হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে না, তবে গাজায় প্রকাশ্যে অস্ত্র বহন করবে কেবল পুলিশ
· Prothom Alo

ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস এখনই তাদের অস্ত্র সমর্পণ করবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে। নিরস্ত্রকরণের দাবি প্রত্যাখ্যান করে সংগঠনটি বলেছে, তাদের সামরিক সক্ষমতা বা অস্ত্রের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা অন্য ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
Visit catcross.org for more information.
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হুসাম বাদরান এ তথ্য জানান।
হুসাম বাদরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, গাজা উপত্যকার শাসনভার পরিচালনায় ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি) দায়িত্ব নেওয়ার পর গাজার রাস্তাঘাটে কোনো প্রকাশ্য অস্ত্র দেখা যাবে না। শুধু এনসিএজির অধীনে থাকা আনুষ্ঠানিক ফিলিস্তিনি পুলিশই অস্ত্র বহন করতে পারবে। তবে এর অর্থ, আনুষ্ঠানিক অস্ত্র সমর্পণ নয়।
এই সাক্ষাৎকারে হুসাম বাদরান ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার অচলাবস্থা দূর করতে হামাসের প্রস্তাবিত সমাধানগুলোর একটি চিত্র তুলে ধরেন।
হুসাম বাদরান বলেন, ‘আমরা অস্ত্র সমর্পণের কথা বলছি না। আমরা বলছি, পুলিশের সরকারি অস্ত্র ছাড়া অন্য কোনো অস্ত্র প্রকাশ্যে দেখা যাবে না। বিষয়টির বিস্তারিত জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় নির্ধারিত হবে।’
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার।
হামাস এমন সময় এই সিদ্ধান্তের কথা জানাল, যখন একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বিবিসিকে বলেছে, ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরুর জন্য সংগঠনটি মিসরের কায়রোয় তাদের প্রতিনিধিদল পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। চলতি সপ্তাহান্তে এই আলোচনা শুরু হতে পারে।
এর আগে ইজ্জ আল–দিন আল–হাদ্দাদ ও মোহাম্মদ ওদেহের মতো সামরিক কমান্ডারদের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে চলমান ইসরায়েলি গুপ্তহত্যা বন্ধের দাবিতে হামাস সাময়িকভাবে আলোচনায় অংশগ্রহণ স্থগিত রেখেছিল।
২০২৫ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ও গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার।
কায়রো বৈঠকে কারা অংশ নেবে
কায়রোয় অনুষ্ঠেয় বৈঠকে ফিলিস্তিনের আটটি প্রধান রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠী অংশ নেবে বলে জানিয়েছেন হুসাম বাদরান। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে হামাস, ইসলামিক জিহাদ, পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (পিএফএলপি), ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (ডিএফএলপি) ও আরও কয়েকটি সংগঠন।
হামাসের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করার কথা থাকলেও বর্তমানে মাত্র ১৫০ থেকে ২৫০টি ট্রাক ঢুকছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, হাসপাতাল, জ্বালানিসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বড় অংশ এখনো ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে আছে।
এই বৈঠকের উদ্দেশ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনাকে নতুন করে কার্যকর করার পথ খুঁজে বের করা।
তবে হুসাম বাদরানের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রথম ধাপের প্রতিশ্রুতিগুলোর ৩০ শতাংশও বাস্তবায়ন করেনি ইসরায়েল। ফলে চুক্তির পরবর্তী ধাপে এগোনোর পরিবেশ তৈরি হয়নি।
গাজায় ইসরায়েলি সেনারাহুসাম বলেন, ‘আমরা মানবিক সহায়তা, রাফা সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থা, অবকাঠামো পুনর্গঠন ও গুপ্তহত্যা বন্ধের মতো বিষয় নিয়ে কথা বলছি। যুদ্ধবিরতির মূল ধারণা ছিল পুরোপুরিভাবে সংঘাত বন্ধ করা। যুদ্ধবিরতি প্রথম শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার মানুষ ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন।’
২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজায় মোট নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৭২ হাজার ৯৪২ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৬৭ জন।
হামাসের দাবি, চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক গাজায় প্রবেশ করার কথা থাকলেও বর্তমানে মাত্র ১৫০ থেকে ২৫০টি ট্রাক ঢুকছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ, হাসপাতাল, জ্বালানিসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বড় অংশ এখনো ধ্বংসস্তূপ হয়ে পড়ে আছে।
নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে অচলাবস্থা
ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলো যেখানে প্রথম ধাপের মানবিক প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে, সেখানে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ও ট্রাম্প প্রশাসনের গাজাবিষয়ক প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ দ্বিতীয় ধাপে যাওয়ার শর্ত হিসেবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্রীকরণের দাবি তুলছেন।
এ অচলাবস্থা নিরসনে সম্প্রতি ম্লাদেনভ যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতাকারীদের তৈরি ১৫ দফার একটি রূপরেখা উপস্থাপন করেন। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে গত মে মাসে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, এই পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক পদক্ষেপ ও যাচাই–বাছাইয়ের ব্যবস্থা।
ফিলিস্তিনিদের উদ্বেগের জবাবে ম্লাদেনভ বলেন, প্রস্তাবে কোথাও বলা হয়নি, ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে তাদের অস্ত্র ইসরায়েলের কাছে হস্তান্তর করতে হবে; বরং ধাপে ধাপে অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করার প্রক্রিয়া ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বেই পরিচালিত হবে এবং সব অস্ত্র এনসিএজির অধীনে স্থানান্তর করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করার অগ্রগতির সঙ্গে সমন্বয় করে গাজা থেকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার করবে ইসরায়েল। একই সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েনের কথাও বলা হয়েছে।
তবে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওয়িসাম আফিফার মতে, এই ১৫ দফা পরিকল্পনা মূলত আলোচনা দীর্ঘায়িত করার একটি কৌশল।
আল–জাজিরাকে ওয়িসাম বলেন, ‘নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে নতুন একটি অচলাবস্থা তৈরি করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনকে বড় ধরনের ছাড় দিতে বলা হচ্ছে। কিন্তু বিনিময়ে কোনো বাস্তবসম্মত নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে না।’
ওয়িসামের অভিযোগ, আলোচনার সময়কে কাজে লাগিয়ে গাজায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত করছে ইসরায়েল। তিনি বলেন, ‘আমরা এমন এক পরিস্থিতির মুখে আছি, যেখানে দখলদার শক্তি নিজেদের শর্তে যুদ্ধবিরতির কাঠামো পুনর্গঠন করেছে।’
গাজায় কবরস্থান গুঁড়িয়ে গোপনে সামরিক ঘাঁটি তৈরি করেছে ইসরায়েলি বাহিনীফিলিস্তিনের গাজা নগরীতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় লন্ডভন্ড বাড়িঘরক্ষমতা হস্তান্তরেও জটিলতা
হামাসের বিরুদ্ধে গাজায় ক্ষমতা ধরে রাখার অভিযোগ থাকলেও সংগঠনটির মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেন, গাজার প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত সব দায়িত্ব জাতীয় কমিটির কাছে হস্তান্তর করতে তাঁরা প্রস্তুত।
হুসাম বাদরানও দাবি করেন, ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক সব নথি ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে হামাস।
তবে জাতীয় কমিটির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল–জাজিরাকে বলেন, শিগগিরই জাতীয় কমিটি গাজায় প্রবেশ করবে, এমন খবর সঠিক নয়। তিনি বলেন, কমিটি ইসরায়েল–নিয়ন্ত্রিত ইয়েলো লাইনের ভেতরে কাজ করতে রাজি নয়। একই সঙ্গে ইসরায়েল–সমর্থিত কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সহযোগিতাও করবে না।
ইসরায়েলি বাহিনীকে গাজার ৭০ শতাংশ দখলের নির্দেশ দিয়েছেন যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহুএ ছাড়া আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় কমিটি গাজার দায়িত্ব গ্রহণ করবে না বলেও জানান ওই সদস্য।
এদিকে গাজায় রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
জাতিসংঘে দেওয়া ব্রিফিংয়ে নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও সংঘাত ও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এতে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও ব্যাহত হচ্ছে।
ম্লাদেনভের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর থেকে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ৯৩৩ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২ হাজার ৮৬৮ জন আহত হয়েছেন।
২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া যুদ্ধে গাজায় মোট নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ৭২ হাজার ৯৪২ জনে পৌঁছেছে। আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৬৭ জন।