কাচের মতো স্বচ্ছ বলে মাছের নাম কাচ চাঁদা
· Prothom Alo

বর্ষাকালে বিকেলে গ্রামের খাল বা বিলের ধারে দাঁড়ালে দেখবে, পানির ভেতর কখনো কখনো ছোট ছোট রুপালি ঝিলিক দেখা যায়। প্রথমে মনে হবে আলোর খেলা। তারপর হঠাৎ বোঝা যাবে, ওগুলো মাছ। কিন্তু সাধারণ মাছের মতো নয়। এ মাছের শরীর প্রায় কাচের মতো স্বচ্ছ। এত স্বচ্ছ যে ভালো করে তাকালে ভেতরের হাড় পর্যন্ত দেখা যায়। বাংলাদেশের বহু খালে-বিলে বাস করা এই অদ্ভুত মাছের নাম কাচ চাঁদা বা Glass Perchlet। এর বৈজ্ঞানিক নাম Parambassis ranga.
Visit h-doctor.club for more information.
বাংলাদেশের খাল, বিল, হাওর, নদীর অগভীর অংশ কিংবা ধানখেতের জমা পানিতে এ মাছ পাওয়া যায়। গ্রামের অনেক মানুষ মাছটিকে ‘চাঁদা মাছ’ নামে চেনেন। কোথাও আবার ‘কাচ চাঁদা’ বলা হয়। আকারে খুব বড় নয়, সাধারণত কয়েক সেন্টিমিটার। কিন্তু এর স্বচ্ছ শরীরই একে অন্য সব মাছ থেকে আলাদা করেছে।
এ স্বচ্ছতা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়। এর পেছনে আছে টিকে থাকার কৌশল। পানির নিচে শিকারির চোখ ফাঁকি দেওয়া খুব সহজ কাজ নয়। বড় মাছ, পাখি কিংবা অন্যান্য জলজ প্রাণীর আক্রমণ থেকে বাঁচতে ছোট মাছদের নানা অভিযোজন তৈরি হয়েছে। কাচ চাঁদার শরীরের স্বচ্ছতা ঠিক তেমনই এক সুবিধা। দূর থেকে তাকালে একে প্রায় পানির অংশ বলে মনে হয়।
পোকেমন গো গেমের ৩ হাজার কোটি ছবি দিয়ে কী শেখানো হচ্ছে এআই রোবটদেরসমুদ্রের অনেক প্রাণীর শরীর স্বচ্ছ হয়। বিশেষ করে জেলিফিশ বা কিছু চিংড়ির। কিন্তু মিঠাপানির মাছের মধ্যে এ বৈশিষ্ট্য তুলনামূলক বিরল। তাই বিজ্ঞানীদের কাছেও কাচ চাঁদা আগ্রহের বিষয়। আলো এর শরীরের ভেতর দিয়ে চলে যেতে পারে। ফলে পানিতে এর উপস্থিতি কম চোখে পড়ে। এক অর্থে, এটি নিজের শরীরকেই ক্যামোফ্লাজ বানিয়ে ফেলেছে!
তবে এ মাছকে শুধু বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো গল্প বলা হয় না। কারণ, কাচ চাঁদার মধ্যে একধরনের সৌন্দর্য আছে। ঝাঁক বেঁধে চলার সময় এদের শরীরে আলো পড়ে চিকচিক করে। মনে হয় যেন পানির নিচে কেউ ছোট ছোট কাচের টুকরো ছড়িয়ে দিয়েছে।
সমস্যা হলো, মানুষের বিস্ময় আবার মাছটির জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্বজুড়ে অ্যাকুয়ারিয়াম ব্যবসায় কাচ চাঁদা বেশ জনপ্রিয়। আর সেই জনপ্রিয়তার সুযোগ নিয়ে একসময় ভয়ংকর এক প্রবণতা শুরু হয়। কিছু ব্যবসায়ী মাছগুলোর শরীরে ইনজেকশন দিয়ে কৃত্রিম রং প্রবেশ করিয়ে উজ্জ্বল গোলাপি, নীল বা সবুজ রং তৈরি করতে শুরু করেন। বাজারে এদের ‘painted glass fish’ নামে বিক্রি করা হতো।
একেক দেশের মোবাইল নম্বর একেক রকম হয় কেনসমুদ্রের অনেক প্রাণীর শরীর স্বচ্ছ হয়।একটি স্বচ্ছ প্রাণী, যার সৌন্দর্য এর স্বাভাবিকতায়, মানুষ সেটিকেও নিজের পছন্দমতো রাঙাতে চেয়েছে।
এ প্রক্রিয়া মাছটির জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক। অনেক মাছ অল্প সময়েই মারা যায়। যেগুলো বেঁচে থাকে, তাদের শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রাণী অধিকারকর্মীরা বহুদিন ধরেই এ চর্চার বিরোধিতা করে আসছেন। অনেক দেশে এটি নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। তবু বাজারে বিচ্ছিন্নভাবে এখনো এমন মাছ দেখা যায়।
বাংলাদেশে এখনো গ্রামের জলাভূমিতে কাচ চাঁদা টিকে আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আর কত দিন টিকে থাকবে?
দেশের খাল-বিল দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জলাভূমি ভরাট হচ্ছে। কীটনাশক মিশছে পানিতে। ছোট মাছের প্রাকৃতিক আবাস কমে যাচ্ছে। বড় মাছ বা বাণিজ্যিক প্রজাতি নিয়ে যত আলোচনা হয়, এসব ছোট দেশি মাছ নিয়ে তত কথা হয় না। অথচ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ছোট পোকামাকড় খাওয়া থেকে শুরু করে খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ হিসেবে সবকিছুতেই এরা জড়িয়ে আছে।
একসময় গ্রামের খালে-বিলে ছোট মাছ ছিল প্রচুর পরিমাণে। এখন অনেক শিশু হয়তো চাঁদা মাছ চেনেই না। শহরের অ্যাকুয়ারিয়ামে দেখা যায়, কিন্তু বাস্তবের খালে দেখা যায় কম। বিষয়টা অদ্ভুত। প্রকৃতির এক সুন্দর প্রাণী ধীরে ধীরে প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গিয়ে কাচের বাক্সে বন্দী হয়ে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: অ্যাকুয়াফিশ ডটনেট, সার্চ ফিশ বেস‘এলিয়েন’ সিনেমার রহস্যময় পাহাড়ে পর্যটকেরা কেন ভিড় করেন