ইরান যুদ্ধে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি
· Prothom Alo

অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে নতুন একটি সহায়তা কর্মসূচির (ঋণ কর্মসূচি) অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের প্রভাবে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তা সামলে নিতে ধুঁকতে থাকার মধ্যে ঢাকার পক্ষ থেকে এই অনুরোধ জানানো হয়েছে।
Visit aportal.club for more information.
বাংলাদেশ সরকার আইএমএফের কাছে ঠিক কী ধরনের সহায়তা চেয়েছে, সংস্থাটির সঙ্গে বাংলাদেশের অতীতের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা কেমন এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী অভিঘাত তৈরি করেছে, তার ওপর আলোকপাত করা হলো।
বাংলাদেশের চাওয়া কী
বাংলাদেশে আইএমএফের মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনার গত মঙ্গলবার জানান, বাংলাদেশ সরকার আইএমএফের নতুন একটি সহায়তা কর্মসূচির অনুরোধ জানিয়েছে।
এক বিবৃতিতে ক্রজনার বলেন, আইএমএফের কর্মকর্তারা বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তাদের সংস্কারের সূচি ও নীতিগত অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করছেন।
ক্রজনার বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলে নেওয়ার সক্ষমতা জোরদার করা এবং শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পথে বাংলাদেশের প্রচেষ্টায় বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে আইএমএফ।
নতুন এ সহায়তা (ঋণ সহায়তা) প্যাকেজের আকার বা শর্তগুলো সম্পর্কে কোনো পক্ষই এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি। অবশ্য গত মার্চে বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছিল, ইরান যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট জ্বালানিসংকট কাটাতে তারা বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ২০০ কোটি ডলারের ঋণ খুঁজছে।
২০২৪ সালেও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তখন ঋণের পরিমাণ ছিল মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ২২ শতাংশ। তবে ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় এই পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরান যুদ্ধের ধাক্কা কতটা
জ্বালানিসংকট: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশে মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালায়। বাদ যায়নি জ্বালানি স্থাপনাও। এ যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট দেখা দেয়। বিশ্ববাজারে দ্রুত বাড়তে থাকে জ্বালানি তেলের দাম। গত ৮ এপ্রিল সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। তবে স্থায়ী শান্তিচুক্তি এখনো অধরা রয়ে গেছে।
এর ওপর বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি। যুদ্ধের শুরুর দিকে এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয় ইরান। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করে ওয়াশিংটন।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল আর প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের পাঁচ ভাগের এক ভাগ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। এসব জ্বালানির বড় অংশের গন্তব্য ছিল এশিয়ার দেশগুলো। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখনো তেহরানের হাতে।
এ প্রণালি ঘিরে দীর্ঘদিনের অবরোধ জ্বালানি সরবরাহে বড় বিঘ্ন ঘটিয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানির বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। যুদ্ধের আগে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৬৬ ডলারের আশপাশে। পরে সেটা বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।
আইএমএফের লোগোপ্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ। জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) চাহিদার ৯৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বিশেষ করে গরমের মৌসুমে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদার কারণে জ্বালানির প্রয়োজনও অনেকাংশে বেড়ে যায়। এ আমদানির বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
জ্বালানি সাশ্রয়ে এরই মধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বেশির ভাগ সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখা হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৯ এপ্রিল বাংলাদেশে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে জ্বালানি তেলের দাম।
তৈরি পোশাক খাত: বাংলাদেশে ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রভাব পড়েছে প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের ওপরও। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এ খাত থেকে আসে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের কারখানাগুলো চীন থেকে বেশির ভাগ কাঁচামাল আনে। সচরাচর এসব পণ্য লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে আসে। সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আমদানির খরচ বেড়ে গেছে।
আইএমএফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেওয়া ঋণের পরিমাণ বেড়ে বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছায় এবং ২০২৯ সালের মধ্যে তা ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ঋণের এমন ভয়াবহ বোঝা আর দেখা যায়নি।
এ বিষয়ে পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ডেনিমের পরিচালক সাঈদ আহমেদ চৌধুরী ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, আগামী মৌসুমে ক্রয়াদেশ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। যুদ্ধ শুরুর পর গত মার্চে কিছু বিমান পরিবহন সংস্থা ফ্লাইট বাতিল করেছিল। এর ফলে বিশ্বখ্যাত পোশাকের ব্র্যান্ড জারা-এর মালিক প্রতিষ্ঠান ইনডিটেক্স এবং আরও বেশ কিছু বড় ব্র্যান্ডের পোশাকের চালান বাংলাদেশ ও ভারতের বিমানবন্দরে আটকা পড়ে।
কাঁচামালের বাড়তি দাম: পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্পও ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্লাস্টিক পণ্যের কাঁচামালের দাম বেড়েছে। জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের কারণে প্লাস্টিকের প্রধানতম কাঁচামাল রেজিনের দাম বেড়েছে।
ইংরেজি ভাষার দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধের আগে প্রতি টন রেজিনের দাম ছিল ৯০০ থেকে ৯৫০ ডলার। এখন তা দেড় হাজার থেকে ১ হাজার ৬০০ ডলারে বিক্রি হচ্ছে।
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে সরকারকে অনেক ঋণ নিতে হয়েছে। আইএমএফের মতে, এর ফলে বিদেশি ঋণের চাপে পড়েছে বাংলাদেশ। ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়ছে।
লন্ডনভিত্তিক মার্কেট ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান আইএসআই-এর তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারে। আগের প্রান্তিকেও তা ছিল ১১ হাজার ২২০ কোটি ডলার।
২০২৪ সালেও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বাংলাদেশকে বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তখন ঋণের পরিমাণ ছিল মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ২২ শতাংশ। তবে ইরান যুদ্ধের ধাক্কায় এই পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আইএমএফের কাছে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি নতুন ঋণ চায় বাংলাদেশআইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস কী?
বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের ৫৭০ কোটি ডলারের একটি ঋণ কর্মসূচির মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৩ সালে শুরু হওয়া এ কর্মসূচি চার বছর চলার কথা ছিল।
গত সপ্তাহে বাংলাদেশের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে একটি ভার্চ্যুয়ালি বৈঠকে অংশ নেন আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্ক। গত সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বৈঠকে দুই পক্ষ দ্রুত নতুন একটি কর্মসূচি চালুর বিষয়ে একমত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গত সপ্তাহে বাংলাদেশকে ৩৫ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ার ধকল সামলানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে এ অর্থ ব্যয় করা হবে।
ঋণের জন্য কি আইএমএফের পেছনে দৌড়াব, অর্থমন্ত্রীর প্রশ্নযুদ্ধের কারণে ঋণসংকট কি আরও গুরুতর হচ্ছে?
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবীয়, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল ও মধ্য ইউরোপের অনেক দেশ ব্যাপকভাবে বৈদেশিক ঋণের চাপে ধুঁকছিল। করোনা মহামারি, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ, খাদ্য ও জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং বৈশ্বিক সুদহার বৃদ্ধির কারণে এ সংকটে পড়েছিল দেশগুলো।
উদাহরণ হিসেবে শ্রীলঙ্কার কথা বলা যায়। ঋণসংকট ও দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনার জেরে ২০২২ সালে দেশটির অর্থনীতি ধসে পড়ে। ২০২৩ সালে আইএমএফের কাছ থেকে ৩০০ কোটি ডলারের ঋণ সহায়তা পায় শ্রীলঙ্কা। চীন, ভারত আর জাপানের মতো পাওনাদার দেশগুলোর সঙ্গেও ঋণ পুনর্গঠন নিয়ে চুক্তি করে দেশটি।
জুনে আইএমএফের কাছে ঋণের কিস্তি চায় বাংলাদেশবিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ৫৯ শতাংশ।
গত এপ্রিলে আইএমএফ সতর্ক করে দিয়ে জানায়, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে পারে। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেওয়া ঋণ বেড়ে বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৯৪ শতাংশে পৌঁছায় এবং ২০২৯ সালের মধ্যে তা ১০০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ঋণের এমন ভয়াবহ বোঝা আর দেখা যায়নি।