হাড়ক্ষয়, আকর্ষণ কমে যাওয়া, সোশ্যাল অ্যাংজাইটি: চাঁদ থেকে ফেরা নভোচারীদের পড়তে হবে ১০টি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে
· Prothom Alo

প্রশান্ত মহাসাগরে সফল স্প্ল্যাশ ডাউনের মাধ্যমে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন আর্টেমিস ২-এর নভোচারীরা। কিন্তু এখানেই শেষ হচ্ছে না তাঁদের চ্যালেঞ্জ।
পৃথিবীতে ফিরে আসার পর মহাকাশচারীরা উল্লেখযোগ্য শারীরিক ও মানসিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। মূলত দীর্ঘদিনের মাইক্রোগ্রাভিটি বা ভারশূন্য পরিবেশে থাকার পর আবার পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার কারণেই এসব সমস্যা দেখা দেয়। শারীরিক সমস্যার মধ্যে থাকে পেশি ক্ষয়, হাড়ের ঘনত্ব কমে যাওয়া, মাথা ঘোরা, ভারসাম্য হারানো এবং হৃদ্রোগ-সংক্রান্ত কার্যকারিতা কমে যাওয়া।
Visit catcross.org for more information.
পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন আর্টেমিস ২-এর নভোচারীরা। কিন্তু এখানেই শেষ হচ্ছে না তাঁদের চ্যালেঞ্জমানসিকভাবে তারা অনেক সময় অতিরিক্ত সংবেদনগত চাপ, ক্লান্তি, মেজাজের পরিবর্তন এবং নিরিবিলি পরিবেশ থেকে ব্যস্ত জীবনে ফিরে আসার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। আজ প্রশান্ত মহাসাগরে সফল স্প্ল্যাশ ডাউনের মাধ্যমে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে এসেছেন আর্টেমিস ২-এর নভোচারীরা। কিন্তু এখানেই শেষ হচ্ছে না তাঁদের চ্যালেঞ্জ। চলুন দেখে নিই কী কী শারিরীক ও মানসিক সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন তাঁরা।
মহাকাশে শরীরের তরল উপরের দিকে সরে যায়, কিন্তু পৃথিবীতে ফিরে আসার পর তা আবার পায়ে নেমে আসেশারীরিক চ্যালেঞ্জ
ভারসাম্যজনিত সমস্যা ও মাথা ঘোরা: শরীরের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণকারী ভেস্টিবুলার সিস্টেম হঠাৎ মাধ্যাকর্ষণের পরিবর্তনে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। ফলে কয়েকদিন পর্যন্ত তীব্র মাথা ঘোরা বা ভার্টিগো হতে পারে।
পেশি ও হাড়ের দুর্বলতা: মহাকাশে থাকার সময় প্রতি মাসে প্রায় ১ শতাংশ পর্যন্ত হাড়ের ভর কমে যেতে পারে এবং পেশি ক্ষয় হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবে হাঁটার জন্যও তাদের দীর্ঘ সময় ধরে পুনর্বাসন প্রয়োজন হয়।
মহাকাশে মেরুদণ্ড কিছুটা প্রসারিত হয়, কিন্তু পৃথিবীতে ফিরে এসে তা আবার সংকুচিত হয়হৃদ্রোগ-সংক্রান্ত পরিবর্তন: মহাকাশে শরীরের তরল উপরের দিকে সরে যায়, কিন্তু পৃথিবীতে ফিরে আসার পর তা আবার পায়ে নেমে আসে। এতে দাঁড়ালে মাথা ঘোরা (অর্থোস্ট্যাটিক ইনটলারেন্স) এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়।
মেরুদণ্ডে চাপ: মহাকাশে মেরুদণ্ড কিছুটা প্রসারিত হয়, কিন্তু পৃথিবীতে ফিরে এসে তা আবার সংকুচিত হয়। এতে কোমরে ব্যথা হতে পারে।
ইন্দ্রিয় ও শরীরের তরল পরিবর্তন: মহাকাশে “ফোলা মুখ” দেখা দিলেও পৃথিবীতে ফিরে এলে তরল নিচের দিকে নেমে আসে। তবে এতে অনেক সময় দৃষ্টিতে ঝাপসা ভাব তৈরি হতে পারে, যা স্পেসফ্লাইট-সম্পর্কিত চোখের সমস্যার সঙ্গে যুক্ত।
মানসিক চ্যালেঞ্জ
সংবেদনগত চাপ: শান্ত ও সীমাবদ্ধ পরিবেশ থেকে হঠাৎ শব্দ, আলো ও ব্যস্ততায় ভরা পৃথিবীতে ফিরে আসা অনেক সময় মানসিকভাবে চাপ তৈরি করে।
ক্লান্তি ও ঘুমের সমস্যা: ২৪ ঘণ্টার স্বাভাবিক সময়চক্রে মানিয়ে নিতে গিয়ে অনিদ্রা বা অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
শান্ত ও সীমাবদ্ধ পরিবেশ থেকে হঠাৎ শব্দ, আলো ও ব্যস্ততায় ভরা পৃথিবীতে ফিরে আসা সহজ নয়সামাজিক জীবনে পুনরায় মানিয়ে নেওয়া: দীর্ঘদিন নির্জনতা ও কঠোর রুটিনের পর সামাজিক ও ব্যস্ত জীবনে ফিরে আসা অনেকের মধ্যে উদ্বেগ বা হতাশা তৈরি করতে পারে।
স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা অনেকের মধ্যে উদ্বেগ বা হতাশা তৈরি করতে পারেমনোযোগ কমে যাওয়া: মস্তিষ্ক আবার নতুন করে মাধ্যাকর্ষণ ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে মনোযোগে ঘাটতি বা ব্রেইন ফগ দেখা দিতে পারে।
যৌন ও হরমোনজনিত চ্যালেঞ্জ
দীর্ঘদিন মহাকাশে থাকার ফলে শরীরের হরমোনের ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে, যা যৌনস্বাস্থ্যেও প্রভাব ফেলে। কিছু মহাকাশচারীর ক্ষেত্রে যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া, ক্লান্তি বা মানসিক চাপের কারণে লিবিডো হ্রাস দেখা যায়।
পুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা সাময়িকভাবে কমে যেতে পারেপুরুষদের ক্ষেত্রে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা সাময়িকভাবে কমে যেতে পারে, আর নারীদের ক্ষেত্রেও হরমোনাল পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া পেশি দুর্বলতা, ক্লান্তি ও মানসিক চাপ যৌন জীবনে স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনতে সময় লাগায়। যদিও এ বিষয়ে গবেষণা এখনো সীমিত, তবুও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যৌনস্বাস্থ্যও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে।
মহাকাশচারীদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক মাস ধরে শারীরিক থেরাপি নিতে হয়পুনরুদ্ধার ও পুনর্বাসন
মহাকাশচারীদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক মাস ধরে শারীরিক থেরাপি নিতে হয়, যাতে পেশির শক্তি, হাড়ের ঘনত্ব এবং হৃদ্যন্ত্রের কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার করা যায়।
দীর্ঘমেয়াদে মহাকাশে থাকা বিকিরণের কারণে ক্যান্সার বা অন্যান্য অবক্ষয়জনিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে চোখ বা স্নায়ুর স্থায়ী ক্ষতিও দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, মহাকাশ থেকে পৃথিবীতে ফেরা শুধু একটি যাত্রার শেষ নয়—এটি শরীর ও মনের জন্য একটি নতুন অভিযোজনের শুরু।
সূত্র: নাসা, দ্য টাইমস, দ্য উইক
ছবি: নাসার ইন্সটাগ্রাম