বিশ্বকাপের জুলে রিমে ট্রফি বনাম ফিফা ট্রফি
· Prothom Alo

অসংখ্য নাটকীয় ম্যাচ, কালজয়ী গোল আর কিংবদন্তি ফুটবলারের জন্ম দিয়েছে বিশ্বকাপ। তবে এই মহাযজ্ঞের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত প্রতীক সেই সোনালি ট্রফি, যার জন্য চার বছর ধরে অপেক্ষা করে পুরো ফুটবল বিশ্ব। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক ফুটবল–সমর্থক দাবি করছেন, ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিজয়ীরা যে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন, সেটি নাকি বিশ্বকাপ ট্রফি নয়; সেটি জুলে রিমে ট্রফি। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। কারণ, শুরুতে বিশ্বকাপের ট্রফির নাম জুলে রিমে ছিল না; এই নামকরণ হয়েছে অনেক পরে।
১৯০৪ সালে মাত্র আটটি দেশ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। সদস্যসংখ্যা বাড়তে থাকলেও ১৯১৪ সালে শুরু হওয়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংগঠনটির কার্যক্রমকে বড় ধাক্কা দেয়। যুদ্ধ শেষে ১৯২১ সালে ফিফার সভাপতি হন ফরাসি ফুটবল সংগঠক জুলে রিমে। বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি নিরলসভাবে কাজ শুরু করেন। প্রায় ৯ বছরের প্রচেষ্টার পর ১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্বকাপ।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
সেই আসরের নাম ছিল ‘ওয়ার্ল্ড কাপ’ বা ফরাসি ভাষায় ‘কোপে দো মন্দে’। আয়োজনটি মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ব্যয় বহনে অনাগ্রহী ছিল ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ। শেষ পর্যন্ত জুলে রিমের প্রচেষ্টায় আসর শুরুর মাত্র দেড় মাস আগে আরও কয়েকটি দেশ অংশগ্রহণে রাজি হয়। মোট ১৩টি দল নিয়ে শুরু হয় প্রথম বিশ্বকাপ।
সে সময় ট্রফিটির নাম ছিল ‘ভিক্টোরি’। গ্রিক বিজয়ের দেবী নাইকির আদলে এটি তৈরি করা হয়েছিল। ফলে আসরের নাম ছিল ওয়ার্ল্ড কাপ, আর ট্রফির নাম ছিল ভিক্টোরি।
১৯৩৪ ও ১৯৩৮ সালে সফলভাবে আরও দুটি বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হলেও ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আবারও ফুটবল-বিশ্বকে সংকটে ফেলে। যুদ্ধ শেষে অনেক দেশ পুনর্গঠনের কাজে ব্যস্ত থাকায় ফিফার অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়ে। কিন্তু জুলে রিমের নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতায় ফিফা দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়।
এই অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৪৬ সালে ফিফার সদস্যদেশগুলো সিদ্ধান্ত নেয়, বিশ্বকাপের ট্রফির নাম হবে ‘জুলে রিমে ট্রফি’। এরপর আগের আসরগুলোসহ ট্রফিটি এই নামেই পরিচিতি পায়। নিয়ম ছিল, কোনো দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিতলে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখতে পারবে। ১৯৭০ সালে তৃতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়ে ব্রাজিল সেই অধিকার অর্জন করে।
জুলে রিমে ট্রফির ইতিহাসে রয়েছে নানা নাটকীয় ঘটনা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্রফিটি নিরাপদ রাখতে ইতালির ফুটবল কর্মকর্তারা সেটি একটি জুতার বাক্সে ভরে মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছিলেন। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের আগে একটি প্রদর্শনী থেকে ট্রফিটি চুরি যায়। সাত দিন পর ‘পিকলস’ নামের একটি কুকুর সেটি খুঁজে বের করে এবং বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়।
ট্রফি উদ্ধারের পর প্রদর্শনীর জন্য ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন জুলে রিমে ট্রফির একটি হুবহু প্রতিরূপ তৈরি করে। কিন্তু ১৯৮৩ সালে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে আসল জুলে রিমে ট্রফি চুরি হয়ে যায়। আজও সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ধারণা করা হয়, চোরেরা ট্রফিটি গলিয়ে ফেলেছিল।
ব্রাজিলকে ট্রফিটি স্থায়ীভাবে দেওয়ার পর ফিফা নতুন ট্রফি তৈরির উদ্যোগ নেয়। ইতালীয় ডিজাইনার সিলভিও গাজানিকার নকশায় তৈরি হয় বর্তমান ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ ট্রফি’। খাঁটি সোনার তৈরি এই ট্রফির উচ্চতা ৩৬ সেন্টিমিটার ও ওজন প্রায় ৫ কেজি। এর ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে ম্যালাকাইট দিয়ে। ১৯৭৪ সাল থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপজয়ী দলের নাম ট্রফির নিচে খোদাই করা হচ্ছে।
ফিফার কঠোর নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার, কোচিং স্টাফ, ফিফার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রপ্রধান ছাড়া অন্য কেউ এই ট্রফি হাতে নিতে পারেন না। তাই ইতিহাস বলছে, জুলে রিমে ট্রফিও বিশ্বকাপ—দুটি আলাদা নয়; বরং বিশ্বকাপের ইতিহাসেরই দুটি ভিন্ন অধ্যায়।
*লেখক: অনিক সরকার: ফুটবলপ্রেমী