মঞ্চের জন্য এতটা নিবেদিতপ্রাণ মানুষ খুব কমই দেখা যায়
· Prothom Alo

চলে গেলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান। গত সোমবার দিবাগত রাত ১ টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তান রেখে গেছেন। গতকাল মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর বনানী কবরস্থান তাঁকে দাফন করানো হয়। আতাউর রহমানকে স্মরণ করে লিখেছেন অনুজ নাট্যব্যক্তিত্ব আবুল হায়াত।
১৯৬৮ সালে যখন নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন থেকেই আতা ভাইয়ের (আতাউর রহমান) সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠ পরিচয়। তবে তাঁকে আমি চিনতাম আরও আগে থেকে, স্কুলজীবন থেকেই। আমরা দুজনই পড়েছি চিটাগাং কলেজিয়েট স্কুলে। তিনি ছিলেন আমার দুই ক্লাস সিনিয়র। তখন ব্যক্তিগত পরিচয় না থাকলেও মুখচেনা ছিলেন।
১৯৬৮ সালে ঢাকায় তাঁকে আবার দেখেই চিনে ফেললাম, এ–ই তো সেই বড় ভাই, স্কুলের বড় ভাই। সে সময় প্রকৌশলী ও অভিনেতা গোলাম রাব্বানী আমাকে একটি মিটিংয়ে নিয়ে যান। সেখানে জড়ো হয়েছিলেন অনেক শিল্পী। উদ্দেশ্য, একটি নাট্যদল গঠন করা। সেদিন পরিচয় হয় নাট্যকার জিয়া হায়দারের সঙ্গে, তিনি সদ্য যুক্তরাষ্ট্রফেরত, নাটক বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন। আতা ভাইয়ের সঙ্গেও সেদিন আনুষ্ঠানিক পরিচয় হয়। আমি ও গোলাম রাব্বানী তখন দুই প্রকৌশলী ব্যাচেলর আজিমপুরে একই মেসে থাকতাম।
Visit betsport24.es for more information.
আবুল হায়াতমিটিংয়ের পর সিদ্ধান্ত হলো, নতুন দল নাটক করবে। প্রথম প্রযোজনা হবে ইডিপাস। একের পর এক মিটিং চলতে থাকল। শুরুতে অনেকেই ছিলেন, পরে ধীরে ধীরে অনেকে সরে গেলেন। একদিন আতা ভাই আমাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমরা গ্রুপটা করে ফেলছি। তুমি আমাদের সঙ্গে আছ তো?’ আমি, ডক্টর ইনাম ও রাব্বানী বলেছিলাম, আমরা আছি। সেভাবেই গড়ে উঠল নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় আর আমরাও হয়ে গেলাম এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
এরপর অনেকেই চলে গেছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত থেকে গেলেন জিয়া ভাই, আতা ভাই আর আমরা কয়েকজন। সেখান থেকেই আমাদের দীর্ঘ যাত্রার শুরু। ১৯৭২ সালে আতা ভাই নাগরিকে নির্দেশনা দিলেন বুড় শালিকের ঘাড়ে রোঁ নাটকটির। সেখানে আমি গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয় করি। সেই কাজের মধ্য দিয়ে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়। পরে আলী যাকের এসে নির্দেশনা দিলেন বাকি ইতিহাস নাটকের, যা বাংলাদেশের নাট্য ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে আছে। সে নাটকে আমি ও আতা ভাই দুজনই প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম।
(বাম থেকে) সারা যাকের, আলী যাকের, আবুল হায়াত ও আতাউর রহমানক্রমেই নাগরিক আমাদের কাছে শুধু দল নয়, পরিবারে পরিণত হয়। প্রতিদিন বিকেলে আমরা সপরিবার মহড়ায় বসতাম। আমাদের সন্তানেরাও বড় হয়েছে এ পরিবেশে। আমার মেয়ে নাতাশা, আতা ভাইয়ের মেয়ে শর্মি—সবাই নাগরিকের আবহের মধ্যেই বেড়ে উঠেছে।
আমি সব সময় মনে করি, আতা ভাই বাংলাদেশের মঞ্চের অন্যতম সেরা পরিচালক। এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাঁর ধ্যানজ্ঞানই ছিল মঞ্চ। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের থিয়েটারের প্রাণপুরুষদের একজন। নিজের পুরো জীবনটাই তিনি নাটকের জন্য উৎসর্গ করেছেন। দীর্ঘ সময় নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্ভবত বছর দুয়েক আগে তিনি এ পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
আতা ভাইয়ের আরেকটি অসাধারণ দিক ছিল তাঁর রবীন্দ্রচর্চা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে তাঁর পড়াশোনা ছিল গভীর। শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন অসাধারণ। তাঁর বহু ছাত্র আজও মঞ্চ আলোকিত করছে। বিভিন্ন নাট্যদলে তিনি নির্দেশনা দিয়েছেন। যাঁরা তাঁর সঙ্গে কাজ করেছেন, তাঁরা সবাই তাঁর কাছে ঋণী।
মানুষ হিসেবেও আতা ভাই ছিলেন অসাধারণ প্রাণবন্ত। হাসিখুশি, রসিক, আড্ডাপ্রিয়। মানুষকে আনন্দ দিতে ভালোবাসতেন। তাঁকে আমি কখনো গম্ভীর মুখে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। উচ্চকণ্ঠে হাসতেন। বয়সে আমি ছোট হলেও সম্পর্কটা ছিল গভীর শ্রদ্ধার। তিনি আমাকে ‘হায়াত’ বলে ডাকতেন, কিন্তু সম্বোধনে সব সময় ‘আপনি’ ব্যবহার করতেন।
আজ ভাবির সঙ্গে কথা বলে জানলাম, কিছুদিন ধরে তিনি বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। হয়তো বয়সের কারণেই। আতা ভাইয়ের লেখালেখিও ছিল অসাধারণ। তাঁর প্রবন্ধ আমাদের মতো পাঠকদের অনেক সমৃদ্ধ করেছে। পরিচালনা, অভিনয় কিংবা জীবনের নানা বিষয় নিয়ে তাঁর ভাবনা ছিল গভীর। অভিনয়টা তিনি করতেন, তবে সব সময় আমরা দেখিনি হঠাৎ কিছু একটা করে ফেলতে। তারপরও ওই মানে পৌঁছাতে অনেকেরই অনেক সময় লাগে। তাঁকে আমি সব সময় বলি, মঞ্চের অন্যতম সেরা পরিচালক।
মঞ্চের জন্য এতটা নিবেদিতপ্রাণ মানুষ খুব কমই দেখা যায়। নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়কে তিনি আগলে রেখেছিলেন, ঠিক মুরগি যেমন বাচ্চাদের আগলে রাখে। পরে আলী যাকের এসে নাগরিকের চেহারায় নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন, কিন্তু দলটিকে শুরু থেকে ধরে রাখার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব আতা ভাইয়ের। তাঁকে ‘মঞ্চসারথি’ বলা হয়। কে প্রথম এ উপাধি দিয়েছিলেন জানি না, তবে আতা ভাইকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত শব্দ আর হতে পারে না।