দলগুলোর জেদাজেদি দিয়ে গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব নয়

· Prothom Alo

কাজী মারুফুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক। শাসনব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও জননীতি তাঁর গবেষণার বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের এই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের একজন সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশন, সংস্কার, স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ইত্যাদি বিষয়ে।

Visit playerbros.org for more information.

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মনজুরুল ইসলাম

স্বৈরাচারের পতন ও গণ–অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক চর্চা, জবাবদিহি ও বিতর্কের সংস্কৃতি কতটা প্রতিফলিত হয়েছে বলে মনে করেন?

কাজী মারুফুল ইসলাম: ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে আমি মূলত টোটালিটারিয়ান বা সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণবাদী শাসনব্যবস্থা থেকে উত্তরণের পর একটি আইনি ও রাজনৈতিক সেতুবন্ধ হিসেবে দেখছি। রাজনৈতিকভাবে এর গুরুত্ব হলো, এই সংসদ ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে আইনি বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক জায়গা থেকে আমরা অনেক দিন পর একদলীয় আধিপত্যের বাইরে গিয়ে একটি বহুত্ববাদী পরিবেশ দেখতে পাচ্ছি।

কিন্তু সংসদের ভেতরে এখনো একটি জবাবদিহিমূলক সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠেনি। যেহেতু সংসদ সদস্যদের মধ্যে একটা বড় অংশ প্রথমবার সদস্য হয়েছেন, ফলে তাঁদের আচরণের মধ্যে এখনো সংসদীয় আচরণের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কার্যপ্রণালি বিধির পক্ষপাতহীন কঠোর প্রয়োগ এবং সংসদীয় কমিটিগুলোতে বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে এটি কেবল আনুষ্ঠানিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হবে।

এখানে মনে রাখা জরুরি যে গণতন্ত্রের শক্তি শুধু সংসদে বিরোধী দলের কতজন সদস্য বা কতগুলো দল প্রতিনিধিত্ব করছে সেই সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে বিতর্কের গুণগত মান এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সরকারি দলকে প্রশ্ন করা এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার সংস্কৃতির ওপর।

সংসদে সংস্কার ও জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি দল ও বিরোধী জোটের অবস্থান পরস্পরের বিপরীত দিকে। তাহলে সংস্কার নিয়ে ঐকমত্য কীভাবে হবে?

কাজী মারুফুল ইসলাম: বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব ইশতেহার থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ বা প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে দলগুলোর মধ্যে কাঠামোগত দ্বিমত বা ফল্ট লাইনস আমরা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ২০২৬ সালের গণভোটে এ দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষ জুলাই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছেন। তাই আমার স্পষ্ট বক্তব্য হলো, জুলাই সনদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ইশতেহার নয়, এটি চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের রক্তে লেখা একটি জাতীয় চুক্তি। এটা উপেক্ষা করার অধিকার কোনো একটি দলের নেই।

এখন ঐকমত্যের জন্য সংসদকে একটি কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি বা সংবিধান সভার মতো কাজ করতে হবে। যেহেতু বর্তমান সংবিধান সংবিধানের মৌলকাঠামো বিষয়ে সংশোধনের সুযোগ দেয় না, তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে এই সংসদের ভেতর থেকেই আলোচনার মাধ্যমে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব অনুসারে একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটি মৌলিক বিষয়গুলোতে দলগুলোর ন্যূনতম সাধারণ ভিত্তি এবং সমাধানের সূত্র খুঁজে বের করবে। বিশেষ কমিটি গঠনে সরকারি দল ইতিবাচক। বিরোধী দলকেও এ ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোর জেদাজেদি দিয়ে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব হবে না।

সংসদের প্রথম অধিবেশনকে আপনি সামগ্রিকভাবে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? এই অধিবেশনের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব কোথায় দেখছেন?

কাজী মারুফুল ইসলাম: আমি যেভাবে দেখি, প্রথম অধিবেশনটি ছিল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে প্রথম কিন্তু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। এই অধিবেশনের মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে আইনি বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি বড় পরীক্ষা ছিল যে তারা রাজপথের আন্দোলনকে সংসদীয় ভাষায় রূপান্তর করতে পারে কি না।

ডেপুটি স্পিকার ও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির প্রধান পদগুলো বিরোধী দলকে দেওয়ার যে সদিচ্ছা বা আলোচনা, তা প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে এর গুরুত্ব তখনই বজায় থাকবে, যখন এই কমিটিগুলো শুধু ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হিসেবে কাজ না করে আমলাতন্ত্রের ওপর প্রকৃত নজরদারি চালাতে পারবে।

নতুন সরকারের প্রথম তিন মাসের কর্মকাণ্ডকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? এই সময়ে সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য কী বলে মনে করেন? আবার কোন ক্ষেত্রগুলোতে সরকারের দুর্বলতা বা সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে?

কাজী মারুফুল ইসলাম: সবচেয়ে বড় সাফল্য নিঃসন্দেহে একটি চরম ভঙ্গুর সময় পার করে প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক চর্চার পথে শান্তিপূর্ণ যাত্রা নিশ্চিত করা। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশের নতুন যাত্রার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করাও বড় অর্জন।

এই সরকারের সাফল্যের একটা অন্যতম বিষয় হলো নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। আমরা দেখছি যে সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বা খাল খনন কর্মসূচির বাস্তবায়নে আন্তরিক উদ্যোগ নিয়েছে। আমি এই কর্মসূচিগুলোর সাফল্য বা প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলতে চাই না। তা বলার সময় এখনো হয়নি। কিন্তু যেটা বলতে চাই তা হলো, জনগণের মধ্যে প্রত্যাশা আছে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে। এ ক্ষেত্রে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। এটা ইতিবাচক বলে মনে করি। তবে এটা সত্যি যে সরকার রাজনৈতিক উত্তরণে সফল হলেও কাঠামোগত সংস্কার, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনায় ধীরগতির পরিচয় দিয়েছে।

এই সরকারের প্রধান দুর্বলতা হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে এখনো কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। সম্প্রতি ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনা ঘটেছে, মব–সহিংসতা এখনো চলমান রয়েছে। বাজার ব্যবস্থাপনায় আমলাতান্ত্রিক অদক্ষতা ও বাজারে প্রচলিত সিন্ডিকেটের আধিপত্য কমানোর ক্ষেত্রেও কোনো উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি না।

সম্প্রতি জ্বালানি তেল নিয়ে যে তেলেসমাতি কাণ্ড হলো, সেটাও সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অনুপস্থিতিই প্রমাণ করে। অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনকালে ক্ষমতার শূন্যতার সুযোগে স্থানীয় পর্যায়ে যে চাঁদাবাজি ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল, তা দমনে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ও মাঠপর্যায়ের প্রয়োগের মধ্যে বড় ধরনের ফাঁক আছে বলে মনে হচ্ছে।

⁠প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর বিষয়ে সরকার কতটা আন্তরিক বলে মনে হয়?

কাজী মারুফুল ইসলাম: প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ব্যক্তিদের আচরণ ও বক্তব্য দেখে আপাতত মনে হচ্ছে, তাঁদের সদিচ্ছা বা আন্তরিকতা আছে। কিন্তু শুধু আন্তরিকতা দিয়ে তো রাষ্ট্র চলে না, কাঠামো লাগে। মাঠপর্যায়ে বদলি বা পদোন্নতির ক্ষেত্রে এখনো রাজনৈতিক আনুগত্য দেখার পুরোনো প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যতক্ষণ না পুলিশ ও সিভিল সার্ভিস–সংক্রান্ত আইনের আমূল সংস্কার করে একটি স্বাধীন, মেধাভিত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক বোর্ড গঠন করা হচ্ছে, ততক্ষণ শুধু আন্তরিকতা বা ভালো ইচ্ছা দিয়ে দলীয় প্রভাব কমানো সম্ভব নয়।

সরকারের প্রথম তিন মাসে জনমনে আস্থা তৈরির ক্ষেত্রে কী ধরনের ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে আপনি মনে করেন?

কাজী মারুফুল ইসলাম: অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বল শাসনামলের পর যখন একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়েছিল, তখন মানুষের মধ্যে একটা প্রাথমিক স্বস্তি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই স্বস্তি আস্থায় রূপান্তরিত হওয়ার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা এখন আবার ক্ষয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা যাচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার এবং ভয়ের সংস্কৃতির অবসান মানুষকে আশাবাদী করেছে ঠিকই; কিন্তু সাধারণ মানুষ সামষ্টিক নীতি বোঝে না, তারা বোঝে নিত্যপণ্যের দাম এবং ঘরে–বাইরের নিরাপত্তা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মানুষের আস্থায় কিছুটা নেতিবাচক ধাক্কা দিয়েছে, এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

দেশে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে এবং এর বিপরীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একধরনের মব জাস্টিস বা আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আইনের শাসনকে পাশ কাটিয়ে এই যে মব সেন্টিমেন্ট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণা ছড়ানো, এটাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

কাজী মারুফুল ইসলাম: এটি আমাদের সামাজিক ও আইনি কাঠামোর গভীরতম সংকটের এক ভয়ংকর বহিঃপ্রকাশ। মানুষের এই তীব্র ক্ষোভের কারণটা আমরা বুঝি। এটা হলো বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা এবং ক্ষমতার প্রভাব। এসব কারণে মানুষ আদালতের ওপর আস্থা হারিয়েছে। কিন্তু আইনি ব্যবস্থাকে অকেজো করা কখনো কোনো সমাধান হতে পারে না।

আমাদের বুঝতে হবে, মব জাস্টিস কোনো বিচার নয়, এটি আসলে প্রাতিষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার এক সহিংস বিজ্ঞাপন। অন্যভাবে যায়, এটা একধরনের সংগঠিত সহিংসতা। যেকোনো পরিস্থিতিতে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে আমরা অপরাধীকে শাস্তি দিই না, বরং রাষ্ট্রকে অপরাধী বানিয়ে ফেলি।

উত্তেজিত জনতা কোনো তথ্য-প্রমাণ বা আইনি প্রক্রিয়া মানে না। ফলে গুজব বা ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরে সম্পূর্ণ নিরীহ মানুষও ডিজিটাল লিঞ্চিংয়ের শিকার হতে পারে। আমরা খেয়াল করছি, ধর্ষণের ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে মারাত্মক ‘স্লট-শেমিং’ বা নারীদের বিরুদ্ধে হেট স্পিচ ছড়ানো হচ্ছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং একধরনের মনস্তাত্ত্বিক বিকৃতি। যখন কোনো ধর্ষণের ঘটনায় অপরাধীর কাঠগড়া ছেড়ে ভুক্তভোগী নারীর পোশাক বা জীবনযাপনকে লক্ষ্য করে ফেসবুকের ট্রায়াল রুম তৈরি হয়, তখন বুঝতে হবে অপরাধী একা নয়, সমাজ মানসিকভাবে সেই অপরাধের অংশীদার হয়ে গেছে। সাইবার বুলিং বা মব জাস্টিস অপরাধের মূল কেন্দ্রবিন্দু; অর্থাৎ ‘ধর্ষণ’ থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে দেয়।

দুঃখজনক হলো, আমাদের ডিজিটাল অপরাধ দমনের আইনগুলোকে রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনে ব্যবহার করা হয়, কিন্তু অনলাইনে নারীদের বিরুদ্ধে ছড়ানো এ ধরনের হেট স্পিচ ও চরিত্রহনন প্রতিরোধে কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে দেখা যায় না।

বস্তুত আমাদের প্রশ্ন তোলা দরকার, সমাজে ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধ কেন হচ্ছে; সমাজে কোন পরিবর্তনের কারণে মানুষ এমন ভয়াবহ অপরাধ করতে সাহস পাচ্ছে বা উৎসাহিত হচ্ছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা তুলে নিতে উৎসাহিত করা প্রকারান্তরে সহিংসতাকে সমর্থন করা। ধর্ষণও চূড়ান্ত মাত্রার সহিংসতা। এক ধরনের সহিংসতা আরেক সহিংসতাকে উসকে দেয়, নরমালাইজ করতে সাহায্য করে। এ ক্ষেত্রে একটা আপাত ও স্বল্প মেয়াদে সমাধান হতে পারে তদন্ত থেকে রায় পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটিকে ভিকটিমবান্ধব করা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলার জট কমাতে বিচারকের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়ানো।

দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের যে উদ্বেগ রয়েছে, সরকার তা মোকাবিলায় কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পেরেছে?

কাজী মারুফুল ইসলাম: বর্তমান পরিস্থিতিকে আমি বলব একটি ‘স্ট্যাগফ্লেশনারি ট্র্যাপ’ বা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ধীর প্রবৃদ্ধির সন্ধিক্ষণ। এডিবি ও আইএমএফের ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪.৭%-এর ঘরে, অথচ মূল্যস্ফীতি ৯.০৪%-এর ওপরে; যেখানে খাদ্যমূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয়কে ঋণাত্মক করে তুলেছে।

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? দেশের অর্থনীতি কি এখনো সংকটের মধ্যে রয়েছে, নাকি ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতার দিকে যাচ্ছে?

কাজী মারুফুল ইসলাম: আমার মতে, অর্থনীতি এখনো গভীর সংকটের মধ্যেই রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে মুদ্রা সংকোচন নীতি নিলেও সরবরাহ লাইনের চাঁদাবাজি ও সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারায় খুচরা বাজারে সাধারণ মানুষ কোনো সুফল পাচ্ছে না। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ধীর হওয়ায় নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বিনিয়োগকারীরা এখনো দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেখতে চাইছেন। ফলে নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগে একধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাপ, ঋণনির্ভর উন্নয়ন ও অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতার মধ্যে কোন বিষয়গুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে বলে মনে করেন?

কাজী মারুফুল ইসলাম: আন্তর্জাতিক চাপ, ইউক্রেন যুদ্ধ বা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ তো অনুঘটক মাত্র। কিন্তু আমাদের আসল ক্ষত তৈরি করেছে অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের অভাব। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের অন্যতম কম, মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশের কাছাকাছি। অথচ আমরা বিপুল পরিমাণ অর্থ করছাড় দিয়ে নষ্ট করছি। বিগত বছরগুলোর মেগা প্রজেক্টের জন্য নেওয়া বৈদেশিক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ায় এখন আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে।

একটু নির্বাচন প্রসঙ্গে আসি। ⁠আগামী সেপ্টেম্বর–অক্টোবরে অনুষ্ঠেয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ ও প্রতিযোগিতামূলক করতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলো কী হতে পারে? অতীতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের অভিজ্ঞতা থেকে বর্তমান সরকারের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন?

কাজী মারুফুল ইসলাম: সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো স্থানীয় পর্যায়ে পেশিশক্তি, মাঠ দখল এবং একক দলের আধিপত্য বিস্তারের পুরোনো প্রবণতাকে রুখে দেওয়া। সংসদ নির্বাচনে একটি বড় দলের বিজয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই তাদের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে মাঠ দখলের চেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। তাঁদের কারও কারও মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হওয়ার ইচ্ছাও থাকতে পারে।

অতীতের স্থানীয় নির্বাচনগুলো আমাদের শিখিয়েছে যে নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রে যতই শক্তিশালী হোক না কেন, মাঠপর্যায়ের স্থানীয় প্রশাসন; অর্থাৎ ডিসি, এসপি বা ইউএনও যদি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন না করেন, তবে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয় না। বর্তমান সরকারকে অতীতের এই দলীয়করণের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে এবং নিশ্চিত করতে হবে যেন স্থানীয় নির্বাচনে সরকার নির্দিষ্ট কোনো দলকে সুবিধা না দেয়।

উন্নয়ন অধ্যয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাংলাদেশের উন্নয়ন মডেলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ও সম্ভাবনা কী?

কাজী মারুফুল ইসলাম: উন্নয়ন অধ্যয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, আমাদের প্রধান ঝুঁকি হলো প্রবৃদ্ধির নামে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হওয়া এবং কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি। তাই আমার মূল পর্যবেক্ষণ হলো বাংলাদেশকে এখন ক্রোনি ক্যাপিটালিজম বা সুবিধাবাদী পুঁজিবাদের তথাকথিত জোড়াতালির উন্নয়ন মডেল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

প্রবৃদ্ধির সংখ্যা দিয়ে নয়, আমাদের টেকসই ভবিষ্যৎ পরিমাপ করতে হবে শক্তিশালী, স্বাধীন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দিয়ে। সম্ভাবনা তখনই তৈরি হবে যখন আমরা আমাদের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে এআই, আইটি, ফ্রিল্যান্সিং এবং স্মার্টপ্রযুক্তিনির্ভর ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের মাধ্যমে মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারব।

শেষ প্রশ্নটা হলো, আগামী এক বছরের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আপনার পূর্বাভাস কী?

কাজী মারুফুল ইসলাম: আগামী একটি বছর হবে বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ; এটাকে ‘মেক অর ব্রেক পিরিয়ড’ বলা যেতে পারে। রাজনৈতিকভাবে সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং এর আইনি সংস্কার নিয়ে সরকারি ও বিরোধী শিবিরের মধ্যে তীব্র দর–কষাকষি ও রাজপথের চাপ তৈরি হবে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন যদি সরকার সম্পূর্ণ সুচারু ও নিরপেক্ষভাবে করতে পারে, তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হবে। অন্যথায় রাজনৈতিক মেরুকরণ আবার সহিংস রূপ নিতে পারে।

আর অর্থনীতিতে, আইএমএফের সংস্কার প্রস্তাব ও কঠোর রাজস্ব নীতির কারণে আগামী ছয় মাস মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের ওপর বজায় থাকবে। তবে ব্যাংকিং খাতে যদি কঠোর সুশাসন নিশ্চিত করা যায়, খেলাপি ঋণ উদ্ধার হয় এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়, তবে আগামী এক বছরের শেষ ভাগে গিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে শুরু করবে। পুরো বিষয়টাই নির্ভর করছে আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর।

সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

কাজী মারুফুল ইসলাম: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

Read full story at source