পদ্মা সেতুর আগের–পরের গল্প

· Prothom Alo

ফজরের নামাজ পড়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। কিন্তু আমাকে বের হতে হবে। গতকালই ঢাকা এসেছি। অফিসে জরুরি কাজ থাকায় আজই ফিরতে হবে। এত ভোরে বের হতে একটু কেমন যেন লাগে। একটা আলস্যভরা জড়তা। আজিমপুর বালুর মাঠ হয়ে লালবাগ থানার বিল্ডিংয়ের পাশে দাঁড়ালাম। হালকা একটা বাতাস আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। কয়েকটি কুকুর রাস্তার পাশে বসে আছে। একটা লেগুনা আসছে। ইশারায় থামালাম। দেখলাম ভেতরে দুপাশে চারজন করে বসে আছেন। সবাই কর্মজীবী। বেশির ভাগেরই গন্তব্য সোয়ারীঘাট। ভাই, একটু বসা যাবে? চারজনের বেশি নিয়ম নাই, তয় উঠছেন যখন বসেন। আমি বসার পরে আরও দুজন লেগুনার দরজায় বাদুড়ঝোলা হলো। কিন্তু এদের বসতে দেওয়া হলো না। তাদের যুক্তি, এদের বসতে দিলে ড্রাইভার আরও ওঠাবে। ব্যাটার খালি খাই খাই স্বভাব। বাবু বাজার ব্রিজের নিচে লেগুনা থামল। নিচ থেকে একটি উঁচু সিঁড়ি আছে ওপরে ওঠার। সিঁড়িটি ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। সাবধানে ওপরে উঠলাম।

Visit bettingx.bond for more information.

ডিএম মাছুম নামে একটা বাস দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সার্ভিস নাকি ভালো। আমাকে ওঠার প্রলোভন দেখায়। কিন্তু ন্যাড়া একবারই বেলতলায় যায়। আমি এ বাসে উঠে কয়েকবার ধোঁকায় পড়েছি। ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তারা টিকিট কেটে ফেলে। এরপর দুই ঘণ্টার মধ্যেও ছাড়ার নাম নেই। নামতে চাইলে টাকা ফেরত না নিয়ে নামতে হবে। পেছনে দেখলাম প্রচেষ্টা বাস দাঁড়িয়ে আছে। খুব সকাল হওয়ায় বেশির ভাগ সিটই ফাঁকা। ওঠার কিছুক্ষণ পরেই বাস ছেড়ে দিল। সাড়ে ছয়টার মধ্যে মাওয়া পৌঁছে গেলাম। কিন্তু যেতে হবে লঞ্চে। আমার আব্বুর কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা রয়েছে। লঞ্চে মাওয়া ঘাটের স্বনামধন্য কিছু কবিরাজ রয়েছে, যারা বিভিন্ন গাছগাছালির দিয়ে একটা বনাজি ওষুধ তৈরি করে। আমাকে সেটা নিয়ে যেতে হবে। লঞ্চে না উঠলে আবার এ বস্তু পাওয়া যায় না। কিন্তু লঞ্চ ছাড়বে সাড়ে সাতটায়। তার মানে আমাকে এক ঘণ্টা বসে থাকতে হবে। কী করা। যদি চাও কবিরাজের দর্শন, করিতে হবে লঞ্চে ভ্রমণ। লঞ্চে বসেই একটা বিষয় মনে পড়ল। এ পথে হয়তো আজি আমার শেষ দিন। আগামী সপ্তাহেই উদ্বোধন হচ্ছে স্বপ্নের পদ্মা সেতু। বিষয়টা আনন্দের তবে ভেতরে হঠাৎ একটা শূন্যতা অনুভূত হলো। এই চিরচেনা লঞ্চ, শম্ভুকগতিতে সে ছুটে যাত্রী নিয়ে। হকারদের চিৎকার, সকালে লঞ্চে ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, পাশের যাত্রীর সঙ্গে গল্প করা। এসব আর থাকবে না। হাজার বছর ধরে কত বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গড়ে উঠছে এ সংস্কৃতি। কত হাজার বছর ধরে এ নদী বয়ে চলেছে। কত জল হিমালয়ের হিমবাহ হয়ে সাগরে মিশেছে। কী তার স্রোত, কী তার রুদ্র রূপ। অথচ এ নদীর বুকে দেখতে দেখতে দাঁড়িয়ে গেল একটা সুবিশাল স্থাপনা! আমি অবাক বিস্ময়ে ভাবি। কিছুটা কল্পনাপ্রবণ হয়ে যাই। ফিরে যাই অতীতের পানে।

২.

ছোটবেলায় এ পথে তেমন ঢাকা যাওয়া হয়নি। তখন নড়িয়া উপজেলার বিখ্যাত ঘাট ছিল ওয়াপদা ঘাট। সারা জেলার অধিকাংশ মানুষ এ ঘাট হয়ে ঢাকা যেত। আমাদের বাসা ছিল ওয়াপদা ঘাটের কাছেই। তখন ওয়াপদা ঘাট ছিল রমরমা। ঘাটের পাশেই ছিল ছোট্ট বাজার। সকালে গরম পরোটা ভাজা হতো। পরোটা নিয়ে যাত্রীরা লঞ্চে উঠত। বসত তাজা ইলিশের পসরা। অনেক যাত্রীরাই ইলিশ মাছ নিয়ে যেত। এ ঘাট থেকে প্রচুর টক দই যেত লঞ্চে করে ঢাকায়৷ রাত–দিন এ ঘাটে কর্মব্যস্ততা লেগেই থাকত। ছোটবেলায় ঢাকা যাওয়ার ব্যাপারটা ছিল একটা উৎসবের মতো। ঢাকা যাওয়া নিয়ে একটা ছড়া লিখেছিলাম—কাল ঢাকা যাব ভাই, ঘুম নেই তাই। আমি ঠিক কবে প্রথম ঢাকা গিয়েছিলাম, সেটা মনে নেই। তবে ঢাকা যাওয়ার অনেক টুকরা স্মৃতি মনে আছে। বাসা লঞ্চ ঘাটের কাছে হওয়ায় সকালে গরম ভাত খেয়েই রওনা হতাম। লঞ্চঘাটের প্রায়ই সবাই পরিচিত। লঞ্চে ওঠার সময় তাই টোল দেওয়া লাগত না। তখন সবচেয়ে জনপ্রিয় লঞ্চ ছিল এমভি নাগরিক ও সুরেশ্বর-১। ওয়াপদা থেকে লঞ্চে উঠে একটা লম্বা বিছানা করতাম। বিছানার এক পাশে ব্যাগ, জুতা, স্যান্ডেল রাখতাম। সকাল আটটায় ওয়াপদা থেকে লঞ্চ ছাড়ত।

নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

সকালের সূর্যটা পদ্মার ঘোলা জলে প্রতিফলিত হয়ে চোখে এসে লাগত। ওয়াপদা থেকে চণ্ডীপুর পর্যন্ত লঞ্চ ফাঁকা থাকত। চণ্ডীপুর ঘাট থেকে কিছু যাত্রী উঠত। পরে লঞ্চ ভিড়ত সুরেশ্বর ঘাটে। সুরেশ্বর ঘাটে ছিল এলাহি ব্যাপার–স্যাপার। সুরেশ্বর ঘাটের আগে একটা বিশাল বাঁক ছিল। বর্ষাকালে পানির তীব্র স্রোত বাঁকে এসে বাধা পেত। সৃষ্টি হতো এক বিশাল ঘূর্ণন। বৃত্তাকার ঘূর্ণনের মাঝখানে থাকত একটা ফাঁকা জায়গা। যত বড় লঞ্চই হোক ওই ঘূর্ণনে পড়লে ডুবে যাওয়ার শঙ্কা থাকত। ঘূর্ণনের চারপাশে থাকত অসংখ্য ছোট ঘূর্ণন। মনে হতে যেন সাপের গর্ত। লঞ্চগুলো ওই ঘূর্ণন এড়িয়ে অনেক দূর ঘুরে ঘাটে ভিড়ত। লঞ্চ ভিড়তেই হুড়মুড় করে যাত্রীরা লঞ্চে উঠত। মুহূর্তেই লঞ্চ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যেত। অনেক পরিচিত লোক পেতাম, যারা বসার জায়গা না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। তাদের নিজের বিছানায় বসাতাম।

সুরেশ্বরে বিখ্যাত ছিল সুরেশ্বরী ডাঁটা। লঞ্চের আশপাশে কৃষকেরা ডাঁটা নিয়ে আসত বিক্রির জন্য। প্রচুর আখখেত ছিল ঘাটের পাশে। আখও বিক্রি হতো প্রচুর। আর ইলিশ মাছ তো ছিলই। সুরেশ্বর ঘাট থেকে পূর্ব-উত্তর কোনাকুনি লঞ্চ পাড়ি দিত বিশাল পদ্মা। মতলব হয়ে লঞ্চ পাড়ি দিত মেঘনার পথে। মেঘনার পানি ছিল স্বচ্ছ নীল। ওদিকে পদ্মার পানি ছিল ঘোলা। ঠিক এখানে বিস্ময়ে পৃথিবী থমকে দাঁড়ায়। দুটো নদীর পানি একে অপরের সঙ্গে মিশে না। পাশাপাশি সমান্তরাল দুটো নদী।

একদিকে ঘোলা অন্যদিকে স্বচ্ছ নীল। লঞ্চে ডেক ছাড়াও ক্যাবিনের ব্যবস্থা ছিল। লঞ্চের যারা স্টাফ তাদের রুমগুলোও ক্যাবিন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এটা ছিল বেতনের বাইরে তাদের বাড়তি ইনকাম। লঞ্চে প্রচুর হকার উঠত। ঝালমুড়ি, ঘুগনি বিক্রেতা ছিল কমন। এক অন্ধ লোক উঠত সুরেশ্বর থেকে। তার কাছে তাস, লডু, চকলেট, জিঞ্জার, চিপস থাকত। সে হাঁক দিত—এই চকলেট আছে, চিপস, জিঞ্জার, লডু আছে, রুমাল আছে, খেলনা আছে। লঞ্চে অনেকেই তাস কিংবা লুডু খেলে সময় পার করে দিত। ক্যাবিনের একপাশে আবার কিছু বুদ্ধিজীবী টাইপ লোক দেখা যেত। তারা দেশের সার্বিক রাজনৈতিক অবস্থা ও অর্থনীতির হালহকিকত নিয়ে আলোচনা করত। ক্যাবিন থেকে হুট করেই দু–একটি অল্প বয়সী বাচ্চা বের হয়ে ডেকের দিকে দৌড় দিত। লঞ্চের নিচতলায় ক্যানটিনে চা, সিগারেট, কেক, বিস্কুট পাওয়া যেত।

কিছুটা দাম বেশি, তবে পদ্মার মাঝে এ ক্যানটিনের বিকল্প ছিল না। লঞ্চের পেছনে ছিল টয়লেট। এখানে সব সময় সিরিয়াল লেগেই থাকত। এখানে আসলে মনে হতো হাগা–মুতা ছাড়া মানুষের আর কোনো কাজ নেই। লঞ্চ যখন মুন্সিগঞ্জ আসত, তখন চম্পা কলা ও বনরুটি নিয়ে একটা গ্রুপ উঠত। রুটি কলা চিৎকারে পুরো লঞ্চ তারা মাতিয়ে তুলত। মিনিট দশেকের মধ্যে সব রুটি–কলা ম্যাজিকের মতো বিক্রি করে তারা হুড়মুড় করে নেমে পড়ত পরবর্তী ঘাটে। যেন একটা ঝড় হঠাৎ বয়ে থেমে যেত। তারা নেমে যেতে আরেক গ্রুপ উঠত বাদাম, চিট, গজা—এসব নিয়ে। ততক্ষণে লঞ্চ বুড়িগঙ্গায় এসে পড়ত। বুড়িগঙ্গায় এলেই মনে হতো ঢাকা এসে পড়েছি। নদীর সঙ্গে কিছু পাকা বাড়ির সিঁড়ি। মনে হতো এ বাড়িতে যদি থাকতে পারতাম, তবে বেশ হতো। বুড়িগঙ্গায় এসে লঞ্চের গতি কমে যেত। মনে হতো পথ আর শেষ হয় না। সদরঘাটের আগে বুড়িগঙ্গা ওপরে একটা ব্রিজের দেখা পেতাম। অবাক বিস্ময়ে ব্রিজের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এত্ত বড় ব্রিজ! ব্রিজের নিচ দিয়ে যখন লঞ্চটি চলে যেত তখন একটা অসাধারণ অনুভূতি কাজ করত। মনে হতো, একবার যদি এই ব্রিজটায় উঠতে পারতাম। ব্রিজ পাড় হতে অল্প কিছু ক্ষণের মধ্যে লঞ্চ সদরঘাটে ভিড়ত।

৩.

রাতের লঞ্চে ঢাকা যাওয়ার অভিজ্ঞতা কিছুটা ভিন্ন। ছোটবেলা থেকে রাতের লঞ্চ বলতে চিনতাম এমভি নিরাপদ। লঞ্চটি বেশ বড়ই ছিল, তবে এর ডিজাইনটা ছিল সেকেলে। কিন্তু হঠাৎ একটা নতুনত্ব নিয়ে দুটি লঞ্চ এ লাইনে যুক্ত হলো। এমভি রেডসান ও এমভি মানিক। দুটো লঞ্চের ডিজাইন একই রকম। সামনের দিকটা ছিল কিছুটা গোলাকার। ওপরে দোতলায় ও তিনতলায় সামনের দিকে ক্যাবিন। ডেকের পাশ থেকে সরাসরি ক্যাবিনে যাওয়া যেত না। ক্যাবিনে ওঠার আলাদা সিঁড়ি ছিল। ক্যাবিনের সামনে একটা প্রশস্ত লনের মতো ছিল। যাত্রীরা এ জায়গাটায় দাঁড়িয়ে নদীর দৃশ্য দেখতে পছন্দ করত। এ লঞ্চের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল ছাদ। ছাদের চার পাশে মুখোমুখি বসার চেয়ার ছিল। মাঝখানে গোল করে সাজানো চেয়ার ওপরে ছিল বিশাল ছাতা। সব মিলিয়ে এ লঞ্চগুলো আমাদের কাছে ছিল একটা ভাসমান পার্কের মতো। আসলে রাতের লঞ্চ ছিল আমাদের কাছে একধরনের জরুরি সেবার মতো। কোনো বিশেষ জরুরি কাজ না থাকলে সাধারণত রাতের লঞ্চে যাওয়া হতো না। একবার আমার বড় খালু মারা গেল। আমি নদীর পাড়ে ক্রিকেট খেলছিলাম। ওখানেই কেউ একজন সংবাদটি জানাল। রাতের লঞ্চেই আমাকে যেতে হবে। সকালে খালুর জানাজা। কখনো কারও অসুস্থতার কারণেও রাতের লঞ্চে ঢাকা যেতে হতো। আবার মাঝেমধ্যে সকালে চাকরির পরীক্ষা থাকলে রাতের লঞ্চে ঢাকা যেতে হতো। সব মিলিয়ে রাতের লঞ্চ ছিল আমাদের কাছে একটা ইমার্জেন্সি ট্রানজিট। রাতের লঞ্চে বেশির ভাগ সময়ে ক্যাবিনে যেতাম। তবে ঢাকা থেকে আসার পথে অনেক সময় ক্যাবিন পাওয়া যেত না। ক্যাবিনে ঘুমানোর চেষ্টা করতাম। তবে একটা আধো ঘুম, আধো জাগরণ অবস্থা বিরাজ করত। ঘুম ভেঙে লঞ্চের ছাদে গেলে একটা অপূর্ব দৃশ্য চোখে পড়ত। পুরো নদীতে অসংখ্য ছোট নৌকা। নৌকায় বাতি জ্বলছে। মনে হতো নদীর বুকে ছোট ছোট তারা নেচে বেড়াচ্ছে। নদীর পাড়ে কাশের বন। সারা বিশ্ব চরাচর ঘুমে বিভোর। দূরে গ্রামগুলো আবছা আবছা বোঝা যেত। মনে হতো স্বর্গের ঘুমে পুরো গ্রামবাসী বিভোর। বাঁশঝাড়, আম, জাম, কাঁঠাল, নারেকেলসহ নানা রকম গাছ পুরো গ্রামটিকে একটা মায়ার বাঁধনে বেঁধে রেখেছে। রাতে অবশ্য লঞ্চ বিভিন্ন ঘাটে ভিড়ত। ঘাটগুলো মনে হতো ঘুমায় না। জেগে থাকে সারা রাত। ছোট ছোট ঘাট থেকে দু–চারজন যাত্রী উঠত। তাদের চোখে থাকত ক্লান্তির ছাপ। লঞ্চ যখন বুড়িগঙ্গায় এসে পড়ত, তখন দেখা যেত নানা রকম দৃশ্যের সমারোহ। নদীর পাড়ে লাল–নীল আলো প্রতিফলিত হয়ে একটা অদ্ভুত চিত্রকর্মের জন্ম দিত। নদীর দুই পাশে অনেক ট্রলার, স্টিমার দেখা যেত। শ্রমিকেরা রাতভর ওখানে কাজ করত। তাদের কাছে রাত দিনের পার্থক্য আছে বলে আমার মনে হতো না। বুড়িগঙ্গা সেতুর ওপরে বাতিগুলো এক অন্যরকম মুগ্ধতার জন্ম দিত। ধীরে ধীরে লঞ্চ সদরঘাটে ভিড়ত। রাতের ঢাকা। কোন কবি আছে এ সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়ে কবিতা লিখবে? ‘হে নগরী, তুমি সুন্দর। যেন কোনো লাবণ্যময়ী নারী। জীবনের প্রথম বাসরে প্রিয়জনের অপেক্ষায় বসে আছে লজ্জা রাঙা মুখে। তার চোখে ঠিকরে বের হচ্ছে লজ্জা লাবণ্যমাখা এক অসাধারণ দীপ্তি। রাতের ঢাকাকে এক পলক দেখে আমার তেমনি মনে হয়েছে।’

এমনি কত রাতজাগা গল্প লেখা হতো রাতের লঞ্চ ভ্রমণে। কত না–বলা কথা, কত গোপন ব্যথা, কত লুকিয়ে থাকা স্মৃতি একাকী বসে থাকা যাত্রীর মনে দোলা দিত। ভেসে উঠত আনন্দ–বেদনার অন্য এক সুর। সে সুর দূর নদী পাড়ের ঢেউয়ে দোলা লেগে ছড়িয়ে যেত অসীমের পথে। তবে রাতের ভ্রমণ নিয়ে অনেক বিষাদের গল্পও আছে। সে গল্প নাহয় আরেক দিন হবে।

৪.

দেশে করোনা চলছে। লকডাউনের কারণে দীর্ঘদিন ঢাকা যেতে পারছি না। ওদিকে আমার সহধর্মিণী ঢাকায়। সে–ও দেশে আসতে পারছে না। ঢাকা থেকে দেশে আসা নিষেধ। ঢাকাবাসী করোনার আঁতুড়ঘরে বাস করছে। তাদের মাধ্যমে করোনা চারদিকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু এ লকডাউন যে কবে ডাউন হবে, তার ইয়ত্তা নেই। সিদ্ধান্ত নিলাম একটা বিকল্প পথ ধরে ঢাকা যাব। নড়িয়া থেকে খুব ভোরে একটা ট্রলার ছাড়বে নারায়ণগঞ্জের দিকে। ট্রলারে থাকবে নানা রকম দুগ্ধজাত পণ্য। সে ট্রলারের একজন হিসেবে আমিও থাকব। কাকডাকা ভোরে রওনা হলাম। কিন্তু কী এক অজানা কারণে ট্রলার ছাড়তে দেরি হবে। তখন পুবের আলো পুরো নদীর বুকে কিরণ ছড়াচ্ছে। আমি ভেবেছিলাম ট্রলারে হয়তো যাত্রী হিসেবে আমি একাই থাকব কিন্তু আমার ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করে এক বৃদ্ধাকে দেখলাম তার নাতিকে নিয়ে ট্রলারের ছৈয়ের মধ্যে বসে আছে। জীবনে বহুবার লঞ্চে ঢাকা গিয়েছে কিন্তু ট্রলারে ঢাকা ভ্রমণ এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। আমি কিছুটা রোমাঞ্চিত। আমি ট্রলারের ঠিক মাথায় বসেছি। পুরো নদী চারপাশ থেকে চমৎকারভাবে দেখা যাচ্ছে। সকালে রোদ উঠলেও এখনো তেমন তাপ নেই। দীর্ঘ এক ঘণ্টার বেশি সময় ট্রলারটি পদ্মা পাড়ি দিল। নদীর পার হতেই দেখা মিলল চরআত্রা ইউনিয়নের। চরআত্রার পাশেই নওপাড়া। নড়িয়া থানার দুটি ইউনিয়ন পড়েছে পদ্মা নদীর মাঝে। এ দুটো ইউনিয়নের মানুষ সংগ্রামী। বিশাল পদ্মা নদীর সঙ্গে অবিরাম সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয় তাদের জীবনধারা। আমি একবার একজন বিখ্যাত গবেষককে নিয়ে এ এলাকায় গিয়েছিলাম। এস এম ইউনুস ভাই। যিনি তখন পদ্মা নদীপারের মানুষের জীবন ও সংগ্রাম বিষয়ে একটি গবেষণা করছিলেন। তিনি আমাকে জানালেন, ‘আমি বাংলাদেশের বহু চর ঘুরেছি, তবে দুটো বিষয় এখানে নতুন; প্রথমত, চর হলেও এখানকার মানুষ শিক্ষাদীক্ষায় যথেষ্ট এগিয়ে আর দ্বিতীয়ত, সেই পাকিস্তান আমলে জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ হয়েছে কিন্তু এ চরে একটা অলিখিত সামন্তপ্রথা বিরাজমান। ভাই জ্ঞানী মানুষ, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ভ্রমণে এটা তার উপলব্ধি। তবে চরের যে বিষয়টা আমাকে টানে, সেটা হচ্ছে এখানকার মানুষের আতিথেয়তা। আপনি যে বাড়িই যাবেন, দেখবেন এক বুক ভালোবাসা নিয়ে মানুষগুলো আপনাকে গ্রহণ করবে। আমার জন্ম অবশ্য এ চরে। আমার নানাবাড়ি ছিল চরআত্রা। নানিও চরআত্রার মেয়ে। সব মিলিয়ে এ এলাকার সঙ্গে একটা নাড়ির টান তো রয়েছেই। তবে চরআত্রাবাসীর সবচেয়ে আবেগের জায়গা হচ্ছে চরআত্রা উচ্চবিদ্যালয় আর এ বিদ্যালয়ের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা। আমি যখনই চরআত্রা নিয়ে গল্প শুনেছি, তখনই দেখেছি তারা এ বিদ্যালয়ের গল্প বলবেই। অত্যন্ত সহজ–সরল, বিনয়ী অথচ সংগ্রামী মানুষের প্রতিচ্ছবি এ অঞ্চলের অধিবাসী। একমাত্র ট্রলারই যাদের বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম। এখানেও জীবন আছে, তবে সেটা শহুরে জীবনের মতো গতিময় নয়। এ জীবন শান্ত–কোমল–স্নিগ্ধতার আবেশে পরিপূর্ণ। এখানে ঝড় হয়, বন্যা হয়, নদীতে ভাঙে কৃষকের স্বপ্ন। প্রকৃতির বিরূপ রাতে অসুস্থ নারী–পুরুষ নিজেকে ছেড়ে দেয় প্রকৃতির হাতে। এভাবেই চলছে জীবন, জীবনের নিয়মে। চরআত্রা পার হচ্ছি। ধীরে ধীরে বাড়ি ঘরের সংখ্যা কমছে। একটা সময় দেখলাম শুধু চর আর চর। বাড়িঘর মাঝেমধ্যে দু–একটা। মাঝি, এটা কী চর। ভাই, বাবুর চর। নাম শুনেছি, কখনো দেখিনি। নদীর কোল ঘেঁষে ধঞ্চেখেত। ফিঙে পাখি বসে আছে একটা মরা ধঞ্চের ওপরে। বিশাল চকের মাঝে একটা ছোট্ট ঘর। চারপাশে কলাগাছ। ছবির মতো সুন্দর দৃশ্য। মনে হয় কোনো শিল্পী এঁকে দিয়েছে এ ছবি। কিন্তু যার ঘর এ নির্জন চরে, তার জীবন কি ছবির মতো কিংবা শিল্পীর তুলিতে আঁকা শিল্পকর্মের মতো? ট্রলারটি একটা ছোট নদীর মধ্যে ঢুকল। নদীর পারে বাজার। অসংখ্য ট্রলার ঘাটে ভিড়ে আছে। হোটেলে জিলাপি ভাজা হচ্ছে। পাশেই গরম–গরম জিলাপি সাবাড় করছে ক্রেতারা। চায়ের দোকান ঘিরে আছে চা–পাগলেরা। গ্রামীণ কসমেটিকসের দোকান, মুদিদোকান, একটা ছোট্ট ওষুধের দোকানও আছে। একটা মাইক থেকে পাগলা মলমের বিজ্ঞাপন শোনা যাচ্ছে—আমার এ পাগলা মলম ব্যবহারে খাউজানি, চুলকানি নিমেষেই গায়েব। হায়রে মজার চুলকানি। চুলকাইতে চুলকাইতে চামড়া যাদের ছ্যাড়াব্যাড়া হইয়া গেছে, আমার একটা মলম ব্যবহার করেন, দেখবেন সব ফিনিশ। রানে, কানে, আঙুলের চিপায়–চাপায় দাউদ, অ্যাকজিমা ভালো করে আমার এ পাগলা মলম। বাজার পেরিয়ে গ্রামে এসে পড়লাম। নদীর দুই ধারে গড়ে উঠছে অনেক বসতবাড়ি। কারও কারও ঘরের কিছু অংশ নদীর ওপরে। টংদোকানের মতো অনেকটা। আমার কেন যেন মনে হলো এ নদী হয়ে আমি লঞ্চে ঢাকা থেকে এসেছিলাম। তখন বর্ষাকাল। নদীতে অথই পানি। সদরঘাটের লঞ্চগুলো সাধারণত বড় নদী দিয়ে চলাচল করে। কিন্তু একদিন দেখলাম আমার লঞ্চটি একটা ছোট নদীতে ঢুকে পড়ল। নদীর দুই ধারে অপূর্ব দৃশ্য। সবচেয়ে বড় যে বিষয়টা, বর্ষাকালে বড় নদীতে কিছুটা ভয় করে কিন্তু ছোট নদীতে সে ভয়টা করছিল না। হঠাৎ লঞ্চে একজন লোক উঠল ভাতের গামলা নিয়ে। সেদ্ধ ডিম ঝোল দিয়ে আর লাল চালের ভাত। খুব মজা করে খেয়েছিলাম। এ নদীতে এসে সে স্মৃতি মনে পড়ে গেল। অনেকক্ষণ চলার পরে আমরা বড় নদীতে এসে পড়লাম। মুন্সিগঞ্জে। এতক্ষণে সূর্যটা তেঁতে উঠেছে। ছৈয়ের নিচে মহিলা থাকায় ওখানেও যেতে পারছি না। বড় নদীতে এসে ছোট নদীর আনন্দও মুছে গেল। ট্রলারের চালকের খোঁজখবর নিলাম। বাসায় এক ছেলে। প্রাইমারিতে পড়ে। একটু দুষ্ট। একজন শিক্ষকও ঠিক করে দিয়েছেন। নিজে পড়াশোনা করতে পারেনি আর্থিক দৈন্য ছিল। চাচাতো ভাইরা পড়াশোনা করেছেন। তারই সমবয়সী। কিন্তু তারা বড় চাকরি করে। একজন ব্যাংকার, একজন কাস্টমস অফিসার। ভাইরা তার খোঁজখবর রাখে। উৎসাহ দেয় ভাতিজা যাতে পড়াশোনা করে। আপনার তো ইনকাম খারাপ না। প্রতিদিন ট্রলার চল্লে তো পঞ্চাশ–ষাট হাজার টাকা মাসে চলে আসে। ‘আহে, তয় যায়ও ভাই। যেই খাটনি খাডি। ঝড়, বৃষ্টি, রোদ কোনো বিশ্রাম নাই। অসুখবিসুখ লাইগাই থাকে। ট্রলার ডুবলে মালের জরিমানা দেওয়া লাগে। আবার ডাকাইতেও ধরে মাঝেমধ্যে। একদম সর্বস্বান্ত কইরা দেয়। তাহলে তো কষ্টও অনেক।’ ট্রলারচালক হাসে। তার কালো চামড়ার ফাঁক গলে সাদা দাঁতের হাসি বিভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে। ট্রলারটি মুক্তারপুর ব্রিজ পার হচ্ছে। অনেক কচুরিপানা জমে আছে এখানটায়। নদীর পানি কালো। কালো নদীর কালো পানি কেড়েছে জীবনের আলো। নদীর নিচে মৎস্য প্রজাতি বিলুপ্ত প্রায়। দূষণে নদী মরে গেছে। প্রাণহীন নদীতে তাই জীবনের গান হয় না। আউল–বাউল–ভাটিয়ালি–মুর্শিদি–জারি–সারি বাজে না। এখানে একদল উগ্র ছেলেপেলের দেখা মেলে, যারা ট্রলার ভাড়া করে সাউন্ড সিস্টেমে উল্টাপাল্টা গানের সঙ্গে উদ্যাম নৃত্য করে। নদী প্রতিবাদ করে না। মরা নদী প্রতিবাদ করতে জানে না! সিমেন্টের কারখানা পার হয়ে আরও ক্ষণিক পরে ট্রলার থামে নারায়ণগঞ্জ ঘাটে। আমি নারায়ণগঞ্জ ঘাটে নামার প্রস্তুতি নিই। মনে মনে এখান থেকে ঢাকা যাওয়ার ছক কষি। লকডাউন। গণপরিবহন নিষিদ্ধ। একটা সিএনজি কিংবা মোটরসাইকেল। দেখি কী হয়। আমি মাস্ক লাগিয়ে টুপ করে নেমে পড়ি।

৫.

সেদিন ভোরবেলা নামাজ পড়ে হাঁটতে হাঁটতে লঞ্চঘাট পৌঁছালাম। আজ ভোরে রাত তিনটার দিকে নাকি মেঘনায় লঞ্চ ডুবেছে। শীতের রাত। ঘন কুয়াশা। বিপরীত দিক থেকে আসা একটা কার্গো জাহাজের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। নিমেষেই পুরো লঞ্চ ডুবে যায়। দুই দিন পরে ঈদ। প্রচুর মানুষ ছিল। প্রচণ্ড ঠান্ডা পানি। ঘন কুয়াশা। যারা সাঁতার জানত, তারাও বুঝতে পারছিল না কী করবে। অসংখ্য মানুষের সলিলসমাধি ঘটে সেদিন। এক ঘণ্টা পরে কয়েকটি লঞ্চ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উদ্ধার অভিযানে নেমেছিল। সকালে ওয়াপদা ঘাটে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বজনহারা মানুষের আর্তচিৎকার। একটা পরিবারের ১০ জন মারা গেছে। ঢাকা থেকে অনেক বছর পর দল বেঁধে ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছিল তারা। মা কোলের সন্তানকে জড়িয়ে ধরে ডুবে গেছে পদ্মার ঠান্ডা জলে। স্বামী স্ত্রীর হাত শক্ত করে ধরে মৃত লাশ হয়ে ভেসে আছে। আমার বাড়ি যেহেতু পদ্মার পারেই, এমন অনেক গল্প দেখে আমি বড় হয়েছি। প্রতিবছরই দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছি। একদিন গভীর রাতে আমাদের প্রতিবেশী রহমান কাকার মেয়ে ও স্ত্রীর কান্নায় আমাদের ঘুম ভেঙে যায়। ঝড়ের কবলে পড়ে তাদের একমাত্র সম্বল ট্রলারটি মালামালসহ ডুবে গেছে। কাকা কোনো রকমে নদী সাঁতারে বেঁচে গেছেন। আরেক দিন ফজরের পর ওয়াপদা ঘাটে একটা লঞ্চ ভেড়ানো ছিল। কিছুক্ষণ আগে ঢাকা থেকে এসেছে। সব যাত্রী নেমে গেছে। শুধু গতকালই জন্ম নেওয়া একটা শিশু, মা ও তার নানি লঞ্চে ছিল। শিশুর বাবা নিচে নেমেছে। হঠাৎ পাড়ের বিশাল একটা অংশ ভেঙে লঞ্চটি এক ঝটকায় তলিয়ে যায়। সলিলসমাধি ঘটে একটি পরিবারের। এমন হাজারো কান্নার গল্প আছে পদ্মাকে ঘিরে। রোগী স্ট্রোক করেছে। ইমার্জেন্সি ঢাকা নেওয়া দরকার কিন্তু ফেরিঘাটের সিরিয়ালেই জীবন শেষ। পিনাক-৬ লঞ্চের ডুবে যাওয়া এখনো পুরো দেশবাসীর কাছে জীবন্ত। মাওয়া থেকে পদ্মা পাড়ি দিতে গিয়ে ঝড়ের কবলে পড়েনি, এমন যাত্রী কমই আছে। আমিও পড়েছিলাম। মানুষ কত অসহায়, তা এ পরিস্থিতিতে না পড়লে বোঝা যায় না। ধরে নিয়েছিলাম, ওই দিনই আমার শেষ দিন। চারপাশে সবাই কাঁদছে। বিশেষ করে ছোট ছোট বাচ্চার মায়েরা ও বৃদ্ধরা। হয়তো আল্লাহর রহমত ছিল, তাই শেষ পর্যন্ত লঞ্চ ডুবেনি। এমনি করে জীবনে হাতের মুঠোয় নিয়ে প্রবল বর্ষায় যাত্রীরা নদী পার হতো। শরীয়তপুরের এক ডাক্তারের কথা মনে পড়ে। সদর হসপিটালে পোস্টিং ছিল। দক্ষ, সজ্জন মানুষ ছিলেন। অল্প সময়েই হাসপাতালের পরিবেশ উন্নত করেছিলেন। তিনি একদিন বোটে নদী পার হতে গিয়ে ডুবে গেলেন। প্রবল স্রোতে অনেক দূরে গিয়ে তাঁর লাশটি ভেসে উঠেছিল।

৬.

প্রচণ্ড বৃষ্টি। আকাশে থোক থোক মেঘ। ঢাকা যাচ্ছি। পদ্মা সেতুর ওপরে বাসে আছি। পদ্মা নদী আমার দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এই বর্ষণমুখর দিনে অবলীলায় আমি তার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছি, এটা তার মানতে কষ্ট হচ্ছে। আগে যখন বৃষ্টি হতো, সঙ্গে সামান্য বাতাস, তখন পদ্মা আমাকে ভয় দেখাত। দুলে উঠত লঞ্চ। এই বুঝি ডুবে যাবে লঞ্চ। লঞ্চের মধ্যে নারী ও শিশুদের চিৎকার। পুরুষেরা চিন্তিত। লঞ্চের স্টাফরা ছোটাছুটি করে যাত্রীদের অভয় দেওয়ার চেষ্টা করছে। লঞ্চের নিচে পদ্মা সেতু দাঁত কেলিয়ে হাসছে। সে প্রচণ্ড ঢেউ সৃষ্টি করে যাত্রীদের ভয় দেখাচ্ছে। আবার যখন প্রচণ্ড শীত পড়ত। কুয়াশায় ঢেকে যেত নদী, লঞ্চ তখন কুয়াশায় পথ হারাত। কানাওলায় ধরলে যেমন মানুষ পথ খুঁজে পেত না, তেমনি লঞ্চের ড্রাইভারও বুঝত না লঞ্চঘাট কোথায়। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা নদীতে কাটাতে হতো। যাহোক এখন আর পদ্মা ঝড়বৃষ্টি কিংবা কুয়াশায় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। এমনো দিন গেছে, বিরূপ আবহাওয়া কিংবা রাতের শেষ লঞ্চটি মিস করলে নদীর পাড় থেকেই ঢাকা না যেতে পেরে বাড়ি ফিরে আসতে হতো। এখন আর সে ভয় নেই। রাত-দিন গাড়ি চলছে। মানুষ সময়–অসময় ঢাকা আসছে-যাচ্ছে। তবে মাওয়া ঘাট খুব মিস করি। সেতুর ওপর থেকে মাওয়া ঘাটের দিকে তাকাই আর অজান্তেই ভাবি—

পদ্মা সেতুর ওপর বৃষ্টি নামছে

বাসের জানালায় পড়ছে বৃষ্টির ফোঁটা

প্রচণ্ড বাতাস আমার চুলগুলো এলোমেলো করে

বয়ে যায় প্রবল বেগে

বাতাসের মৃত্যু ঘটে বাসের গায়ে এসে!

আমি যখন সেতুর ওপরে

তখন মাওয়া ঘাটেও কি বৃষ্টি হচ্ছে

বৃষ্টির মাঝে কেউ কি দাঁড়িয়ে আছে ঘাটে

ইলিশের সাথে বেগুন ভাজার ম–ম গন্ধে

ওখানে কি এখনো হকাররা হাঁকে

এখনো কি চলে নদী পার হওয়ার প্রতিযোগিতা

এখনো কি বৃষ্টি এলে দুলে উঠে লঞ্চ

ডুবে যাওয়ার ভয়ে যাত্রীরা কাঁদে ক্ষণে ক্ষণে

নাকি ওখানে বৃষ্টিরাও এখন বদলে গেছে?

*লেখক: সুলতান মাহমুদ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে, শরীয়তপুর

Read full story at source