মায়ার সেই আঙিনায়

· Prothom Alo

প্রতি ঈদের অন্তত মাসখানেক আগে থেকেই বারবার একই প্রশ্ন শুনতে হতো, ‘বাড়ি আইবি কবে? তুই কবে রওনা দিবি? এবার আইলে কয়টা দিন থাকিছ! ছুটি নাই কইয়া তাড়াহুড়া কইরা চইলা যাইছ না।’

Visit mchezo.life for more information.

নানু বলত, আর আমি ফোনের এপাশ থেকে চুপ করে শুনতাম। আমার নিস্তব্ধতা নানুকে আরও ভাবাত বোধ হয়। তাই তো জোরালো গলায় আবারও জানতে চাইত—‘আমি কী কইছি, তুই বুঝছস?’

শান্তস্বরে বলতাম, ‘থাকব নানু।’

জানি, মাকে, বাবাকেও এভাবেই ফোন করত । আর একই ভাবে থাকার জন্যও বলত নানু। তবে শুধু একবার বলেই থেমে যেত না, আমরা রওনা না হওয়া পর্যন্ত বারবার মনে করিয়ে দিত।

নানুর কথা রাখতে আর সবাই মিলে একসঙ্গে ঈদ উদ্‌যাপন করব তাই ঈদের কয়েক দিন আগেই ট্রেনের টিকিট কেটে রাখতাম। তারপর নির্ধারিত দিনে রওনা হব ভেবে সাহ্‌রি খেয়ে আমরা তৈরি হয়ে নিতাম, ভোরের আলো উজ্জ্বল হবার আগেই। রাত্রিশেষের অলস অন্ধকার তখনো জড়িয়ে থাকত চরাচরে। ঘুমঘুম, কাঁপা–কাঁপা চোখে তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে আমরা স্টেশনে পৌঁছাতাম। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে আধো আলো, আধো অন্ধকার। টিমটিমে বাতিগুলো যেন রাতের শেষ প্রহর পাহারা দিচ্ছিল। কোথাও দু-একজন কুলি হাই তুলছিল লাল গামছা কাঁধে ঝুলিয়ে, কেউ–বা বেঞ্চে গুটিসুটি মেরে বসে ছিল। চায়ের দোকানদার চুলায় পানি চাপিয়েছিল তখন—পাতিলের ভেতর ফুটন্ত জলের মৃদু শব্দে কেঁপে উঠত কুয়াশাভেজা বাতাস। দূরে রেললাইনের গায়ে শিশির জমে চিকচিক করত, সবাই যেন সূর্যের আগমনের অপেক্ষায়…।

তখন লাউডস্পিকারে ভাঙা–ভাঙা ঘোষণার শব্দ ভেসে এসে আবার মিলিয়ে যেত। মাঝেমধ্যে কোনো মালগাড়ি ধীরগতিতে পাশ কাটিয়ে গেলে লোহার চাকা আর রেলের ঘর্ষণে দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ হতো। আমরা ব্যাগ আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতাম—চোখদুটো বারবার রেললাইনের দিকে ছুটে যেত।

ধীরে ধীরে ভোরের আলো উজ্জ্বল হয়ে উঠত। আকাশের রং বদলে ধূসর থেকে কমলা হতো। আমরা অপেক্ষায় থাকতাম আমাদের নির্ধারিত ট্রেনের। কখন আসবে? কখন? ট্রেন ছুটবে কু-ঝিকঝিক, ঝিকঝিক সুর তুলে…।

অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ট্রেন এলে আব্বা আমাদের নিয়ে তাড়াহুড়া করে উঠতেন। এক হাতে বড় ব্যাগ, আরেক হাতে ছোট বোনের হাত শক্ত করে ধরে রাখা। ট্রেনে উঠেই আগে আমাদের নির্ধারিত সিট খুঁজে বের করে, ব্যাগগুলো ওপরে গুঁজে রেখে, জানালার কাচ ঠিক আছে কি না দেখে নিয়ে বলতেন—‘জানালার বাইরে মাথা দিবা না, মায়ের কথা শুনবা।’

বাবার কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানাতাম। আমাদের ঠিকঠাক বসিয়ে দিয়ে, যেন আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিশ্চিত হতে চাইতেন —সব ঠিক আছে তো? তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে প্রায় প্রতিবারই একই কথা বলতেন, ‘আচ্ছা, তোমরা তাইলে থাকো। ঠিক আছে?’

কথাটা শেষ হতেই আর দাঁড়াতেন না। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি দরজার দিকে এগিয়ে যেতেন।

ট্রেন তখন ধীরে ধীরে কেঁপে উঠত। যেন দীর্ঘক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকার পর হঠাৎ প্রাণ ফিরে পেয়েছে। লম্বা এক হুইসেল ভোরের আকাশ চিরে বেজে উঠত। প্ল্যাটফর্মের টিমটিমে বাতি, চায়ের দোকানের ধোঁয়া, কুলি আর দু-একজন যাত্রীর ছায়া—সব ধীরে ধীরে পিছিয়ে যেত। আমি আর আমার অন্য ভাই–বোনরা অবাক হয়ে তখন মাকে জিজ্ঞেস করতাম,

‘আম্মা, ট্রেন তো ছাইড়া দিছে! আব্বা উঠবে ক্যামনে? আব্বারে ডাক দেন! তাড়াতাড়ি উঠতে বলেন!’

আমার কথা শেষ না হতেই ছোট্ট বোনটির কাঁপা কাঁপা গলার স্বর কানে বাজত, ‘আব্বা, আপনে যাইবেন না?’

তারপর হঠাৎ ট্রেনের গতি বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে আব্বা দূর থেকে দূরে যেতে থাকেন। এক এক করে সবকিছু যখন দৃষ্টির অগোচরে চলে যেত, দূরে ওই দূরের পথে স্টেশনের সব শব্দ যখন মিলিয়ে যেত, তখনো আমরা বাবাকে খুঁজে ফিরতাম, যত দূর দু-চোখ যেত… আর ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার কয়েক মুহূর্ত পরেই নানু ফোন করত, ‘কী রে..., কোন জায়গায় আছস তোরা? ট্রেনে ঠিকমতো উইঠা বইছস তো?’

জানালার গরাদ ধরে আমরা তখন বাইরে তাকিয়ে দেখতাম—আব্বা ঠিক আমাদের সিটের পাশের জানালার কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন। প্রথমে হাঁটছিলেন, তারপর ট্রেনের গতি বাড়তেই একটু দ্রুত পা বাড়ালেন। তাঁর শ্বাসের ওঠানামা দূর থেকেও টের পাওয়া যেত। জানালার ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে ছোট বোনের মাথায় আলতো করে ছুঁয়ে দিতেন। মনে হতো, সেই স্পর্শে মিশে ছিল কত আশ্বাস, কত না–বলা কথা!

ট্রেনের ছুটে চলার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলতেন, ‘তোমরা এখন যাও। আব্বা দুই-একদিন পরেই আসতেছি।’

আব্বার কথা শুনে ছোট্ট বোনটির চোখগুলো ক্রমশ ঝাপসা হয়ে এসেছিল। তার ভাষাহীন চোখ দুটো যেন তখন বলছিল, ‘আব্বা, ট্রেনে ওঠেন, আমাদের সাথে চলেন। ছাইড়া যায়েন না আমাদের।’

কী মায়া, কী নিষ্পাপ আকুতি তার! ভালোবাসা, মায়া বুঝি এমনই হয়!

তারপর হঠাৎ ট্রেনের গতি বেড়ে যায়। ধীরে ধীরে আব্বা দূর থেকে দূরে যেতে থাকেন। এক এক করে সবকিছু যখন দৃষ্টির অগোচরে চলে যেত, দূরে ওই দূরের পথে স্টেশনের সব শব্দ যখন মিলিয়ে যেত, তখনো আমরা বাবাকে খুঁজে ফিরতাম, যত দূর দু-চোখ যেত…

আর ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার কয়েক মুহূর্ত পরেই নানু ফোন করত, ‘কী রে..., কোন জায়গায় আছস তোরা? ট্রেনে ঠিকমতো উইঠা বইছস তো?’

‘বসছি, বসছি। তুমি চিন্তা কইরো না।’

‘আইচ্ছা, আয় তাইলে।’

নানুর সঙ্গে কথা শেষে আমি হাতে রাখা ব্যাগ থেকে নতুন খবরের কাগজটা বের করে চোখ বুলাতাম, কখনো বা ম্যাগাজিনের দু–একটা পৃষ্ঠা ওলটাতেই আবার মোবাইল ফোন বেজে উঠত, তাকিয়ে দেখতাম—আবারও নানু ফোন করেছে। সেই একই প্রশ্ন—‘কই তুই? আর কতক্ষণ লাগব?’

‘নানু, স্টেশনে নাইমাই তোমারে ফোন দিব। বাড়ি পৌঁছাইতে এখনো অনেক সময় লাগবে।’ ফোন রেখেই মনে মনে খুব বিরক্ত হতাম। এতবার ফোন দেওয়ার কী আছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই এই ভেবে ভালো লাগত যে, অগাধ ভালোবাসা হৃদয়ে জড়িয়ে আমার প্রতীক্ষায় তুমি প্রহর গুনছ! আমাকে একটিবার দেখার আশায়, ঘর থেকে বেরিয়ে কাছারিঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আর যদি কখনো দেরি করে রওনা হতাম, তখন বাড়ি পৌঁছাতে দেরি হলে, দিনের আলো রাতের গভীরে লুকালে, হারিকেন হাতে অন্ধকার রাতে তখনো তুমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে আমার অপেক্ষায়।

আর ঈদ ছাড়াও কিছুদিন না দেখলেই নানু ফোন দিয়ে বলত, ‘সময় করে একবার আয় ভাই। তোরে কত দিন দেখি না! তোর কাছে কইমু কইরা কত কথা জমাইয়া রাখছি মনের মইধ্যে…!’

খানিকক্ষণ থেমে আবার বলত, ‘তুই আইবি, তাই তোর নানারে দিয়া বাজার থেইকা শিমের বিচি আর রুই মাছ আনায়া রাখছি। খেজুরের গুড় আর নারকেল বাড়িতেই আছে। তুই আইলেই পায়েসটা রানমু। আর সকালে ভাপা পিঠাটা কইরা দিমু। চুলার কাছে বইসা আগুনের তাপ নিতে নিতে গরম–গরম ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা খাবি। ও, আরেকটা কথা শোন ভাই, আবারও কইয়া রাখি তোরে, এবার আইলে দুইটা দিন কিন্তু আমার কাছে থাকিছ। কাম আছে কইয়া আইয়াই আবার চইলা যাইছ না।’

এভাবেই নানু আবদার করত। ছুটেও যেতাম সুযোগ পেলেই। শহরের পথ পেরিয়ে রেললাইন ধরে ট্রেন ছুটে চলত দ্রুতগতিতে। জানালার ধাতব গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সকালের ঠান্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগত। এক অদ্ভুত শীতল অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ত তখন শরীরজুড়ে। ট্রেনের চাকার ছন্দময় ঝমঝম ঝমঝম শব্দ যেন ভেতরের ঘুমন্ত ভাবনাগুলোকেও জাগিয়ে দিত। রেললাইনের দু’ধার দিয়ে দ্রুত পেছনে সরে যেত সবুজ ধানখেত, ছোট ছোট স্টেশন, খোলা মাঠ আর মাঝেমধ্যে দেখা মিলত পুকুর আর সরু খালের।

নতুন কাপড়টা হাতে পাওয়ার মুহূর্তে আমাদের সব ভাইবোনদের মুখটা খুশিতে ঝলমল করে উঠত। মনে হতো, সেই মুহূর্তটাই বুঝি ঈদ! পলিথিনের ভাঁজ খুলতেই নতুন কাপড়ের স্নিগ্ধ সুবাসে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত ঈদের আবেশ। আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে যেতাম নকশাগুলো, সেলাইয়ের সূক্ষ্ম কারুকাজ, কাপড় আর বোতামের চকচকে ভাব বারবার দেখেও দেখার ইচ্ছাটা যেন ফুরোত না।

দূরে কোথাও গরু চরাত রাখাল, কোথাও বা গাছতলায় বসে থাকত কয়েকজন মানুষ। এসব দেখতে দেখতে হঠাৎ চোখের সামনে ভিড় করত শৈশবের বহু স্মৃতি…।

বাড়িতে বেড়াতে গেলেই সারা দিন এবাড়ি–ওবাড়ি ঘুরে বেড়ানো, দুপুরের কড়া রোদে পুকুরে সাঁতার কাটা, বর্ষায় বিল থেকে শাপলা তোলা, বিকেলে স্কুলের মাঠে হাডুডু, ফুটবল খেলা। এমন অনেক ব্যস্ততার মাঝেই দিন যে কখন ফুরিয়ে যেত, টেরই পেতাম না।

সারা দিন মাকে তখন কত জ্বালাতন করতাম! মনে পড়ে, খাবারটাও সময়মতো খেতাম না।  মা রেগে গিয়ে বলতে, ‘সারা দিন যাই করিস না করিস, খাবারটা তো ঠিক সময়ে খাবি!’ সেই দিনগুলোর দিকে ফিরে তাকালে আজও চোখ দুটি ঝাপসা হয়ে আসে। আজকাল মাও আর অমন ঝাঁজালো স্বরে কথা বলে না। মায়েদের ওই স্বরটাও একটা সময়ে এসে কেবল অনুরোধের মতো শোনায়! কেন এমন হয়? সবকিছু কেন বদলাতে হয়? জানি না।

ট্রেন থেকে স্টেশনে যখন নামতাম, তখন দুপুরের রোদ মাথার ওপরে। সোনালি ধানের গায়ে রোদের আলো চিকচিক করত। বাড়িতে পৌঁছে দেখতাম, নানু দাঁড়িয়ে আছেন কাছারিঘরের কাছে। নানুর মুখে সেই চেনা হাসির রেখা। বয়সের ভারে আমার নানুর কপালে যে ভাঁজ পড়েছিল, তাতেও যেন খুশি লুটিয়ে পড়ত। শত ব্যস্ততার সব ক্লান্তি তাঁর মুখের দিকে তাকাতেই কোথায় যেন হারিয়ে যেত!

তারপর বাড়ির সামনে থেকে সবাইকে নিয়ে ঘরে ঢুকে একসঙ্গে বসে গল্প করতে করতে হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে আফসোসের স্বরে নানু বলত, ‘কিরে তুই খানাদানা খাস না? এরম শুকাই গেছস ক্যান মনু?’ কথা শেষ করে আমার মাথায়, পিঠে হাত বুলিয়ে দিত। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলত, ‘দেখছস, ও কী রকম শুকাই গেছে।’ পাছে অন্য ভাই–বোনেরা যদি রাগ করে তাই ওদেরকে দেখিয়েও বলত, ‘হেডিও খায় না মনে অয়। ওই, তোগো কি খাইতে মনে চায় না?’

আমরা নিচু স্বরে বলতাম, ‘খাই তো নানু…।’ এভাবেই অনেক কথা আর অনেক গল্পে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলে নানু ঝট করে হাসিমুখে বলত, ‘বয় তোরা, আমি তোগো লাইগা তোর নানা কী কী আনছে বাইর কইরা তোগোরে দেখাই।’

তারপর স্টিলের আলমারি খুলে ঈদের নতুন কাপড় বের করে এক এক করে সবার হাতে দিত নানু।

নতুন কাপড়টা হাতে পাওয়ার মুহূর্তে আমাদের সব ভাইবোনদের মুখটা খুশিতে ঝলমল করে উঠত। মনে হতো, সেই মুহূর্তটাই বুঝি ঈদ! পলিথিনের ভাঁজ খুলতেই নতুন কাপড়ের স্নিগ্ধ সুবাসে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত ঈদের আবেশ। আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে যেতাম নকশাগুলো, সেলাইয়ের সূক্ষ্ম কারুকাজ, কাপড় আর বোতামের চকচকে ভাব বারবার দেখেও দেখার ইচ্ছাটা যেন ফুরোত না।

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গায়ে ধরে মিলিয়ে দেখতাম—কেমন লাগছে? হাতা ঠিক আছে তো? লম্বা বেশি হয়নি তো? তারপর আবার যত্ন করে ভাঁজ করে রেখে দিতাম ব্যাগের ভেতর—গ্রামের বাড়ির অন্য আত্মীয়স্বজনেরা কেউ যেন আগে থেকে দেখে না ফেলে সেই ভয়ে! দেখলেই তো ঈদ ফুরিয়ে যাবে! এ রকমই ভাবতাম তখন! বিশ্বাস করতাম—ঈদ মানে শুধু একটি দিন বা সকাল নয়, বরং অদেখা আর অপেক্ষার ভেতর লুকিয়ে থাকা এক মায়াময় রহস্য; যার পর্দা সময়ের আগে সরানো চলবে না।

ঈদের দিন যখন ঘুম ভাঙত, বাইরে তখন আধো আলো, আধো অন্ধকার। রসুইঘর থেকে টুংটাং শব্দ ভেসে আসত। কখনো আবার ঝনঝন শব্দে মেতে উঠত খুন্তি, কড়াইগুলো। মাটির চুলায় টগবগ করে ফুটত পায়েসের চাল। কেউ নারকেল কুরিয়ে নিতে ব্যস্ত। কেউবা সেমাই রান্নায়। ঘর, উঠান আর রসুইঘরের আশপাশ মুখরিত থাকত বাড়ির মানুষের পদচারণে।

মনে পড়ে, সোনালুগাছটাকে! হলুদ ফুলে ভরা ঝুলন্ত সেই থোকাগুলো, যারা আমার শৈশবের সাথি হয়ে পাশে ছিল, নিশিদিন! কত দিন দেখি না তাদেরও! আরও মনে পড়ে, বাড়ির পাশের কৃষ্ণচূড়াটাকে। আমার বড্ড জানতে ইচ্ছা করে, সে কি আজও আগুনরঙা পাপড়ি মেলে উজ্জ্বলতা ছড়ায়? নাকি সেও রং হারিয়েছে সময়ের কাছে?

মসজিদ থেকে মুয়াজ্জিন নামাজের সময়সূচি জানাতেন। এক এক করে ছেলে, বুড়ো সবাই নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে ঈদের নামাজ পড়তে যেত। তাদের যাবার পথে বাতাসে ভেসে থাকত আতরের মিষ্টি সুবাস। নামাজ শেষে কোলাকুলি আর চেনা মুখগুলোর সঙ্গে গল্প করতে করতে বাড়ি ফেরার পথে বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে ঈদের সালামি দিতেন। তখন কী যে আনন্দ হতো! মন যেন প্রজাপতি হয়ে পাখা মেলে উড়ে বেড়াতে চাইত। সেই ভালোবাসার অনুভূতিগুলো তখন খেলে যেত ছোট্ট জীবনের অবুঝ হৃদয়জুড়ে!

মনে পড়ে ঈদের ছুটি কাটিয়ে বাড়ি থেকে শহরে ফেরার পথে নানুও আমার পিছু পিছু আসত। যত দূর আসা যায়! বাতের ব্যথায় হাঁটতে কষ্ট হতো খুব। তবু ব্যথা নিয়েই একটু একটু করে এগোত। মুখে তখন বিষণ্নতার ছাপ। চোখ দুটো জলে ছলছল। বাড়ির সামনের পুকুর, কবরস্থান, কৃষ্ণচূড়া আর সোনালুগাছ তারপর মাটির সরু আঁকাবাঁকা পথটা পেরোতে গিয়ে যতটা এগিয়ে যেতাম, নানুও ততটা এগোতে থাকত। ধীরে, ধীরে। মাঝে মাঝে মাথা থেকে আঁচলটা যেন খসে না পড়ে তাই সচেতনভাবেই ঘোমটাটা টেনে নিত বারবার। আমি একটু এগিয়ে যেতাম আবার পেছন ফিরে তাকাতাম। যদি তারে আরেকটু দেখতে পেতাম সেই আশায়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাদ্রাসার কাছে এলেই বাড়ির পথটা অদৃশ্য হয়ে যেত। নানু তখন থমকে দাঁড়াত রাস্তার পাশের তালগাছটার আড়ালে। আমাদের দেখা আর অদেখার, লুকোচুরি–লুকোচুরি খেলার পথটা ওখানেই ফুরিয়ে যেত। নানু তখন গোপনে দু’চোখের জল মুছত শাড়ির আঁচলে।

আজ আর সেই মুখ খুঁজে পাই না। কেউ কাছারিঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে না। নানুর নম্বর থেকেও কোনো কল আসে না, বহুদিন হয়। মাঝে মাঝে নানুর অব্যবহৃত ফোনটার দিকে কিছুটা সময় তাকিয়ে থেকে ভাবি, কত কিছুই তো না চাইতেই বদলে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেসব মেনে নিতেও শিখে যাই। তবু কখনো কখনো বুকের ভেতর এক অদ্ভুত ইচ্ছে জাগে! বড় সাধ হয়– সকল নিয়ম ভেঙে যদি হঠাৎ নানুর ফোন থেকে একটা কল আসত! আর নানু যদি আবার আগের মতো করে বলত, ‘একবার আইসা ঘুইরা যা ভাই। কত দিন আসিস না! তোরে কত দিন দেখি না…’

কল আর আসে না। তাই তো আজও সেই স্মৃতির পথে হেঁটে বেড়াই, খুঁজে ফিরি হারিয়ে যাওয়া সেই সময়কে। কখনো ছুটির দিনের সকালে জানালার ধারে বসে, কখনোবা দিনের শেষ লগ্নে, নয়তো উদাস দুপুরের একাকী অবসরে। কিন্তু খুঁজে পাই না। সেই পরিচিত কণ্ঠস্বর, মায়ায় জড়ানো আঁচল, চিরচেনা পদধ্বনি—সবই যেন আজ কেবলই রূপকথার মতো মনে হয়। অথচ হৃদয়ের গোপন কোণে তারা এখনো অনুরণন তোলে, যেন চুপিচুপি বলে যায়, ফিরে চল, মায়ার সেই আঙিনায়।

মনে পড়ে, সোনালুগাছটাকে! হলুদ ফুলে ভরা ঝুলন্ত সেই থোকাগুলো, যারা আমার শৈশবের সাথি হয়ে পাশে ছিল, নিশিদিন! কত দিন দেখি না তাদেরও! আরও মনে পড়ে, বাড়ির পাশের কৃষ্ণচূড়াটাকে। আমার বড্ড জানতে ইচ্ছা করে, সে কি আজও আগুনরঙা পাপড়ি মেলে উজ্জ্বলতা ছড়ায়? নাকি সেও রং হারিয়েছে সময়ের কাছে?

তারপর ভাবি—গাছগুলো হয়তো এখনো ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। কেবল আমিই আর গিয়ে দাঁড়াই না তাদের পাশে…

যেমন করে ঈদ এখনো আসে। ট্রেন এখনো ছুটে চলে। স্টেশনে এখনো ভোর হয়।

শুধু এখন আর কেউ ঈদের আগে বারবার সেই একই প্রশ্ন করে না, কবে বাড়ি আসবি? তুই কবে রওনা হবি…?

Read full story at source