয়ে ওঠে প্রেম ও শিল্পের দারুণ সম্মিলন। আমরা রিভার ক্রুজ সেরে আবার সন্ধ্যার আইফেল টাওয়ার দেখার জন্য চলে আসি। নিজের চোখেকে বিশ্বাস করানো কঠিন কী এক অপরূপ আলোর ঝলকানি টাওয়ারজুড়ে। আইফেল টাওয়ারের আসল জাদু দেখা যায় সন্ধ্যার পর।
ইতিহাসের স্মৃতি বয়ে বেড়ানো স্থাপনাআমরা আইফেল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে আসি রাস্তার পাশে সারি সারি কফি শপের একটিতে। কফির সৌরভে তখন চারদিক মাতোয়ারা। সেখানে দেখা মেলে কয়েকজন বাংলাদেশি ওয়েটারের। আমরা প্যারিসের কফির স্বাদ নিয়ে মেট্রোতে করে চলে আসি এক বাংলাদেশি ভাইয়ের বাসায়। সেখানে ডিনার আর প্রাণ খুলে আড্ডা দিয়ে আমাদের এয়ার বিএনবিতে ফিরি বাসে করে। স্বপ্নের প্যারিসযাত্রা শেষ হয় এখানে। কারণ, পরের দিন আমাদের গন্তব্য জেনেভা।
লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
ছবি: লেখক