স্পেনের চোখে চোখ রেখে স্বপ্নের ড্র কেপ ভার্দের
· Prothom Alo
স্পেন ০–০ কেপ ভার্দে
আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের বাইরে যখন বিকাল নামছিল, তখন হয়তো কেউ ভাবেননি যে এই দিনটি ইতিহাসের পাতায় আলাদাভাবে লেখা থাকবে। ফুটবলের ইতিহাসে এমন কত দিন এসেছে, যখন ছোটরা বড়দের চোখে চোখ রেখেছে। কিন্তু এভাবে? এত নিখুঁতভাবে!
Visit moryak.biz for more information.
স্পেন বনাম কেপ ভার্দে।
এই বাক্যটি লিখতে গিয়েই কোথাও একটা অস্বস্তি হয়। যেন দুটো শব্দ একসঙ্গে বসানো ঠিক হচ্ছে না। ২০১০ বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন, ২০২৪ ইউরোজয়ী স্পেন বনাম পাঁচ লাখ মানুষের ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র, যারা এবারই প্রথমবার বিশ্বকাপে পা রেখেছে।
ম্যাচটা হলো এবং ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ড ০–০।
গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ালে গোলকিপাররা নাকি নিজের সীমা ও সম্ভাবনা, দুটোই আবিষ্কার করেন। ভোজিনিয়া সেই সীমা ভেঙে দিলেন এই রাতে। বয়স চল্লিশ। কিন্তু যখন তিনি স্পেনের একের পর এক শট থামাচ্ছিলেন, তখন তথ্যটা অবিশ্বাস্য লাগছিল। আসলেই তাঁর বয়স চল্লিশ? ফুটবলে গোলরক্ষকের জন্যও এই বয়সটা ঘরের ছেলে ঘরে ফেরার সময়। কিন্তু গতকাল ভোজিনিয়ার ঘর ছিল সেই গোলপোস্টের নিচেই।
ইয়ামালদের প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দে কেমন দল, চিনে নিনস্পেন ২৭টি শট নিয়েছে। সাতটা সরাসরি গোলমুখে, একটিও গোল নেই। সংখ্যাগুলো পড়লে মনে হয় হয়তো ভুল হয়েছে গণনায়। কিন্তু ভুল হয়নি। যা হয়েছে তা হলো একটি মানুষের এক ম্যাচে সমস্ত অভিজ্ঞতা নিংড়ে দেওয়া।
প্রথমার্ধের শেষ দিকে পরপর তিনটি সেভ—মিকেল ওয়াইরসাবালকে থামানো, এমেরিক লাপোর্তকে থামানো, ফেরান তোরেসকে থামানো। তোরেস ক্রসবারেও লাগালেন। ভোজিনিয়া প্রতিটিতে যেন জানতেন বল কোথায় যাবে। চল্লিশ বছরের শরীরে সতেরো বছরের প্রতিক্রিয়া। দ্বিতীয়ার্ধে মিকেল মেরিনো এলেন। মার্ক কুকুরেয়া এলেন, তারপর ইয়ামালও এবং কিছুই হলো না। কেপ ভার্দের রক্ষণ যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কোনো পরিখার মতো—মাটিতে গভীর, অটল, অপ্রবেশ্য।
স্পেনকে হতাশায় ভাসিয়ে কেপ ভার্দের উদ্যাপনপাঁচ লাখ মানুষের একটা দেশ। আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ছড়িয়ে থাকা দশটা দ্বীপ নিয়ে গঠিত কেপ ভার্দে, বিশ্বকাপের ইতিহাসে জনসংখ্যার বিচারে দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশ। এবারই প্রথম ফুটবলের মহাযজ্ঞে নামল তারা। মাঠে নামার আগে ফুটবল বোদ্ধাদের মনোভাব ছিল সহানুভূতিশীল কিন্তু নিষ্ঠুর—উপভোগ করো, কিন্তু ফলাফলের আশা কোরো না।
কিন্তু বুবিস্তার দলটা আসলে যতটা ভঙ্গুর মনে করা হচ্ছিল, ততটা ছিল না। আফ্রিকার বাছাইপর্বে ক্যামেরুনকে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে এসেছে তারা। বিশ্বকাপের আগে সার্বিয়াকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়েছে প্রস্তুতি ম্যাচে। তাই বলে ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে ড্র?
ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ২০০২ বিশ্বকাপে ১–০ গোলে হারিয়েছিল নবাগত সেনেগাল। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ইতালিকেও একই ব্যবধানে হারিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। এমনকি চার বছর আগে সর্বশেষ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে চমকে দিয়েছিল সৌদি আরব। গতকালের স্পেন ০–০ কেপ ভার্দে ম্যাচটা সেই বিস্ময়ের তালিকায় ঢুকে পড়ল।
স্পেনকে জেতাতে পারেননি ইয়ামালওদ্বিতীয়ার্ধে যখন লামিনে ইয়ামালকে মাঠে নামানো হলো, স্পেনের ডাগআউটে হয়তো একটা স্বস্তির নিশ্বাস পড়েছিল। ১৮ বছর ৩৪২ দিনের এই কিশোর এখন বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ফুটবল প্রতিভা। বাজারমূল্য ২০ কোটি ইউরো। আর কেপ ভার্দের পুরো দলের সম্মিলিত বাজারমূল্য মাত্র ৫ কোটি ৪৪ লাখ ইউরো। কিন্তু ফুটবল মাঠে বাজারমূল্য খেলে না। খেলে পায়ের দক্ষতা আর বুকের সাহস। যে সাহসই জয়ের সমান এক ড্র এনে দিল কেপ ভার্দেকে। সম্ভবত বিশ্বকাপ ইতিহাসেরই অন্যতম স্মরণীয় ড্র।
বিশ্বকাপ অভিষেক হতে যাওয়া কেপ ভার্দের দলে কারা কারাম্যাচ শেষ হওয়ার পর ভোজিনিয়া কাঁদছিলেন। কিছু জিনিস যা পাওয়ার সময় পার হয়ে গেছে বলে মনে হয়, সেটা হঠাৎ এসে পড়লে চোখে জল আসে। এই ম্যাচটা মৃত্যুর আগপর্যন্ত মনে রাখবেন তিনি। আটলান্টার মাঠে গতকাল যেন পুরো কেপ ভার্দে একটা মানুষের হাতের গ্লাভসের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল
জোভানে কাবরাল, জামিরো মন্তেইরো, গ্যারি রদ্রিগেজরা হয়তো স্পেনের তারকাদের মতো নাম করেননি ক্লাব ফুটবলে। কিন্তু এই একটি ম্যাচে তাঁরা প্রমাণ করে গেছেন যে স্বপ্নের মাপ দেশের মানচিত্রের আয়তনে হয় না।
এবং ফুটবল আরেকবার মনে করিয়ে দিল কেন মাঠে নামার আগে কেউ জানে না কী হবে।