‘নিশ্চয়ই আমার জমিন প্রশস্ত’

· Prothom Alo

ইবরাহিম (আ.) তাঁর কওমকে একত্ববাদের পথে ডাকার জন্য সম্ভাব্য সব পথ ও পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। তিনি তাঁদের সঙ্গে সর্বোত্তম পন্থায় বিতর্ক করেছেন, যুক্তি দিয়েছেন এবং মূর্তিপূজার অসারতা প্রমাণ করেছেন।

কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও তাঁদের হৃদয়ে বিশ্বাসের আলো জ্বলেনি।

Visit mchezo.co.za for more information.

এমনকি যখন সমগ্র কওম কাঠ সংগ্রহ করে বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করল এবং তাঁকে তাতে নিক্ষেপ করল। তাঁরা চাক্ষুষ দেখল, দাউ দাউ করে জ্বলা আগুন তাঁর কোনো ক্ষতিই করতে পারল না।

কিন্তু এই চাক্ষুষ মোজেজাও তাঁদের অন্ধত্বের আবরণ সরাতে পারেনি। 

মহাপ্রস্থানের কঠিন সিদ্ধান্ত

যখন দাওয়াতের সব পথ রুদ্ধ হয়ে গেল এবং কওমের হেদায়েতের ব্যাপারে চরম হতাশা তৈরি হলো, তখন তিনি নিজের জন্মভূমি ত্যাগ করার কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন।

দুনিয়া কেন ‘মুমিনের জন্য কারাগার’

পবিত্র কোরআনে তাঁর সেই ঘোষণার কথা এভাবে এসেছে, “তিনি বললেন, আমি আমার রবের উদ্দেশ্যে হিজরত করছি।” (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ২৬)

ইমাম ফখরুদ্দিন রাজি এই হিজরতের যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে লিখেছেন, যখন একজন পথপ্রদর্শক তাঁর কওমকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন এবং তারা তাতে কোনো ভ্রূক্ষেপ করে না, তখন সেখানে অবস্থান করা বরং ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কারণ, যদি তিনি দাওয়াত অব্যাহত রাখেন তবে তা হবে একটি নিষ্ফলা কাজ; আর যদি তিনি চুপ থাকেন তবে মনে করা হতে পারে তিনি তাঁদের কর্মের প্রতি সন্তুষ্ট। তাই যখন অবস্থানের আর কোনো সংগত কারণ থাকে না, তখন হিজরত করা ওয়াজিব বা আবশ্যক হয়ে পড়ে। (ফখরুদ্দিন রাজি, মাফাতিহুল গায়েব, ২৫/৫০-৫২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৮১)

মজলুমের প্রতি মহান রবের আহ্বান

ইবরাহিম (আ.)-এর এই হিজরত কেবল একটি দেশান্তর ছিল না, বরং এটি ছিল বিশ্বাসের স্বাধীনতার এক চিরন্তন ঘোষণা। যখন কোনো জনপদে মানুষের ধর্ম পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং ফিতনা ও উৎপীড়নের শিকার হতে হয়, তখন সেখানে পড়ে থাকা মুমিনের জন্য অপমানের বিষয়।

বিপদ মোকাবিলায় ইবনুল জাওজির দর্শন

আল্লাহ-তাআলা মুমিনদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, “আমার মুমিন বান্দাগণ, নিশ্চয়ই আমার জমিন প্রশস্ত। অতএব তোমরা আমারই ইবাদত করো।” (সুরা আনকাবুত, আয়াত: ৫৬)

এই আয়াতটি মূলত মক্কার সেই দুর্বল মুসলমানদের উদ্দেশ্যে নাজিল হয়েছিল, যাঁরা কুরাইশদের অত্যাচারে নিজেদের ঈমান প্রকাশ করতে পারছিলেন না। ইমাম বাগভি লিখেছেন, আল্লাহ তাঁদের মক্কা ছেড়ে মদিনার দিকে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন, কারণ মদিনা ছিল তখন প্রশস্ত ও নিরাপদ আশ্রয়। (ইমাম বাগভি, মাআলিমুত তানজিল, ৬/২৫৩, দারুত তাইয়্যেবা, রিয়াদ, ১৯৮৯)

বিখ্যাত তাবেয়ি সাঈদ ইবনে জুবায়ের এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, “যখন কোনো জনপদে প্রকাশ্যে পাপাচারে লিপ্ত হওয়া হয়, তখন সেখান থেকে বেরিয়ে পড়ো; কারণ আল্লাহর জমিন প্রশস্ত।”

আতা (রহ.) বলেছেন, “যদি তোমাদের পাপাচারের আদেশ দেওয়া হয়, তবে পালিয়ে যাও।”

আলেমদের মতে, যে ব্যক্তি এমন কোনো দেশে বসবাস করেন যেখানে অন্যায়-অবিচার দমন করা তার পক্ষে সম্ভব নয় এবং তিনি নিজের ধর্ম পালন নিয়ে শঙ্কিত, তবে তাঁর জন্য এমন স্থানে চলে যাওয়া উচিত যেখানে আল্লাহর ইবাদত করা সহজ হয়।

স্বদেশ ত্যাগ করা মানুষের জন্য সবসময়ই বেদনার। পরিচিত মাটি ও শেকড় উপড়ে ফেলার এই ব্যথা আল্লাহ-তাআলা দুটি মমতাপূর্ণ পরশ দিয়ে দূর করে দিয়েছেন।

প্রথমত, তিনি ‘আমার বান্দাগণ’ বলে ভালোবাসাময় সম্বোধন করেছেন।

দ্বিতীয়ত, তিনি ‘জমিন প্রশস্ত’ বলে পৃথিবীজুড়ে রিযিক ও আশ্রয়ের নিশ্চয়তা দিয়েছেন।

মুমিনের কাছে সেই ভূখণ্ডই সবচেয়ে প্রিয়, যেখানে সে মাথা নত করে কেবল এক আল্লাহর ইবাদত করতে পারে।

বেহেশতে ঘর নির্মাণ হবে যাদের জন্য

Read full story at source