আটঘাট বেঁধে বড় আন্দোলনে নামার লক্ষ্য জামায়াতসহ ১১ দলের
· Prothom Alo

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে বড় কর্মসূচির দিকে এগোচ্ছে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। গণমিছিল, সেমিনার ও লিফলেট বিলির পর বিভাগীয় শহরগুলোয় সমাবেশের পর রাজধানীতে মহাসমাবেশ করতে চাইছে তারা। এর উদ্দেশ্য ক্ষমতাসীনদের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো।
১১–দলীয় ঐক্যের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, বর্তমান কর্মসূচি মূলত জনমত গঠন ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির ধাপ। মাঠের পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া মূল্যায়ন করে আগামী ধাপে কর্মসূচির পরিধি আরও বিস্তৃত করা হবে। প্রয়োজনে আরও কঠোর কর্মসূচির দিকে যাওয়ার আলোচনা রয়েছে।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
হামিদুর রহমান আযাদ, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, জামায়াতে ইসলামীধাপে ধাপে যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হচ্ছে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সেটি চলমান থাকবে। সরকার গণভোটের রায় মেনে না নিলে আরও কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবে ১১ দল।গত ৯ থেকে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি পালন করেছে ১১ দল। এ সময় সারা দেশে লিফলেট বিলি, মহানগর ও জেলা পর্যায়ে বিক্ষোভ এবং ১৩ এপ্রিল ঢাকায় জাতীয় সেমিনার করেছে।
এরপর গত ১৬ এপ্রিল রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয়–সংলগ্ন আল ফালাহ মিলনায়তনে বৈঠকে বসেন ১১ দলের শীর্ষ নেতারা। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে ১৮ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ১৮ এপ্রিল ঢাকায় গণমিছিলের পর ২৫ এপ্রিল বিভাগীয় শহরগুলোয় এবং ২ মে জেলা শহরগুলোয় গণমিছিল হবে। পাশাপাশি এ সময়ের মধ্যে বিভাগীয় শহর ও গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরে সেমিনার এবং লিফলেট বিলি চলবে।
১১–দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তারা এখন বিভাগ ও জেলা শহরে গণমিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। পাশাপাশি সেমিনারের বিষয় ও অতিথি কাদের করা হবে, তা নির্ধারণের কাজ করছে তারা।
২৫ এপ্রিল বিভাগীয় শহরগুলোয় এবং ২ মে জেলা শহরগুলোয় গণমিছিলের কর্মসূচি রয়েছে ১১–দলীয় ঐক্যের। পাশাপাশি বিভাগীয় শহর ও গুরুত্বপূর্ণ জেলা শহরে সেমিনার এবং লিফলেট বিলি চলবে। এরপর ঢাকায় মহাসমাবেশের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সদস্যদের দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।
তবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারির শপথ অনুষ্ঠানে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ বিরোধী দলের সদস্যরা দুটি শপথ নিলেও বিএনপির সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নেননি। তাই এখনো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হয়নি।
জামায়াত নেতারা বলে আসছেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলেও ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করছে। ফলে দেশে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি হচ্ছে। তবে বিএনপির যুক্তি, জুলাই সনদের অধিকাংশ বিষয় তারা বাস্তবায়ন করছে। তবে কিছু বিষয়ে তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ তখনই দেওয়া ছিল। সেসব বিষয় বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা তাদের নেই।
ঢাকার শাহবাগে গত ৯ এপ্রিল লিফলেট বিলি ও গণসংযোগ কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারএদিকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সংসদে সরব ভূমিকা পালন করছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। এর পাশাপাশি সরকারকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে মাঠের কর্মসূচিতে নেমেছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১–দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ গত ১৭ এপ্রিল প্রথম আলোকে বলেন, ধাপে ধাপে যে কর্মসূচি ঘোষণা করা হচ্ছে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত সেটি চলমান থাকবে। সরকার গণভোটের রায় মেনে না নিলে আরও কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবে ১১ দল।
জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সারা দেশে ১১-দলীয় জোটের বিক্ষোভপরবর্তী পরিকল্পনা
১১ দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র বলছে, তাঁদের প্রত্যাশা ছিল গণভোটের ফল অনুসারে দ্রুতই সংস্কারের কাজগুলো শুরু হবে। কিন্তু সময় গড়ালেও সে বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে জনমনে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, যা রাজনৈতিক কর্মসূচির পটভূমি হিসেবে কাজ করছে।
সূত্রগুলো বলছে, সরকারের ওপরে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে চায় বিরোধী দল। সেভাবেই কর্মসূচিগুলো সাজানো হচ্ছে। ২ মের পরের কর্মসূচি নিয়ে ইতিমধ্যে একটি প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি হয়েছে। ১১ দলের লিয়াজোঁ কমিটির বৈঠকে কর্মসূচির দিনক্ষণ ঠিক হবে। সেই বৈঠক আগামী সপ্তাহে হতে পারে।
রাষ্ট্র সংস্কার ও গণভোট ইস্যুতে এত বিতর্ক কেনগত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত ১১ দল দফায় দফায় কর্মসূচি দেবে। সরকারকে হুঁশিয়ারও করে তিনি সেদিন বলেছিলেন, আন্দোলন দমনের চেষ্টা করলে তার ফল ভালো হবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জনসভায় যেভাবে জামায়াতসহ ১১ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা গিয়েছিলেন, একইভাবে সামনে বিভাগীয় ও জেলার কর্মসূচিগুলোয় বিরোধী দলের কেন্দ্রীয়সহ শীর্ষস্থানীয় নেতারা যাবেন। আর জাতীয় মহাসমাবেশে সারা দেশ থেকে নেতা-কর্মীদের রাজধানী ঢাকায় আনার চিন্তা করা হচ্ছে।
১১–দলীয় জোটভুক্ত একটি দলের শীর্ষ এক নেতা প্রথম আলোকে বলেন, সরকার দাবি মেনে নেবে, বিরোধী দল এমনটাই আশা করে। তবে সরকারের সাড়া না পেলে সামনের কর্মসূচি কঠোর হবে।
সংসদে সরব থেকে রাজপথে আন্দোলন
১১ দলসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, লম্বা সময় ধরে আন্দোলনের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, দীর্ঘ আন্দোলনে কর্মীদের সক্রিয় রাখা কঠিন। দ্বিতীয়ত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জনভোগান্তির প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। সে কারণে পরিবেশ–পরিস্থিতি বিবেচনা করে দলগুলো ধাপে ধাপে এগোতে চায়। তাই কর্মসূচি দেওয়ার ক্ষেত্রে ঈদুল আজহা, এসএসসি–এইচএসসি পরীক্ষা, আবহাওয়াসহ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা হচ্ছে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে গত ১২ এপ্রিল পঞ্চগড়ে ১১-দলীয় ঐক্যের বিক্ষোভএসব সূত্রের মতে, কর্মসূচির পরবর্তী ধাপগুলো শেষ হতে হতে বর্ষাকাল চলে আসবে। এর মধ্যে জনস্বার্থসম্পর্কিত কোনো বিষয় এলে সেগুলো নিয়েও সরব থাকবে ১১ দল। সব মিলিয়ে কর্মসূচিগুলো শেষ করতে করতে আগস্ট মাস শেষ হয়ে যাবে। তবে এর মধ্যেও দাবি আদায় না হলে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার বিষয়ে এখন থেকেই ভেবে রাখছেন নেতারা।
দলগুলোর নেতারা মনে করেন, গণভোটের প্রশ্নে বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলা প্রয়োজন। সে কারণে ১১ দলের বাইরে আরও কিছু দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ চলছে। তাঁদের মতে, কর্মসূচি যত বিস্তৃত হবে, সরকারের ওপর চাপও তত বাড়বে।
গণভোটের রায় না মানলে বিএনপি সরকারকে অবৈধ সরকার বলা শুরু করব: আসিফ মাহমুদদলগুলোর কৌশলের আরেকটি দিক হচ্ছে সংসদ ও রাজপথে সমান্তরাল চাপ তৈরি করা। সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকা দলগুলো সেখানে বিষয়টি তুলবে, আর মাঠে শরিক দলগুলো কর্মসূচি চালাবে।
১১–দলীয় ঐক্যভুক্ত বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান) ১৭ এপ্রিল প্রথম আলোকে বলেন, জনগণের ভোটের মূল্য দিচ্ছে না বিএনপি সরকার। গণভোটের রায় মানা হচ্ছে না। সে কারণে বিরোধী জোটের জনসমর্থন বাড়ছে। গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ১১ দলের কর্মসূচিতে ভোটের অধিকারের জন্য জনগণই রাস্তায় নামবে।
রাজনীতি–সংশ্লিষ্ট অনেকে মনে করেন, বিরোধী জোট কতটা শান্তিপূর্ণ, ধারাবাহিক এবং জনসম্পৃক্ততা বজায় রেখে আন্দোলন চালাতে পারে, তার ওপর সাফল্য নির্ভর করবে। আগামী কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক পরিস্থিতিই ঠিক করে দেবে, তাদের সামনের কর্মসূচি কেমন হবে।