কাজলী শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, বদলিয়েছেন অন্যের ভাগ্যও
· Prothom Alo

বিয়ের পর কাজলী বেগম জানতে পারেন, তাঁর স্বামী বেকার। শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখেন, থাকার ঘরও নেই—বৃষ্টির দিনে ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ে, বেড়ায় পলিথিন টাঙানো। এমন দুর্দিনে একসময় তাঁদের সংসার থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়, শুরু হয় অভাব-অনটনের সঙ্গে নিত্য বসবাস।
সেই কাজলী এখন সফল উদ্যোক্তা। গাভির খামার করে বদলে ফেলেছেন নিজের ভাগ্য। জরাজীর্ণ ঘর থেকে এখন তিনি আধা পাকা বাড়ির সঙ্গে ২০ শতাংশ বসতভিটা ও দুই বিঘা জমির মালিক। আছে গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি।
Visit umafrika.club for more information.
কাজলীর বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের পলাশবাড়ী গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের হাসমত আলীর স্ত্রী। গরুর খামার থেকে এখন তিনি মাসে ৩০ হাজার টাকা আয় করছেন। মেধা ও শ্রম দিয়ে তিনি শুধু একার দিন বদলাননি, তাঁর দেখানো পথ ধরে আশপাশের গ্রামের অনেক নারী-পুরুষের জীবন বদলে গেছে।
তারাগঞ্জ সদর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে পলাশবাড়ী গ্রাম। সম্প্রতি ওই গ্রামে ঢুকে কাজলীর বাড়ি খুঁজতেই একজন দেখিয়ে দিলেন। বাড়িতে ঢুকতেই দেখা গেল, কাজলী গাভির দুধ দোহনে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ পর খামার থেকে বালতিভর্তি দুধ নিয়ে বেরিয়ে এলেন তিনি। বাড়ির উঠানে গাছের ছায়ায় বসতে দিলেন।
নিজের খামারের ছাগলকে খাওয়াতে ব্যস্ত কাজলী বেগম। সম্প্রতি রংপুরের তারাগঞ্জের পলাশবাড়ী গ্রামেকাজলীর কাছে তাঁর দিনবদলের গল্প শুনতে চাইলে তিনি তাঁর দিনবদলের গল্প শোনান। তারাগঞ্জের হাজীপুর গ্রামে ১৯৯২ সালে মধ্যবিত্ত পরিবারে তাঁর জন্ম। ৫ বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। দশম শ্রেণিতে উঠলে ২০০৭ সালে তাঁর বিয়ে হয় একই উপজেলার পলাশবাড়ী গ্রামের হাসমতের সঙ্গে। বেকার স্বামীর সংসারে এসে প্রায়ই অনাহারে-অর্ধাহারে থাকতে হতো। এত অভাব, এত দারিদ্র্য তিনি মেনে নিতে পারেননি। একদিন তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, দারিদ্র্যের কাছে হার মানবেন না। এ প্রতিজ্ঞা থেকে তিনি আয়ের উৎস খুঁজে বের করার চেষ্টা করতে থাকেন। ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে স্বামীর সঙ্গে চলে যান ঢাকায়। তিন বছর চাকরি শেষে দেড় লাখ টাকা নিয়ে বাড়িতে ফেরেন।
২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে বদরগঞ্জের হাট থাকে ৯০ হাজার টাকায় সংকর জাতের দুটি বকনা বাছুর কেনেন কাজলী। বছর দুয়েক পর বাছুর দুটি বড় হয়ে বাচ্চা জন্ম দেয়। এর পর থেকে প্রতিদিন ৩০ লিটার দুধ দিতে শুরু করে। এ দুধ বিক্রি করে দিনে প্রায় ৪০০ টাকা আয় হতে থাকে। এভাবে তিন বছরে আরও তিনটি সংকর জাতের গাভি কেনেন। পাঁচটি গাভি দিয়ে শুরু করেন গরুর খামার। বর্তমানে তাঁর খামারে দেশি-বিদেশি ১০টি গরু রয়েছে। প্রতিদিন খামার থেকে ৭৫-৮০ লিটার দুধ পান। দুধ বিক্রি করে দৈনিক এক হাজার টাকা লাভ থাকে। বছরে দুই লাখ টাকার বাছুরও বিক্রি করেন তিনি।
গরুর খামার থেকে আয় হওয়া টাকা দিয়ে কাজলী টিনের ঘরের জায়গায় পাকা বাড়ি করেছেন। তিনি কিনেছেন ৮০ শতক জমি। আত্মনির্ভরশীল কাজলী এলাকাবাসী ও পরিবারের কাছে হয়ে হয়ে উঠেছেন আদর্শ গৃহিণী। নিজের সংসারে সচ্ছলতা আনার পাশাপাশি গ্রামে তাঁর মতো বিপদে পড়া অন্য গৃহবধূর কথাও ভুলে যাননি তিনি। তাঁদেরও পরামর্শ দিয়ে গরু পালনে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর দেখাদেখি কুসা ইউনিয়নের অনেক গৃহবধূ গরু পালন শুরু করেছেন।
শুধু নারীরাই নন, গ্রামের অনেক বেকার তরুণও কাজলীর দেখাদেখি গাভি পালন করে বেকারত্ব ঘুচিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পলাশবাড়ী গ্রামের আইয়ুব হোসেনও আছেন। আইয়ুব বলেন, ‘আগে কাজ না থাকায় অলস সময় কাটিয়েছি। এখন কাজলীর পরামর্শে গাভি পালন করে সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। শুধু আমিই নই, আমাদের গ্রামের অনেকেই কাজলীর কাছে পরামর্শ ও বকনা নিয়ে গাভি পালন করছেন। সেই গাভির দুধ বেচে আমাদের সংসার চলছে।’
বুড়িরহাট গ্রামের এনামুল হক ডিগ্রি পাস করার পর বেকার ঘুরে বেরিয়েছেন ৮ বছর। মাঝখানে তিনি ছোটখাটো ব্যবসাও করেছেন, সুবিধা হয়নি। সব আশা ফুরিয়ে গেলে একদিন কাজলীর বাড়িতে ছুটে যান। পরে ২০২৩ সালে করেন গাভির খামার। দুটি বিদেশি জাতের গাভি দিয়ে শুরু করা এনামুলের খামারে এখন দৈনিক আয় হাজার টাকা। এনামুলের সংসারজুড়ে বাইছে প্রশান্তির হাওয়া।
কাজলীর কাছে অনুপ্রেরণা পেয়ে গাভির খামার করেন ওই গ্রামের মিনারুল ইসলাম। তিনি বলেন, কাজলীর সাফল্য দেখে ৫ বছর আগে আমিও গাভির খামার করেছি। ইতিমধ্যেই খামার লাভজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ৪টি গাভি দিয়ে শুরু করা খামারে এখন ৭টি গাভি আছে। খামারের দুধ বিক্রি করে মাসে খরচ বাদে ৩০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।
কুর্শা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আফজালুল হক বলেন, কাজলী পরিশ্রমী গৃহবধূ। তাঁর হাত ধরে কুর্শা ইউনিয়নের অনেকেই দারিদ্র্যর অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
এ ব্যাপারে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ইফতেখার মাহমুদ বলেন, ‘কাজলীর খামার ও তাঁর কার্যক্রম আমি দেখেছি। তিনি একজন দক্ষ খামারি। নিজের সন্তানের মতো গাভিগুলোর পরিচর্যা করেন। তাঁকে দেখে গ্রামের অনেক নারী-পুরুষ গাভি পালনে উৎসাহিত হচ্ছেন।’