বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ছিলেন না, কয়েক সপ্তাহ পর তাঁরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন
· Prothom Alo
ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাননি ট্রেন্ট আলেকজান্ডার–আর্নল্ড, ফিল ফোডেনরা। ফ্রান্সের বিশ্বকাপ দলে জায়গা হয়নি এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গার। তবে নিজ দেশের ২৬ জনের চূড়ান্ত দলে জায়গা না পেলেও তাঁদের বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা কিন্তু পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তাঁদের বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ তো আছেই, এমনকি শিরোপাও জিতে যেতে পারেন।
Visit h-doctor.club for more information.
বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে? বিশ্বকাপ ইতিহাসে এমন কিছু খেলোয়াড় আছেন, যাঁরা চূড়ান্ত দলে জায়গা না পাওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের পদক গলায় ঝুলিয়েছেন, হাতে তুলেছেন ট্রফি। এমনই ৬ খেলোয়াড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব আজ।
আলদাইর ও রোনালদো (১৯৯৪)
বিশ্বকাপের দলে প্রথম ঘোষণায় জায়গাই হয়নি আলদাইরের। ১৯৯৪ বিশ্বকাপের ছয় সপ্তাহ আগে ব্রাজিল কোচ কার্লোস আলবার্তো পাহেইরা ২২ সদস্যের দল ঘোষণা করেছিলেন, সেখানে তাঁর নাম ছিল না। পরে বিতর্কিতভাবে কার্লোস মোজেরকে দল থেকে বাদ দেওয়া হলে শেষ মুহূর্তে ডাক পান আলদাইর।
এর মধ্যেই আরেক ধাক্কা খায় ব্রাজিল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাত্র তিন দিন আগে চোটে ছিটকে যান মূল একাদশের সম্ভাব্য সেন্টারব্যাক রিকার্ডো গোমেস। তাঁর বদলি হিসেবে দলে নেওয়া হয় জাপানের শিমিজু এস-পালসের হয়ে খেলা রোনালদোকে। কোচের যুক্তি ছিল, অন্য অনেক খেলোয়াড় অফ-সিজনে (বিশ্বকাপের কারণে বেশির ভাগ ক্লাব ফুটবল বন্ধ) থাকলেও রোনালদো এশিয়ার মাটিতে নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল খেলছিলেন।
রাশিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে আবার চোট পান রিকার্ডো রোচা। তাঁর জায়গায় মাঠে নামেন আলদাইর। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। টুর্নামেন্টের বাকি সব ম্যাচে তিনি মাঠে ছিলেন, ব্রাজিলের চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও রাখেন।
১৯৯৪ বিশ্বকাপে আলদাইর প্রথমে সুযোগ পাননিপরে আলদাইর এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বিশ্বকাপ দলে জায়গা না পেয়ে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন। একজন সাংবাদিক যখন ফোন করে দলে ডাক পাওয়ার খবর দেন, তখন তিনি সেটি বিশ্বাস করতে পারেননি। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই হতাশা বদলে যায় বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার আনন্দে।
এদিকে ১৭ বছর বয়সী রোনালদো অবশ্য এক মিনিটের জন্যও মাঠে নামতে পারেননি। তবু ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হিসেবে স্বর্ণপদক নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন তখনকার ১৭ বয়সী এই খেলোয়াড়। পরে ২০০২ বিশ্বকাপে জাপানে হওয়া ফাইনালেই জোড়া গোল করে নিজেকে বিশ্বকাপ কিংবদন্তিতে পরিণত করেন রোনালদো।
সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন রোনালদো নাজারিওরিকার্দিনহো (২০০২)
দক্ষিণ কোরিয়ার উলসানে অনুশীলন করছিল ব্রাজিল। এক দিন পরই বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচ। কিন্তু হঠাৎই বড় ধাক্কা। অনুশীলনে মজা করে রিভালদোর একটি শট ঠেকাতে গিয়ে অধিনায়ক এমারসন চোটে পড়েন। তাঁর কাঁধের হাড় স্থানচ্যুত হয়, ছিটকে পড়েন বিশ্বকাপ থেকে।
সে সময় ব্রাজিল থেকে প্রায় ১৯ হাজার কিলোমিটার দূরে কুরিতিবায় ছুটি কাটাচ্ছিলেন রিকার্দিনহো। লুই ফেলিপে স্কলারির অধীনে আগে কখনো জাতীয় দলে সুযোগ না পাওয়ায় তাঁর ধারণাই ছিল না যে বিশ্বকাপ দলে ডাক আসতে পারে। তাই ফোন বন্ধ করে তিনি গির্জায় প্রার্থনায় চলে যান।
কিন্তু তাঁর স্ত্রী জুলিয়ানা আশা ছাড়েননি। সিবিএফের (কনফেডারেশন অব ব্রাজিল ফুটবল) ফোন রিসিভ করে তিনি জানিয়ে দেন, রিকার্দিনহো ফিরলেই প্রথম ফ্লাইটে রওনা দেবেন। এরপর পাসপোর্ট নবায়নের বিশেষ ব্যবস্থা, দীর্ঘ ভ্রমণ আর একাধিক ট্রানজিট পেরিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ায় দলের সঙ্গে যোগ দেন।
পরে রিকার্দিনহো বলেছিলেন, হঠাৎ পাওয়া এই ডাক প্রথমে তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। ধীরে ধীরে বিস্ময়ের জায়গা নেয় উত্তেজনা। তাঁর কাছে এটি ছিল জীবনের সবচেয়ে বিশেষ মুহূর্তগুলোর একটি।
বিশ্বকাপে রিকার্দিনহো তিন ম্যাচে বদলি হিসেবে খেলেছিলেন। তবু ব্রাজিলের পঞ্চম বিশ্বকাপ জয়ের অংশ হয়ে যান। আর এমারসনের দুর্ভাগ্যের পর অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পাওয়া কাফুই পরে ইয়োকোহামায় বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরেন।
ম্যারাডোনার কান্না এবং আর্জেন্টিনার প্রথম মুকুটশকদ্রান মুস্তাফি (২০১৪)
জাতীয় দলের হয়ে কোনো ম্যাচ না খেলেই জার্মানির প্রাথমিক স্কোয়াডে জায়গা পেয়েছিলেন মুস্তাফি। কিন্তু ২৩ সদস্যের দল চূড়ান্ত করতে গিয়ে ইওয়াখিম ল্যুভ তাঁকে রাখেননি। বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ বলেই ধরে নিয়েছিলেন সাম্পোদরিয়ায় খেলা এই সেন্টার ব্যাক।
কিন্তু পাঁচ দিন পর সবকিছু বদলে যায়। জার্মানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় মার্কো রয়েস গোড়ালির চোটে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেলে তাঁর পরিবর্তে মুস্তাফিকে ব্রাজিলে ডেকে পাঠানো হয়।
মার্কো রয়েস চোটে পড়ায় বিশ্বকাপ দলে সুযোগ পান শকদ্রান মুস্তাফিহঠাৎ পাওয়া এই সুযোগে তিনি শুধু দলের সদস্যই হননি, তিনটি ম্যাচে মাঠেও নেমেছেন। পরে মুস্তাফি বলেছিলেন, দলে ডাক পাওয়ার খবর শুনে তিনি হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। সবকিছু এত দ্রুত ঘটেছিল যে তিনি প্রায় অটো-পাইলটের মতো স্যুটকেস গুছিয়ে বিশ্বকাপের উদ্দেশে রওনা দেন।
শেষ পর্যন্ত মারাকানায় আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় জার্মানি, চ্যাম্পিয়ন হন মুস্তাফিও। শিরোপা জয়ের পর মুস্তাফি উদ্যাপন করেছিলেন ‘রয়েস ২১’ লেখা জার্সি নিয়ে। কারণ, তাঁর বিশ্বকাপে থাকাটা যে ওই রিউসের কারণেই।
এমবাপ্পের উত্থানের মঞ্চে মেসিকে ঘিরে বিচ্ছেদ আর পদক প্রত্যাখ্যান জিদানের ঢুস, স্টেডিয়ামে বোমা এবং জাতীয় সংগীত বিভ্রাটথিয়াগো আলমাদা ও আনহেল কোরেয়া (২০২২)
২০২২ বিশ্বকাপের আগে আর্জেন্টিনার চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণার সময় আনহেল কোরেয়ার নাম ছিল না। থিয়াগো আলমাদা তো লিওনেল স্কালোনির প্রাথমিক তালিকাতেও ছিলেন না।
কিন্তু বিশ্বকাপ শুরুর ঠিক আগে চোট বদলে দেয় সব হিসাব–নিকাশ। প্রথমে নিকো গঞ্জালেস ছিটকে গেলে কোরেয়া ডাক পান। পরদিন আবার চোটের কারণে বাদ পড়েন জোয়াকিন কোরেয়া। তাঁর জায়গায় শেষ মুহূর্তে সুযোগ মেলে আলমাদার। আলেহান্দ্রো গারনাচো ও জিওভানি সিমিওনের মতো কয়েকজন আলোচিত খেলোয়াড়কে পেছনে ফেলে আটলান্টা ইউনাইটেডে খেলা এই তরুণকে ডাকার ঘটনা ছিল বড় চমক।
আচমকা ২০২২ বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাওয়া আলমাদা এবার ২৬ জনের চূড়ান্ত দলে আছেনপরে সে সময়ের বর্ণনা দিয়ে আলমাদা বলেন, ‘আমি যখন ফোনটা পাই, তখন কেঁদে ফেলেছিলাম। তারপর পরিবারকে জানালে শুনে ওরাও কেঁদে ফেলেছিল। আমি বাবা দিবসে আমার বাবাকে বিশ্বকাপের টিকিট উপহার দিয়েছিলাম, আর এখন আমি নিজেই সেখানে খেলতে যাচ্ছিলাম!’
শেষ পর্যন্ত এই দুই ‘শেষ মুহূর্তের যাত্রী’ই আর্জেন্টিনার ২০২২ বিশ্বকাপজয়ী দলের অংশ হয়ে যান। লিওনেল মেসি যখন পঞ্চম চেষ্টায় প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তোলেন, তখন কোরেয়া ও আলমাদা দুজনেই বদলি হিসেবে গিয়ে একটি করে ম্যাচ খেলে চ্যাম্পিয়ন পদক গলায় পরেন।
আর্জেন্টিনার জন্য বিশ্বকাপ শিরোপা ধরে রাখা যে কারণে কঠিন