জসীমউদ্‌দীনের সাম্প্রতিক পাঠ

· Prothom Alo

কুদরত-ই-হুদা জসীমউদ্‌দীন: আধুনিকতা ছাড়িয়ে নামের যে পুস্তক সম্প্রতি প্রচার করেছেন, তার নামের মধ্যেই কালের একটি ইশারা আছে। কবি জসীমউদ্‌দীন লেখালেখি করেছেন ঘোরতর আধুনিকতাবাদী কাব্যচর্চার কালে। তাঁর মূল্যায়ন ও পর্যালোচনার একটি বড় অংশও সেই নান্দনিক আবহের মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে আধুনিকতাবাদী নন্দনতত্ত্বের নানামাত্রিক সমালোচনা-পর্যালোচনা শুরু হওয়ার পরে এবং বিশেষত উত্তর–আধুনিক নামধারী বেশ কিছু সাহিত্য-আন্দোলন দানা বাঁধলে জসীমউদ্‌দীন নতুন জ্ঞানদৃষ্টির আভায় বেশ কতকটা নতুনভাবে পঠিত হতে শুরু করে। কুদরত-ই-হুদার বইয়ে গত কয়েক দশকের নতুন চর্চার পরিষ্কার সাক্ষ্য আছে। ‘আধুনিকতা ছাড়িয়ে’ কথাটা সে চিহ্ন বহন করছে। তবে সে বিষয় আরেকটু বিশদ করার আগে বইটির সূচিপত্রে নজর দেওয়া যাক।

Visit freshyourfeel.org for more information.

জসীমউদ্‌দীন: আধুনিকতা ছাড়িয়ে বইয়ে ‘প্রস্তাবনা’ ও ‘উপসংহার’ বাদ দিয়ে ১০টি অধ্যায় আছে। অধ্যায়গুলোর নামকরণে বেশ কতকটা নাটকীয়তা আছে। নামগুলো সুন্দর, অর্থবহ এবং বইয়ের জ্ঞানগত অভিপ্রায়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। যেমন ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’, ‘কবি ও কবিতার কথা’, ‘সে ভাষা ভুলিয়া গেছি’, ‘পদ্মাপারের গানের মুরশিদ’ ইত্যাদি। বইয়ের প্রথম দুই অধ্যায়ে সরস ভাষায় কবির জীবনকথা বলা হয়েছে; তবে তা সাহিত্যিক জীবনী। যে আবহের মধ্যে জসীমউদ্‌দীনের মতো স্বতন্ত্র মাত্রার বড় কবি জন্মান বলে লেখক মনে করেন, তার নিরিখেই তিনি জীবনকথার অনুষঙ্গগুলো বাছাই করেছেন। অধ্যায় দুটির বিশেষ তাৎপর্য এই যে এরা শুধু কবির জীবন ও সাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্কিত জীবনাংশের খবর দেয় না; যে ভিত্তির ওপর বইটি দাঁড়িয়ে আছে, তার বনিয়াদও গড়ে দেয়।

`জসীমউদ্‌দীন: আধুনিকতা ছাড়িয়ে' বইয়ের প্রচ্ছদ
তবে এ বইয়ের প্রধান তাত্ত্বিক প্রস্তাব সবচেয়ে ভালোভাবে এবং প্রত্যক্ষভাবে ঘোষিত হয়েছে তৃতীয় ও নবম অধ্যায়ে। শিরোনাম থেকেই তার আভাস পাওয়া যায়, ‘সে ভাষা ভুলিয়া গেছি’ এবং ‘বাংলা সাহিত্যচিন্তা: যমুনার উজান স্রোত’। তৃতীয় অধ্যায়ে লেখক দেখিয়েছেন, পুরোনো বাংলা সাহিত্যের ভাষা উপনিবেশায়নের প্রচণ্ড চাপের মধ্যে প্রাত্যহিক সাহিত্যচর্চার মূলধারা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। জসীমউদ্‌দীন খুব সচেতনভাবে সে ধারা অবলম্বন করেছেন।

কয়েকটি অধ্যায় জসীমউদ্‌দীনের বিভিন্ন ধরনের সাহিত্যকৃতীকে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে পাঠ ও পর্যালোচনা করেছে। যেমন ‘নাটকে স্বতন্ত্র রাস্তার ইশারা ও দ্বিধা-দ্বৈরথ’, বাঙালির হাসির গল্পে ‘ভদ্দরলোকী’ ‘অনুপ্রবেশ’ ইত্যাদি। এর মধ্যে চতুর্থ অধ্যায়ে ‘পদ্মাপারের গানের মুরশিদ’ শিরোনামের আলোচনা বিশেষভাবে মূল্যবান। গান নিয়ে জসীমউদ্‌দীনের লিপ্ততা ও গানময় যাপনের বিশদ পরিচয় দিয়ে লেখক দাবি করেছেন, কবির কাব্যসাফল্যের একটি প্রধান উৎস গানের সঙ্গে গভীর সংশ্লিষ্টতা। আরও অগ্রসর হয়ে তিনি বলতে চেয়েছেন, গানের নিরিখ ব্যবহার করে জসীমউদ্‌দীনের কবিতা পড়লে যথার্থ ফল ফলবে। গ্রন্থকারের এ দাবি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। জসীমউদ্‌দীনের কবিতা প্রধানত কাহিনিময়; আর কাহিনি অধিকতর গদ্যাত্মক, এমনকি যখন কাব্যাকারে বর্ণিত হয়, তখনো। কাজেই ন্যারেটিভ বা বয়ানসংক্রান্ত যে বিপুল পাঠকাঠামো গত ১০০ বছর ধরে দুনিয়াজুড়ে বিকশিত হয়েছে, এসব কবিতা তার নিরিখে পাঠ করলে অধিকতর ফলপ্রসূ হওয়ার কথা। গীত বা গীতিধর্মিতা বিষয়ে হুদার অভিপ্রায়ের একটি সুরাহা এভাবে হতে পারে যে কাহিনিকাব্যের মধ্যেও জসীমউদ্‌দীনের কবিতার সুর ও স্বর বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে তাঁর গানলিপ্ততা বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষত, যে ধরনের গানে তাঁর আগ্রহ ছিল, সেগুলোর মাটিলগ্ন সুর ও যাপিত জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার কথা মনে রাখলে হুদার প্রস্তাবের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যাবে।

তবে এ বইয়ের প্রধান তাত্ত্বিক প্রস্তাব সবচেয়ে ভালোভাবে এবং প্রত্যক্ষভাবে ঘোষিত হয়েছে তৃতীয় ও নবম অধ্যায়ে। শিরোনাম থেকেই তার আভাস পাওয়া যায়, ‘সে ভাষা ভুলিয়া গেছি’ এবং ‘বাংলা সাহিত্যচিন্তা: যমুনার উজান স্রোত’। তৃতীয় অধ্যায়ে লেখক দেখিয়েছেন, পুরোনো বাংলা সাহিত্যের ভাষা উপনিবেশায়নের প্রচণ্ড চাপের মধ্যে প্রাত্যহিক সাহিত্যচর্চার মূলধারা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। জসীমউদ্‌দীন খুব সচেতনভাবে সে ধারা অবলম্বন করেছেন। এটা তাঁর পক্ষে সাফল্যের সঙ্গে করা সম্ভব হয়েছে এ কারণে যে গ্রামীণ জনপদ, যাপন ও যাপনের ভাষার যে সংযোগস্থলে তাঁর জীবন ও কাব্য বাসা বেঁধেছে, সেখানে বাংলার ঐতিহ্যগত কাব্যভাষার সংস্থান রয়েই গিয়েছিল।

যে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কুদরত-ই-হুদা এ দুই অধ্যায় লিখেছেন, সেগুলো পূর্ববর্তী গবেষক-সমালোচকদের সামনেও হাজির ছিল; কিন্তু সেগুলোকে প্রত্যয়ের সঙ্গে সামনে নিয়ে এসে বিবেচনার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার ঘটনা তখন ঘটেনি। ঠিক এ অর্থেই লেখার শুরুতে বলেছিলাম, হুদার বইটি সাম্প্রতিক প্রবণতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সাক্ষ্য বহন করছে।

তিনি তাঁর প্রতিভাবলে সে ভাষাকে কেবল অনুসরণই করেননি, নতুন জীবনও দান করেছেন। নবম অধ্যায়ের সাহিত্যচিন্তা বিষয়ক আলোচনাটিকে বলা যায় তৃতীয় অধ্যায়ের পরিপূরক। এ অধ্যায় বেশ জোর দিয়ে দেখিয়েছে, জসীমউদ্‌দীনের কাব্যভাষা ও প্যাটার্ন কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় বা অগতির গতি নয়; বরং সাহিত্যতাত্ত্বিক সিদ্ধান্তের পরিণতিতে এটি এক সবল-সামর্থ্যবান প্রতিবাদ।

যে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে কুদরত-ই-হুদা এ দুই অধ্যায় লিখেছেন, সেগুলো পূর্ববর্তী গবেষক-সমালোচকদের সামনেও হাজির ছিল; কিন্তু সেগুলোকে প্রত্যয়ের সঙ্গে সামনে নিয়ে এসে বিবেচনার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার ঘটনা তখন ঘটেনি। ঠিক এ অর্থেই লেখার শুরুতে বলেছিলাম, হুদার বইটি সাম্প্রতিক প্রবণতা ও দৃষ্টিভঙ্গির সাক্ষ্য বহন করছে।

দীনেশচন্দ্র সেন জসীমউদ্‌দীন পড়ার উপভোগমূলক ধারার যে বর্ণাঢ্য সূচনা করেছিলেন, সুনীলকুমার মুখোপাধ্যায়ের বইটিকে বলতে পারি সে ধারার পরিণতি। পরবর্তী প্রজন্মে আবু হেনা মোস্তফা কামাল, আবদুল মান্নান সৈয়দ ও হুমায়ুন আজাদের মতো মেধাবী সমালোচকেরা জসীমউদ্‌দীন নিয়ে লিখেছেন। এ প্রজন্মের অন্যতম উদ্বেগ ছিল আধুনিকতার ছাঁচের মধ্যে জসীমউদ্‌দীনকে খাপ খাওয়াতে পারা। আগেই বলেছি, গত শতকের নব্বইয়ের দশকে এ উদ্বেগের আংশিক অবসান ঘটে; আর একুশ শতকের গোড়ায় জসীমউদ্‌দীনের জন্মশতবর্ষে সলিমুল্লাহ খান, ফরহাদ মজহারসহ বেশ কয়েকজন সমালোচকের রচনায় জসীমচর্চা সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়। কুদরত-ই-হুদার জসীমউদ্‌দীন: আধুনিকতা ছাড়িয়ে বইটিকে খানিকটা উচ্চাভিলাষী হয়ে এ ধারার একটি পরিণতি হিসেবে সাব্যস্ত করতে পারি।

তবে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি অঙ্গীকার করলেও বইটিতে বিশদ পাঠ অনুপস্থিত। নিশ্চয়ই লেখক নিজে বা অন্য কেউ সে কাজে অগ্রসর হবেন। তা ছাড়া গত শতকে বিকশিত বিচিত্র পাঠপদ্ধতি অবলম্বনে জসীমউদ্‌দীন পাঠ তো এখনো উপেক্ষিতই থেকে গেল। আলোচ্য বইয়ের অন্যতম গুরুত্ব এই যে সে ধরনের পাঠের প্ররোচনা জাগাতে পারে, এমন বেশ কিছু উপাদান এ বইতে আছে।

  • জসীমউদ্দীন: আধুনিকতা ছাড়িয়ে
    কুদরত–ই–হুদা

    প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
    প্রকাশকাল : অক্টোবর ২০২৫
    প্রচ্ছদশিল্পী : মাসুক হেলালের স্কেচ অবলম্বনে আনিসুজ্জামান সোহেল
    পৃষ্ঠা : ১৯২; মূল্য : ৪২৫ টাকা

Read full story at source