পশ্চিমবঙ্গে গরু কেনাবেচায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে হিন্দু কৃষকদের বিপদে ফেলল বিজেপি

· Prothom Alo

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গরু কেনাবেচার ওপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে, তা যে বিজেপিকে খানিকটা চিন্তায় ফেলে দিয়েছে, এটা স্বীকার করছেন বিজেপির মুসলিম কর্মকর্তারা। উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায় বিজেপির সংখ্যালঘু সেলের অন্যতম সহসভাপতি ইউনুস আলী। তিনি চাষবাসের পাশাপাশি জমি কেনাবেচার কাজও করেন। ইউনুস আলী ২০১৪ সালে ফরওয়ার্ড ব্লক দল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। বর্তমানে উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার একজন প্রভাবশালী সংখ্যালঘু নেতা।

গতকাল মঙ্গলবার ইউনুস আলী প্রথম আলোকে বলেন, গরু কেনাবেচার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করার নানা কারণ রয়েছে। তবে বিষয়টি বিজেপিকে কিছুটা সমস্যায় ফেলেছে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, দল পবিত্র ঈদুল আজহার আগেই পরিস্থিতি সামলে নেবে।

Visit turconews.click for more information.

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস বিষয়টিকে হাতিয়ার করে মাঠে নেমেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেসদলীয় সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্র বলেছেন, গরু কেনাবেচার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে সদ্য নির্বাচিত বিজেপি সরকার।

৯ মে শপথ নেওয়ার চার দিন পরে (১৩ মে) বিজেপি একটি নির্দেশিকা জারি করে জানিয়েছে, সরকারি কয়েকটি দপ্তর থেকে গবাদিপশুর বয়স ও শারীরিক সক্ষমতার সনদ ছাড়া তা কেনাবেচা করা যাবে না। পবিত্র ঈদুল আজহার আগে এই নির্দেশিকার কারণে পশ্চিমবঙ্গে বড় রকমের ধাক্কা খেয়েছে গরু কেনাবেচা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গরুপালকেরা, যাঁদের বড় অংশই হিন্দু কৃষক।

হিন্দুরা পড়েছেন বিপদে

বাংলায় যাকে বলে শাঁখের করাত, অর্থাৎ যে করাতের দুই দিক ধারালো এবং যা টানলে বা ঠেললে দুদিকেই কাটে। গরু নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করে সেই রকম অবস্থার মধ্যেই বিজেপি গিয়ে পড়েছে বলে মনে করছে দলেরই একাংশ। বিজেপি নেতা ইউনুস আলী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিষয়টা কিছুটা সমস্যা সৃষ্টি করেছে। তবে আশা করছি, ঈদুল আজহার আগেই দল এটা সামলে নেবে।’

১৩ মের নির্দেশিকা ঠিক কী ধরনের সমস্যা তৈরি করেছে, তা ব্যাখ্যা করে ইউনুস আলী পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতির একটা চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমরা গরু জবাই করেন এবং খান। কিন্তু গরুর ব্যবসাটা করেন হিন্দুরা এবং মূলত গোপালক ঘোষেরা। তাঁরা গরুকে লালন–পালন করেন, বড় করেন। তারপর এর দুধ বিক্রি করেন, যা থেকে রকমারি সন্দেশ, দই, ঘি ইত্যাদি হয়।

এই বিজেপি নেতা আরও বলেন, একটা পর্যায়ের পরে গরুর স্বাস্থ্যগত কারণে এবং নিজেদের অর্থের প্রয়োজনের ভিত্তিতে হিন্দুরা গরুটাকে বিক্রি করে দেন। স্বাভাবিকভাবেই গরু কেনেন মুসলিমরা। কিন্তু সাধারণভাবে তাঁরা গরু পালন করেন না। এইটা বুঝতে একটু ভুল হয়ে গেছে, যে কারণে এই বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে।

ইউনুস আলীর বক্তব্য, এ ঘটনার জেরে হিন্দুরা যদি গরু পালন বন্ধ করে দেন, তবে পশ্চিমবঙ্গে দুধ, ছানা, মিষ্টির মতো দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার বিরাট ধাক্কা খাবে। এতে শিল্পে অনুন্নত পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর বিরাট চাপ পড়বে।

তৃণমূল নেত্রী মহুয়া মৈত্র

বিজেপিকে আক্রমণ মহুয়া মৈত্রর

এ কথাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গতকাল বলেছেন তৃণমূলের এমপি মহুয়া মৈত্র। তিনি বলেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরে এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই তারা গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর সাংঘাতিক এক আঘাত করেছে। গ্রামগঞ্জে যেখানে যত পশুর হাট আছে, সেখানে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং ব্যবসা প্রায় বন্ধের মুখে।

মহুয়া লিখেছেন, ‘বিজেপি সরকার একটি সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে এ কাজ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে শুধু একটি সম্প্রদায় নয়...গরিব মানুষ...জাতিধর্ম–নির্বিশেষে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। ঘোষ, দাস যেমন এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, তেমনই মুসলিম সম্প্রদায়ও যুক্ত। ফলে আপনারা (বিজেপি) একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে আঘাত করতে চাইলেও চোট সব গরিব মানুষের গায়েই লাগবে।’

এরপর পার্লামেন্টের প্রশ্নোত্তর উদ্ধৃত করে মহুয়া মৈত্র দেখান, ভারত থেকে গরুর মাংস রপ্তানি উত্তরোত্তর বাড়ছে। ২০২৪-২৫ সালে মাংস রপ্তানি করে ৪০ হাজার কোটি টাকা বিদেশি মুদ্রা আয় করেছে ভারত। পাশাপাশি মহিষের মাংস বিক্রির বড় করপোরেট সংস্থা অ্যালানা গ্রুপ বিজেপির তহবিলে ৩০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছে।

এ বিষয় উল্লেখ করে মহুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘তাহলে গরুর মাংস বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা বা করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে ৩০ কোটি টাকা অনুদান বিজেপি নিতে পারে। তাতে কোনো অন্যায় নেই। কিন্তু গরিব মানুষের পেটে লাথি মেরে এই ব্যবসা বন্ধ করে আপনারা কী প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন?’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গরু–বিতর্ক ক্রমেই জোরদার হয়ে উঠছে। হাজার হাজার হিন্দু গোপালককে দেখা যাচ্ছে ক্যামেরার সামনে এসে বা সাংবাদিকের মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে তাঁদের দুর্দশার কথা তুলে ধরতে।

বিশেষ করে বাড়ির নারীরা বলছেন, বছরের এই সময়ে গরু বিক্রি করে তাঁরা বেশ কয়েক লাখ টাকা রোজগার করেন, যা দিয়ে তাঁরা সাধারণত তাঁদের কৃষিঋণ ও মাইক্রোক্রেডিট সংস্থা থেকে নেওয়া ধার মেটান। তাঁদের অনেকেই ক্যামেরার সামনে বলেছেন, বিধিনিষেধ শিথিল করা না হলে আত্মহত্যা করা ছাড়া তাঁদের সামনে আর কোনো পথ খোলা থাকবে না।

সমাধান বের করার আশা

বিজেপি নেতা ইউনুস আলী অবশ্য প্রথম আলোকে বলেন, বিষয়টি দল খতিয়ে দেখছে।

বিজেপির এই নেতা বলেন, ‘আমি বুঝতে পারছি, ঈদের দিন রাস্তায় গরুর মাংস কাটাকাটি করা যাবে না। গ্রামের একটু ভেতরের দিকে ঢুকে করতে হবে। নেতাদের কথা শুনে বুঝতে পারছি, শেষ পর্যন্ত খুব একটা অসুবিধা হবে না।’

তবে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ যে তাঁর বাড়িতে আসছেন এবং বিষয়টি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছেন, সেটা স্বীকার করে ইউনুস আলী বলেন, ‘এ নিয়ে এলাকায় আমার ওপরে কিছুটা চাপ সৃষ্টি হয়েছে।’

এ ঘটনার কারণও ব্যাখ্যা করেন বিজেপির ওই নেতা। তিনি বলেন, ‘আসলে বিজেপি তো মুসলিমদের ভোট পেয়ে ক্ষমতায় আসেনি। এসেছে হিন্দুদের ভোট পেয়ে। ফলে তাদের কিছু একটা করতে হবে, যাতে হিন্দুরা মনে করে যে তাদের সরকার এসেছে। এখন সেটা করতে গিয়েই সমস্যা হয়েছে। আমি যতটুকু বুঝি, শুভেন্দু অধিকারী এমন মানুষ নন যে তিনি কাউকে বিপদে ফেলতে চাইবেন। ফলে আমি আশা রাখি, একটা সমাধান সূত্র বেরোবে।’

Read full story at source