ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা: আমাদের পাড়ার দুই দূরদেশ

· Prothom Alo

এক হাতে ধোঁয়া ওঠা প্রেশার কুকার। পরনে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা ১০ নম্বর জার্সি। তিস্তার পাড় ধরে প্রাণপণে ছুটছে ঢাকাইয়া রিটন। পেছনে আমরা কয়েকজন। কেউ ডাকছি, ‘রিটন থাম!’ কেউ বলছি, ‘দোস্ত, এত সিরিয়াস হওয়ার কী আছে!’ কিন্তু রিটন তখন অন্য জগতে। কোপা আমেরিকার ফাইনালে আর্জেন্টিনা হেরেছে। তার মুখের গভীর অভিমান দেখে মনে হচ্ছিল, পরাজয়টা বুয়েনস এইরেসে নয়, ঘটেছে তার নিজের বাড়ির উঠোনে। দৌড়াতে দৌড়াতে সে শুধু একটাই কথা বলছিল, ‘কোনো হালায় আর্জেন্টিনার খাসি খাইবার পাইবো না!’

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ফুটবল বিশ্বকাপ বা বড় কোনো টুর্নামেন্ট এলেই এই ঘটনাটা মনে পড়ে। একা একা হাসি। আবার একই সঙ্গে একধরনের ধূসরতা ছুঁয়ে যায়। হাজার হাজার মাইল দূরের একটা দেশের হারে আমার দেশের মানুষের এত উন্মাদনা হয় কী করে?

আসলে এই তরিকার প্রশ্ন করাই ভুল। বাংলাদেশের মানুষের ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা সমর্থন কখনোই শুধু ৯০ মিনিটের ফুটবলে সীমাবদ্ধ নয়। এটা একধরনের যৌথ যাপনের ফুটবলীয় স্মৃতি, যা আমাদের ধূসর পথচলাকেই মনে করিয়ে দেয়। আজ ক্রিকেটের তুমুল চাপে এ দেশে ফুটবল কিছুটা কোণঠাসা। ঢাকার মাঠে আগের মতো সারা বছর ঘরোয়া ফুটবলের উন্মাদনা নেই। অথচ এই ফুটবলকে কেন্দ্র করেই বাঙালির যৌথ যাপনের দ্বন্দ্বগুলো একসময় কী প্রাঞ্জলভাবে ফুটে উঠত! ফুটবলকে কেন্দ্র করেই তো ঢাকা আর কলকাতার পাড়াকেন্দ্রিক নাগরিক নান্দনিকতা গড়ে উঠেছিল। সেই দিন গত হয়েছে। এখন, বিশেষত ঢাকায়, পাড়াকেন্দ্রিক কোনো নান্দনিকতার রেশ আছে বলে জানা নেই।

আমাদের মিলেনিয়াল প্রজন্মটা বড় হয়েছিল এক বিচিত্র সমান্তরাল ভূগোল নিয়ে। একটা ছিল স্কুলের পাঠ্যবইয়ের মানচিত্র, আরেকটা আমাদের কল্পনার মানচিত্র। বইয়ের ভূগোলে রাজধানী ছিল বুয়েনস এইরেস। কিন্তু আমাদের মনোজগতের রাজধানী শাসন করতেন পেলে, ম্যারাডোনা, রোনালদো আর বাতিস্তুতা। তখন ইন্টারনেট ছিল না, হাই-ডেফিনিশন স্ক্রিন ছিল না। ছিল বিটিভির ঝিরঝিরে পর্দা, রেডিওর উত্তেজিত কণ্ঠ আর পরদিনের খবরের কাগজের খেলার পাতা।

দিনবদলের এই হাওয়াটা কিন্তু বড় অদ্ভুত। অতীতে এই দ্বন্দ্বে যে ক্ল্যাসিক পরিমিতিবোধ ছিল, নব্বইয়ের দশকে এসে তাতে যুক্ত হলো তীব্র কাদা–ছোড়াছুড়ি আর কড়া খিস্তিখেউড়। সমর্থন তখন মাঝে মাঝেই রূপ নিত এক জেদি আক্রোশে; দল হারলে প্রতিবেশীর মুখ দেখাদেখি বন্ধ। এমনকি বুড়িমার চকলেট বোম ফাটানো থেকে হাতাহাতি পর্যন্ত গড়াত। আর আজ? আজকের এই ডিজিটাল স্ক্রিনের যুগে এসে সেই উগ্রতা হয়তো একটু থিতিয়েছে, কিন্তু তার জায়গায় ভর করেছে ভাসা-ভাসা ভালো লাগা। খেলাটার ভেতরের রসটুকু উপভোগ করার চেয়ে চটজলদি একটা ‘ট্রল ম্যাটেরিয়াল’ খোঁজাটাই যেন এখনকার জেন–জির মূল ট্রেন্ড।

কিন্তু ভেবে দেখুন, সময়টা তো আসলে বৃত্তাকার। কালকের সেই রেডিওর কানঘেঁষা শ্রোতাটাই আজকের ফেসবুকের রিল স্ক্রল করা মানুষ। প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু ওই অলৌকিক ঘোরের নকশাটা বদলায়নি। প্রতিটি প্রজন্মের উন্মাদনার নিজস্ব একটা ভাষা থাকে, যা শেষমেশ এই চিরচেনা পাগলামিটাকেই টিকিয়ে রাখে। বাঙালির যৌথ যাপনের সেই ধারাটাই ফুটবলের মাধ্যমে এখনো ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে।

আমাদের মিলেনিয়াল প্রজন্মটা বড় হয়েছিল এক বিচিত্র সমান্তরাল ভূগোল নিয়ে। একটা ছিল স্কুলের পাঠ্যবইয়ের মানচিত্র, আরেকটা আমাদের কল্পনার মানচিত্র। বইয়ের ভূগোলে রাজধানী ছিল বুয়েনস এইরেস। কিন্তু আমাদের মনোজগতের রাজধানী শাসন করতেন পেলে, ম্যারাডোনা, রোনালদো আর বাতিস্তুতা। তখন ইন্টারনেট ছিল না, হাই-ডেফিনিশন স্ক্রিন ছিল না। ছিল বিটিভির ঝিরঝিরে পর্দা, রেডিওর উত্তেজিত কণ্ঠ আর পরদিনের খবরের কাগজের খেলার পাতা। কিন্তু সেই সীমিত আয়োজনেই আমরা ফুটবলের ক্ল্যাসিক যুগটা দেখে ফেলেছিলাম।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ক্যানিজিয়ার বাতাসে ওড়া সোনালি চুল, ওর্তেগার চতুর ড্রিবলিং, ভেরনের চোখের সেই চেনা জেদ—সব মিলিয়ে সে এক ভিন্ন উপাখ্যান। পরে এলেন লিওনেল মেসি। ছোটখাটো, বিষণ্ন চোখের এক জাদুকর। বাংলাদেশের অগণিত মানুষ বছরের পর বছর তাঁর জন্য অপেক্ষা করেছে; শুধু একটা ট্রফির খোঁজে নয়, একটা মহাকাব্যিক গল্পের যোগ্য সমাপ্তি দেখার ব্যাকুলতায়।

পেলে তখন রূপকথার রাজপুত্র। তাঁকে আমরা সরাসরি খেলতে দেখিনি, কিন্তু মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতাম; ঠিক যেমন মানুষ কোনো প্রাচীন বীরের গল্পকে অবলীলায় সত্য বলে মেনে নেয়। ম্যারাডোনা ছিলেন তার উল্টো। তিনি ছিলেন জাগতিক বিস্ময়, এক চিরদ্রোহী শিল্পীর নাম। তারপর এক বিকেলে আমাদের কৈশোরে এল রোমারিও আর বেবেতোর সেই বিখ্যাত ‘রকিং দ্য বেবি’ উদ্‌যাপন। এল সেই এল ফেনোমেনা রোনালদো, যাঁর গতি দেখলে মনে হতো ঈশ্বর নিজেই বুঝি ভিডিওর ফরওয়ার্ড বাটন চেপে ধরেছেন। রবার্তো কার্লোসের সেই অলৌকিক বাঁক নেওয়া ফ্রি-কিক দেখে আমরা তাহের স্যারের পদার্থবিজ্ঞানের চেনা সূত্রগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলাম।

আর রোনালদিনিও? তিনি তো শুধু ফুটবল খেলতেন না, মাঠে এক চিরসবুজ বসন্তের জন্ম দিতেন। খেলাটাকে এক চরম সুখানুভূতিতে রূপ দেওয়া সেই জাদুকর হাসতে হাসতে এমন সব অবিশ্বাস্য কাণ্ড করতেন, যা ফুটবলীয় ব্যাকরণকে বুড়ো আঙুল দেখাত। বল যখন তাঁর পায়ে আসত, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররাও যেন থমকে দাঁড়িয়ে এক অপার্থিব সুন্দরের সাক্ষী হতেন। তিনি মাঠটাকে বানিয়েছিলেন নিজের ক্যানভাস, যেখানে ফুটবল হয়ে উঠেছিল শুদ্ধ আনন্দ আর খাঁটি শিল্প।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে ক্যানিজিয়ার বাতাসে ওড়া সোনালি চুল, ওর্তেগার চতুর ড্রিবলিং, ভেরনের চোখের সেই চেনা জেদ—সব মিলিয়ে সে এক ভিন্ন উপাখ্যান। পরে এলেন লিওনেল মেসি। ছোটখাটো, বিষণ্ন চোখের এক জাদুকর। বাংলাদেশের অগণিত মানুষ বছরের পর বছর তাঁর জন্য অপেক্ষা করেছে; শুধু একটা ট্রফির খোঁজে নয়, একটা মহাকাব্যিক গল্পের যোগ্য সমাপ্তি দেখার ব্যাকুলতায়।

এই দেশের মানুষ যখন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে চিল চিৎকার করে, তখন তারা আসলে কোনো আধুনিক ট্যাকটিস নিয়ে বিতর্ক করে না। তারা মূলত বিতর্ক করে নিজেদের ফেলে আসা ধূসর স্মৃতি নিয়ে। নিজেদের তীব্র স্মৃতি আর হারিয়ে যাওয়া চঞ্চল দিনগুলোর খোঁজে। তারা অবচেতনেই ফিরে যায় মাস্টার বাড়ির উঠোন আর পুরোনো পাড়ার মোড়ে।

মজার ব্যাপার হলো, এই মানুষদের কেউ কোনো দিন আমাদের চেনেওনি। পেলে জানতেন না কুড়িগ্রামের কোনো এক কিশোর তাঁর ছবি লুকিয়ে নিজের খাতার মলাটে লাগিয়েছে। ম্যারাডোনা জানতেন না বাংলাদেশের কোনো দূরগ্রামে তাঁর সুস্থতার জন্য জায়নামাজে বসে মোনাজাত করা হয়েছে। মেসিও হয়তো পুরোপুরি জানেন না, তাঁর সেই কাঙ্ক্ষিত রাতে এই দেশের মাঝবয়সী পুরুষেরা কীভাবে শিশুর মতো কেঁদেছিল।

তবু এই একপক্ষীয় দায়বদ্ধতার সম্পর্কটা টিকে গেছে। আজও টুর্নামেন্ট এলে এই দেশের চেনা আবহ পরিবর্তন হয়ে যায়। ছাদের ওপর আকাশছোঁয়া বাঁশের মাথায় পতাকা ওড়ে। চায়ের দোকানে বাড়ে প্লাস্টিকের চেয়ারের ভিড়। মধ্যরাতে গোল হলে নিস্তব্ধ পাড়া একলহমায় গ্যালারি হয়ে জেগে ওঠে। গম্ভীর চাকরিজীবী কিংবা হিসাবি ব্যবসায়ীও কয়েক সপ্তাহের জন্য লাতিন ফুটবলের চুলচেরা বিশ্লেষক বনে যান।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, আধুনিক ফুটবল এখন করপোরেট সংস্কৃতির দখলে। খেলাটা এখন অনেক বেশি বৈজ্ঞানিক, হিসাবি, যান্ত্রিক। খেলোয়াড়েরা এখন কেবল অ্যাথলেট নন, বহুজাতিক ব্র্যান্ডের প্রতিনিধি। হয়তো কথাটা সত্যি। কিন্তু এই দেশের মানুষ যখন ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা নিয়ে চিল চিৎকার করে, তখন তারা আসলে কোনো আধুনিক ট্যাকটিস নিয়ে বিতর্ক করে না। তারা মূলত বিতর্ক করে নিজেদের ফেলে আসা ধূসর স্মৃতি নিয়ে। নিজেদের তীব্র স্মৃতি আর হারিয়ে যাওয়া চঞ্চল দিনগুলোর খোঁজে। তারা অবচেতনেই ফিরে যায় মাস্টার বাড়ির উঠোন আর পুরোনো পাড়ার মোড়ে।

এই কারণেই আজও খেলার রাতে আমি ঢাকাইয়া রিটনের কথা ভাবি। সে এখন পুরোদস্তুর সংসারী। সংসারের জটিল হিসাব মেলায়। তবু আমি জানি, তার অবাধ্য ভেতরের মানুষটায় আজও একটা ওর্তেগা বেঁচে আছে। পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে আর্জেন্টিনা যদি আবার হেরে যায়, তবে তিস্তার বাতাসে আজও আমি সেই চিরচেনা অভিমানী চিৎকারটা শুনতে পাই, ‘আর্জেন্টিনার খাসি…’

কারণ, ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনা তো কেবল দুটো দেশের মানচিত্র নয়। এ দেশের মানুষের কাছে তারা বহুদিন ধরেই স্মৃতির উঠোন। সফেদ বন্ধুত্ব আর যৌথ যাপনের অন্য এক নাম।

Read full story at source