যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে ট্রাম্পকে যা করতে হবে
· Prothom Alo

ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ করতে সময় লেগেছিল পাঁচ বছর। ১৯৬৮ সালে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তা গিয়ে শেষ হয় ১৯৭৩ সালের জানুয়ারিতে প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে। তখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রশাসন ছিল চাপে জর্জরিত। এই দীর্ঘ আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে গোপন বৈঠকগুলোতে। সেখানে মুখোমুখি বসতেন হেনরি কিসিঞ্জার এবং ভিয়েতকং-এর প্রতিনিধি লে ডাক থো। এমন ৬৮ দফা গোপন বৈঠক হয়েছিল।
Visit casino-promo.biz for more information.
কিসিঞ্জার তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, এ ধরনের আলোচনার প্রক্রিয়া সূক্ষ্ম, জটিল এবং কখনো কখনো প্রায় দুঃসহ হয়ে ওঠে। অবশ্য তখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে এখনকার কিছু পার্থক্য রয়েছে। ভিয়েতনাম যুদ্ধ বহু বছর ধরে চলেছিল, দুই পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ যোদ্ধা জড়িত ছিলেন, হাজার হাজার ভিয়েতনামি বন্দীর বিনিময়ে কয়েক শ মার্কিন বন্দী ছাড়া পেয়েছিলেন আর আলোচনায় ছিল চারটি পক্ষ।
কিন্তু বর্তমান যুদ্ধের সময় দুই মাসের কম, স্থলযুদ্ধ প্রায় হয়নি বললেই চলে, বন্দী নেই, আর আলোচনায় আসতে হবে মূলত দুই পক্ষকেই। ফলে কূটনীতি কিছুটা সহজ মনে হতে পারে। তবু কাজটি যে সহজ নয়, তা ভুলে গেলে চলবে না।
আমার মূল উদ্বেগের জায়গাটি হলো ইরান এই যুদ্ধে তাদের অর্থনৈতিক শক্তির যে প্রভাব রয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি প্রদর্শন করেনি। হয়তো সেই কারণেই তারা এখন কোনো সমঝোতায় আসতে রাজি নয়। তাদের আসল হাতিয়ার হলো অর্থনীতি এবং তার প্রকৃত প্রভাব এখনো অনুভবের অপেক্ষায়। সম্ভবত তারা চাইছে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের কর্মকাণ্ডের যে চরম অভিঘাত, তা আগে আছড়ে পড়ুক; এরপরই তারা সমঝোতার জন্য প্রস্তুত হবে। সেটি ঘটতে অন্তত কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে। আপাতত বর্তমান পরিস্থিতির স্থবিরতাই তাদের পক্ষে যাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে যে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তার প্রাথমিক লক্ষণগুলো ইতিমধ্যে ফুটে উঠতে শুরু করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তেলের মজুত ফুরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে। সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের জোগানও কমে আসছে।
গত সপ্তাহে আমাদের দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতির কারণে দীর্ঘমেয়াদি লোডশেডিংয়ের মাধ্যমেই সংকটের প্রথম আঁচ পাওয়া গিয়েছিল। তবে সরকারের সময়োচিত দাম নির্ধারণ এবং আমাদের তেলসমৃদ্ধ বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার কারণে জ্বালানির বাজার সাময়িকভাবে সচল রাখা সম্ভব হয়েছে।
কোনো যুদ্ধ এত দ্রুত এবং এত বড় আকারে আমেরিকার পরাজয়ের কারণ হয়নি। এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে যে কূটনীতির প্রয়োজন, তা তখনই কার্যকর হবে, যখন আমেরিকান পক্ষ এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারবে এবং এর প্রকৃত অর্থ বুঝে নেবে। যত দিন তা না ঘটছে, তত দিন ইরানের অনমনীয়তা অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজনে গ্যাস সরিয়ে নিতে কয়েকটি সার কারখানা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। পেট্রলপাম্পগুলোতে দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। শ্রীলঙ্কার পাম্পগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ফিলিপাইনের জ্বালানি স্টেশনে কর্তব্য পালনের জন্য পুলিশের ৯৮ হাজার কর্মীকে তলব করেছে। থাইল্যান্ডে সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে জ্বালানি বিক্রির প্রবণতা রুখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। এশিয়ার প্রতিটি প্রান্তে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়ার লক্ষণ দেখা দিচ্ছে।
ইউরোপও এই পরিস্থিতি থেকে খুব একটা পিছিয়ে নেই, যেখানে জেট ফুয়েলের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে এবং আতঙ্কিত হয়ে মানুষ তেল কেনার জন্য ছুটছে।
যুদ্ধের প্রভাবে এত দিন পর্যন্ত কেবল তেলের দাম বাড়ছিল, কিন্তু এখন আমরা এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছি, যেখানে তেলের ভৌত ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। আসল সংকট হয়তো এখান থেকেই শুরু।
ইরানি সভ্যতার ওপর ট্রাম্পের এত আক্রোশ কেনএর পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিও নিজস্ব সংকটের সম্মুখীন। যদিও প্রশাসনিক গোপনীয়তার কারণে তারা বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করছে। কাতার সম্প্রতি তিন বিলিয়ন ডলারের জরুরি বন্ড ছেড়েছে, যা তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বড় আকারের অর্থ উত্তোলনের চাপ সামলানোর জন্যই করা হয়েছে বলে মনে হয়। এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতও আমেরিকার ট্রেজারি বিভাগের কাছে জরুরি সোয়াপ লাইনের জন্য আবেদন করেছে, যা তাদের নগদ অর্থসংকটেরই ইঙ্গিত দেয়।
যদি বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এই বিঘ্ন আরও বাড়বে এবং এর প্রভাব কেবল জ্বালানি বা শক্তি বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং পেট্রোলিয়ামজাত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য উৎপাদন শিল্পেও ছড়িয়ে পড়বে। তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ করার ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষমতা ক্রমে হ্রাস পাবে এবং যখন তেলের আসল দাম ও সরবরাহের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতির সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে, তখন তার ফলে যে ধ্বংসলীলা সৃষ্টি হবে, তার কাছে ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটকে সামান্য মনে হতে পারে।
ট্রাম্পের ছায়ায় বিপর্যস্ত ভ্যান্স, বিদ্রোহই কি বাঁচার একমাত্র পথইরান সম্ভবত এই মুহূর্তের অপেক্ষায় আছে। তাদের সরকারি ঘোষণায় এই সুরই শোনা যায়। তারা জানে, সময় যত গড়াবে, অবরোধের কারণে ইরানের ওপর যে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক দ্রুত ট্রাম্পের অস্থিরতা ও মন্দা বাড়বে। নিজেদের দিক থেকে তারা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত এবং তাদের ইতিহাসের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাদের ধৈর্য ও সহ্যশক্তি প্রচুর।
কিন্তু ট্রাম্প কি এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন? তাঁর ভোটাররাই–বা এই চাপ কতটা সহ্য করবেন? ইরান যে পরিস্থিতির দিকে বিশ্বকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে, তার উত্তর হয়তো সেখানেই লুকিয়ে আছে।
আমার দেখামতে, কোনো যুদ্ধ এত দ্রুত এবং এত বড় আকারে আমেরিকার পরাজয়ের কারণ হয়নি। এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে যে কূটনীতির প্রয়োজন, তা তখনই কার্যকর হবে, যখন আমেরিকান পক্ষ এই বাস্তবতাকে উপলব্ধি করতে পারবে এবং এর প্রকৃত অর্থ বুঝে নেবে। যত দিন তা না ঘটছে, তত দিন ইরানের অনমনীয়তা অব্যাহত থাকবে।
আমেরিকার হরমুজ-দুর্বলতাকে যেভাবে হাতিয়ার বানাল ইরানএটি এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয় যে ট্রাম্প তার প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক বেশি মরিয়া হয়ে এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন। কিন্তু তিনি যে প্রস্থান চাইছেন, তার জন্য তাঁকে হেনরি কিসিঞ্জারের মতো কৌশলগত ছাড় দিতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাঁর এই বিশৃঙ্খল প্রস্থানের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে।
খুররম হুসেইন পাকিস্তানের লেখক ও সাংবাদিক
ডন থেকে নেওয়া, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ