এআই বদলে দিচ্ছে দুনিয়া, যা দেখছি দক্ষিণ কোরিয়াতে

· Prothom Alo

দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে সেজং ইউনিভার্সিটির ‘সিস-কোর ল্যাবে’ কম্পিউটার ও সাইবার নিরাপত্তা গবেষক হিসেবে কাজ করার সুবাদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক নীরব বিপ্লব খুব কাছ থেকে দেখছি। এখানকার চাকরির বাজারে এআই এখন কেবল কোনো প্রযুক্তি নয়, অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি। ডেটা অ্যানালিসিস, কোডিং থেকে শুরু করে স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তা বলয় তৈরিতে এআই মানুষের কাজের গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এই রূপান্তর যেমন নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলছে, তেমনি প্রথাগত অনেক চাকরিকে ঝুঁকিতেও ফেলছে। এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকতে হলে শুধু ডিগ্রি নয়, এআইয়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেকে দক্ষ করে তোলার কোনো বিকল্প নেই।

এআই বদলে দিচ্ছে কোরিয়া

Visit turconews.click for more information.

সিউলে বসবাস করতে গিয়ে এআইয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি টের পাই দৈনন্দিন জীবনেই। বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই মুঠোফোনে দেখা যায় কোন বাস ঠিক কত মিনিট পরে স্টপেজে পৌঁছাবে, গন্তব্যে যেতে কত সময় লাগবে, এমনকি বাসে ভিড় কতটা, সেটিও জানা যায়। মেট্রোর ক্ষেত্রেও একই অভিজ্ঞতা—কোন ট্রেন কখন আসবে, কখন গন্তব্যে পৌঁছাবে, সবকিছু এতটাই নির্ভুল যে অনেক সময় এক মিনিটও এদিক-সেদিক হয় না। শহরের বিভিন্ন স্থানে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হয়, ফলে যানবাহনের চাপ অনুযায়ী সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। এমনকি অনলাইন কেনাকাটায়ও এআইয়ের ব্যবহার চোখে পড়ার মতো, সেবাদাতা কোম্পানিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে গ্রাহককে ঠিক তার প্রয়োজনীয় পণ্যটাই সঠিক সময়ে দেখাচ্ছে, মনে হয় যেন তারা গ্রাহকের মনের কথা পড়তে পারছে। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এআইভিত্তিক শিক্ষা দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, আর শিল্পকারখানা, সেমিকন্ডাক্টর, লজিস্টিকস ও রপ্তানি খাতে এআই ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো হচ্ছে। ফলে এখানে এআইকে শুধু একটি প্রযুক্তি হিসেবে নয়, অর্থনীতি, শিক্ষা ও জনসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা শুরু হয়েছে।

এআই বদলে দিচ্ছে কাজের ধরন

কর্মক্ষেত্রে এখন নীরবে এআই সহকর্মী ঢুকে পড়েছে। তার কোনো চেয়ার নেই, বেতন নেই, ছুটিও লাগে না। সে কখনো লিখে দেয় খসড়া, কখনো মিটিংয়ের সারাংশ বানায়, কখনো কোড দেখে, কখনো গ্রাহকের প্রশ্নের জবাব সাজিয়ে দেয়। এই সহকর্মীর নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। যে কাজ সম্পন্ন করতে মাত্র কয়েক বছর আগেও তিনজনের এক বিকেল লাগত, এখন সেটি মাত্র একজন কর্মী মাত্র দুই-তিন ঘণ্টায় করে ফেলছেন। ফলে চাকরির বাজারে এক অদ্ভুত দৃশ্য সৃষ্টি হয়েছে, একই প্রযুক্তি একই সঙ্গে দুটি বিপরীত কাজ করছে। কোথাও মানুষ চাকরি হারাচ্ছে আবার কোথাও নতুন চাকরির সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। অফিসে রিপোর্টের খসড়া, ই-মেইলের জবাব, কোডিং—সবকিছুই দ্রুত হচ্ছে। সহকর্মীর চাইতেও কো-পাইলট, চ্যাটজিপিটি বা ক্লডের মতো লার্জ-ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলোর ওপর নির্ভরতা কয়েক গুণ বেশি। কিন্তু দ্রুত গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনিশ্চয়তা আর নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিও বেড়ে চলেছে। চারদিকে রব উঠেছে চাকরির বাজার ধ্বংস করে দেবে এআই।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে চাকরির বাজারে ২২ শতাংশের মতো বড় ধরনের রদবদল হবে; ৯ কোটি ২০ লাখের বেশি বিদ্যমান চাকরির ভূমিকা বিলুপ্ত বা রূপান্তরিত হতে পারে, তবে ১৭ কোটি নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। তবে কর্মসংস্থান বাড়লেও একই সঙ্গে ৩৯ শতাংশ চাকরির ভূমিকার দক্ষতা বদলে যাবে। আইএমএফ বলছে, বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ চাকরিতে এআইয়ের প্রভাব পড়বে! হয়তো চাকরির ভূমিকা পরিবর্তন হবে নয়তো দক্ষতা বদলে যাবে। মাইক্রোসফট-লিঙ্কডইনের জরিপে ৭৫ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন তাঁরা তাঁদের কাজের জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছেন। আবার ৬৬ শতাংশ ইন্ড্রাস্ট্রি লিডার এআই দক্ষতাকে নিয়োগের শর্ত হিসেবে দেখছেন। লিঙ্কডইনের হিসাবে ২০৩০ সালের মধ্যে অধিকাংশ চাকরির ব্যবহৃত দক্ষতার ৭০ শতাংশ বদলে যাবে। অ্যানথ্রপিকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, এআইয়ের বাস্তব ব্যবহার এখনো তার সম্ভাব্য সক্ষমতার তুলনায় সীমিত। চাকরি থাকবে কি থাকবে না—এই প্রশ্নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘এআইয়ের যুগে মানুষের কোন দক্ষতার দাম বাড়বে? অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার হিসেবে, এআই-প্রভাবিত কাজেও ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা প্রক্রিয়া, যোগাযোগ, সামাজিক দক্ষতার চাহিদা বাড়বে।

পড়াশোনা শেষে কাজের সুযোগে বড় পরিবর্তন আনছে নিউজিল্যান্ড

বাংলাদেশে যা হচ্ছে

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই রূপান্তর আরও বেশি স্পর্শকাতর, কারণ আমাদের শ্রমবাজার আগে থেকেই দক্ষতার অসামঞ্জস্যে ভুগছে। বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন শ্রমবাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে ঢুকছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী সেই বাজারেই বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীদের বেকারত্ব প্রায় ১৪ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে এআই এখানে ভবিষ্যতের প্রশ্ন নয়, বর্তমানের চাপ। বিশেষ করে আইটি খাত ও ফ্রিল্যান্সিংয়ে যে কাজগুলো টেমপ্লেট-নির্ভর, সাধারণ কনটেন্ট, বেসিক ডিজাইন, রুটিন ওয়েব কাজ, সেখানে দরপতনের চাপ বাড়বে। কিন্তু একই সঙ্গে ক্লায়েন্টের সমস্যা বোঝা, বাংলা ভাষার লোকালাইজেশন, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিং, এআই-সিস্টেম যাচাই ও পণ্য-ভাবনার মতো কাজে নতুন দরজা খুলবে।

ফ্রিল্যান্সিং, মিডিয়া, শিক্ষা, ব্যাংকিং ও প্রশাসনিক চাকরিতেও একই দ্বৈততা। ২০২৬ সালে সরকার ফ্রিল্যান্সার আইডি চালু করেছে, এটি খাতটিকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিচ্ছে। কিন্তু নিম্নমূল্যের লোগো, সাধারণ কনটেন্ট, ডেটা এন্ট্রি বা অনুবাদের কাজ এআইয়ের চাপে সস্তা হয়ে যাবে; টিকে থাকবেন তাঁরা, যাঁরা গবেষণা, ব্র্যান্ড-বোধ, বাংলা ভাষার সূক্ষ্মতা, ক্লায়েন্ট ম্যানেজমেন্ট বা এআই-সহায়ক উন্নত কাজ করতে পারবেন। সংবাদমাধ্যমে প্রথাগত সারসংক্ষেপ ও শিরোনাম তৈরির কাজ ইতিমধ্যে বদলাচ্ছে। শিক্ষা খাতে এআই একসঙ্গে আশীর্বাদ ও অভিশাপ। এটি পাঠ প্রস্তুত, ভাষা সহায়তা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখা—সবকিছু সহজ করতে পারে। কিন্তু অতিনির্ভরতা শেখাকে শর্টকাটেও নামিয়ে আনতে পারে। তাই এখন সবচেয়ে জরুরি দক্ষতা কেবল প্রম্পট লেখা নয়; এখন বিশ্লেষণ, যাচাই, যোগাযোগ, দলগত কাজ, নৈতিক বোধ আর নিজের ক্ষেত্রের গভীর জ্ঞান বেশি জরুরি। মাইক্রোসফট ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও দেখা যাচ্ছে, এআই-যুগে মান নিয়ন্ত্রণ, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো মানবিক দক্ষতার গুরুত্ব আরও বাড়ছে।

এমআইটিতে পড়তে চান, জানুন খরচসহ বিস্তারিত তথ্য

নিতে হবে দ্রুত পদক্ষেপ

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন উচ্চশিক্ষায় এআইয়ের নৈতিক ব্যবহারের নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, আর বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকিং খাতে এআই ব্যবহার, জালিয়াতি শনাক্তকরণ এবং ডিজিটাল সেবা উন্নয়নের বিষয়ে কাজ করছে। ফলে কেরানি, রিপোর্ট-ড্রাফটিং, ফর্ম-প্রসেসিং, কমপ্লায়েন্স-সহায়তা ও ফ্রন্ট-ডেস্ক প্রশাসনিক কাজ আগে বদলাবে বলাই যায়। তবে বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তি নয়, প্রস্তুতি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নে দেখা যায়, দেশের এআই-প্রস্তুতি এখনো বিকাশমান পর্যায়ে রয়েছে। ডিজিটাল অবকাঠামো, উচ্চগতির ইন্টারনেট প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং গবেষণা সক্ষমতার ক্ষেত্রে এখনো উল্লেখযোগ্য বৈষম্য বিদ্যমান। এই বাস্তবতায় জাতীয় বাংলা ভাষা মডেল গড়ার প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো শিক্ষক, ব্যাংকার, সাংবাদিক, প্রশাসনিক কর্মী, ফ্রিল্যান্সার ও তরুণ চাকরিপ্রার্থীদের জন্য ব্যবহারিক পুনঃদক্ষতাকরণ। সামনে টিকে থাকবেন তাঁরা, যাঁরা এআইকে ভয় না পেয়ে নিজের কাজের ভেতর বিচারবোধ, ভাষা, সম্পর্ক, দায়বদ্ধতা ও সৃজনশীলতাকে আরও শক্ত করবেন। চাকরির দুনিয়া শেষ হচ্ছে না; তার মানচিত্র বদলাচ্ছে।

বাংলাদেশের জন্য তাই প্রশ্নটি সহজ: এআই আসবে কি না, তা আর বিতর্ক নয়; প্রশ্ন হলো, আমরা কি কম খরচে শ্রমিকের পুরোনো মডেলে আটকে থাকব, নাকি এআই-সচেতন, দ্রুত শেখে এমন এক শ্রমশক্তি গড়ে তুলব। ভয় দেখিয়ে এর উত্তর মিলবে না, অন্ধ উচ্ছ্বাসেও নয়। যে দেশ তার তরুণদের দ্রুত নতুন দক্ষতা শেখাতে পারবে, সে দেশেই এআই চাকরি কম খাবে, কাজের মান বেশি বাড়াবে। আগামী দিনের শ্রমবাজারে সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা মানুষ বনাম মেশিন নয়; এআই–সচেতন মানুষ বনাম এআই–অসচেতন মানুষের প্রতিযোগিতা হবে। ভয়টা শুধু চাকরি যাবে কি না, তা নয়; ভয়টা হলো, কে বদলাতে পারবে আর কে পারবে না। এআই-যুগে নিরাপদ মানুষ সে নয়, যে প্রযুক্তিকে এড়িয়ে চলে। বরং সে, যে প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে পারে; কিন্তু নিজের বিচারবুদ্ধি আউটসোর্স করে না। বাংলাদেশের সামনে এখন আসল কাজ দ্রুত দক্ষতা বৃদ্ধি, শক্তিশালী গবেষণা ইকোসিস্টেম তৈরি, কার্যকরী কারিগরি ও উচ্চশিক্ষা, বাংলাভিত্তিক ডিজিটাল অবকাঠামো, আর নীতিমালা। নইলে এআই আমাদের জন্য সুযোগের চেয়ে বৈষম্যের যন্ত্রই বেশি হয়ে উঠবে।

*ওমর বিন কাশিম ভুঁইয়া, কম্পিউটার এবং সাইবার নিরাপত্তা গবেষক, সিস-কোর ল্যাব, সেজং ইউনিভার্সিটি, সিউল দক্ষিণ কোরিয়া, [email protected]

Read full story at source