হামে শিশুর মৃত্যু, নেতাদের বিদেশযাত্রা ও আস্থাহীনতার বার্তা
· Prothom Alo

চলতি বছর বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাবে ছয় শতাধিক শিশু মারা গেছে। হাজার হাজার আক্রান্ত হয়েছে। একই সময়ে দেশের রাষ্ট্রপতি উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেছেন। এ দুটি ঘটনাকে আলাদা করে দেখা ভুল হবে—এগুলো একই রাষ্ট্রের দুটি ‘মুখ’।
যখন কয়েক ডলারের টিকার অভাবে একটি শিশুর জীবন নিভে যায়, আর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বিদেশি হাসপাতালে আশ্রয় নেন, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক সংকট নগ্ন হয়ে ওঠে। এই বৈপরীত্যই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার নির্মম সত্য প্রকাশ করে; এখানে কার্যত দুটি পৃথক বাস্তবতা বিদ্যমান—একটি তাদের জন্য, যারা অর্থ দিয়ে নিরাপত্তা কিনতে পারে; আরেকটি তাদের জন্য, যারা প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর মুখে নীরবে অপেক্ষা করে।
Visit tr-sport.bond for more information.
হাম দুরারোগ্য কোনো রোগ নয়। কয়েক ডলারের একটি টিকাই এটি প্রতিরোধ করতে পারে—সেই টিকা পৃথিবীতে রয়েছে ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে। তবু ঢাকার বস্তিতে, উত্তরের প্রত্যন্ত গ্রামে কিংবা কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরে শিশুরা এমন রোগে মারা যাচ্ছে, যা বিশ্বের অধিকাংশ দেশ বহু আগেই নিয়ন্ত্রণ করেছে। এ মৃত্যু দুর্ভাগ্য নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতিফলন।
সংখ্যাগুলো লজ্জাজনক
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, বিনিয়োগহীনতা, দুর্বল সুশাসন ও স্বাস্থ্য খাতকে জাতীয় অগ্রাধিকারের বাইরে ঠেলে দেওয়ার ক্রমবর্ধমান পরিণতি। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির মাত্র ২ শতাংশ ব্যয় করে, যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অন্যতম নিম্ন হার। মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশেরও বেশি আসে মানুষের নিজের পকেট থেকে, তাই অসুস্থতা শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এটি দারিদ্র্যেরও অন্যতম কারণ।
মানবসম্পদের সংকটও গভীর। বর্তমানে প্রতি ১০ হাজার মানুষের বিপরীতে চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ৫ দশমিক ২৬ জন, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যূনতম মানের অনেক নিচে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক নেই, কমিউনিটি ক্লিনিকে যন্ত্রপাতির অভাব, জেলা হাসপাতালে পর্যাপ্ত ডায়াগনস্টিক সুবিধা নেই। সরকারি হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপে কার্যত ভেঙে পড়ছে। একদিকে সংক্রামক রোগের পুনরুত্থান, অন্যদিকে দ্রুত বাড়ছে ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগ। জলবায়ুর পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সুশাসনের সংকট
এই সংকট কেবল অর্থের নয়, এটি সুশাসনেরও সংকট। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারের রাজনীতি দৃশ্যমানতার ওপর নির্ভরশীল। সেতু বা উড়ালসড়ক তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি করে; কিন্তু টিকাদান কর্মসূচি বা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি দীর্ঘ মেয়াদে ফল দেয়, তাৎক্ষণিক দৃশ্যমানতা নয়। ফলে স্বাস্থ্য খাত প্রায়ই উন্নয়ন অগ্রাধিকারের প্রান্তে থেকে যায়।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের সূচক অনুযায়ী, স্বাস্থ্য শাসনে বাংলাদেশ ১৯৫ দেশের মধ্যে ১১৩তম স্থানে—ভারত ও শ্রীলঙ্কার তুলনায় অনেক পিছিয়ে। বিআইডিএসের গবেষণা অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতের নেতৃত্বের প্রায় ৬০ শতাংশ পদ রাজনৈতিক প্রভাবে পূরণ হয়, ফলে পেশাগত দক্ষতার বদলে আনুগত্য প্রাধান্য পায়। ডেঙ্গু মোকাবিলায় কিট সংগ্রহে বিলম্ব কিংবা টিকাদান কার্যক্রমে ধীর প্রতিক্রিয়া তাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর লক্ষণ।
অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও ক্রয় দুর্নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দুর্নীতির কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্য বাজেট অপচয় হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২৪ সালের গবেষণা বলছে, অন্তত ৪০ শতাংশ চিকিৎসা সরঞ্জাম অতিরিক্ত ব্যয়ে ক্রয় করা হয় এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রায় ৩৫ শতাংশ সরঞ্জাম অকেজো হয়ে পড়ে থাকে। দরপত্রপ্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক প্রভাব, মধ্যস্বত্বভোগী ও দুর্বল তদারকি সীমিত সম্পদের দক্ষ ব্যবহারকে বাধাগ্রস্ত করছে।
অন্যদিকে দেশে হাজার হাজার বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালিত হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নবায়ন ছাড়া, এমনকি সম্পূর্ণ লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় চলছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবার একটি বড় অংশ কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও মান তদারকির বাইরে থেকে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসার মান ও জবাবদিহির ওপর। এই অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ শুধু স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মানকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং পুরো চিকিৎসাব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাকেও ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে।
নেতাদের বিদেশযাত্রা: আস্থাহীনতার বার্তা
রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা যাকে বলেন ‘এলিট এক্সিট’, ক্ষমতাবানদের জনসেবাব্যবস্থা থেকে ধীরে ধীরে সরে যাওয়া, বাংলাদেশে তা এখন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। রাজনৈতিক নেতা, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও এলিট শ্রেণি নিয়মিতভাবে বিদেশে চিকিৎসা নেন। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় আট লক্ষাধিক বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, ব্যয় করেন চার থেকে পাঁচ বিলিয়ন ডলার। এই বিপুল অর্থের একটি অংশও যদি দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোয় বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে বিশেষায়িত হাসপাতাল ও উন্নত জরুরি সেবা গড়ে তোলা সম্ভব ছিল।
রাষ্ট্রপতির বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া ব্যক্তিগতভাবে অন্যায় নয়। কিন্তু প্রশ্নটি ব্যক্তিগত নয়, এটি প্রতীকী। আর রাজনীতিতে প্রতীক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন প্রভাবশালী মানুষ সরকারি হাসপাতাল ব্যবহার বন্ধ করে দেন, তখন সেই প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশীদারদের হারায়। মানোন্নয়নের রাজনৈতিক চাপও কমে যায়। ধীরে ধীরে দুটি পৃথক বাস্তবতা তৈরি হয়—একটি নিরাপদ ও সুরক্ষিত; অন্যটি অনিশ্চিত ও ভঙ্গুর। যখন রাষ্ট্র পরিচালনাকারীরা নিজেরাই দেশের হাসপাতালের ওপর আস্থা রাখতে পারেন না, তখন তাঁরা নীরবে একটি বার্তা দেন: এই ব্যবস্থা ক্ষমতাবানদের জীবনের জন্য যথেষ্ট নিরাপদ নয়।
এটি নৈতিক প্রশ্ন
এই সংকট তাই কেবল প্রশাসনিক নয়, এটি মৌলিকভাবে নৈতিক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার কাঠামো স্বাস্থ্যসেবাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদও স্বাস্থ্যকে নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফলে প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যু শুধু নীতিগত ব্যর্থতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার প্রমাণ।
অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন উন্নয়নকে মানুষের বাস্তব সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। যে শিশু টিকা পায় না, তার সবচেয়ে মৌলিক সক্ষমতা অর্থাৎ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার সক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হয়। দার্শনিক জন রলস যুক্তি দিয়েছিলেন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা সেই পরীক্ষায় এখনো উত্তীর্ণ নয়। নরওয়েজীয় সমাজবিজ্ঞানী ইউহান গালতুংয়ের ভাষায়, দরিদ্র পরিবারের শিশু ও শরণার্থীশিবিরের মায়েরা আজ ‘কাঠামোগত সহিংসতা’র শিকার, যেখানে মানুষ সরাসরি আক্রমণে নয়; বরং বৈষম্যমূলক প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো, এই মৃত্যু ধীরে ধীরে সমাজে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।
অগ্রাধিকারের প্রশ্ন
জনস্বাস্থ্য কেবল সামাজিক সেবা নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্ন। একটি দেশ যখন তার শিশুদের টিকা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, সেই ব্যর্থতার প্রভাব শুধু হাসপাতালে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা শ্রমশক্তি, শিক্ষা, উৎপাদনশীলতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও আঘাত হানে।
রুয়ান্ডা ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো টিকাদান কর্মসূচিকে জাতীয় অগ্রাধিকারে উন্নীত করে স্থায়ী অর্থায়ন ও মাঠপর্যায়ে কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে প্রতিরোধযোগ্য রোগে মৃত্যুহার নাটকীয়ভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার জেকেএন কর্মসূচি সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষার পরিধি বিস্তৃত করেছে; মালয়েশিয়া সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, আর থাইল্যান্ডের ‘৩০ বাত স্কিম’ প্রমাণ করেছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে স্বল্পব্যয়েও বিস্তৃত জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্ভব। প্রশ্নটি সক্ষমতার নয়, রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের।
এই বাস্তবতায় অন্তত চারটি ক্ষেত্রে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
প্রথমত, টিকাদান কর্মসূচি ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে স্থায়ী অর্থায়নের আওতায় আনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জেলা হাসপাতাল, বিশেষায়িত চিকিৎসা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ দরকার—এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বও দেশের হাসপাতালের ওপর আস্থা রাখতে পারেন।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশেরও বেশি ভার যে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে আসে, তা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের কাঁধে স্থানান্তর করতে হবে—কার্যকর স্বাস্থ্য সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
চতুর্থত, ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, বেসরকারি খাতের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল স্বাস্থ্য তথ্যব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া কেবল বাজেট বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
শেষ কথা
স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়। এটি রাষ্ট্রের বৈধতা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং নাগরিক মর্যাদার অন্যতম ভিত্তি। বাংলাদেশে দক্ষ চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্যকর্মীর অভাব নেই। অভাব হলো দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির; স্বচ্ছ, জবাবদিহি, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও পেশাদারত্বের। স্বাস্থ্যকে মৌসুমি প্রতিশ্রুতি হিসেবে নয়; বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় স্থিতিশীলতার কৌশলগত বিনিয়োগ হিসেবে দেখার মানসিকতার।
একটি দেশের প্রকৃত শক্তি তার ক্ষমতাবানদের বিদেশে চিকিৎসা নিশ্চিত করার মধ্যে নয়; বরং তার দরিদ্রতম শিশুটিকেও বাঁচিয়ে রাখার সক্ষমতার মধ্যে। যত দিন কয়েক ডলারের টিকার অভাবে শিশু মারা যাবে, আর ক্ষমতাবানেরা নিরাপত্তার জন্য বিদেশি হাসপাতালের দিকে ছুটবেন, তত দিন বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প নৈতিকভাবে অসম্পূর্ণই থেকে যাবে। এটি দুর্ভাগ্য নয়, এটি অবিচার।
গোলাম রসুল অধ্যাপক অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা।
ই-মেইল: [email protected]
* মতামত লেখকের নিজস্ব