‘আগের ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়ায় আবার মব সন্ত্রাস’
· Prothom Alo

‘মব কালচার শেষ’—বিএনপি সরকার গঠনের পরদিনই এই ঘোষণা দিয়েছিলেন নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তাঁর ওই বক্তব্যের পেছনে ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরে একের পর এক মব সন্ত্রাসের ঘটনা। সেসবের অবসানের কথাই বলেছিলেন তিনি।
Visit extonnews.click for more information.
সালাহউদ্দিন আহমদ কথাটি বলেছিলেন গত ১৮ ফেব্রুয়ারি। তার দুই মাসের মধ্যে গত শুক্রবার রাজধানীর শাহবাগে মব সৃষ্টি করে আড্ডারত কয়েকজন নারী–পুরুষকে ‘সমকামী’, ‘ট্রান্সজেন্ডার’ আখ্যা দিয়ে তাঁদের ওপর হামলা হয়। তার এক দিন বাদে মব সৃষ্টি করে হত্যাকাণ্ডই ঘটে কুষ্টিয়ায়।
এই জেলার দৌলতপুর উপজেলায় স্থানীয়ভাবে পীর হিসেবে পরিচিত শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরকে তার দরবারে ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুরোনো একটি ভিডিও সামনে এনে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এই হামলা হয়েছিল।
কুষ্টিয়ার ঘটনাটি মব সন্ত্রাসের বিষয়টি আবার সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে ঘটে যাওয়া এমন সব ঘটনায় বিচার না হওয়ায় তা আবার ঘটছে। এখনি কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের সহিংসতা বাড়তে থাকবে।
লেখক ও শিক্ষক আনু মুহাম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, আগের ঘটনাগুলোর বিচার হয়নি বলে আবার একই ঘটনা ঘটেছে। আগে যেসব মব সৃষ্টি করে হামলা হয়েছে, সরকারের উচিত সেসব ঘটনা তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা এবং ব্যবস্থা নেওয়া। বিচার না করলে বুঝতে হবে এসব ঘটনায় সরকারের সমর্থন রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছর গণপিটুনি বা ‘মব সন্ত্রাসের’ শিকার হয়ে প্রাণ গেছে ১৯৭ জনের। ২০২৪ সালে সংখ্যাটি ছিল ১২৮।
বিচার না হওয়ায়ই নতুন ঘটনা ঘটার পথ তৈরি করে দিচ্ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান, সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগও। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, মব সহিংসতা যারাই করুক, বিচার হতে হবে।
আনু মুহাম্মদ‘হামলা ছিল পরিকল্পিত, পুলিশ ছিল নিষ্ক্রিয়’
সমাজে দীর্ঘ সময় ধরে বিরাজমান স্বৈরশাসনের রাজনীতি ও লুণ্ঠনের অর্থনীতি মব সন্ত্রাসের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে দিয়েছে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
আনু মুহাম্মদ বলেন, এ ব্যবস্থার ভেতরে জন্ম নিয়েছে সাংঘাতিক রকমের অসহিষ্ণুতা। ভিন্ন চিন্তা, ভিন্ন পরিচয়, ভিন্ন লিঙ্গ, ভিন্ন মত, যা কিছু নিজের থেকে আলাদা, তার প্রতি বিদ্বেষ ও আক্রমণ। নিজেরা যা বলবে, যেভাবে পোশাক পরবে, যেভাবে জীবনযাপন করবে, যেভাবে ধর্ম মেনে চলবে— অন্যরা সেভাবে মেনে না চললে আক্রমণ করতে হবে। এ ধরনের ফ্যাসিবাদী চিন্তা সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তার করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই প্রবণতা বেড়ে যাওয়া নিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, অনেক ঘটনায় তারা নিষ্ক্রিয় ছিল, নমনীয় ছিল, অনেক ঘটনায় তাদের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। কোনো ক্ষেত্রে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা ছিল। ফলে মব সহিংসতা আরও ডালপালা ছড়িয়েছে।
শাহবাগ ও কুষ্টিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাকে পরিকল্পিত মনে করেন তিনি। এটা ঠেকাতে না পারার জন্য সরকারকেও তিনি দায়ী করেন।
ভালো মব খারাপ মব, কোনটা কার মবআনু মুহাম্মদ বলেন, এ ধরনের মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে পুলিশসহ প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতি সরকারের স্পষ্ট বার্তা থাকা উচিত ছিল। শাহবাগে হামলার সময় পুলিশ বসে ছিল, ব্যবস্থা নেয়নি। তার মানে এ ধরনের ঘটনা ঠেকানোর বার্তা পুলিশের কাছে নেই। কুষ্টিয়ায় পুলিশের কোনো শক্ত অবস্থান দেখা যায়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাজার ভাঙা, বাউলদের অনুষ্ঠানে হামলা যারা করেছিল, সাম্প্রতিক হামলায় তারাই জড়িত বলে মনে করেন আনু মুহাম্মদ। তাই এই গোষ্ঠী নিয়ে পুলিশের সতর্ক থাকা উচিত ছিল বলে তাঁর মন্তব্য। তাঁর মত, এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা ব্যর্থতা ছিল।
ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক আনু মুহাম্মদ বলেন, যেসব গোষ্ঠী হামলা করছে, তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। তারা ফ্যাসিবাদী রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য উসকানি দিয়ে সংঘবদ্ধ হামলা করে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করতে চাইছে। তাদের নারীবিষয়ক নির্দিষ্ট চিন্তা, ভিন্ন লিঙ্গ, ভিন্ন বিশ্বাসের মানুষের প্রতি নিজস্ব হিংস্র চিন্তা রয়েছে। সেটাকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইতে পারে। সেটা বেশি উদ্বেগের।
এ জন্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে জোর দিচ্ছেন তিনি। রেডিও, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারাভিযান চালাতে সরকারকে পরামর্শও তিনি দিলেন।
নতুন সরকার মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে, এমন আশা করছেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, এ সরকারের বয়স বেশি নয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মব সন্ত্রাস আর হবে না বলেছিলেন। এখন পর্যন্ত আশা করা যেতে পারে, এ সরকার মবের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবে।
মব সন্ত্রাস ও অনলাইনে আক্রমণে নিরাপত্তাঝুঁকিতে নারীরা‘বিচার না হওয়ায় অভ্যাসগত অপরাধে পরিণত হয়েছে’
বিচার না হওয়াটা কীভাবে মব সন্ত্রাস বাড়িয়ে তোলে, তার ব্যাখ্যা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান সহকারী অধ্যাপক রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে যে আইনের হাতে সোপর্দ করলে অপরাধের যথাযথ বিচার হবে না। নিজেরাই আগবাড়িয়ে বিচারের নামে অপরাধে জড়াচ্ছে। কোন বিষয় অপরাধ, আর কোন বিষয় অপরাধ না—সেটা নিয়ে জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। না বুঝে নিজেরাই অপরাধের একটি সংজ্ঞা দাঁড় করিয়ে হামলা করছে। গুজবের ওপর ভিত্তি করে মব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে।
মব সন্ত্রাসের ঘটনা আর ঘটবে না, নতুন সরকারের এমন কথা কাজে প্রমাণিত করতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মব সহিংসতার বিচার নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়ে রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, একই মানুষ, একই গোষ্ঠী বারবার হামলা করছে, অপরাধ করছে। এ ধরনের অপরাধের ঘটনায় যে রকম শাস্তি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। একই অপরাধের বিচার না হওয়ায় তা বারবার ঘটছে এবং অভ্যাসগত অপরাধে পরিণত হচ্ছে। এখনই ঘটনাগুলোকে আইনের আওতায় নিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করলে মব সহিসংতা আরও বাড়বে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশের ভেঙে পড়া মনোবল এখনো পুনরুদ্ধার হয়নি বলেও মনে করেন অপরাধবিজ্ঞানের এই শিক্ষক।
রেজাউর রহমান সোহাগরাত থেকে সাতটি আইডি দিয়ে ছড়ানো হয় ভিডিও, হামলার নেতৃত্বে ছিলেন এক নেতারেজাউল করিম সোহাগ বলেন, বিভিন্ন কারণে পুলিশের মনোবলে ফাটল দেখা যাচ্ছে। তারা অপরাধের ঘটনাস্থলে যেতে ভয় পাচ্ছে। কারণ, তারা প্রত্যেক জায়গায় আক্রান্ত হচ্ছে। শাহবাগ ও কুষ্টিয়ায় মব সহিংসতার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দ্রুত সাড়া দিতে দেখা যায়নি।
এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, আগস্ট–পরবর্তী সময়ে পুলিশের মধ্যে অনেক রদবদল হয়েছে। অনেক বদলি হয়েছে। অপরাধের ঘটনা তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছেন এমন কর্মকর্তারা, যাঁরা আগে তদন্তের দায়িত্ব পালন করেননি। অনেকের দ্রুত কর্মস্থল পরিবর্তন হচ্ছে। স্থানীয় ঘটনাগুলো সম্পর্কে তাঁদের জানাশোনা কম থেকে যাচ্ছে।
অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে পুলিশের সংখ্যাস্বল্পতার কথাও বলেন রেজাউল করিম সোহাগ। তিনি বলেন, ২০০ নাগরিকের জন্য একজন পুলিশ থাকার কথা, সেখানে ৮০০ মানুষের বিপরীতে একজন পুলিশ দায়িত্বে রয়েছেন। এই বিশাল পার্থক্যের কারণেও মব সহিংসতার মতো অপরাধ বাড়ছে।
পুলিশকে আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, কোন কোন অপরাধ বাড়ছে, তা শনাক্ত করতে হবে। সেসব ঘটনায় পুলিশ কীভাবে সাড়া দিচ্ছে, জনগণ কী প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে, সেসবের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন হতে হবে। গুজব প্রতিরোধে স্থানীয় সরকারকে কাজে লাগানোর পরামর্শও দেন তিনি।
মবসহ অন্যান্য অপরাধের বিচার নিশ্চিত করে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে হবে, বলেন রেজাউল করিম সোহাগ।