সাদাত হাসান মান্টো: সভ্যতার মুখোশের আড়ালে মানুষের ভেতরের অন্ধকার

· Prothom Alo

সাদাত হাসান মান্টো উর্দু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গল্পকার। দেশভাগের রক্তাক্ত বাস্তবতা, দাঙ্গার উন্মাদনা, নারীর অসহায়তা, যৌনকর্মীদের বঞ্চিত জীবন, মানুষের ভেতরের নিষ্ঠুরতা এবং সমাজের প্রান্তিক মানুষের দুঃখ—এসব অন্ধকার বাস্তবতাকে তিনি কোনো ভণিতা বা রাখঢাক ছাড়াই সাহিত্যে তুলে এনেছেন। মান্টো অশ্লীলতার অভিযোগে ছয়বার বিচারের মুখোমুখি হন—ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশে। তবু তিনি লেখা থামাননি। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘যদি আমার গল্প সহ্য করতে না পারো, তাহলে এই সমাজ সহ্য করার অযোগ্য।’ তিনি ছিলেন গভীরভাবে আহত একজন মানুষ, যিনি নিজের সময়ের নির্মমতা শরীরের ভেতর বহন করেছেন। তাঁর জীবন ছিল দারিদ্র্য, অবহেলা, মানসিক অস্থিরতা, মদ্যপান, সামাজিক বিতর্ক এবং গভীর একাকিত্বে পূর্ণ। কিন্তু এই ভগ্ন, ক্ষতবিক্ষত মানুষটিই উপমহাদেশের সমাজকে এমন নির্মম সততায় দেখেছিলেন, যা আজও পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলে। মান্টোকে পড়া মানে শুধু সাহিত্য পড়া নয়; বরং মানুষের ভেতরের অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়ানো। তাঁর গল্পে সভ্যতার মুখোশ খুলে যায়। সেখানে মানুষ আর আদর্শের মহিমাময় প্রতীক নয়; বরং ক্ষুধার্ত, ভীত, যৌনাকাঙ্ক্ষায় জর্জরিত, বিভক্ত, সহিংস এক সত্তা। এই সত্যকে তিনি এমন নিরাবরণ ভাষায় প্রকাশ করেছিলেন যে তাঁর সময়ের সমাজ তাঁকে অশ্লীলতার অভিযোগে বারবার আদালতে দাঁড় করিয়েছিল। অথচ মান্টো জানতেন, অশ্লীলতা তাঁর গল্পে নয়—অশ্লীলতা সমাজের ভেতরেই লুকিয়ে আছে।

১৯১২ সালে পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় জন্ম নেওয়া মান্টো এমন এক সময়ে বড় হয়েছেন, যখন ভারতীয় উপমহাদেশ রাজনৈতিক উত্তেজনা, ঔপনিবেশিক শোষণ এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মধ্য দিয়ে অস্থির হয়ে উঠছিল। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও খুব সুখের ছিল না। বাবার সঙ্গে দূরত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সাহিত্যজগতের অবহেলা—সব মিলিয়ে তাঁর ভেতরে একধরনের অস্তিত্বগত ক্ষত তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই ক্ষতই তাঁকে সমাজকে ভিন্ন চোখে দেখতে শিখিয়েছিল। তিনি মধ্যবিত্ত নৈতিকতার ভদ্র আবরণে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর চোখ ছিল সেই সব মানুষের দিকে, যাদের সমাজ দেখতে চায় না। পতিতা, ভবঘুরে, উন্মাদ, উদ্বাস্তু, মদ্যপ, ব্যর্থ প্রেমিক, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষ—এসব চরিত্রই তাঁর গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠে। কারণ তিনি জানতেন, সমাজের প্রকৃত সত্য ক্ষমতাবানদের ড্রয়িংরুমে নয়, বরং প্রান্তিক মানুষের জীবনে লুকিয়ে থাকে। মান্টো ছিলেন সমাজের নিরাবেগ পর্যবেক্ষক। তিনি মানুষের ভেতরের নিষ্ঠুরতা দেখেছেন, আবার সেই নিষ্ঠুরতার ভেতরেও ক্ষীণ মানবিক আলো খুঁজেছেন। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো তাই কখনো সম্পূর্ণ পাপী নয়, আবার পুরোপুরি নির্দোষও নয়। তারা মানুষের মতোই জটিল।

Visit casino-promo.biz for more information.

১৯৪৭ সালের দেশভাগ মান্টোর সাহিত্যজগতে এক গভীর ভূমিকম্পের মতো আঘাত হেনেছিল। এই বিভাজন শুধু ভূখণ্ডের ছিল না; এটি মানুষের চেতনা, সম্পর্ক এবং মানবিকতারও ভাঙন ঘটিয়েছিল। সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা যখন রক্তক্ষয়ী পরিস্থিতির রূপ নিল, ধর্মের নামে তখন প্রতিবেশী প্রতিবেশীকে হত্যা করতে লাগল, অসংখ্য নারী ধর্ষণের শিকার হলো, ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেল, আর লাখো মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে অনিশ্চয়তা আর উদ্বাস্তু জীবনের অন্ধকারে নিক্ষিপ্ত হলো। এই বিভীষিকার প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন সাদাত হাসান মান্টো, এবং সেই কারণেই তাঁর লেখায় এই সময়ের নির্মম সত্য এত তীব্রভাবে ধরা পড়েছে।

সাদাত হাসান মান্টো ( ১১ মে ১৯১২—১৮ জানুয়ারি ১৯৫৫)
অশ্লীলতার অভিযোগ সাদাত হাসান মান্টোর সাহিত্যজীবনের এক অনিবার্য ছায়া ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিকবার মামলা হয়েছে, আদালতে দাঁড় করানো হয়েছে তাঁকে। পাকিস্তানে এক মামলায় তাঁকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং সঙ্গে আরোপ করা হয়েছিল তিন শ রুপি জরিমানা। তাঁর গল্পকে অনৈতিক, অশ্লীল, সমাজবিধ্বংসী বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

দেশভাগ নিয়ে বহু লেখক লিখেছেন, কিন্তু মান্টোর মতো নির্দয় সততা খুব কমই দেখা যায়। তাঁর গল্পগুলোতে কোনো রোমান্টিকতা নেই, নেই কোনো কৃত্রিম নৈতিকতা। বরং তিনি দেখিয়েছেন মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা আদিম হিংস্রতা, যা সুযোগ পেলেই বেরিয়ে আসে। টোবা টেক সিং, খোল দো, ঠান্ডা গোশত—এই গল্পগুলো কেবল রাজনৈতিক বিপর্যয়ের বিবরণ নয়; এগুলো সভ্যতার মুখোশ খুলে যাওয়ার দলিল, যেখানে মানুষ নিজেকেই চিনতে ব্যর্থ হয়। বিশেষত টোবা টেক সিং গল্পটি উপমহাদেশের বিভক্তির এক অনন্য প্রতীক। মানসিক রোগী বিশন সিং বুঝতে পারে না, তার জন্মভূমি ঠিক কোন দেশে পড়েছে। এই বিভ্রান্তি আসলে গোটা উপমহাদেশেরই বিভ্রান্তি—যেখানে মানুষ হঠাৎ করেই নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলে। শেষ পর্যন্ত সীমান্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার মৃত্যু যেন এক গভীর প্রতীক—এটি কেবল একজন উন্মাদের মৃত্যু নয়; বরং বিভক্ত মানুষের আত্মপরিচয়ের মৃত্যু।

মান্টো আমাদের মনে করিয়ে দেন—রাষ্ট্র চাইলে কাগজে-কলমে সীমান্ত এঁকে দেশকে টুকরো করতে পারে, কিন্তু মানুষের ভেতরে জমে থাকা স্মৃতি, মাতৃভাষার আবেগ, জন্মভূমির মাটি, শৈশবের গন্ধ কিংবা ভালোবাসার বন্ধনকে কোনো বিভাজনরেখাই আলাদা করতে পারে না। আর সেই অসম্ভব বিভাজনের মধ্যেই জন্ম নেয় সবচেয়ে নির্মম ট্র্যাজেডি—মানুষের ভেতরের পশুত্বের উন্মোচন। পতিতালয় ও প্রান্তিক মানুষের জীবন মান্টোর সাহিত্যে কেবল একটি পটভূমি নয়, বরং সেটাই তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সবচেয়ে গভীর ক্ষেত্র। তিনি কখনো যৌনতা বা পতিতালয়কে সস্তা কৌতূহলের বিষয় বানাননি। বরং তিনি বুঝেছিলেন, সমাজের সবচেয়ে নির্মম সত্যগুলো লুকিয়ে থাকে সেই সব অন্ধকার জায়গায়, যেগুলোকে তথাকথিত ভদ্রসমাজ ঘৃণা ও নৈতিকতার মুখোশ পরে দূরে সরিয়ে রাখে। তাই তাঁর গল্পে বারবার ফিরে আসে পতিতালয়ের ঘর, উদ্বাস্তু শিবির, মদের দোকান কিংবা সমাজচ্যুত মানুষের জীবন।

মান্টো পতিতাদের কেবল শরীর হিসেবে দেখেননি। তিনি তাঁদের ভেতরের মানুষটিকে দেখেছেন—তাদের ক্ষুধা, একাকিত্ব, অপমান, বেঁচে থাকার সংগ্রাম, এমনকি প্রেম ও স্বপ্নকেও। তাঁর গল্পের নারীরা নিছক করুণার পাত্র নয়; তারা অনুভব করে, ভালোবাসে, অভিমান করে, কখনো প্রতিরোধও গড়ে তোলে। এই কারণেই মান্টোর নারী চরিত্রগুলো এত জীবন্ত ও স্মরণীয়। তিনি দেখিয়েছেন, সমাজ যাদের অশ্লীল বলে প্রত্যাখ্যান করে, তারাই অনেক সময় মানবিকতার শেষ আশ্রয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে তথাকথিত সভ্য ও ভদ্র মানুষের মুখোশের আড়ালে মান্টো আবিষ্কার করেছেন নিষ্ঠুরতা, ভণ্ডামি ও পশুত্ব। তাঁর গল্পে যৌনতা কোনো রোমান্টিক বিষয় নয়; বরং ক্ষমতা, অর্থনীতি, শ্রেণিবৈষম্য এবং সামাজিক শোষণের নির্মম বাস্তবতা। এই উল্টো দৃষ্টিভঙ্গিই মান্টোকে আলাদা করে। তিনি সমাজের প্রান্তিক মানুষদের মধ্যে মানবতার আলো খুঁজেছেন, আর সভ্যতার দাবিদার মানুষদের ভেতরে দেখেছেন গভীর অন্ধকার।

অশ্লীলতার অভিযোগ সাদাত হাসান মান্টোর সাহিত্যজীবনের এক অনিবার্য ছায়া ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিকবার মামলা হয়েছে, আদালতে দাঁড় করানো হয়েছে তাঁকে। পাকিস্তানে এক মামলায় তাঁকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং সঙ্গে আরোপ করা হয়েছিল তিন শ রুপি জরিমানা। তাঁর গল্পকে অনৈতিক, অশ্লীল, সমাজবিধ্বংসী বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।

দেশভাগের পর সাদাত হাসান মান্টোর ব্যক্তিগত জীবন ধীরে ধীরে গভীর বিষাদ, নিঃসঙ্গতা ও মানসিক অস্থিরতার এক অন্ধকার গহ্বরে ডুবে যেতে থাকে। তিনি ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে গেলেও সেখানে কোনো স্থিরতা কিংবা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাননি। চারপাশে ছিল অনিশ্চয়তা, অর্থকষ্ট, সামাজিক অবহেলা এবং এক অদ্ভুত মানসিক বিচ্ছিন্নতা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—মান্টো কি সত্যিই অশ্লীল ছিলেন, নাকি সমাজ নিজের নগ্ন মুখ দেখতে ভয় পেয়েছিল? আসলে মান্টো এমন এক লেখক ছিলেন, যিনি মানুষের ভেতরের অন্ধকারকে কোনো অলংকার ছাড়াই প্রকাশ করেছিলেন। তিনি যৌনতা, সহিংসতা, দারিদ্র্য, বিকৃত মানসিকতা, ভণ্ড নৈতিকতা কিংবা দেশভাগের রক্তাক্ত উন্মাদনাকে এমন নির্মম সততায় লিখেছিলেন যে তথাকথিত ভদ্রসমাজ অস্বস্তিতে পড়ে যায়। কারণ, আমরা সাধারণত সেই সত্যকেই আড়াল করতে চাই, যা আমাদের নিজেদের ভয় ও পশুত্বের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

মান্টোর গল্পে পতিতালয় এসেছে, ধর্ষণ এসেছে, মানুষের বিকৃত কামনা এসেছে—কিন্তু সেগুলো কখনো সস্তা উত্তেজনা তৈরির জন্য নয়; বরং তিনি দেখিয়েছেন সভ্যতার চকচকে আবরণের নিচে কতটা পচন লুকিয়ে আছে। তাঁর গল্পের ভাষা ছিল নিরাবরণ, কারণ বাস্তবতাও ছিল নগ্ন। তিনি শব্দ দিয়ে সমাজকে সাজিয়ে তুলতে চাননি; বরং আয়নার মতো তুলে ধরেছিলেন। এই কারণেই মান্টো লিখেছিলেন, ‘যদি আমার গল্পগুলো অশ্লীল হয়, তবে সমাজও অশ্লীল। কারণ, আমি সমাজের বাইরে কিছু লিখিনি।’ এই বক্তব্যের মধ্যেই তাঁর সাহিত্যিক অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি কোনো নীতিবাগীশ ছিলেন না, সমাজসংস্কারকের ভূমিকাও নেননি। তিনি শুধু মানুষের বাস্তব মুখটি দেখিয়েছিলেন। আর সেই মুখ দেখে সমাজ নিজেই আতঙ্কিত হয়ে উঠেছিল।

দেশভাগের পর সাদাত হাসান মান্টোর ব্যক্তিগত জীবন ধীরে ধীরে গভীর বিষাদ, নিঃসঙ্গতা ও মানসিক অস্থিরতার এক অন্ধকার গহ্বরে ডুবে যেতে থাকে। তিনি ভারত থেকে পাকিস্তানে চলে গেলেও সেখানে কোনো স্থিরতা কিংবা নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাননি। চারপাশে ছিল অনিশ্চয়তা, অর্থকষ্ট, সামাজিক অবহেলা এবং এক অদ্ভুত মানসিক বিচ্ছিন্নতা। ধীরে ধীরে মদ্যপান তাঁর জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যে সেটি আর শুধু অভ্যাস থাকে না, হয়ে ওঠে ভেতরের যন্ত্রণাকে সাময়িকভাবে ভুলে থাকার এক মরিয়া চেষ্টা। কিন্তু সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত তাঁকে আরও ভেঙে দেয়। মান্টো অনুভব করতেন, সমাজ তাঁর লেখা পড়ে বিস্মিত হয়, আলোচনাও করে, কিন্তু তাঁকে সত্যিকার অর্থে গ্রহণ করে না। তাঁর গল্পে যে নগ্ন বাস্তবতা উঠে আসত—যৌনতা, সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা, পতিতালয়ের জীবন কিংবা মানুষের পশুত্ব—সেগুলো ভদ্রসমাজকে অস্বস্তিতে ফেলত। ফলে তাঁকে অশ্লীলতার অভিযোগে বারবার আদালতের মুখোমুখি হতে হয়েছে। সাহিত্যিক মহলেও তিনি সব সময় নিঃসঙ্গ ছিলেন। তাঁর স্পষ্টভাষিতা এবং সামাজিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে নির্ভীক অবস্থান তাঁকে অনেকের কাছেই বিতর্কিত করে তুলেছিল।

কিন্তু এই ভাঙনই তাঁর সাহিত্যকে আরও গভীর ও তীক্ষ্ণ করেছে। মান্টো বুঝেছিলেন, মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যগুলোর একটি হলো নিঃসঙ্গতা। ধর্ম, রাষ্ট্র, নৈতিকতা কিংবা সম্পর্ক—সবকিছুর আড়ালে মানুষ শেষ পর্যন্ত একাই থেকে যায়। তাই তাঁর গল্পের চরিত্রগুলোও প্রায়ই ভাঙা, আহত, উদ্বাস্তু কিংবা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত মানুষ। তারা সমাজের প্রান্তে দাঁড়িয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে। এক অর্থে মান্টো নিজেই তাঁর গল্পের চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন। তিনি সমাজকে খুব গভীরভাবে বুঝেছিলেন, মানুষের মধ্যে অন্ধকার দেখেছিলেন সবচেয়ে নির্মম সততায়; কিন্তু সেই সমাজেই কখনো পুরোপুরি আশ্রয় বা স্বস্তি খুঁজে পাননি। তাঁর জীবন তাই শুধু একজন লেখকের জীবনী নয়, বরং এক আহত সময়ের প্রতিচ্ছবি।

মান্টো শেষ পর্যন্ত কোনো মতাদর্শের লেখক হয়ে ওঠেননি। তিনি পুরোপুরি বামপন্থী ছিলেন না, ডানপন্থীও না। তিনি ছিলেন মানুষের লেখক—বিশেষ করে মানুষের ভেতরের ভাঙন ও অন্ধকারের লেখক। তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতা খুব পাতলা একটি আবরণ। তার নিচেই লুকিয়ে আছে আদিম ভয়, হিংসা, কামনা, একাকিত্ব।

মান্টোর গল্পের ভাষা ছিল আশ্চর্য রকমের সরল। তিনি অলংকারময় সাহিত্যিক ভঙ্গিতে বিশ্বাস করতেন না। তাঁর বাক্য ছোট, ধারালো, সংক্ষিপ্ত। কিন্তু সেই সরলতার মধ্যেই ছিল বিস্ফোরণের শক্তি। তিনি জানতেন, গভীরতম ট্র্যাজেডি প্রায়ই সবচেয়ে নিঃশব্দ ভাষাতেই প্রকাশ পায়। কখনো একটি ছোট্ট দৃশ্যই পুরো সভ্যতার পতনকে প্রকাশ করতে পারে। তাঁর গল্পে তাই অতিরিক্ত আবেগ নেই, কৃত্রিম নাটকীয়তাও নেই। বরং একধরনের ঠান্ডা নির্মমতা আছে, যা পাঠককে আরও বেশি আহত করে। এই ভাষাশৈলী তাঁর সাহিত্যকে আধুনিক করে তুলেছে। আজও তাঁর গল্প পড়লে মনে হয়, তিনি যেন আমাদের সময়ের কথাই লিখেছেন। কারণ, মানুষের ভেতরের গোপন হিংস্রতাকে খুব বেশি বদলায়নি।

মান্টো আজও পঠিত হয় শুধু সাহিত্যিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং তাঁর নির্মম সততার জন্য। পৃথিবী বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, রাষ্ট্র বদলেছে—কিন্তু মানুষের ভেতরের বিভাজন, ঘৃণা, সহিংসতা, যৌন ভণ্ডামি এবং একাকিত্ব এখনো রয়ে গেছে। আজও ধর্মের নামে মানুষ খুন হয়। আজও উদ্বাস্তু মানুষ সীমান্তে আটকে থাকে। আজও নারীর শরীরকে পণ্য বানানো হয়। আজও সমাজ নিজের কপটতা আড়াল করতে নৈতিকতার ভাষা ব্যবহার করে। তাই মান্টো আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের বুঝিয়েছেন, সাহিত্য শুধু নান্দনিকতার অনুশীলন নয়। সাহিত্য মানুষের অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সাহসও। তিনি কোনো সান্ত্বনার গল্প লেখেননি; বরং এমন গল্প লিখেছেন, যা মানুষকে অস্বস্তিতে ফেলে, প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। এই কারণেই মান্টোকে পড়া সহজ নয়। তাঁর গল্প পাঠকের আত্মতুষ্টি ভেঙে দেয়। তিনি আমাদের বাধ্য করেন নিজেদের অন্তর্গত হিংস্রতার মুখোমুখি হতে।

মান্টো শেষ পর্যন্ত কোনো মতাদর্শের লেখক হয়ে ওঠেননি। তিনি পুরোপুরি বামপন্থী ছিলেন না, ডানপন্থীও না। তিনি ছিলেন মানুষের লেখক—বিশেষ করে মানুষের ভেতরের ভাঙন ও অন্ধকারের লেখক। তাঁর সাহিত্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সভ্যতা খুব পাতলা একটি আবরণ। তার নিচেই লুকিয়ে আছে আদিম ভয়, হিংসা, কামনা, একাকিত্ব। আর মানুষ যখন সংকটে পড়ে, সেই আবরণ খুব সহজেই ছিঁড়ে যায়। এই সত্য তিনি নিজের জীবন দিয়েই বুঝেছিলেন। তাই তাঁর গল্পে কৃত্রিম নৈতিকতা নেই, আছে কেবল মানুষের নির্মম বাস্তবতা। ১৯৫৫ সালে মাত্র ৪২ বছর বয়সে মান্টো মারা যান। তাঁর মৃত্যু কেবল শরীরকে থামিয়েছে, তাঁকে নয়। কারণ, তিনি এমন সব সত্য শব্দে ধরে গেছেন, যা সময়ের ধুলোতেও কখনো মুছে যাবে না। আজও যখন আমরা মান্টোকে পড়ি, তখন শুধু অতীতের কোনো লেখককে পড়ি না। আমরা আমাদের নিজেদের সমাজকে পড়ি। আমাদের নিজেদের ভয়, হিংস্রতা, ভণ্ডামি ও একাকিত্বকে পড়ি।

সাদাত হাসান মান্টো প্রধানত উর্দু ভাষাতেই লিখেছেন। মাত্র দুই দশকের সাহিত্যজীবনে তিনি রচনা করেছেন ২৭০টি ছোটগল্প, শতাধিক নাটক, অসংখ্য চলচ্চিত্রের কাহিনি ও সংলাপ এবং বিখ্যাত-অখ্যাত বহু মানুষের জীবন্ত লেখাচিত্র। তাঁর সাহিত্যভান্ডারে রয়েছে ২২টি ছোটগল্পগ্রন্থ, একটি উপন্যাস, পাঁচটি ধারাবাহিক রেডিও নাটক, তিনটি প্রবন্ধগ্রন্থ এবং নানা ব্যক্তিত্বকে নিয়ে লেখা তিনটি স্কেচসংকলন। মান্টো বিশ্বাস করতেন, কাল্পনিক চরিত্র নির্মাণের চেয়ে বাস্তব মানুষের মনস্তত্ত্ব, আবেগ ও ভাঙনের ভেতরেই সমাজের প্রকৃত মুখ লুকিয়ে থাকে। তাই তিনি বাস্তব চরিত্রগুলোর অন্তর্গত অন্ধকার, ক্ষত ও মানবিক দ্বন্দ্বের মাধ্যমে সমাজের নির্মম ও কুৎসিত মুখ উন্মোচন করেছেন।

Read full story at source