গাছে লিচু, নিচে বেচাকেনা দফায় দফায়

· Prothom Alo

দেশের সবচেয়ে বেশি লিচু উৎপাদন হয় দিনাজপুরে। চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবছর সেখানে লিচুর বাণিজ্যিক চাষাবাদ বাড়ছে। আবার সুস্বাদু এই ফলের দামও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হলো বাগান থেকে বাজার পর্যন্ত আসতে কয়েক দফা হাতবদল হয়। এমনকি লিচু গাছে থাকতেই একাধিকবার বিক্রি হয়ে যায়। প্রতিটি ধাপে মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য। এই ফড়িয়াদের কারণে ক্রেতার পকেট কাটে।

দেশের সবচেয়ে বেশি লিচুর ফলন হয় দিনাজপুর জেলায়। সম্প্রতি সেখানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় কীভাবে বাগানে লিচু হাতবদল হয়ে যায়। এ জন্য গড়ে উঠেছে মধ্যস্থতাকারী কমিশন এজেন্ট গোষ্ঠী। ফলে বাগান থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে কমপক্ষে ৮–১০ বার বিক্রি হয়ে যায়। প্রতি ধাপে দাম বাড়ে। এতে ভোক্তার কাছে যখন পৌঁছায়, তখন লিচুর দাম সীমিত ও মধ্যবিত্তের নাগালের অনেকটাই বাইরে চলে যায়।

Visit afnews.co.za for more information.

দিনাজপুরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লিচু হয় বিরল উপজেলায়। সরেজমিনে পাঁচটি বাগান ঘুরে কাঁচা লিচুর হাতবদলের এমন চিত্র জানা গেছে।

বিরলের মাধববাটী রকি মৌলভীর বাগানে ৪৫টির বেশি গাছ আছে। বাগানে ফুল আসার পর ৩ লাখ ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন তিনি। এর সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে এটা দ্বিতীয় দফায় ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।

এই লিচু রাজধানীর বাজারে আসতে আরও দুই সপ্তাহ লাগবে। এখন তৃতীয় দফা বাগানটি বিক্রির জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু শিলাবৃষ্টির কারণে এবার ফলন কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নয়তো এটা আবার বিক্রি হয়ে যেত, বলছেন স্থানীয় ফড়িয়া মো. বিপুল। এভাবে প্রায় ৮০ শতাংশ বাগানে কয়েক দফা হাতবদল শেষ বলে জানান তিনি।

মো. বিপুল ভৈরবের এক ব্যবসায়ীর স্থানীয় এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের নিজস্ব বাগানও রয়েছে।

এখানকার বেদানা ও বোম্বাই লিচুর আলাদা চাহিদা রয়েছে সারা দেশজুড়ে। প্রতি মৌসুমে আগাম জাত হিসেবে মাদ্রাজ জাতের লিচু সবার আগে বাজারে আসে। এসব লিচু সংগ্রহ করতে সারা দেশের পাইকারেরা এখানে ভিড় জমান। তাঁদের গাছ বা বাগান কেনায় সহায়তা করার জন্য একধরনের এজেন্ট শ্রেণিও তৈরি হয়েছে।

তাঁদের মতো একজন হলেন বিরলের নাজমুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা পাইকারদের বাগান কিনে দিই। বিনিময়ে কিছু টাকা নিই। বাগানের মালিকেরাও আমাদের বাগান বিক্রি করে দিতে বলেন। তাঁদেরও উপকার হয়।’

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার একটি বাগানে থোকায় থোকায় লিচু ঝুলছে

বাগানে দাম বাড়ে যেভাবে

বিরলের সবচেয়ে বড় বাগানগুলোর একটির মালিক শিশির শাহ। তাঁর ৩০ একর জমির বিশাল বাগান রয়েছে। যেখানে সব জাতের লিচু হয়।

কমিশন–বাণিজ্যের বিষয়টি ব্যাখ্যা করে শিশির শাহ বলেন, অনেক সময় বিক্রয়মূল্যের ওপর ১ শতাংশ হারে কমিশন দিতে হয় এজেন্টেদের। আর বাগান লিজ দেওয়া থেকে শুরু করে তিন থেকে পাঁচবারও হাতবদল হয়। তবে এই হাতবদলের কারণে দামে খুব প্রভাব পড়ে না বলে জানান তিনি।

এর কারণ হিসেবে শিশির শাহর মত হলো, ১ লাখ টাকার বাগান তাঁরা মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা বেশি দাম পেলে বিক্রি করে দেন। তাই এটার প্রভাব সামান্য। তাঁর মতে, আড়তদারেরা দাম বাড়ানোর মূল কারিগর।

উদাহরণ দিয়ে এ তরুণ উদ্যোক্তা জানান, আড়তদারেরা লিচুর মৌসুমে বাগানের পাশে অবস্থান করেন। তবে অন্য সময় এজেন্টদের মাধ্যমে লিচুর ফলন কখন উঠবে, এর খবর রাখতে থাকেন তাঁরা। লিচু বেশি পাকলে দাম কম হাঁকেন তাঁরা। আবার চাহিদা বেশ থাকলে দাম বাড়ে।

রাজধানী ঢাকায় ৫০ বা ১০০ পিস হিসাবে লিচু বিক্রি হয়। কিন্তু বাগানে বিক্রি হয় হাজার হিসাবে। স্থানীয় লিচু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাগানে এক হাজার বোম্বাই লিচুর দাম তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। অর্থাৎ, প্রতিটি লিচুর দাম পড়ে সাড়ে তিন টাকা। সে হিসাবে ১০০টি লিচুর দাম ৩৫০ টাকা।

কয়েক দফা হাতবদল হয়ে ঢাকায় এসব লিচু বিক্রি হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। তবে বাগানিরা প্রতি হাজারে ১১ শ লিচু দেওয়ায় সেখান থেকেই পাইকারদের পরিবহন খরচ উঠে যায় বলে জানা গেছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. বিপুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাইকারেরা ১ লাখ লিচু কিনলে সেখানে ১০ হাজার লিচু অতিরিক্ত পায়, যার দাম প্রায় ৩০ হাজার টাকা। আর গাড়িভাড়া পড়ে ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা।’

অর্থাৎ, অতিরিক্ত লিচু থেকেই ট্রাকভাড়ার খরচ ওঠে যায়। আর বাগানে মাদ্রাজ জাতের লিচুর দাম প্রতি হাজার ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকা। পরিবহনের সময় লিচু পচে যাওয়ার হার অন্য ফলের তুলনায় কম।

সবচেয়ে দামি লিচু চায়না ৩। এগুলোর দাম প্রতি পিস ১০ টাকার বেশি। মূলত বড় আকৃতির কারণেই এ জাতের লিচুর দাম বেশি। আর গাছে প্রথমবার ফলন আসতে অপেক্ষা করত হয় ১০ বছর।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার একটি বাগানে থোকায় থোকায় লিচু ঝুলছে

ঢাকার কয়েক দফা হাতবদল

ঢাকায় আসার পর আরও কয়েক দফা হাতবদল হয় লিচুর। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ট্রাক থেকে পণ্য নামার পর তা আড়তদার, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতার হাত ঘুরে ক্রেতার কাছে যায়।

এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএসের সাবেক গবেষণা পরিচালক এম আসাদুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, প্রতিবার হাতবদলেই দাম বাড়ে। অনিশ্চয়তা থেকেই এমনটা হয়। বিদেশে চাষিদের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতির আশঙ্কা থেকে শস্যবিমা করা হয়। কিন্তু দেশে এমন শস্যবিমার মতো কোনো পদ্ধতি না থাকায় হাতবদল ঠেকানোর সুযোগ কম বলে মন্তব্য করেন এ বিশেষজ্ঞ।

উৎপাদনে শীর্ষ দিনাজপুর

একক জেলা হিসেবে লিচু উৎপাদনের শীর্ষে দিনাজপুর। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ জেলায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট উৎপাদন ছিল ৩৯ হাজার ৫৯৩ টন।

দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা পাবনায় উৎপাদন ছিল ৩৫ হাজার টন। তৃতীয় স্থানে আছে রাঙামাটি। এ জেলায় বছরে ১৭ হাজার টন লিচু উৎপাদিত হয়। এ ছাড়া গাজীপুর ও খাগড়াছড়িতে ১১ হাজার টন উৎপাদিত হয়। এ বছর সারা দেশে লিচুর উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৩২ হাজার ৭২৯ টন।

Read full story at source