আক্কেলদাঁত কেন ওঠে
· Prothom Alo

বয়স ১৭ পার হতে না হতেই অনেকেরই মুখের একদম পেছনের মাড়িতে প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়। ব্যথায় অনেক সময় গাল ফুলে যায়, খাবার চিবোতে বা গিলতে রীতিমতো কান্না চলে আসে! দন্তচিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি হয়তো এক্স-রে করে জানান, আক্কেলদাঁত উঠছে!
Visit tr-sport.bond for more information.
নামটা শুনলেই একটা অদ্ভুত খটকা লাগে, তাই না? দাঁতের সঙ্গে আবার আক্কেল বা বুদ্ধির কী সম্পর্ক! ইংরেজিতেও কিন্তু একে উইজডম টুথ বলা হয়। কারণ, মানুষের এই তৃতীয় মাড়ির দাঁতগুলো সাধারণত ১৭ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে ওঠে। ধরে নেওয়া হয়, এই বয়সে মানুষ যথেষ্ট পরিণত বা বুদ্ধিমান হয়ে ওঠে। যদিও এই দাঁত ওঠার সঙ্গে বুদ্ধির কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই আক্কেলদাঁতগুলো ওঠার সময় আমাদের যে পরিমাণ ভোগান্তি পোহাতে হয়, তা মোটেই বুদ্ধিমানের মতো কাজ নয়।
এই দাঁতগুলো কিন্তু আমাদের তেমন কোনো কাজেই আসে না, উল্টো ব্যথায় জীবন অতিষ্ঠ করে তোলে। ফলে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, নচ্ছার, অপ্রয়োজনীয় আক্কেলদাঁত কেন ওঠে? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে লাখ লাখ বছর আগে, আমাদের আদিম পূর্বপুরুষদের কাছে।
আজ থেকে লাখ লাখ বছর আগে, আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবনযাপন আমাদের মতো এত আরামদায়ক ছিল না। তাদের কোনো গ্যাসস্টোভ বা মাইক্রোওয়েভ ওভেন ছিল না। তাদের বেঁচে থাকার প্রধান উপায় ছিল শিকার করা এবং বনজঙ্গল থেকে খাবার সংগ্রহ করা। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ছিল কাঁচা মাংস, গাছের শক্ত শিকড়, বাদাম এবং শক্ত লতাপাতা।
ওয়াকা ওয়াকা গান, ভুভুজেলা বাঁশির সঙ্গে তিকিতাকার জয়োধ্বনিএ ধরনের কাঁচা ও শক্ত খাবার চিবিয়ে হজম করার উপযোগী করার জন্য প্রচুর শক্তির প্রয়োজন হতো। আর এই কাজ করার জন্যই আদিম মানুষের চোয়াল ছিল বর্তমান মানুষের চেয়ে অনেক বেশি লম্বা ও চওড়া। সেই বড় চোয়ালে অতিরিক্ত দাঁতগুলোর জন্য যথেষ্ট জায়গা ছিল। মুখের একেবারে পেছনের দিকে থাকা এই আক্কেলদাঁতগুলো শক্ত খাবার পিষে ফেলার জন্য দারুণ আশীর্বাদ ছিল।
কিন্তু মজার বিষয় হলো, এই অতিরিক্ত মাড়ির দাঁতগুলো মানুষের একদম ছোটবেলায় উঠত না। বরং এগুলো ওঠার জন্য একজন মানুষকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। কারণ, চোয়াল পুরোপুরি বড় ও শক্ত হওয়ার পরই কেবল এই বিশাল দাঁতগুলোর জন্য সেখানে জায়গা তৈরি হতো।
আগুনের আবিষ্কার ও চোয়ালের পরিবর্তন
মানুষ যখন আগুনের ব্যবহার শিখল, তখন মানবেতিহাসে এক বিশাল পরিবর্তন এল। মানুষ কাঁচা মাংসের বদলে খাবার পুড়িয়ে বা রান্না করে খেতে শুরু করল। পাশাপাশি পাথরের তৈরি ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাংস বা অন্যান্য খাবার ছোট ছোট টুকরো করে কাটার কৌশলও তারা শিখে ফেলল।
রান্না করা নরম খাবার চিবানোর জন্য মানুষের আর আগের মতো অতিরিক্ত শক্তির প্রয়োজন হলো না। লাখ লাখ বছর ধরে এই নরম খাবার খাওয়ার ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই মানুষের চোয়ালের আকার ধীরে ধীরে ছোট হতে শুরু করল। অন্যদিকে উন্নত খাবার ও জীবনযাপনের কারণে মানুষের মস্তিষ্কের আকার আগের চেয়ে অনেক বড় হয়ে গেল। বড় মস্তিষ্ককে জায়গা করে দিতে গিয়ে মানুষের মাথার খুলির গঠনে পরিবর্তন এল। ফলে চোয়াল গেল আরও ছোট হয়ে।
সমস্যাটা হলো এখানেই! আমাদের চোয়াল ছোট হয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমাদের জেনেটিক কোডে সেই ৩২টি দাঁতের হিসাব এখনো রয়ে গেছে। ২৮টি দাঁত ওঠার পর যখন ওই শেষ চারটি আক্কেলদাঁত প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে উঠতে যায়, তখন ছোট চোয়ালে আর আগের সেই জায়গা অবশিষ্ট থাকে না।
জায়গা না পেয়ে এই আক্কেলদাঁতগুলো তখন বাঁকা হয়ে ওঠে, পাশের দাঁতকে ধাক্কা দেয় অথবা মাড়ির ভেতরেই আটকে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ইমপ্যাক্টেড টুথ। এ কারণেই আক্কেলদাঁত ওঠার সময় আমরা এত মারাত্মক ব্যথা অনুভব করি। অনেক সময় সেখানে ইনফেকশনও তৈরি হয়।
চালক জ্ঞান হারালে হাইওয়েতে যেভাবে স্কুলবাস থামিয়ে দিল শিক্ষার্থীরাজায়গা না পেয়ে এই আক্কেলদাঁতগুলো তখন বাঁকা হয়ে ওঠে, পাশের দাঁতকে ধাক্কা দেয় অথবা মাড়ির ভেতরেই আটকে থাকে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ইমপ্যাক্টেড টুথ। এ কারণেই আক্কেলদাঁত ওঠার সময় আমরা এত মারাত্মক ব্যথা অনুভব করি। অনেক সময় সেখানে ইনফেকশনও তৈরি হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, আক্কেলদাঁত আমাদের শরীরের একটি লুপ্তপ্রায় অঙ্গ। আমাদের অ্যাপেন্ডিক্স হাড়ের মতো এই দাঁতগুলোও পুরোনো স্মৃতিমাত্র, যা বর্তমানে আমাদের কোনো কাজেই আসে না।
আশার কথা হলো, মানবদেহ এখনো পরিবর্তিত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা গবেষণায় দেখেছেন, বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ কোনো আক্কেলদাঁত ছাড়াই বেঁচে আছে! অর্থাৎ, ধীরে ধীরে এই অপ্রয়োজনীয় দাঁতগুলোকে হয়তো আমাদের শরীর থেকে চিরতরে বিদায় নেবে। কিন্তু তুমি–আমি হয়তো এই পরিবর্তন দেখে যেতে পারব না। এতে হাজার হাজার বা লাখ লাখ বছর সময় লেগে যেতে পারে।
তবে চিন্তার কোনো কারণ নেই! তোমাকে লাখ লাখ বছর অপেক্ষা করতে হবে না। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান মাত্র কয়েক মিনিটেই এই সমস্যার সমাধান করে দিচ্ছে! আক্কেলদাঁত ব্যথা দিলে দন্তচিকিৎসকেরা ছোট্ট একটি সার্জারির মাধ্যমে সেটি তুলে ফেলেন। আর দাঁতটি ফেলে দিলে আমাদের খাবার চিবোতে বা হজম করতে কোনো অসুবিধাই হয় না।
তবে আক্কেলদাঁত যদি ব্যথা না দেয় বা কোনো ঝামেলা না করে, তাহলে দাঁত না ওঠালেও কোনো সমস্যা নেই। শুধু আক্কেলদাঁত যদি তোমাকে কোনো প্যারা দেয়, তাহলেই দন্তচিকিৎসকের সাহায্যে তা তুলে ফেলতে পারো। তবে মনে রেখো, ওই দাঁতটি কিন্তু আমাদের লাখ লাখ বছরের পুরোনো আদিম ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী!
সূত্র: সায়েন্স ডেইলি, আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জনস, ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ও বিবিসি সায়েন্স ফোকাস
ওমানের মিরবাত শহরের সৈকতে এত চিংড়ি এল কীভাবে