যেভাবে তৈরি হয়েছিল বিদায় হজের রূপরেখা 

· Prothom Alo

হিজরি নবম বর্ষের হজ ইসলামের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এই হজের মাধ্যমেই মহান আল্লাহর ঘর পবিত্র কাবা শরিফ এবং হজ পালনের বিধানাবলিকে জাহেলিয়াতের দীর্ঘদিনের কুসংস্কার ও শিরকি আচার-আচরণ থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করা হয়।

Visit syntagm.co.za for more information.

ইসলামের ইতিহাসে ‘সিদ্দিকি হজ’ নামে পরিচিত এই আয়োজন ছিল প্রকৃতপক্ষে দশম হিজরিতে মহানবীর ‘বিদায় হজে’র এক অপরিহার্য ও সুদূরপ্রসারী প্রস্তুতি। এই হজের মাধ্যমেই ঘোষণা করা হয়েছিল, এখন থেকে পবিত্র হারাম শরিফের বিধানাবলি শুধু একত্ববাদী মুসলিমদের জন্য নির্দিষ্ট।

হজের ‘আমির’ নিযুক্তি

তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে মহানবী (সা.) মদিনায় রমজান, শাওয়াল ও জিলকদ মাস অতিবাহিত করলেন। এরপর নবম হিজরিতে আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-কে মক্কায় পাঠালেন হজের আমির নিযু্ক্ত করে, যেন তিনি মানুষের হজ সম্পাদন করান। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ২/৫৪৩, সম্পাদনা: সাক্কা ও আবিয়ারি, মাকতাবা শামেলা)

আবু বকরের কাফেলা মক্কার পথে রওয়ানা হওয়ার পর সুরা তাওবার প্রথম অংশ নাজিল হয়। নবীজি তখন আলি ইবনে আবু তালিব (রা.)-কে ডাকলেন এবং তাকে আবু বকরের পেছনে পেছে পাঠালেন।

আরবের বিভিন্ন গোত্র তখনও হজ পালন করত বটে, কিন্তু তাদের অনেকে ইসলামের আদর্শ পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণ করেনি বা মুশরিকদের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তি বহাল ছিল। ফলে হজ মৌসুমে জাহেলি যুগের বহু সংস্কার ও অনৈসলামিক রীতিনীতি রয়ে গিয়েছিল।

তাই আবু বকরের এই নেতৃত্ব ছিল পবিত্র কাবার পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্ব ইসলামের অধীনে আনার প্রথম পদক্ষেপ।

সুরা তাওবা নাজিল

আবু বকরের কাফেলা মক্কার পথে রওয়ানা হওয়ার পর সুরা তাওবার প্রথম অংশ নাজিল হয়।

নবীজি তখন আলি ইবনে আবু তালিব (রা.)-কে ডাকলেন এবং তাকে আবু বকরের পেছনে পেছনে পাঠালেন, যেন তিনি সমবেত মানুষের সামনে এই সুরার প্রথম অংশ পাঠ করে শোনান এবং আল্লাহর নতুন  নির্দেশগুলো প্রচার করেন। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৪/১০২, দারু তাইবাহ, মদিনা)

মুসলিম উম্মাহকে নিয়ে নবীজির ৮ আশঙ্কা

হজরত আলি পথে আবু বকরের সঙ্গে মিলিত হলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, তিনি আমির হয়ে এসেছেন নাকি অনুসারী? আলি (রা.) উত্তর দেন, তিনি এসেছেন অনুসারী হিসেবে এসেছেন। এরপর তারা উভয়ে মক্কায় পৌঁছান।

হজরত আবু বকর হজের আমির হিসেবে মূল আনুষ্ঠানিকতা পালনে নেতৃত্ব দেন, আর হজরত আলি নবীজির পক্ষ থেকে আল্লাহর নতুন বিধানগুলো মানুষের সামনে প্রচারের দায়িত্ব পালন করেন।

আরবের প্রথা অনুযায়ী চুক্তি বাতিল বা নতুন চুক্তি ঘোষণার বিষয়টি কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা তার পরিবারের কোনো সদস্যের মাধ্যমেই সম্পন্ন হতো, বিধায় মহানবী (সা.) নিজের পরিবার থেকে আলিকে এই বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। (ইবনুল কাইয়িম, জাদুল মাআদ ফি হাদয়ি খাইরিল ইবাদ, ৩/৫১৯, মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত)

যেসব মুশরিক গোত্রের সঙ্গে মুসলমানদের নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তি ছিল এবং তারা সেই চুক্তি ভঙ্গ করেনি বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করেনি, তাদের চুক্তি মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

ঐতিহাসিক ঘোষণা

হজের প্রধান দিন অর্থাৎ কোরবানির দিন (১০ জিলহজ) আবু বকর (রা.) এক ঐতিহাসিক ঘোষণার ব্যবস্থা করেন।

সাহাবি আবু হোরায়রা (রা.) বলেন, আবু বকর (রা.) কোরবানির দিন মিনায় লোকদের মাঝে এই ঘোষণা করার জন্য ঘোষকদের সঙ্গে আমাকেও পাঠান এটা বলতে যে এই বছরের পর আর কোনো মুশরিক হজ করতে পারবে না এবং কেউ উলঙ্গ হয়ে কাবা তওয়াফ করতে পারবে না। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৬২২)

এই দুটি ঘোষণাই ছিল হজ ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের মূল ভিত্তি। এই ঘোষণার মাধ্যমে পবিত্র কাবাকে শিরকের কলুষতা থেকে চিরতরে মুক্ত করা হয়। আবার কাবায় ইসলামি শালীনতা ও পোশাকের বিধান কার্যকর করা হয়।

চুক্তির বিধান

যেসব মুশরিক গোত্রের সঙ্গে মুসলমানদের নির্দিষ্ট মেয়াদের চুক্তি ছিল এবং তারা সেই চুক্তি ভঙ্গ করেনি বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করেনি, সুরা তাওবার ৪ নম্বর আয়াতের নির্দেশ অনুযায়ী তাদের চুক্তি মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বহাল রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

আর যাদের কোনো চুক্তি ছিল না, কিংবা চুক্তিটি ছিল সাধারণ ও অনির্ধারিত, অথবা চুক্তির মেয়াদ চার মাসের কম ছিল, তাদের জন্য চার মাসের এক সাধারণ অবকাশ বা সময়সীমা ঘোষণা করা হয়। এই চার মাস তারা নিরাপদে আরবের যেকোনো স্থানে বিচরণ করে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পেয়েছে। (তাবারি, জামেউল বায়ান, ১৪/১১৩-১১৪, সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ আত-তুর্কি, দারু হাজার, কায়রো)

‘তোমরা দ্রুত হজ আদায় করো’

বিদায় হজের রূপরেখা তৈরি

নবম হিজরির ‘সিদ্দিকি হজ’ ছিল প্রকৃতপক্ষে দশম হিজরির বিদায় হজের এক অপরিহার্য রূপরেখা ও প্রস্তুতি। আবু বকর সিদ্দিক (রা.)-এর নেতৃত্বে পবিত্র কাবা ও হজ মৌসুমকে জাহেলিয়াতের সকল আবর্তন থেকে মুক্ত করার ফলেই মহানবী (সা.) তাঁর বিদায় হজে এক সুশৃঙ্খল ও একত্ববাদী পরিবেশ পেয়েছিলেন।

সেই রূপরেখার ফলাফল হলো:

  • বিশুদ্ধ হজ: সিদ্দিকি হজের ফলে পবিত্র কাবা সম্পূর্ণরূপে মুসলমানদের অধীনে আসে। শিরক বা উলঙ্গপনার কোনো চিহ্ন সেখানে অবশিষ্ট ছিল না।

  • হজের বিধানের পূর্ণাঙ্গ রূপ: সিদ্দিকি হজ ছিল মূলত কাবাকে শিরক থেকে মুক্ত করার হজ, আর বিদায় হজ ছিল হজের পূর্ণাঙ্গ আনুষ্ঠানিকতা মুসলমানদের হাতে-কলমে শিখিয়ে দেওয়ার হজ। মহানবী (সা.) বিদায় হজে বলেছিলেন, তোমরা আমার কাছ থেকে তোমাদের হজের বিধানাবলি শিখে নাও (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২৯৭, ১২১৮)

হজের ইতিহাসে সিদ্দিকি হজ ছিল মূলত পরিবর্তনের এক বড় সন্ধিক্ষণ। না হলে বিদায় হজের সেই ঐতিহাসিক খুতবা এবং পূর্ণাঙ্গ হজের বিধানাবলি মুসলমানদের হাতে-কলমে শিখিয়ে দেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হতো না।
  • মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা: মহানবী (সা.) তাঁর বিদায় হজের খুতবায় মানবজীবনের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করে বলেছিলেন, নিশ্চয়ই তোমাদের রক্ত এবং তোমাদের ধন-সম্পদ তোমাদের জন্য পবিত্র ও নিরাপদ, যেমন পবিত্র তোমাদের আজকের এই দিনটি। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭)

  • জাহেলিয়াতের অবসান: তিনি জাহেলি যুগের সকল কুপ্রথাকে চিরতরে বাতিল ঘোষণা করে বলেন, জেনে রাখো, জাহেলি যুগের সকল কুপ্রথা আজ আমার পায়ের নিচে দলিত ও অবলুপ্ত হলো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২১৮)

সারকথা

হজের ইতিহাসে সিদ্দিকি হজ ছিল মূলত পরিবর্তনের এক বড় সন্ধিক্ষণ। এর মাধ্যমে পবিত্র কাবাকে শিরক ও জাহেলিয়াতের দীর্ঘদিনের কুসংস্কার থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে। এই ঐতিহাসিক আয়োজন না হলে বিদায় হজের সেই ঐতিহাসিক খুতবা এবং পূর্ণাঙ্গ হজের বিধানাবলি মুসলমানদের হাতে-কলমে শিখিয়ে দেওয়ার মতো পরিবেশ তৈরি হতো না।

তাই ইসলামের ইতিহাসে সিদ্দিকি হজ ছিল প্রকৃতপক্ষে বিদায় হজেরই এক অনিবার্য ও সুদূরপ্রসারী ভিত্তি।

‘এই তো আল-আমিন, আমরা রাজি’

Read full story at source