হামিদা হোসেন: স্মৃতি, সংগ্রামের ভেতর দিয়ে এক জীবন
· Prothom Alo
মানবাধিকারকর্মী ডক্টর হামিদা হোসেন বললেন তাঁর জীবনের নানা পর্বের গল্প। ব্যক্তিগত স্মৃতি, ইতিহাস, কাজ—সব মিলিয়ে এক সংযত কিন্তু গভীর কথোপকথন। প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজন ‘ক্রাউন সিমেন্ট অভিজ্ঞতার আলো’ শীর্ষক নিয়মিত সাক্ষাৎকারের অংশ হিসেবে আমরা মুখোমুখি হয়েছিলাম তাঁর।
১৯৩৬ সালে তাঁর জন্ম সিন্ধুর হায়দরাবাদে। তখন ব্রিটিশ ভারত। তিনি নিজেই বলেন, হায়দরাবাদ নিয়ে বিভ্রান্তি থাকে—সিন্ধুর হায়দরাবাদ এখন পাকিস্তানে, আর দাক্ষিণাত্যেরটি ভারতে। তাঁর জন্ম সিন্ধুতে। পরিবার ছিল বহুমাত্রিক। বাবা ছিলেন ব্রিটিশ আমলের বিচারক। ছোট শহরে চাকরি করতেন। মায়ের পরিবার ধর্মান্তরের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। সেই অভিজ্ঞতা পরিবারে প্রভাব ফেলেছিল।
Visit truewildslot.com for more information.
শৈশব কেটেছে ঘুরে ঘুরে। বাবার পোস্টিং যেখানে, সেখানেই স্কুল। হায়দরাবাদ ও করাচির কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা। শিক্ষাজীবনে একটি ঘটনা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। একটি প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা। বিষয় ছিল—কেমন পৃথিবী চাই। সেই লেখার সূত্রেই যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ পান। নিউইয়র্কে তিন মাস থাকেন। পরে স্কলারশিপ নিয়ে ওয়েলেসলি কলেজে ভর্তি হন। ইতিহাস ও ইংরেজি সাহিত্য পড়েন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর জীবনেও ঝুঁকি আসে। স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি সন্তানদের নিয়ে করাচি চলে যান। ঢাকায় থাকা নিরাপদ ছিল না। পরে পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই বিমানে ছিলেন। সেই স্মৃতি তিনি সংক্ষেপে বলেন। আবেগের জায়গা এড়িয়ে যান।
১৯৬৩ সালে প্রথম ঢাকায় আসা। বোন তখন এখানে থাকতেন। সেই সময়েই পরিচয় হয় ডক্টর কামাল হোসেনের সঙ্গে। বিয়ে হয় ১৯৬৪-৬৫ সালের দিকে। পরে অক্সফোর্ডে যান। সেখানেই উচ্চশিক্ষা।
ষাটের দশকের শেষ দিকে তিনি যুক্ত হন ইংরেজি সাময়িকী ফোরাম-এর সঙ্গে। তখন পূর্ব পাকিস্তানে ইংরেজি পত্রিকা কম ছিল। তিনি বলেন, ‘আমরা ভাবলাম, একটা প্ল্যাটফর্ম দরকার।’ ১৯৬৯ সালে প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। ১৯৭১ সালের মার্চের আগে তাঁদের শেষ সম্পাদকীয় ছিল—যুদ্ধের বিকল্প পথ নিয়ে। কিন্তু পরিস্থিতি অন্য দিকে গড়ায়।
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর জীবনেও ঝুঁকি আসে। স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি সন্তানদের নিয়ে করাচি চলে যান। ঢাকায় থাকা নিরাপদ ছিল না। পরে পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার সময় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই বিমানে ছিলেন। সেই স্মৃতি তিনি সংক্ষেপে বলেন। আবেগের জায়গা এড়িয়ে যান।
বাংলাদেশের তাঁতশিল্প নিয়েও তাঁর কাজ আছে। শুরুটা ছিল মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছেন। তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কোথায় কোন কাপড়তৈরি হয়, সেই মানচিত্র তৈরির কাজ করেছেন। পরে অক্সফোর্ডে বসে এই কাজকে গবেষণায় রূপ দেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটেছেন। সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
স্বাধীনতার পর তিনি যুক্ত হন নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনের কাজে। মহিলা সমিতি ও অন্য সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেন। আশ্রয়, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ—এই তিনটি বিষয়েই গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, পরিবারগুলো অনেক সময় মেয়েদের নিতে চাইত না। তখন সংগঠনগুলোকেই দায়িত্ব নিতে হয়েছে।
এরপর আসে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো একটি ঘটনা নয়, বরং অভিজ্ঞতার সঞ্চয় কাজ করেছে। তিনি বলেন, শুধু মামলা করে অপেক্ষা করা যথেষ্ট নয়। বিকল্প ব্যবস্থা দরকার। সালিশের মাধ্যমে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার চিন্তা থেকেই উদ্যোগটি শুরু।
বাংলাদেশের তাঁতশিল্প নিয়েও তাঁর কাজ আছে। শুরুটা ছিল মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরেছেন। তাঁতিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কোথায় কোন কাপড়তৈরি হয়, সেই মানচিত্র তৈরির কাজ করেছেন। পরে অক্সফোর্ডে বসে এই কাজকে গবেষণায় রূপ দেন। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পুরোনো নথিপত্র ঘেঁটেছেন। সেখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
গণতন্ত্র ও বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর মন্তব্য সংক্ষিপ্ত। তিনি বলেন, পরিবর্তন হচ্ছে, কিন্তু দিকটি বোঝা জরুরি। শুধু সরকার বদল নয়, মানুষের বাস্তব অবস্থার পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ কতটা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে—এটাই আসল প্রশ্ন।
আলাপের শেষ দিকে তাঁর কথায় একটি বিষয় পরিষ্কার হয়—তিনি বড় কোনো ঘোষণা দিতে চান না। অভিজ্ঞতা থেকে যা দেখেছেন, সেটুকুই বলেন। সংক্ষেপে, সরাসরি। তাঁর জীবনও তেমন—অতিরঞ্জনহীন, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।
নারীর অবস্থান নিয়েও তিনি সরাসরি কথা বলেন। তাঁর মতে, নারীরা প্রস্তুত, কিন্তু সামাজিক চাপ আছে। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা কথা বলতে পারেন না। সংখ্যায় উপস্থিত থাকলেও সিদ্ধান্তে প্রভাব কম। তিনি এটাকে চলমান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন।
নতুন প্রজন্ম নিয়ে তাঁর বক্তব্যও সংক্ষিপ্ত। তিনি সরাসরি উপদেশ দিতে চান না। বলেন, সময় বদলেছে। প্রজন্মই ঠিক করবে তারা কোন পথে যাবে।
বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর ভাবনা বাস্তবধর্মী। তিনি বহুত্বের কথা বলেন। দেশে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী আছে। ধর্মীয় ও সামাজিক বৈচিত্র্য আছে। এগুলো স্বীকার করতে হবে। সহাবস্থানই মূল বিষয়। শিক্ষা ও পারস্পরিক বোঝাপড়া ছাড়া অগ্রগতি সম্ভব নয়।
আলাপের শেষ দিকে তাঁর কথায় একটি বিষয় পরিষ্কার হয়—তিনি বড় কোনো ঘোষণা দিতে চান না। অভিজ্ঞতা থেকে যা দেখেছেন, সেটুকুই বলেন। সংক্ষেপে, সরাসরি। তাঁর জীবনও তেমন—অতিরঞ্জনহীন, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ।