বিজেপির বঙ্গজয় ও অধরা তিস্তার ঝিলিক

· Prothom Alo

রাজ্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার ফল্গু যে নিঃশব্দে বইছে, নির্বাচনের প্রাক্কালে পশ্চিমবঙ্গে এসে তা বুঝতে দেরি হয়নি। উচ্চ ও মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু পরিবারের তীব্র মমতাবিদ্বেষ আমাকে বিস্মিত করেছিল। অথচ দুই বছর আগেও এরা তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে। তাহলে রাতারাতি কী হলো যে তারা এভাবে মমতার বিদায়ের প্রতীক্ষায় চাতক পাখি সেজে থাকল? 

শহর ও জেলা সফরকালে বোঝা গেল, বীতশ্রদ্ধ হওয়ার প্রথম কারণ লাগামহীন দুর্নীতি, চরম অরাজকতা, স্থানীয় নেতাদের দৌরাত্ম্য ও ঔদ্ধত্য এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতি। বুঝলাম, সাধারণ মানুষ প্রতিকারের আশায় যাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল, তাঁর ঔদাসীন্য ও নিরুচ্চারিততায় তারা হতাশ। 

Visit bettingx.club for more information.

গেরুয়ার এই জয় পশ্চিমবঙ্গকে যেভাবে ভেতর থেকে বদলে দেবে

দ্বিতীয় কারণ, মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যে বিভাজন। পিসি ও ভাইপো ক্ষমতার সমান্তরাল ভরকেন্দ্র হয়ে ওঠায় দল ও সমাজে প্রবল অসহায়তা সৃষ্টি হয়। কিংকর্তব্যবিমূঢ়তায় ভুগতে থাকে সর্বস্তরের নেতৃত্ব। অভিষেক সংস্কারপন্থী। পুরোনো নেতারা তাঁর কাছে বোঝা। মমতা আবার পুরোনোদের ছাড়তে নারাজ।

প্রশান্ত কিশোরের তৈরি ‘আইপ্যাক’ সংস্থা ২০২১ সালে মমতাকে জেতানোর অন্যতম কারিগর ছিল। অভিষেক সেই সংস্থাকে দলের চোখ ও কান করে তোলেন। এতে তৃণমূল স্তরের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মমতার সরাসরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আইপ্যাকই হয়ে ওঠে নির্ণায়ক। পিসি-ভাইপোর টানাপোড়েনে দল হাঁসফাঁস করতে থাকে। 

এই পরিস্থিতিতে বিজেপির কোমর কষে নামা। নির্বাচন কমিশনের অতি সক্রিয়তাও বীতশ্রদ্ধ এই জনসমষ্টিকে একধরনের আশার আলো দেখায়। তারা বুঝতে পারে, পরিবর্তন যদি কেউ আনতে পারে, তাহলে এরাই পারবে। এর সঙ্গে জোট বাধে হিন্দুত্বের টান। বিজেপির প্রচারণায় মমতাও মুসলমানদের ‘ত্রাতায়’ পরিণত। 

প্রশ্ন হলো, কেন্দ্র পরিক্রমার সময় পরিবর্তনের এই প্রবল হাওয়ার আভাস কেন পাওয়া যায়নি? মমতার এমন মুখ থুবড়ে পড়ার আগাম আন্দাজ কেন কেউ আঁচ করেনি? বিজেপি যে দুই–তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে তৃণমূলকে ধরাশায়ী করতে চলেছে, সেই ইঙ্গিত তাহলে কেন কেউ দিতে পারল না? উত্তরটা সহজ। রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে সেই ইঙ্গিত কোনোভাবে প্রচ্ছন্ন ছিল না। 

বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর গত সোমবার নয়াদিল্লিতে বিজেপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ৪ মে ২০২৬

রাজ্যে শেষবার ভোট হয়েছিল ২০২৪ সালে। লোকসভার। দুর্নীতি, দৌরাত্ম্য, অরাজকতা ও অসহায়ত্ব তখনো ছিল। তা সত্ত্বেও সেই ভোটে বিজেপির আসন ১৮ থেকে ১২তে নামিয়ে দিয়েছিলেন মমতা। পরিবর্তনের উদগ্র বাসনার প্রতিফলন তখনো দেখা যায়নি।

পরিস্থিতিটা ২০১১ সালের বাম ফ্রন্টের পতনের সঙ্গে একবার তুলনা করে দেখুন। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে বাম ফ্রন্টের কাছ থেকে মমতা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন ২টি জেলা পরিষদ। আরও ৬টিতে জেতার মতো অবস্থায় চলে গিয়েছিল তৃণমূল। পরের বছর লোকসভা ভোটে তৃণমূল ও তার জোটসঙ্গীরা রাজ্যের ৪২টির মধ্যে ২৭টি জিতে বাম ফ্রন্টকে বেঁধে রাখে মাত্র ১৫ আসনে। ২০১০ সালে তৃণমূল ছিনিয়ে নেয় কলকাতাসহ একের পর এক পৌরসভা। ২০১১–তে বাম ফ্রন্টের বিদায় অনেক আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। বাম ফ্রন্টকে সরিয়ে তৃণমূলের উত্থান ও ধাপে ধাপে ক্ষমতা দখল তা বুঝিয়েও দিচ্ছিল। 

২০১১ থেকে ‘তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি’ অধরা। মনমোহন সিং ও নরেন্দ্র মোদি বারবার যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রসঙ্গ তুলে চুক্তি সই থেকে পিছিয়ে গেছেন। মমতার বিরোধিতাকে আমল দিয়েছেন। কেন্দ্রের অসহায়তার উল্লেখ করেছেন। কলকাতা ও দিল্লিতে এখন একই দলের সরকার কায়েম হওয়ায় সেই অজুহাত আর খাড়া করা যাবে না।

এবার কিন্তু তার চিহ্নটি পর্যন্ত দেখা যায়নি। সম্ভাব্য পতনের বিন্দুবিসর্গ বোঝা যায়নি। গত বছর বিধানসভার ১০ কেন্দ্রের উপনির্বাচন হয়। ১০টিই তৃণমূল জেতে। প্রাতিষ্ঠানিক বিরোধিতা সত্ত্বেও মমতা তাই ভেবেছিলেন, সব বাধা কাটিয়ে উঠতে তাঁকে সাহায্য করবে মুসলমান, নারী মহল ও দরিদ্র জনসমষ্টির বিপুল সমর্থন এবং হিন্দু ভোটারদের একাংশ। এসআইআরের দুর্ভোগ ও হয়রানি উসকে বাঙালি জাত্যভিমান জাগিয়ে কেল্লা ফতের বাজিও তিনি খেলেছিলেন। বাড়তি ভরসা ছিল সাংগঠনিক শক্তি।  এখন বোঝা যাচ্ছে, প্রায় এক কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার পাশাপাশি এসআইআর যে মানুষকে ভয়ডরহীন করে তুলবে, সবাই যে নিজের ভোট নিজেই দিতে পারবে, রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসন যে শাসকের পাশে দাঁড়াবে না, ভোট পরিচালনা ও গণনার সব কাজে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের লাগানো হবে, সেই অনুমান মমতা করতে পারেননি। যখন বুঝলেন, তত দিনে বিজেপি ও কমিশন লড়াইটা তৃণমূল বনাম রাষ্ট্রে পরিণত করে ফেলেছে।

এর মোকাবিলার ক্ষমতা মমতার ছিল না। শেষ চেষ্টা তিনি করেছিলেন এই ভোটকে বাঙালি বনাম বহিরাগতের রূপ দিতে। বাঙালি জাত্যভিমান জাগিয়ে তুলতে। কিন্তু গত পাঁচ বছরের অপশাসনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বাঙালি তাতে মজেনি। 

ভারতীয় রাষ্ট্র বনাম পশ্চিম বাংলা: ২০২৬ দেখছে এক নজিরবিহীন নির্বাচন

ফলে অঙ্গ (বিহার) ও কলিঙ্গের (ওডিশা) পর বঙ্গেও এই প্রথমবার বিজেপি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করল। ঝাড়খন্ড ছাড়া গোটা উত্তর–পূর্বাঞ্চলই চলে এল বিজেপির মুঠোয়। গত ১২ বছরে একে একে ধরাশায়ী হয়েছেন উত্তর প্রদেশে মুলায়ম, অখিলেশ, মায়াবতী; লালু প্রসাদ ও তেজস্বীর পর নীতীশ কুমারকে সরিয়ে বিহারকেও মোদি তালুবন্দী করেছেন। ওডিশাতে নবীন কুমারকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলার পর পশ্চিমবঙ্গকেও এবার তিনি মুক্ত করলেন মমতার বাহুডোর থেকে।

ত্রিপুরা থেকে মানিক সরকারকে পাততাড়ি গোটাতে বাধ্য করেছেন আগেই। এবার কেরালা ও তামিলনাড়ুতে অস্তে গেলেন পিনারাই বিজয়ন ও এম কে স্ট্যালিন। মহারাষ্ট্রে শারদ পাওয়ার অস্তমিত সূর্য। উদ্ধব ঠাকরে কোণঠাসা। হীনবল। সর্বভারতীয় পর্যায়ে নরেন্দ্র মোদির একমাত্র চ্যালেঞ্জার ও প্রতিস্পর্ধী হিসেবে টিকে রইলেন শুধু কংগ্রেসের সোনিয়া-রাহুল-প্রিয়াঙ্কা। 

অর্ধশতাব্দী পর নরেন্দ্র মোদির হাত ধরে পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লিতে কায়েম হতে চলেছে একদলীয় শাসন। ৫১ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির অভিমুখ হয়ে দাঁড়িয়েছিল কেন্দ্রবিরোধিতা। ‘ডাবল ইঞ্জিন’ সরকারের স্বপ্ন দেখিয়ে শ্যামাপ্রসাদের জন্মভূমিকে ‘উন্নয়নের সামনের সারিতে’ নিয়ে আসার অঙ্গীকার করেছেন মোদি।

মহারাষ্ট্র, গুজরাট, তামিলনাড়ু, কর্ণাটকের মতো পশ্চিমবঙ্গকেও শিল্পোন্নত রাজ্যে পরিণত করবেন জানিয়েছেন। ভাতাভিত্তিক জীবন থেকে ‘ভালো থাকার’ স্বপ্ন বঙ্গবাসী এখন দেখতেই পারে। তবে সবার আগে মোদিকে ঝরাতে হবে সেই অবাঞ্ছিত মেদ, মমতাকে যা স্থবির ও অপ্রিয় করে তুলেছিল। পরিবর্তনের নামে নব কলেবরে পুরোনোর প্রত্যাবর্তন ঘটলে বঙ্গবাসী তাকেও রেয়াত করবে না। 

এই প্রথম বাংলাদেশকে বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে ফেলল বিজেপি। এই নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের আগ্রহ কী প্রবল ছিল, এক পক্ষকাল ধরে তা টের পেয়েছি। পরিচিতরা প্রতিদিন দূরাভাষ মারফত খবর নিয়েছেন। অভ্যন্তরীণ রাজনীতির স্বার্থে ‘ঘুসপেটিয়া’ ও রোহিঙ্গাদের ‘চুন চুনকে’ বেছে ফেরত পাঠানোর আখ্যানে বিজেপি আরও বেশি করে হাওয়া দিলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি কী হবে, সহজেই অনুমেয়। 

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন: নাগরিক হয়েও আমরা কেন ভোট দিতে পারলাম না

তবে আশাবাদী হওয়ার কারণও কি নেই? ২০১১ থেকে ‘তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি’ অধরা। মনমোহন সিং ও নরেন্দ্র মোদি বারবার যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রসঙ্গ তুলে চুক্তি সই থেকে পিছিয়ে গেছেন। মমতার বিরোধিতাকে আমল দিয়েছেন। কেন্দ্রের অসহায়তার উল্লেখ করেছেন। কলকাতা ও দিল্লিতে এখন একই দলের সরকার কায়েম হওয়ায় সেই অজুহাত আর খাড়া করা যাবে না।

উত্তরবঙ্গের একচ্ছত্র অধিকারীও এখন বিজেপি। মনে থাকা উচিত, আসামের বিজেপি নেতাদের বিরোধিতায় মনমোহন সিং সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে স্থলসীমান্ত চুক্তি সই করতে পারেননি। মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়ে সেই আপত্তি উপেক্ষা করে চুক্তি সই করেছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত তিস্তা চুক্তির ক্ষেত্রেও মোদি তেমন ভূমিকা পালন করতে পারলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হবে। 

বিজেপির বঙ্গ বিজয় ‘দিদি-মোদি সেটিং’ তত্ত্ব নস্যাৎ করে দিল। রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক থাকতে মমতাকে এখন কংগ্রেসের হাত ধরতে হবে। ‘ইন্ডিয়া’ জোটে এত দিন যাঁর নেতৃত্ব তিনি মানেননি, সেই রাহুল গান্ধীর সাহচর্যে জোট-রাজনীতিই হতে চলেছে ‘মুক্ত বিহঙ্গ’ মমতার একমাত্র সাহারা। 

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি

* মতামত লেখকের নিজস্ব

Read full story at source