ঢাবির হলে ‘গুপ্ত’ দেয়াললিখন ঘিরে উত্তেজনা

· Prothom Alo

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) একাধিক হলে দেয়াললিখন ঘিরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

গতকাল বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ৭১ ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে দেয়াললিখন ঘিরে এই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলেও গতকাল রাতে একই রকম দেয়াললিখন হয়েছে। এ নিয়ে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

এসব ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে ছয়জন সাংবাদিক হেনস্তা–হুমকি–ধমকির শিকার হন। ভুক্তভোগী সাংবাদিকেরা বলেন, এসব ঘটনায় ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা জড়িত ছিলেন। এ ঘটনায় ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছে।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে ছাত্রদলের দেয়াললিখন

গতকাল রাত ৮টার দিকে বিজয় একাত্তর হলে ‘প্রতিবাদী দেয়াললিখন’ কর্মসূচি পালন করে ছাত্রদল। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, ছাত্রদলের কর্মীরা হল সংসদ কক্ষের সামনের দেয়ালে ‘গুপ্ত’ ছাড়াও অন্যান্য বিষয় লিখেছিলেন। এতে বাধা দেন হল সংসদের পাঠকক্ষ সম্পাদক তারেক রহমান শাকিব।

বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে তারেক ছাত্রদলের একজন কর্মীকে গালাগালি করেন বলে অভিযোগ বিজয় ৭১ হল ছাত্রদলের। তাদের এক কর্মীর মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাও হয় বলে অভিযোগ করে তারা। এর প্রতিবাদে ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ-মিছিল করেন।

তারেক রহমান শাকিব তাঁর বিরুদ্ধে আনা গালাগালির অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কোনোপ্রকার গালিগালাজ করিনি। শুধু বাধা দিয়েছি হল সংসদ কক্ষের দেয়ালে কিছু না লিখতে।

মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ সম্পর্কে তারেক রহমান শাকিব বলেন, ‘ওই ছেলে (যাঁর ফোন) আমার মোস্ট জুনিয়র। ওর ফোন কেন কেড়ে নিতে চাইব? মোবাইল কেড়ে নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’

ঘটনাটি নিয়ে বিজয় ৭১ হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) হাসানুল বান্না তাঁর ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে শৃঙ্খলা নষ্টের ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। তিনি লিখেছেন, ‘প্রতিবাদের নামে বিজয় একাত্তর হলের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য এবং শৃঙ্খলা নষ্ট করছে একটা গোষ্ঠী। নিন্দা জানিয়ে রাখলাম।’

একইদিনে রাতে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে দেয়াললিখন ঘিরে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

হল সূত্র জানায়, ছাত্রদল হলে ‘গুপ্ত রাজনীতি নিপাক যাক’ লিখে দেয়াললিখন করে। প্রতিবাদে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে ‘আদু ভাইদের ঠিকানা, আবাসিক হলে হবে না’ লিখে দেয়াললিখন করা হয়। এ নিয়ে দুইপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে ছাত্রশিবিরের পাল্টা দেয়াললিখন

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হলের হাউস টিউটর মিজানুর রহমান উভয়পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করেন। তিনি দুটি দেয়াললিখনই মুছে ফেলার প্রস্তাব দেন। কিন্তু ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা দেয়াললিখন মুছে ফেলার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তাঁরা বলেন, আগে প্রধাক্ষ্যের সঙ্গে আলোচনা করবেন, তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন। এর আগপর্যন্ত দেওয়াললিখন এভাবেই থাকবে।

অপরদিকে গতকাল গভীর রাতে শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের অতিথিকক্ষে ছাত্রদলের উদ্যোগে ‘গুপ্ত শিবির’ লিখে দেওয়াললিখন করা হয়।

হল সংসদের সমাজসেবা সম্পাদক জহির রায়হান রিপন এই দেওয়াললিখনকে ‘মস্তিষ্ক বিকৃত কার্যক্রম’, ‘রাজনৈতিক নোংরামি’ হিসেবে অভিহিত করে ফেসবুকে পোস্ট দেন।

বিষয়টি নিয়ে হল সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) খালেদ হাসান ফেসবুকে লিখেন, অতিথিকক্ষে যে ঘটনাটি ঘটেছে, তা তাঁর জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়। ছাত্রদল–শিবির দ্বন্দ্বে জড়াবে, এটা হয়তো তাদের নিজস্ব বিষয়। কিন্তু হলের উন্নয়নমূলক কাজগুলো এভাবে নষ্ট করে দেওয়া সত্যিই তাঁর জন্য কষ্টের।

ছয় সাংবাদিককে হেনস্তা

দেয়াললিখন ঘিরে ছাত্রদল–ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে ছয়জন সাংবাদিক হেনস্তা–হুমকিধমকির শিকার হয়েছেন। বিজয় একাত্তর ও ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলে পৃথকভাবে এই ঘটনা ঘটে।

গতকাল রাত ৮টার দিকে বিজয় একাত্তর হলে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির ভিডিও ধারণ করতে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির (ডুজা) তিন সদস্য হেনস্তার শিকার হন। তাঁরা হলেন ইফতেখার সোহান সিফাত, আসাদুজ্জামান খান ও হারুন ইসলাম।

ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, এক সাংবাদিক ঘটনার ভিডিও ধারণ করছিলেন। তাঁকে ভিডিও ধারণে বাধা দেন ছাত্রদলের নেতা–কর্মীরা। পরিচয় দিলে তাঁকে বলা হয়, ‘সাংবাদিক হলেই এখানে ভিডিও করা যাবে না।’ এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত ডুজার দুই সদস্য প্রতিবাদ জানালে তাঁদেরও হেনস্তা করা হয়।

অন্যদিকে গতকাল দিবাগত রাত ১টার দিকে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলে তিন সাংবাদিক হেনস্তা–হুমকিধমকির শিকার হন। হলটিতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দেওয়াললিখন ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার সংবাদ সংগ্রহ করতে তাঁরা গিয়েছিলেন। ভুক্তভোগী সাংবাদিকেরা হলেন মানজুর হোছাইন মাহি, নাইমুর রহমান ইমন ও সজিব মিয়া।

শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলে ছাত্রদলের দেয়াললিখন

ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, হলের একটি কক্ষে হাউস টিউটরের উপস্থিতিতে বৈঠক চলাকালে সেখানে তিন সাংবাদিক প্রবেশ করেন। তখন তাঁদের বের হয়ে যেতে বলা হয়। এ সময় ছাত্রদলের কয়েকজন নেতা–কর্মী এই তিন সাংবাদিকের দিকে তেড়ে যান। তাঁদের ভয়ভীতি দেখান।

বিজয় একাত্তর হলের ঘটনার পর বিষয়টি মীমাংসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতিতে যান ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, দপ্তর সম্পাদক মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন তামিসহ অন্য নেতারা। সেখানে তাঁরা সাংবাদিকদের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সতর্ক থাকার আশ্বাস দেন।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ হলের ঘটনার বিষয়ে মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন বলেন, সাংবাদিক সমিতির সদস্যদের চিনতে না পেরে ছাত্রদলের কয়েকজন কর্মী তাঁদের সঙ্গে উচ্চস্বরে কথা বলেছিলেন। একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনিসহ হলের যাঁরা সিনিয়র রয়েছেন, তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে সাংবাদিকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক লিটন ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সাংবাদিকরা কারও প্রতিপক্ষ নন। তাঁরা নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতার সঙ্গে দায়িত্বের জায়গা থেকে কাজ করেন। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে গতকাল রাতে সাংবাদিকেরা হেনস্তার শিকার হয়েছেন। তাঁদের হেনস্তায় দুবার মব সৃষ্টি করা হয়েছে। এ ধরনের কার্যক্রমে জড়িতদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

Read full story at source