কোরবানি প্রথার একটি মনস্তাত্ত্বিক দিক

· Prothom Alo

কোরবানির ধারণাটি সম্ভবত মানব সভ্যতার ইতিহাসের মতোই প্রাচীন। ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে কোরবানি প্রথা কোনো না কোনো রূপে বিদ্যমান ছিল। যুগে যুগে এই রীতি ও আচারের বাহ্যিক রূপ পরিবর্তিত হলেও, এর পেছনে কাজ করেছে মানুষের অন্তরে নিহিত এক ‘চিরন্তন আবেগ ও ত্যাগের আকুলতা’।

Visit albergomalica.it for more information.

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা অগণিত উদাহরণের ভিড়ে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, আদিম ও প্রাচীন অনেক সভ্যতায় এই আবেগটি প্রায়ই চরম ও নৃশংস রূপ ধারণ করত।

উদাহরণস্বরূপ, রোমানরা দ্বিতীয় পিউনিক যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত দেবতাদের তুষ্ট করতে মানুষের রক্ত ঝরাতো। আধুনিক দৃষ্টিতে এটি নৃশংস মনে হলেও, তৎকালীন সমাজে এটি এক প্রকার ‘স্বাভাবিক প্রবৃত্তি’ হিসেবেই গৃহীত হয়েছিল।

এখানে মনোবিদ্যার একটি মৌলিক সত্য উল্লেখ করা জরুরি— ‘যখন মানুষের কোনো অভ্যন্তরীণ তীব্র আবেগ বা উদ্দীপনার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, তখন সেই আবেগটি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায় না। বরং তা সাময়িকভাবে অবদমিত হয় এবং পরবর্তীতে আরও কুৎসিত ও বিধ্বংসী রূপে আত্মপ্রকাশের পথ খোঁজে।’

এই প্রেক্ষাপটে ‘সুন্নাতে ইব্রাহিমি’র অসংখ্য প্রজ্ঞার মধ্যে একটি প্রধান দিক হলো, এটি মানুষের সেই সহজাত মানসিক চাহিদাকে এক মার্জিত ও মহৎ রূপ দান করে।

যখন মানুষের কোনো অভ্যন্তরীণ তীব্র আবেগ বা উদ্দীপনার স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, তখন সেই আবেগটি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায় না। বরং তা সাময়িকভাবে অবদমিত হয়
অনলাইনে কোরবানির পশু কেনা: ৫ বিধান জানা জরুরি

একটি পশুর গলায় ছুরি চালানো বা রক্তপাত করাকে বাহ্যিক দৃষ্টিতে কেউ কেউ নিষ্ঠুর মনে করতে পারেন; কিন্তু বাস্তবতা হলো, মানুষের ভেতরে যে আদিম তেজ বা বলি দেওয়ার প্রবৃত্তি রয়েছে, তা যদি এই পন্থায় নিষ্ক্রান্ত হওয়ার সুযোগ না পায়, তবে সেটি আরও ভয়ংকর ও অমানবিক দিকে মোড় নেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। যার চরম ও চূড়ান্ত রূপ হলো মানুষ বলিদান বা অকারণ হত্যাকাণ্ড।

গত দেড় হাজার বছরের মুসলিম ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, ইসলামে কোরবানির বিধান থাকার কারণে মুসলমানদের মধ্যে কখনোই মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংসকারী কোনো নিষ্ঠুর আচার বিকশিত হতে পারেনি।

ইসলামের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এটি মানুষের মৌলিক আবেগ ও প্রবৃত্তিকে অস্বীকার করে না, বরং তাকে সভ্য ও পরিশোধিত করে। ঠিক যেভাবে যুদ্ধ ও হানাহানির আদিম আকাঙ্ক্ষাকে জিহাদের সুশৃঙ্খল ও ন্যায়নিষ্ঠ কাঠামোর মাধ্যমে একটি সভ্য রূপ দেওয়া হয়েছে।

রক্তপাতহীন এক পৃথিবীর কল্পনা করা বা কোরবানির বিরোধিতা করা খুব সহজ; কিন্তু সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব ও আচরণের বিচারে তা পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়।

‘আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি, আমিই সংরক্ষক’
রক্তপাতহীন এক পৃথিবীর কল্পনা করা বা কোরবানির বিরোধিতা করা খুব সহজ; কিন্তু সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব ও আচরণের বিচারে তা পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়।

উদাহরণস্বরূপ, ঐতিহাসিকভাবে যেসব জাতি চরম নিরামিষভোজী ছিল, তাদের আচারের দিকে তাকালে দেখা যায়, একদিকে তারা পশুকে পূজা করছে, অথচ অন্যদিকে সতীদাহের মতো প্রথার মাধ্যমে নারীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারতেও কুণ্ঠিত হচ্ছে না।

ত্যাগের এই প্রাকৃতিক আবেগটি সঠিক ও যৌক্তিক প্রকাশের পথ পায়নি বলেই তা এমন অসংলগ্ন ও বেদনাদায়ক রূপ নিয়েছে।

ইসলাম মানুষের আদর্শ হিসেবে অবাস্তব বা অপ্রাকৃতিক কোনো দর্শন চাপিয়ে দেয় না। ইসলামি জীবনদর্শন যৌক্তিক, সহজাত এবং মানবিক বোধগম্যতার অনুকূল।

মানবাত্মার কলুষিত আবেগগুলোকে জোরপূর্বক অবদমিত করে রাখার পরিবর্তে ইসলাম সেগুলোকে প্রকাশের একটি মার্জিত ও সৌম্য বিকল্প উপহার দিয়েছে। ফলে মানুষের হীন প্রবৃত্তিগুলো যেমন দমিত হয়, তেমনি সে মানুষ হিসেবে মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অবলম্বন পায়।

সভ্যতা যদি ভবিষ্যতে ‘কুৎসিত ও বিকৃত আচার’ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে চায়, তবে কোরবানির পেছনের এই গভীর প্রজ্ঞা ও ইব্রাহিমী আদর্শের গুরুত্ব অনুধাবন করা তাদের জন্য অপরিহার্য।

  • ইফতেখারুল হক হাসনাইন : শিক্ষক ও লেখক

কোরবানি কার ওপর কখন ওয়াজিব

Read full story at source