নিমগ্ন বিস্ময়ের মূল্যবান আবিষ্কার

· Prothom Alo

গোলাম কাসেম ড্যাডি (১৮৯৪-১৯৯৮) অবিভক্ত বাংলার এক অদম্য শিল্পী। হিমালয়ের পাদদেশে জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণকারী এই শিল্পীর শৈশব কাটে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে। আদি বাড়ি ফরিদপুরের মাদারীপুর মহকুমায়। সার্কাস, থিয়েটার, ম্যাজিক, ঘোড়দৌড় আর বায়োস্কোপের নেশায় তাঁর শৈশব কাটে। তাঁর প্রকৃত নাম গোলাম কাসেম; শ্রদ্ধার শিরোপা হিসেবে অর্জন করেন ‘ড্যাডি’ খেতাব। ড্যাডি নিজেকে শুধু আলোকচিত্র ধারণেই সীমাবদ্ধ রাখেননি; সেই সঙ্গে লেখালেখি, ছবি আঁকা, সংগীত সাধনা, অভিনয়, কবিতা আবৃত্তিসহ নিজ কামরায় পাঠাগার তৈরি আর বাড়ির সামনে বাগান করা ছিল তাঁর শৌখিনতার অংশ। ড্যাডির বহুমুখী প্রতিভাকে হার্দিক প্রচেষ্টায় অনুসন্ধান করে গ্রন্থভুক্ত করেছেন খ্যাতিমান আলোকচিত্রশিল্পী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ। ড্যাডির সমগ্র শিল্প-সাহিত্যকর্মকে চার খণ্ডে উপস্থাপন করেছেন তিনি।

আলোকচিত্রের আলোকচ্ছটায়

কার হাতে পূর্ব বাংলায় ফটোগ্রাফি একটা পরিণত রূপ লাভ করল—সেই জিজ্ঞাসা থেকেই উঠে আসে গোলাম কাসেম ড্যাডির নাম। নিজ ভূমিকাকে আড়ালে রেখে তিনি সারা জীবন আলোকচিত্র সাধনা করে গেছেন। তিনি যখন সেলফ পোর্ট্রেট তোলেন, সে সময়ে বাঙালি মুসলমান সমাজে এ ধরনের ছবি তোলার ঘটনা ছিল বিরল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রণ–প্রশিক্ষণে গিয়েও তাঁর ক্যামেরা থেমে থাকেনি। ড্যাডির ক্যামেরায় খুঁজে পাওয়া যায় অবিভক্ত বাংলার মুখ। সে সবই সময় ও স্মৃতির সম্মিলন।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

এলসি নামের এক খ্রিষ্টান তরুণীর তাচ্ছিল্যের জবাব দিতে ১৯১২ সালে ক্যামেরা হাতে নেন ড্যাডি। তাঁর ছবি তোলার হাতেখড়ি বন্ধুর ক্যামেরায়। কিন্তু তাতে প্লেটের ইমালশন গলে নেগেটিভ নষ্ট হওয়ায় বারবার ব্যর্থ হয়ে অন্তরের আগ্রহ আরও প্রবল হয়ে ওঠে। তাঁর আলোকচিত্র ধারণ শুরু হয় এনসাইন বক্স ক্যামেরায়। এরপর কলেজের টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে ১০ টাকায় কেনেন কোডাক ব্রাউনি কিউ এ ক্যামেরা। ১৯৯৩ সালে বিপিএসের পক্ষ থেকে উপহার পাওয়া পেনটেক্স কে-১০০০ ছিল তাঁর ব্যবহার করা সর্বশেষ ক্যামেরা। এটি ছিল তাঁর আস্থা অর্জনে নিঃসঙ্গতার সঙ্গী, ভীষণ মন খারাপে কথা বলতেন ক্যামেরাটির সঙ্গে।

জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণকারী এই শিল্পীর শৈশব কাটে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে। আদি বাড়ি ফরিদপুরের মাদারীপুর মহকুমায়। সার্কাস, থিয়েটার, ম্যাজিক, ঘোড়দৌড় আর বায়োস্কোপের নেশায় তাঁর শৈশব কাটে। তাঁর প্রকৃত নাম গোলাম কাসেম; শ্রদ্ধার শিরোপা হিসেবে অর্জন করেন ‘ড্যাডি’ খেতাব।

ড্যাডি সারা জীবনে আট থেকে দশ হাজার ছবি তুলেছেন। ১৯১৫ সাল থেকে সেই কাচের নেগেটিভগুলো যত্নে আগলে রেখেছিলেন পুরোনো কাগজপত্রের স্তূপের ভেতর। ব্রিটিশ সরকারের সাবরেজিস্ট্রার হিসেবে চাকরি করায় বদলি ছিল তাঁর নিত্য সঙ্গী। আর এ কারণেই জমানো নেগেটিভগুলো থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ গ্লাস-প্লেট ভেঙে নষ্ট হয়েছে কিংবা হারিয়ে গেছে। এরপরও পাঁচ শতাধিক নেগেটিভ তাঁর সংগ্রহে ছিল জীবনের ক্রান্তিকালে। হাজার হাজার ছবি তোলার পর কোনো কাঙ্ক্ষিত ছবি পেয়েছেন কি না—সেই প্রশ্নের উত্তরে ড্যাডি জানান, ‘মনের মতো ছবি এখনো পাইনি। কেননা সৌন্দর্যের তো সীমা নেই, সে যে অসীম।’ তিনি মনে করতেন, ফটোগ্রাফি মানুষের জন্য এক বিরাট অবদান। এর মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষ পরস্পরকে চেনার সুযোগে প্রীতির বন্ধন গড়ে তোলে। সাহাদাত পারভেজ ড্যাডির দুর্লভ ছবি, সাক্ষাৎকার, চিঠি, কবিতা ও স্মৃতিকথা দিয়ে সাজিয়েছেন ‘আলোকচিত্র ও বিবিধ’ নামের খণ্ডটি।

ছোটগল্পের সৃষ্টিপাশে

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রণ–প্রশিক্ষণরত সময়ে ক্যাম্পে অবসরে গল্প লেখার সূচনা। সেই সময় বাংলা সাহিত্যে মুসলিম গল্পলেখক খুঁজে পাওয়া যেত না। নায়িকা চরিত্র হিসেবে পর্দানশিন মুসলিম নারীকে উপস্থাপন করাও নিষিদ্ধ ছিল। রক্ষণশীল পত্রিকাগুলো এ বিষয়ে ঝুঁকিও নিত না। ড্যাডিই প্রথম এ ধারা ভেঙে মুসলিম নারী চরিত্র–সংবলিত গল্প লেখার সূত্রপাত করেন। ১৯১৮ সালে ত্রৈমাসিক বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প ‘সুন্দরী’। গল্পের নামেই তাঁর সাহসিকতার প্রমাণ পাওয়া যায়। সওগাত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সেটি পড়ে ড্যাডিকে নিয়মিত গল্প পাঠানোর অনুরোধ করেন। সওগাত পত্রিকার মাধ্যমেই তিনি গল্পকার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

ড্যাডিসমগ্র
[গোলাম কাসেম ড্যাডির আলোকচিত্র, গল্প, প্রবন্ধ ও দুষ্প্রাপ্য রচনা]
সংগ্রহ, গবেষণা ও সম্পাদনা: সাহাদাত পারভেজ
প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২১
প্রকাশক: পাঠক সমাবেশ
প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল
পৃষ্ঠা: (৪ খণ্ডে) ১২৯৬
মূল্য: ৪৮০০ টাকা

সেলফ পোর্ট্রেট [১৯৫১]। আলোকচিত্র: গোলাম কাসেম ড্যাডি

বাংলা সাহিত্যে সওগাত যুগ গ্রন্থে ড্যাডি সম্পর্কে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন লেখেন, ‘তিনি সারা জীবন ছোটগল্প লিখলেও সে চর্চায় নিয়মিত ছিলেন না। সেই সময়ের পাঠক সমাজ তাঁর গল্প পড়ার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকত।’ সাধু ও চলিত রীতির সংমিশ্রণে গল্প লিখতেন ড্যাডি, যদিও তখন লেখালেখিতে শুধু সাধুরীতিই প্রযোজ্য ছিল। এমনকি ইংরেজি শব্দের ব্যবহারও তাঁর লেখায় লক্ষণীয়।

সাহাদাত পারভেজ নিরলস প্রচেষ্টায় ড্যাডিসমগ্র গ্রন্থের ‘গল্প’ খণ্ডে অবিকৃত অবস্থায় মোট ছেঁচল্লিশটি গল্প সংযুক্ত করেছেন। ১৯১৮ সাল থেকে পরবর্তী আট দশক পর্যন্ত এসব পাঠকপ্রিয় গল্প রচিত হয় ড্যাডির। নিখাদ গল্পরস, অতিপ্রাকৃতের অবস্থান ও ছকভাঙা লেখার ধারা ছিল তাঁর আশ্রয়। ড্যাডির গল্পের অভ্যন্তরে ধ্রুপদি আনন্দ-বেদনার কথা সংগ্রহে সাহাদাত পারভেজকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে, সেও এক জীবন্ত গল্প। তবু এ সময়ের পাঠকদের তৃষ্ণা মেটাতে অক্লান্ত সময় ব্যয়ে গল্পগুলোকে এক ফ্রেমে গেঁথেছেন তিনি। প্রত্যাশা একটিই, তৃপ্ত হোক পাঠকচিত্ত।

প্রবন্ধের প্রাজ্ঞপুরুষ

সমস্ত জীবন ফটোগ্রাফির প্রবল নেশায় কাটিয়েছেন ড্যাডি। পেশাদার ফটোগ্রাফার হওয়ার ইচ্ছা না থাকলেও মানুষকে ফটোগ্রাফি শেখানোর ইচ্ছা তাঁর বরাবরই ছিল। এই আগ্রহে ১৯৩৯ সালে সওগাত পত্রিকায় ফটোগ্রাফি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন তিনি। ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি ২০টি পর্ব লেখেন এই পত্রিকায়। ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে বিপিএস নিউজ লেটার প্রকাশিত হয়। তিনি এখানে ফটোগ্রাফির টেকনিক্যাল বিষয় নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লিখতে থাকেন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রকাশিত ফটোগ্রাফি সাময়িকীতে লিখতেন তিনি।

নিজ ভূমিকাকে আড়ালে রেখে তিনি সারা জীবন আলোকচিত্র সাধনা করে গেছেন। তিনি যখন সেলফ পোর্ট্রেট তোলেন, সে সময়ে বাঙালি মুসলমান সমাজে এ ধরনের ছবি তোলার ঘটনা ছিল বিরল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে রণ–প্রশিক্ষণে গিয়েও তাঁর ক্যামেরা থেমে থাকেনি। ড্যাডির ক্যামেরায় খুঁজে পাওয়া যায় অবিভক্ত বাংলার মুখ।

ড্যাডি তাঁর ‘ফটোগ্রাফি ও আলো’ প্রবন্ধে হার্দিক অনুভবে প্রকাশ করেছেন যে হস্তশিল্পীর আঁকার সরঞ্জাম হলো রং ও তুলি, ঠিক যেমন ক্যামেরাশিল্পীর অবলম্বন ক্যামেরা ও আলো। ক্যানভাসের ওপর যেমন–তেমনভাবে রং ফেলে দিলেই ছবি হয় না; ক্যামেরার ক্ষেত্রেও যেমন–তেমনভাবে আলো ফেললেই ফটো হয় না। আলো নিয়ন্ত্রণেই ভালো ছবি তোলা সম্ভব, সেই সঙ্গে থাকবে আলো-ছায়ার সুষ্ঠু সমাবেশ। সাহাদাত পারভেজ ড্যাডির ফটোগ্রাফিবিষয়ক এমন ৩৯টি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত করেছেন তাঁর ড্যাডিসমগ্র–এর ‘প্রবন্ধ’ খণ্ডে। একই সঙ্গে ড্যাডির ধারণকৃত দুষ্প্রাপ্য কিছু ছবিও তিনি সংযুক্ত করেছেন। সওগাত, বিপিএস নিউজ লেটার, মাসিক ফটোগ্রাফি, পোর্ট্রেটসহ বিভিন্ন সাময়িকীতে প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে দুঃসহ প্রচেষ্টায় সংগ্রহ করেছেন সাহাদাত পারভেজ।

ড্যাডিকে আবিষ্কারের নিবিড় নিদিধ্যাসে

আত্মকুণ্ঠ, প্রচারবিমুখ ও নির্জনতম মানুষ ছিলেন ড্যাডি। তাঁর আগে শৈলীসমেত কোনো বাঙালি মুসলমান আলোকচিত্র ধারণ করতেন কি না, সে তথ্য অজানা। বঙ্গের প্রথম মুসলমান হিসেবে তাঁর কৃতিত্ব সমানভাবে বিদ্যমান সাহিত্যচর্চায়ও। লেখনীর মাধ্যমে সমাজের অভ্যন্তরীণ রূপ উন্মোচনের চেষ্টা করেছেন তিনি, সে বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর গল্পে। ছবির মতো স্পষ্ট সেসব গল্পের চরিত্রগুলো। ড্যাডির জীবনকাল গভীরভাবে স্পর্শ করেছে দুটি শতাব্দীকে। আলোকচিত্র ও সাহিত্যসাধনায় ১০৪ বছরের দীর্ঘ জীবন তিনি উৎসর্গ করেছেন। সাধারণ জীবনবোধে সাহিত্য-শিল্পের চর্চায় অসাধারণ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। একই সঙ্গে ছিলেন রুচি ও ভারসাম্যবোধের বিশ্বস্ত ধারক। ফটোগ্রাফি বিষয়ে তিনটি বই লেখেন ড্যাডি—ক্যামেরা (১৯৬৪), একনজরে ফটোগ্রাফি (১৯৮৬) ও সহজ আলোকচিত্রণ (২০০২)। এই তিনটি দুর্লভ ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের অবিকৃত আদ্যোপান্ত ছেপেছেন সম্পাদক।

ড্যাডিসমগ্রর প্রান্তে

‘সৃষ্টির বিচিত্র কার্যকলাপ মানুষের বুদ্ধির অতীত’—জীবন ও জগৎ সম্পর্কে এমন বোধে পর্যবসিত হয়েছিলেন ড্যাডি। ফটোগ্রাফি মিশে গেছে তাঁর জীবনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, সেই সঙ্গে রচিত গল্পের মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন পাঠকসমাজে। তাঁর জীবন থেকে কেউ যদি সামান্যতম অনুপ্রেরণা লাভ করে এর চেয়ে মস্ত কিছু আর হতে পারে না বলে তিনি মনে করতেন। তাই নিজ জীবনবোধে আত্মতৃপ্তির ব্যাখ্যায় শততম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ড্যাডির অনুভূতি, ‘শত বছর বেঁচে থাকা তেমন কৃতিত্বের ব্যাপার নয়। কাজই মানুষের জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। পৃথিবীর জন্য, মানুষের জন্য কতটা করতে পারলাম, সেটাই বড় কথা।’

Read full story at source