দেশের চা–শিল্পের নতুন রূপান্তর

· Prothom Alo

চা শুধু একটি পানীয় নয়, এটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও আড্ডার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্ব চা দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের চা–শিল্পের সামগ্রিক চিত্রটি যদি আমরা বিশ্লেষণ করি, তবে দেখা যাবে এই খাত আজ এক বিশাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে বিপুল চাহিদা ও রেকর্ড উৎপাদন, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে এক মিশ্র সময় পার করছে দেশের চা–শিল্প।

এই তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বাজারে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই)-এর ‘ফ্রেশ প্রিমিয়াম টি’ আজ একটি শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। এই সফলতার পেছনে প্রথম থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে আমাদের সুবিস্তৃত ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক, ধারাবাহিক ও অ্যাগ্রেসিভ মার্কেটিং কার্যক্রম, কার্যকর ক্যাম্পেইন এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্য। দেশব্যাপী পণ্যের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা দ্রুত গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে পেরেছি। তবে বিপণন কৌশলের পাশাপাশি এমজিআই-এর দক্ষ পরিচালনা পর্ষদের সুপরিকল্পিত দিকনির্দেশনা এবং চায়ের স্বাদ ও মানের প্রতি আমাদের আপসহীন অঙ্গীকারই ফ্রেশ প্রিমিয়াম টি-কে আজকের এ অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

Visit newsbetsport.bond for more information.

অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি চা–শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। অনিয়মিত বৃষ্টি ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার মধ্যেও উৎপাদন ঠিক রাখতে এমজিআই কিছু টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

বর্তমান বাজারে শতভাগ গুণগত মান, অনন্য স্বাদ ও সুগন্ধ নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা কোনো সনাতন পদ্ধতিতে আটকে থাকিনি; বরং যুক্ত করেছি অত্যাধুনিক প্রযুক্তি।

অটোমেটেড ব্লেন্ডিং সিস্টেম: চায়ের প্রতিটি প্যাকেজে যেন একই রকম স্বাদ বজায় থাকে, সে জন্য আমরা স্বয়ংক্রিয় ব্লেন্ডিং প্রযুক্তি ব্যবহার করি। আমাদের রয়েছে নিজস্ব বিশেষজ্ঞ টিম, যারা চায়ের সূক্ষ্মতম স্বাদ ও সুগন্ধ পরীক্ষা করে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যকর পরিবেশে চা প্যাকেটজাত করা হয়। বিশেষ ধরনের প্যাকেজিং মেশিনের সাহায্যে চায়ের সতেজতা ও সুগন্ধ দীর্ঘদিন অক্ষুণ্ন রাখা হয়।

বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও অঞ্চল, শহর, গ্রাম, মানুষের আয় ও বয়সভেদে চায়ের চাহিদায় বিপুল ভিন্নতা রয়েছে। ভোক্তাদের এই বৈচিত্র্যময় রুচিকে ফ্রেশ প্রিমিয়াম টি সব সময় অগ্রাধিকার দেয়। যেমন দেশের উত্তর ও দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের জন্য আমরা বাজারজাত করছি মিহি দানার (কড়া লিকারের) চা। আবার হোটেল-রেস্টুরেন্টের জন্য রয়েছে বিশেষায়িত ব্লেন্ড। শহুরে ব্যস্ত জীবনের জন্য টি-ব্যাগ, স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তিদের জন্য গ্রিন টি, মসলা টি কিংবা পারিবারিক আড্ডার জন্য সুগন্ধি চা—সব ধরনের চাহিদাই আমরা পূরণ করছি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে চায়ের রেকর্ড উৎপাদন হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের রপ্তানি আশানুরূপ বাড়ছে না। এর কারণ হচ্ছে, দেশে উৎপাদিত চায়ের একটি বড় অংশের গুণগত মান বিশ্ববাজারের চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তরুণ প্রজন্ম এখন শুধু ‘এক কাপ চা’ খুঁজছে না—তারা খুঁজছে নতুন অভিজ্ঞতা, ফ্লেভারের বৈচিত্র্য এবং তাদের লাইফস্টাইলের সঙ্গে মানানসই একটি ব্র্যান্ড। এই তরুণদের চায়ের টেবিলে ধরে রাখতে আমরা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাচ্ছি। এর অংশ হিসেবে বাজারে আসছে নতুন প্রজন্মবান্ধব ফ্লেভারড চা, রেডি-টু-ড্রিংক, অন-দ্য-গো চা এবং স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তিদের জন্য কম চিনির বিকল্প। ঐতিহ্যবাহী চায়ের স্বাদকে ধরে রেখে আধুনিক ক্যাফে কালচারের প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে কাঁচামাল, জ্বালানি ও লজিস্টিকস ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই প্রতিকূলতার মধ্যেও সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে মানসম্মত চা পৌঁছে দিতে আমরা ‘সাপ্লাই চেইন অপটিমাইজেশন’ এবং লোকাল সোর্সিং বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছি। প্যাকেজিং ও পরিবহনব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়িয়ে এবং ভলিউম–ভিত্তিক উৎপাদন সম্প্রসারণ করে আমরা খরচের ভারসাম্য বজায় রাখছি। আমাদের মূল নীতিই হলো—‘মানের সঙ্গে আপস নয়’।

অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি চা–শিল্পের জন্য সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন। অনিয়মিত বৃষ্টি ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার মধ্যেও উৎপাদন ঠিক রাখতে এমজিআই কিছু টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে চায়ের রেকর্ড উৎপাদন হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের রপ্তানি আশানুরূপ বাড়ছে না। এর কারণ হচ্ছে, দেশে উৎপাদিত চায়ের একটি বড় অংশের গুণগত মান বিশ্ববাজারের চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাম্প্রতিক রেকর্ড উৎপাদনে মুখ্য ভূমিকা রেখেছে দেশের উত্তরাঞ্চলের মধ্যম মানের চা; অথচ উচ্চ গুণগত মানের চায়ের উৎপাদন তুলনামূলক কমেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের বৃহৎ রপ্তানিকারকদের তুলনায় আমাদের উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ অনেক বেশি। এ ছাড়া দেশের ভেতরেই ভালো মানের চায়ের একটি বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার ও চাহিদা রয়েছে। ফলে এই চড়া মূল্যে চা কিনে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা লাভজনক হয় না।

এমজিআই বিশ্বের যেসব দেশে অন্যান্য ভোগ্যপণ্য রপ্তানি করছে, সেসব দেশে আমাদের প্রিমিয়াম প্যাকেট চা–ও সরবরাহ করা হচ্ছে, যাতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চায়ের একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরি হয়।

চা–শিল্প এখনো দীর্ঘদিনের সাধারণ পণ্য হিসেবে বিক্রির মানসিকতা থেকে পুরোপুরি ‘ব্র্যান্ড ও এক্সপেরিয়েন্স ইকোনোমি’-তে রূপান্তর হতে পারেনি। উচ্চমূল্যের বা লাক্সারি চা ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠায় আমাদের গবেষণা, প্রোডাক্ট ইনোভেশন ও ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতার অভাব রয়েছে। এই রূপান্তরটাই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ।

শ্রীলঙ্কা, ভারত, চীন কিংবা কেনিয়ার মতো দেশগুলো তাদের চা–বাগান ও ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে লাভজনক ‘টি ট্যুরিজম’ বা চা-পর্যটন গড়ে তুলেছে। আমাদের সিলেট, শ্রীমঙ্গল ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের চা–বাগানগুলোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হওয়ার জন্য উপযুক্ত হলেও আমরা এখনো পিছিয়ে আছি। এর মূল কারণ পরিকল্পিত অবকাঠামোর অভাব, আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডিংয়ের ঘাটতি এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের অভাব।

আগামী দিনে এই খাতে ভালো করতে হলে চা–বাগানভিত্তিক ইকো লজ, রিসোর্ট ও ক্যাফে গড়ে তুলতে হবে। পর্যটকদের জন্য ‘লাইভ টি প্রসেসিং’ ও ‘টি টেস্টিং’-এর মতো অভিজ্ঞতাভিত্তিক কার্যক্রম চালু করতে হবে। ডিজিটাল মার্কেটিং জোরদার করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে এই প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করতে পারলে এটি দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

এই প্রাচীন ও সমৃদ্ধ শিল্পের টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণায় রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ, স্বল্প সুদে অর্থায়ন, জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনা এবং কঠোর বাজার তদারকি। সঠিক পরিকল্পনা এবং সরকার, শিল্প–উদ্যোক্তা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে বাংলাদেশের চা–শিল্প দেশের চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক বাজারে তার গৌরবময় অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।

শরীফুল আলম: কৃষিবিদ ও মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন), মেঘনা টি কোম্পানি লিমিটেড (এমজিআই)।

Read full story at source