আড়াই শ টাকা সাশ্রয় করতে মালেকা বানুর ৪ ঘণ্টার লড়াই
· Prothom Alo
৭০ বছর বয়সী মালেকা বানু চোখে ভালো দেখেন না। বাঁ চোখটাতে ছানি পড়েছে তাঁর। টাকার অভাবে অস্ত্রোপচার করাতে পারেননি। এ অবস্থায় গতকাল বুধবার সকালে ভর্তুকি মূল্যে ভোগ্যপণ্য কিনতে রাজধানীর সায়েদাবাদ এলাকায় ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ট্রাক সেলের লাইনে দাঁড়ান তিনি।
Visit afnews.co.za for more information.
দুপুর ১২টার দিকে মালেকা বানুর সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। ততক্ষণে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে পণ্য কিনতে অপেক্ষা করছেন তিনি। মাথার ওপর কাঠফাটা রোদ। অস্বস্তিকর গরম। মালেকা বানু জানান, পাশের একটি ছোট খাবার হোটেলে পানি খেতে চেয়েও পাননি।
মালেকা বানু রাজধানীর দয়াগঞ্জ এলাকায় সড়কের পাশে বসে পান বিক্রি করেন। থাকেনও ওই এলাকার এক কক্ষের একটি ঘরে। একসময় মানুষের বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করলেও এখন আর পারেন না। স্বামী মারা গেছেন প্রায় ২৫ বছর। তিন ছেলের মধ্যে বড় ছেলেটিও কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। মেজ ছেলেও অসুস্থ, পরিবার নিয়ে অন্যত্র থাকেন। মালেকা বানুর সঙ্গে রয়েছে শুধু ছোট ছেলেটি। তবে তাঁকে নিয়েও ‘অশান্তি’তে রয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘পুলাডা আমার নেশা খাইয়া শ্যাষ। কুনো কামকাজ করে না।’ ফলে মালেকা বানুর একার সামান্য আয়েই কোনোরকমে চলে সংসার।
টিসিবির ট্রাক থেকে ভর্তুকি মূল্যে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডাল—এই তিন পণ্য কেনা যায়। একজন ভোক্তা সর্বোচ্চ দুই লিটার ভোজ্যতেল, এক কেজি চিনি ও দুই কেজি মসুর ডাল কিনতে পারেন। এর মধ্যে প্রতি লিটার ভোজ্যতেল ১৩০ টাকা, প্রতি কেজি চিনি ৮০ টাকা ও প্রতি কেজি মসুর ডাল ৭০ টাকায় বিক্রি হয়। সব পণ্য একসঙ্গে কিনলে একজন ক্রেতার খরচ হয় ৪৮০ টাকা। খুচরা বাজার থেকে এসব পণ্য কিনতে ৭০০ থেকে ৭৩০ টাকা লাগে, অর্থাৎ সাশ্রয় হয় ২২০ থেকে ২৫০ টাকা।
মালেকা বানু আগে কখনো টিসিবির ট্রাক থেকে ভোগ্যপণ্য কেনেননি। ট্রাকে কম দামে মালামাল পাবেন জেনে অন্য আরেকজনের সঙ্গে সকাল ১০টার দিকে সায়েদাবাদ এলাকায় যান তিনি। তখনো অবশ্য ট্রাক এসে পৌঁছায়নি।
বেলা ১১টার দিকে যখন ট্রাক এসে পৌঁছায়, ততক্ষণে কম দামে পণ্য কিনতে নারী–পুরুষের ভিড় জমে গেছে। লাইনে দাঁড়ানো নিয়ে শুরু হয়েছে ঠেলাঠেলি, চিৎকার, হাতাহাতি। ঘণ্টাখানেক লাইনে দাঁড়ানোর পর ঠেলাঠেলিতে না পেরে লাইন ছেড়ে বের হয়ে আসেন মালেকা বানু। তখনই কথা হয় তাঁর সঙ্গে।
মালেকা বানু বলেন, ‘আমারে তো ধাক্কায়া–তাক্কায়া ফালাইয়া দিছিল, মইরাই গেছিলাম গা। যাগো লগে আইছি, ওরা তো পারে। আমি তো হাঁটতেও পারি না ঠিক কইরা। হোডেলডাতে একটু পানি চাইলাম। ব্যাডায় খ্যাঁক খ্যাঁক কইরা উঠল।’
ঠেলাঠেলিতে না পেরে লাইন থেকে বের হয়ে এসেছেন যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা তন্নি খাতুনও। কোলে দেড় বছরের সন্তান। পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। বললেন, ‘দেড় ঘণ্টা ধরে দাঁড়াইয়া বাইর হইয়া আসন লাগল।’
তন্নির কথার সঙ্গে সুর মিলিয়ে মালেকা বানু বলেন, ‘সবে এক দলরে টুকেন (টোকেন) দিছে। ওগোর লওয়া শ্যাষ হইলে হেরপর আমাগোরে দিব। দুইটার মতো বাইজা যাইব মনে হয়।’ কণ্ঠে উৎকণ্ঠা নিয়ে যোগ করলেন, ‘পুলাডারে পান বেচতে বসায়ে দিয়া আইছি। কী করত্যাছে কে জানে।’
মালেকা বানুর সঙ্গে কথা বলতে বলতে দেখা গেল ট্রাকের পেছনে নারী ও পুরুষের আলাদা লাইন। নারীদের লাইনে ভিড় বেশি। গুনে দেখা গেল, অন্তত ৫৬ জন রয়েছেন। পুরুষের লাইনে ২৫ জনের মতো। এ ছাড়া ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আরও বেশ কিছু নারী–পুরুষ সেখানে পণ্য কিনতে অপেক্ষায় রয়েছেন। চড়া রোদের কারণে কয়েকজন প্লাস্টিকের ব্যাগ মাথায় দিয়ে রেখেছিলেন। কেউ আবার মাথায় গামছা পেঁচিয়ে রেখেছেন।
এর মধ্যে ট্রাকে থাকা পণ্য মাপার যন্ত্র হঠাৎ অকেজো হয়ে যায়। চড়া রোদের মধ্যে অপেক্ষারত নারী–পুরুষেরা লাইন থেকে সরে যে যাঁর মতো দাঁড়ান। বেশ কিছুক্ষণ পর আবার পণ্য বিক্রি শুরু হলে মুহূর্তেই সবাই আবার হুড়োহুড়ি করে লাইনে আসতে শুরু করেন। আবার শুরু হয় ঠেলাঠেলি ও ধাক্কাধাক্কি। এ ঠেলাঠেলির এক ফাঁকেই ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়েন মালেকা বানু।
টোকেন জমা দিয়ে যখন পণ্য হাতে পান, ঘড়িতে তখন পৌনে দুইটা। জানতে চাইলাম, এই তেল–ডালে কত দিন চলবে? বললেন, ‘খাই তো এতদুটো ডাল আর আলুভর্তা। এক মাসের বেশিই যাইব।’
ডান হাতে তেলের বোতল আর বাঁ হাত দিয়ে বুকের সঙ্গে ডাল–চিনির ব্যাগ চেপে ধরে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করেন মালেকা বানু। যেতে যেতে বলে ওঠেন, ‘বুইড়া মাইনষের কোনো দাম নাই।’