বাঘ ও বাঘিনীর প্রেম
· Prothom Alo

প্রকৃতিতে প্রেম যেমন সুন্দর, তেমনি কখনো তা হয়ে ওঠে প্রাণঘাতী। জাতীয় চিড়িয়াখানায় বাঘিনী ‘জুঁই’-এর মর্মান্তিক মৃত্যু সামনে নিয়ে এসেছে বাঘের প্রজনন কৌশলের এক অজানা ও নিষ্ঠুর অধ্যায়।
ঢাকার জাতীয় চিড়িয়াখানায় গত ৪ জানুয়ারি বাঘ দম্পতি বেলি–টগর চারটি বাচ্চা জন্ম দিয়েছে। খবরটি অতি সম্প্রতি সামনে এসেছে। চিড়িয়াখানার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বেলি গর্ভবতী হওয়ার পর থেকে টগরকে আলাদা রাখা হয়েছে। বাচ্চা জন্মের পরও টগর আলাদা আছে। স্ত্রী বাঘ গর্ভবতী হওয়ার পর পুরুষ বাঘের আর বিশেষ কর্তব্য থাকে না।
Visit syntagm.co.za for more information.
এই বেলি–টগর দম্পতির ঘরেই ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল এসেছিল জুঁই, জবা ও রঙ্গন নামে তিনটি বাচ্চা। এর মধ্যে জুঁই ছিল সাদা। জাতীয় চিড়িয়াখানায় সেটিই ছিল প্রথম কোনো সাদা বাঘের জন্ম। ছোট্ট জুঁই একসময় বড় হয়, হয় প্রজননক্ষম। এ অবস্থায় জুঁই ও কসমস নামে একটি পুরুষ বাঘকে রাখা হয় এক খাঁচায়। ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর মিলনের সময় কসমসের কামড়ে মৃত্যু হয় জুঁইয়ের।
পুরুষ বাঘ মিলনের সময় বাঘিনীর ঘাড় ও গলায় কামড় দিয়ে ধরে রাখে। বাঘিনী যখন মিলনে সহযোগিতা করে, তখন সেই কামড়ে তার ক্ষতি হয় না। বাঘিনী মিলনে সহযোগিতা না করলে অনেক সময় ক্ষিপ্ত হয়ে পুরুষ বাঘ শক্ত করে কামড় দেয়। জুঁইয়ের ক্ষেত্রেও তা–ই হয়েছিল। পুরুষ বাঘের (কসমস) কামড়ে জুঁইয়ের শ্বাসনালি ছিদ্র হয়ে যায়। প্রচুর রক্তক্ষরণে সে মারা যায়। জাতীয় চিড়িয়াখানায় এটিই প্রথম কোনো বাঘের কামড়ে বাঘিনীর মৃত্যুর ঘটনা।
মিলনের সময় এই যে বাঘিনীর মৃত্যু, এটিই আজকের লেখার বিষয়। কেন এমন হয়? বিজ্ঞান কী বলে এই রহস্যের পেছনে? আসুন দেখি, সহজ ভাষায়।
যেভাবে বাঘ গোনা হয়বেলি–টগর দম্পতির ঘরেই ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল এসেছিল জুঁই, জবা ও রঙ্গন নামে তিনটি বাচ্চা। এর মধ্যে জুঁই ছিল সাদা। জাতীয় চিড়িয়াখানায় সেটিই ছিল প্রথম কোনো সাদা বাঘের জন্ম।
সলিটারি প্রজাতির প্রজনন কৌশল
বাঘ একা থাকতে পছন্দ করে। সারা জীবন সে একলা ঘুরে বেড়ায়। শুধু প্রজননের সময়ই বাঘিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। বিজ্ঞানীরা এই আচরণকে বলেন ‘সলিটারি প্রজাতির প্রজনন কৌশল’। এটা বলতে বোঝায়, যেসব প্রাণী সাধারণত একা একা থাকে, তারা প্রজননের সময় কীভাবে সঙ্গী খুঁজে নেয়, মিলিত হয় এবং আবার আলাদা হয়ে যায়, তার পুরো আচরণগত ধরন।
বাঘিনী যখন ঋতুচক্র বা ইস্ট্রাসে থাকে অর্থাৎ প্রজননের উপযুক্ত সময়, তখন সে জোরে ডাকে, গন্ধ ছড়ায় আর গড়াগড়ি দেয়। পুরুষ বাঘ এই সংকেত পেয়ে বাঘিনীর কাছে আসে। দুজন প্রথমে একে অপরকে ঘুরে দেখে, ঘষাঘষি করে, একটু চাটে। কয়েক দিন ধরে চলে এই পর্ব।
এরপর আসে আসল মিলনের মুহূর্ত। বাঘিনী বিশেষ ভঙ্গিতে শুয়ে পড়ে, লেজ সরিয়ে জননাঙ্গ তুলে ধরে। এটাকে বলা হয়, ‘লর্ডোসিস’। পুরুষ বাঘ পেছন থেকে উঠে বাঘিনীর গলার পেছনের ঢিলা চামড়ায় দাঁত বসিয়ে ধরে। এই ‘নেক বাইট’ বা ঘাড়ে কামড় কেন? বিজ্ঞান বলছে, তিনটি কারণে। প্রথমত, মিলনের সময় বাঘিনীকে স্থির রাখতে। দ্বিতীয়ত, বাঘিনী যাতে ঘুরে আক্রমণ না করে। তৃতীয়ত, এই কামড় মস্তিষ্কে সংকেত পাঠিয়ে ডিম্বাণু নির্গত করে, যাকে বলে ‘ইনডিউসড ওভুলেশন’ বা ‘প্রণোদিত ডিম্বস্ফোটন’।
পুরুষ বাঘের জননাঙ্গের গোড়ায় ছোট ছোট কাঁটার মতো থাকে। এগুলো মিলনের সময় বাঘিনীর জননাঙ্গে আঁচড় কাটে, যা আরও দ্রুত ডিম্বাণু ছাড়তে সাহায্য করে। মিলন খুব সংক্ষিপ্ত। মাত্র ১০–৩০ সেকেন্ড। তারপর বাঘিনী চিৎকার করে উঠে থাবা মারে। পুরুষ বাঘ চলে যায়। ইস্ট্রাসে এমন মিলন হতে পারে ৫০ থেকে ১০০ বার! সময় হয় চার থেকে ছয় দিন।
বাঘ পড়েছে বিরাট প্যারায়বাঘ একা থাকতে পছন্দ করে। সারা জীবন সে একলা ঘুরে বেড়ায়। শুধু প্রজননের সময়ই বাঘিনীর সঙ্গে মিলিত হয়। বিজ্ঞানীরা এই আচরণকে বলেন সলিটারি প্রজাতির প্রজনন কৌশল।
বিবর্তনের গল্প
এই আচরণের পেছনে রয়েছে বিবর্তনের গল্প। গবেষক মেলভিন সানকুইস্ট ও ফিয়োনা সানকুইস্ট তাঁদের বই Wild Cats of the World (2002)–এ লিখেছেন, বাঘের মিলনে পুরুষের কামড় ও জননাঙ্গের কাঁটার আঘাতের আচরণ কেবল শারীরিক নয়; বরং মানসিক। সেটা বাঘিনীর হরমোনকে উদ্দীপিত করে, ডিম্বস্ফোটন বাড়ায় এবং প্রজননের সম্ভাবনা নিশ্চিত করে।
প্রকৃতিতে একবারের মিলন যথেষ্ট নয়। এই আচরণ বাঘিনীর আবার মিলনের আগ্রহ বাড়ায়, ফলে একাধিক মিলন প্রতিটি ক্ষেত্রে কার্যকর হয়ে ওঠে। বাঘিনীর শরীরে লুটেইনাইজিং হরমোন নিঃসৃত হওয়ায় প্রতিটি মিলন প্রজননে সাহায্য করে।
সংক্ষেপে এই ঘাড়ে কামড় ও জননাঙ্গে জননাঙ্গ কাঁটার আঘাতের কৌশল হলো বাঘের বিবর্তিত প্রজনন কৌশল, যা বন্য পরিবেশে তাদের সন্তানের সংখ্যা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভ্লাদিমির মাজাক (১৯৮১) ও চীনা বিজ্ঞানী লিউর কাজও একই মত প্রকাশ করে।
জর্জ শ্যালার হলেন খ্যাতনামা প্রাকৃতিকতত্ত্ববিদ ও জীববিজ্ঞানী। তিনি বন্য প্রাণীর আচরণ, বিশেষ করে বৃহৎ মাংসাশী ও স্তন্যপায়ীদের অধ্যয়ন করে বিশ্বখ্যাত। ভারতের জঙ্গলে বাঘ ও হরিণ পর্যবেক্ষণ কাজ করে সারা দুনিয়ায় পরিচিত তিনি। তাঁর বিখ্যাত বই The Deer and the Tiger–এ দেখা যায়, প্রকৃতিতে বাঘিনী সহজেই পালিয়ে যায়, তাই মিলনের সময় মৃত্যু প্রায় হয় না। অর্থাৎ এই শারীরিক আচরণ ও সংক্ষিপ্ত মিলনের কৌশলই বাঘের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সাহায্য করে।
আমরা এডিস বাঘজর্জ শ্যালার হলেন খ্যাতনামা প্রাকৃতিকতত্ত্ববিদ ও জীববিজ্ঞানী। তিনি বন্য প্রাণীর আচরণ, বিশেষ করে বৃহৎ মাংসাশী ও স্তন্যপায়ীদের অধ্যয়ন করে বিশ্বখ্যাত।
চিড়িয়াখানার ব্যাপার ভিন্ন
কিন্তু চিড়িয়াখানার ব্যাপারটা ভিন্ন। এখানে বাঘ–বাঘিনীকে জোর করে একসঙ্গে রাখা হয়। স্ট্রেস, অপরিচিতি আর পালানোর জায়গা না থাকায় কামড়টা কখনো কখনো মারাত্মক হয়ে যেতে পারে। গলার হাড় ভেঙে বা শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাঘিনী মারা যায়।
বিশ্বের বিভিন্ন চিড়িয়াখানায় এমন ঘটনা ঘটেছে। যেমন ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগো চিড়িয়াখানায় মালয়ান বাঘিনী টিগার সঙ্গে মিলনের সময় পুরুষ বাঘ মারা যায়। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্যাক্রামেন্টো চিড়িয়াখানায় সুমাত্রান বাঘিনী বাহা, ২০১৯ সালে লন্ডন চিড়িয়াখানায় মেলাতি, ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে টাকোমার পয়েন্ট ডিফায়েন্সে কিরানা এবং ২০২৫ সালে যুক্তরাজ্যের মারওয়েল চিড়িয়াখানায় আমুর বাঘিনী ভ্যালেন্টিনা প্রজননের সময় আহত হয়ে মারা যায়।
এসব ঘটনা দেখায়, বাঘের ঘাড়ে কামড় ও জননাঙ্গের কাঁটার আঘাতের আচরণ এবং সংক্ষিপ্ত মিলনের কৌশল প্রজননের ক্ষেত্রে কার্যকর হলেও কখনো কখনো ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে।
চিড়িয়াখানায় বাঘ–বাঘিনীর মিলনের সময় মৃত্যুর ঘটনা এড়াতে কর্তৃপক্ষকে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। মিলনের আগে বাঘ ও বাঘিনীর মধ্যে পরিচয় করানো, পর্যাপ্ত জায়গা থাকা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। স্ট্রেস কমানোর জন্য দর্শনার্থী দূরে রাখা, রুটিন বজায় রাখা এবং মিলনের সময় নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ করা হয়। ঝুঁকি দেখা দিলে দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়। এই পদক্ষেপগুলো মেনে চললে চিড়িয়াখানায় মৃত্যুর ঝুঁকি কমানো যায় আবার বাঘের প্রজনন কার্যক্রমও সুষ্ঠুভাবে চালানো সম্ভব হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে বার্ড ফ্লুতে মারা গেছে ২০টি বাঘস্ট্রেস, অপরিচিতি আর পালানোর জায়গা না থাকায় কামড়টা কখনো কখনো মারাত্মক হয়ে যেতে পারে। গলার হাড় ভেঙে বা শ্বাসনালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বাঘিনী মারা যায়।
এই প্রেমই বাঁচিয়ে রাখে প্রাণিজগৎ
তবু এই প্রেমই বাঘের প্রজাতিকে বাঁচিয়ে রাখে। একটা সফল মিলনে বাঘিনী গর্ভবতী হয়, ৯৫ থেকে ১০৭ দিন পর দুই থেকে চারটি বাচ্চা জন্মায়। প্রকৃতিতে এ নিয়মেই বাঘের সংখ্যা টিকে আছে।
বাঘ ও বাঘিনীর এই গল্প আমাদের শেখায়, প্রকৃতি কখনো কখনো শুধু সুন্দর নয়, নিষ্ঠুরও। কখনো জীবন দেয়, কখনো মৃত্যু। বিজ্ঞান এই রহস্য উন্মোচন করে আমাদের প্রকৃতির প্রতি আরও শ্রদ্ধাশীল করে তোলে।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী চিকিৎসা অনুষদের সাবেক ডিন ও গাইনোকোলজি বিভাগের প্রধান বিশিষ্ট পাখি ও বন্য প্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আ ন ম আমিনুর রহমানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম পুরো ব্যাপারটি নিয়ে। তিনি বলেন, আবদ্ধ অবস্থায় বাঘ–বাঘিনীর প্রথমবার প্রজননের ক্ষেত্রে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষকে বিশেষ নজরদারি রাখতে হবে। কারণ, সদ্য যৌবনে আসা বাঘ–বাঘিনীর প্রজনন অভিজ্ঞতা নেই। কাজেই নতুন বাঘ–বাঘিনীর মধ্যে হৃদ্যতা গড়ে তোলার জন্য সময় দিতে হবে। এদের মধ্যে ভালোবাসা গড়ে উঠলে বাঘিনী বাঘকে প্রজননের জন্য সহজে গ্রহণ করবে এবং বাঘও জোরে নেক বাইট করবে না। এতে মিলন সফল হবে।
আমিনুর রহমান আরেকটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করতে চাইলেন। তা হলো, সব চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্কে, যেখানে সাদা (লিউসিস্টিক) অথবা অ্যালবিনো বাঘ আছে, সেগুলোকে প্রজননের আওতায় আনা যাবে না। কারণ, সাদা ও অ্যালবিনো বাঘ অন্তঃপ্রজননের ফলে সৃষ্টি হয়। এসব বাঘের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা সাধারণ বাঘের তুলনায় অনেক কম। সে কারণেই বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন বিখ্যাত চিড়িয়াখানাগুলোয় সাদা বা অ্যালবিনো বাঘের প্রজনন নিরুৎসাহিত করা হয়।
লেখক: কবি ও সাংবাদিক*লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় মে সংখ্যায় প্রকাশিতপ্রাণীদের ছদ্মবেশ!