শত্রু হয়েও কিছু বিড়াল কেন কুকুরের সঙ্গে খেলে

· Prothom Alo

ইন্টারনেটে তুমি নিশ্চয়ই অনেক মজার ভিডিও দেখেছ, যেখানে একটা বিড়াল ও একটা কুকুর খুব আনন্দ করে একসঙ্গে খেলছে। কিংবা হয়তো দেখেছ, একটা কুকুর ও একটা বিয়ার্ডেড ড্রাগন নামের টিকটিকিজাতীয় সরীসৃপ প্রাণী একসঙ্গে দিব্যি সময় কাটাচ্ছে! কুকুর ও বিড়াল তো চিরশত্রু, আবার কুকুর ও সরীসৃপ প্রাণী হিসেবে একদমই আলাদা। তাহলে তারা একে অপরের সঙ্গে খেলে কীভাবে?

Visit likesport.biz for more information.

জার্মানির একটি পার্কে একবার অল্পবয়সী এক রিং–টেইলড লেমুর হঠাৎ বেশ বড়সড় ও বয়স্ক একটি রাফড লেমুরের গায়ের ওপর সজোরে লাফিয়ে পড়ে! লাফিয়ে পড়ার পর ছোট লেমুরটি সেই বড় লেমুরটিকে আলতো করে চড় মারতে থাকে এবং খামচে ধরে। বড় ও শক্তিশালী রাফড লেমুরটি কিন্তু রাগ করে এই খেলা থামিয়ে দেয়নি! উল্টো সে নিজের পিঠের ওপর শুয়ে পড়ে, মুখ খোলা রেখে একদম শান্ত ও আরামদায়ক একটা ভঙ্গি করে ছোট লেমুরটিকে নিজের গায়ের ওপর খেলতে দেয়।

আলাদা প্রজাতির দুই প্রাণীর এমন মজার কুস্তির ঘটনা গবেষকদের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে ফ্রন্টিয়ার্স ইন ইকোলজি অ্যান্ড ইভল্যুশন নামের বিজ্ঞান সাময়িকীতে এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। বিজ্ঞানীরা এ ধরনের বিরল ও বেশ ঝুঁকিপূর্ণ খেলাকে বলেন ইন্টারস্পিসিস প্লে বা ভিন্ন প্রজাতির মধ্যে খেলা।

মাদ্রিদ পুলিশের ভাইরাল কুকুর পনচো

খেলার ছলে শেখা

যেসব প্রাণী দলবদ্ধভাবে বাস করে, তারা খেলতে খুব ভালোবাসে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, খেলার মাধ্যমে অল্পবয়সী প্রাণীরা একে অপরের সঙ্গে সামাজিক বন্ধন তৈরি করে, নতুন কিছু শেখে এবং শারীরিক ভারসাম্য ঠিক রাখতে সাহায্য পায়। দলবদ্ধ প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় প্লেফাইটিং বা খেলার ছলে মারামারি করা। কিন্তু খেলা যখন নিজেদের প্রজাতির বাইরে চলে যায়, তখন বিষয়টি বিজ্ঞানীদের বেশ অবাক করে।

সাধারণত একই প্রজাতির প্রাণীরা একসঙ্গে খেলে। কারণ, তাদের ভাষা বা শারীরিক ইশারা একই রকম হয়। তারা সহজেই বুঝতে পারে কখন খেলাটা অতিরিক্ত মাত্রায় চলে যাচ্ছে বা মারামারিতে রূপ নিচ্ছে। কিন্তু আলাদা প্রজাতির মধ্যে খেলাটা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ একটি কাজ। কারণ, ইশারা বুঝতে ভুল হলে তা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীর আচরণ বিশেষজ্ঞ ও পোস্টডক্টরাল গবেষক হিদার জে বি ব্রুকস ওই লেমুরের প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, খেলার সঙ্গী যখন আর খেলতে চাইছে না, তখন সেই ইশারা বুঝতে না পেরে তাকে ক্রমাগত বিরক্ত করতে থাকলে তা সত্যিকারের মারামারিতে রূপ নিতে পারে এবং এর ফলে শারীরিক ও সামাজিক ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। একটি প্রাণীর যদি ধারালো দাঁত, তীক্ষ্ণ নখ বা শিং থাকে এবং অন্যটির যদি তা না থাকে, তবে খেলার পরিণতি খুব খারাপ হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।

কুকুর-বিড়াল ছাড়াও পোষার জন্য জনপ্রিয় ১০ প্রাণী

এত বিপদের পরও কেন তারা একসঙ্গে খেলে

এর একটা বড় কারণ হলো পাশাপাশি থাকা বা পরিচিত হওয়া। মানুষের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রাণীরা বন্য পরিবেশের চেয়ে অনেক বেশি কাছাকাছি থাকে। ব্রুকস বলেন, খুব কাছাকাছি থাকার কারণে প্রাণীরা একে অপরের প্রতি অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এবং অন্য প্রাণীর খেলার সংকেতগুলো সঠিকভাবে পড়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে।

যেমন বন্য পরিবেশে রিং–টেইলড ও রাফড লেমুররা সাধারণত একসঙ্গে বসবাস করে না। কিন্তু মানুষের তত্ত্বাবধানে চিড়িয়াখানা বা পার্কে একসঙ্গে থাকার কারণে তারা একে অপরের কাছাকাছি আসে এবং একসঙ্গে খেলার মতো যথেষ্ট বোঝাপড়া তৈরি করে নেয়। বাসাবাড়িতে একসঙ্গে বড় হওয়া কুকুর ও বিড়াল, কিংবা কুকুর ও বিয়ার্ডেড ড্রাগনের ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকম গতিশীলতা কাজ করে।

এ ছাড়া বন্য পরিবেশে প্রাণীদের খাবার খুঁজতে হয় বা শিকারির হাত থেকে পালাতে হয়। কিন্তু মানুষের কাছে বন্দী অবস্থায় প্রাণীদের অনেক প্রয়োজন এমনিতেই মিটে যায় বলে তাদের শরীরে প্রচুর অতিরিক্ত শক্তি জমা হয়, যা তারা খেলার মাধ্যমে সমতা করে।

কুকুর কীভাবে ভালো বা খারাপ মানুষ চিনতে পারে

অল্পবয়সীরা কেন বেশি সাহসী হয়

বন্য পরিবেশে প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে অল্পবয়সী প্রাণীরা বেশি খেলাধুলা করে। কারণ, মা–বাবার যত্নের কারণে তাদের নিজেদের সব প্রয়োজন সহজেই মিটে যায়। তাই মা যখন বিশ্রাম নেয়, তখন ছানারা খেলার সঙ্গী খোঁজে, এমনকি সেই সঙ্গী অন্য প্রজাতির হলেও তাদের কোনো আপত্তি থাকে না!

বিখ্যাত প্রাণীবিজ্ঞানী জেন গুডঅল গোম্বে স্ট্রিম ন্যাশনাল পার্কে ফার্ডিনান্ড নামে একটি অল্পবয়সী শিম্পাঞ্জি ও একটি অল্পবয়সী অলিভ বেবুনের মধ্যে এমন চমৎকার, কিন্তু অদ্ভুত খেলার সম্পর্ক দেখেছিলেন। অথচ ব্রুকস মনে করিয়ে দেন, বড় হয়ে গেলে শিম্পাঞ্জিরা কিন্তু এই অলিভ বেবুনদের শিকার করে খায়! তাই এখানে খেলার মধ্যে একটা বিপদের ঝুঁকি সব সময়ই লুকিয়ে থাকে। ব্রুকস আরও বলেন, যেসব অল্পবয়সী প্রাণী নিজের প্রজাতির সমবয়সী সঙ্গী পায় না, তারা অন্য প্রজাতির সঙ্গে খেলতে বেশি আগ্রহী হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, নিজের দলের বয়স্কদের চেয়ে অন্য প্রজাতির বয়স্ক প্রাণীর কাছে গিয়ে খেলার আমন্ত্রণ জানানোটা ছোটদের জন্য অনেক সময় বেশি সহজ হয়। শুনতে খুব অদ্ভুত লাগলেও এটি বুদ্ধিমানের কাজ। নিজের দলে যখন অনেক প্রতিযোগিতা বা আক্রমণাত্মক আচরণ থাকে, তখন অন্য প্রজাতির সঙ্গীর কাছে গেলে সেই ঝামেলা থাকে না। ওই লেমুরের ঘটনা এর চমৎকার উদাহরণ। সেখানে অন্যান্য রিং–টেইলড লেমুর উপস্থিত থাকার পরও ছোট লেমুরটি প্রাপ্তবয়স্ক রাফড লেমুরের সঙ্গেই খেলা শুরু করেছিল।

পশুপাখির প্রতি দয়া করতে শেখায় এই রোবট কুকুর

এটি কি রোমাঞ্চ নাকি ক্ষমতা

ভিন্ন প্রজাতির খেলার অনেক ঘটনাতেই দেখা যায়, প্রাণী দুটি মূলত একে অপরের শিকার ও শিকারি। ব্রুকসের মতে, শিকার ও শিকারির মধ্যে এই খেলার একটি ব্যবহারিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে। এর মাধ্যমে তারা হয়তো ভবিষ্যতে একে অপরের শিকার করার বা শিকার থেকে পালানোর ক্ষমতা সম্পর্কে আগেভাগেই ধারণা পেয়ে যায়।

তবে ব্রুকস মনে করেন, এই ভিন্ন প্রজাতির খেলার পেছনে এর চেয়ে সহজ একটি ব্যাখ্যা থাকতে পারে। তা হলো রোমাঞ্চ বা থ্রিল! মানুষসহ অনেক প্রাণীই এমনভাবে নিজেদের শারীরিক সীমানা পরীক্ষা করতে ভালোবাসে, যেখানে আহত হওয়া বা আরও খারাপ কিছুর ঝুঁকি থাকে। মানুষের বেলায় আমরা জানি, এ ধরনের চ্যালেঞ্জগুলো আমাদের শরীরে অ্যাড্রেনালিন রাশ বা একধরনের প্রবল উত্তেজনা তৈরি করে, যা খেলাটিকে আরও রোমাঞ্চকর করে তোলে। প্রাণীদের ক্ষেত্রেও হয়তো ঠিক তা–ই ঘটে! কে জানে, হয়তো আরেকটা শিম্পাঞ্জির সঙ্গে খেলার চেয়ে একটা বেবুনের সঙ্গে খেলাতেই তাদের কাছে বেশি মজা লাগে!

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

চলন্ত গাড়ি দেখলে কুকুর কেন ধাওয়া করে

Read full story at source