প্রেম, বেদনা নাকি সংগ্রাম, ‘কবি’ উপন্যাসের আসল শক্তি কোনটি
· Prothom Alo

বাংলা গদ্যসাহিত্যের অন্যতম সমৃদ্ধ শাখা কথাসাহিত্য; আর কথাসাহিত্যিক হিসেবে যে কয়জন লেখক এই ধারাকে বিশ্বমানের উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১)। তিনি ছিলেন জনজীবনের শিল্পী, মাটি ও মানুষের কথক। তাঁর সাহিত্যকর্মে গ্রামবাংলার বহুবর্ণ জীবন, প্রান্তিক মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, সংগ্রাম ও স্বপ্ন এক অনন্য শিল্পরূপ লাভ করেছে। তাঁর উপন্যাসগুলো কেবল কাহিনি নয়, সমাজবাস্তবতার দলিলও বটে। খেটে খাওয়া মানুষের জীবনসংগ্রাম, শ্রেণিবৈষম্যের নির্মমতা এবং মানবমনের গভীর অনুভব তাঁর রচনার প্রধান উপজীব্য। এ কারণেই তাঁর সাহিত্য পাঠককে কখনো ব্যথিত করে, কখনো আন্দোলিত করে, আবার কখনো এক অদ্ভুত মানবিক মমতায় আবিষ্ট করে রাখে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহুল আলোচিত ও কালজয়ী উপন্যাস কবি (১৯৪৩) বাংলা কথাসাহিত্যের এক অনন্য সংযোজন। এই উপন্যাসে তিনি সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণির জীবন, তাদের সাংস্কৃতিক পরিসর, প্রেম, বেদনা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে অসাধারণ শিল্পনৈপুণ্যের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। বিশেষত ডোম সম্প্রদায়ের জীবনচিত্র এবং কবিগানের ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র স্থান অধিকার করে আছে।
তারাশঙ্করের অধিকাংশ কথাসাহিত্যের প্রেক্ষাপট গড়ে উঠেছে বীরভূম ও বর্ধমান অঞ্চলের সাঁওতাল, বাগদি, ডোম, বাউরি, বোষ্টম প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর জীবনকে ঘিরে। সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন এসব মানুষের জীবনযাপন, তাদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস, সংকট ও সংগ্রামকে তিনি গভীর মমত্ববোধের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করেছেন। কবি উপন্যাসেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এখানে তিনি ডোম সম্প্রদায়ের জীবন ও ঝুমুর দলের শিল্প-সংস্কৃতিকে কাহিনির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।
উপন্যাসের প্রধান চরিত্র নেতাইচরণ, সংক্ষেপে নেতাই। সে জন্মগ্রহণ করেছে হিন্দুসমাজের পতিততম স্তর হিসেবে বিবেচিত ডোম বংশে। তার পরিবারও ছিল অপরাধ জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। মামা গৌরচরণ একজন খ্যাতিমান ডাকাত, বাবা সিঁধেল চোর এবং পিতামহ ছিলেন ঠ্যাঙাড়ে। এমন এক পরিবারে জন্ম নিয়েও নেতাই পূর্বপুরুষদের পথ অনুসরণ করতে চায় না। তার স্বপ্ন কবিয়াল হওয়ার। সে কবিগানের দোহারের কাজ করে এবং একদিন নিজেকে প্রতিষ্ঠিত কবিয়াল হিসেবে দেখতে চায়; কিন্তু সমাজের শ্রেণিবদ্ধ কাঠামো নিম্নবর্গের মানুষের স্বপ্নকে সহজে স্বীকৃতি দিতে চায় না।
নেতাইয়ের জীবনের প্রথম সংগ্রাম শুরু হয় শিক্ষালাভকে কেন্দ্র করে। স্থানীয় জমিদারের মায়ের স্মৃতি রক্ষার্থে প্রতিষ্ঠিত নৈশবিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে সে নানা ব্যঙ্গবিদ্রূপের শিকার হয়। ডোম বংশের ছেলে হয়ে লেখাপড়া করার প্রয়োজন কী—এই প্রশ্নই যেন চারপাশের মানুষের মনে। একে একে অন্য ছেলেরা স্কুল ছেড়ে দিলেও নেতাই শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারায় না। আত্মীয়স্বজনও তাকে ‘পণ্ডিতমশাই’ বলে বিদ্রূপ করে। মামা গৌরচরণ পর্যন্ত তার বই-খাতা ছুড়ে ফেলে দিয়ে তাকে পারিবারিক পেশায় ফিরে আসার নির্দেশ দেয়; কিন্তু নেতাই নিজের স্বপ্ন থেকে সরে আসে না।
‘ট্রেন টু পাকিস্তান’–এ লেখক কিসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেনপরবর্তী সময়ে সে ঘনশ্যাম গোঁসাইয়ের বাড়িতে মাহিন্দারীর কাজ নেয়। গাভির দেখাশোনা করাই ছিল তার দায়িত্ব; কিন্তু জন্মপরিচয়ের কারণে সর্বত্র তাকে অবহেলা ও অপমানের সম্মুখীন হতে হয়। এই অভিজ্ঞতাগুলো উপন্যাসে নিম্নবর্গের মানুষের সামাজিক অবস্থানকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
কবি উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শ্রেণিবৈষম্য ও শোষণের নির্মম চিত্র। সমাজে প্রতিভা ও শ্রমের যথার্থ মূল্যায়ন যে সব সময় হয় না, তার প্রমাণ মেলে নোটনদাস চরিত্রে। তিনি একজন খ্যাতিমান কবিয়াল হয়েও প্রাপ্য পারিশ্রমিক থেকে বঞ্চিত হন। পাওনা অর্থের পরিবর্তে তাকে দেওয়া হয় একটি জবা ফুল ও আশীর্বাদ। এই ঘটনা সমাজের উচ্চবর্গের ভণ্ডামি এবং নিম্নবর্গের শিল্পীদের প্রতি অবহেলার প্রতীক হয়ে ওঠে। তারাশঙ্কর এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে শোষণ-বঞ্চনার সামাজিক বাস্তবতাকে নির্মোহভাবে উন্মোচন করেছেন।
তবে সব প্রতিকূলতার মধ্যেও নেতাই নিজের স্বপ্ন আঁকড়ে ধরে। ভাগ্য একসময় তার জন্য নতুন পথ খুলে দেয়। অট্টহাস গ্রামের চামুণ্ডা পূজাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত কবিগানের আসরে এক প্রতিষ্ঠিত কবিয়ালের অনুপস্থিতি নেতাইকে সুযোগ এনে দেয়। হাজারো মানুষের সামনে সে প্রথমবারের মতো নিজের প্রতিভার প্রকাশ ঘটায়। যদিও অভিজ্ঞ মহাদেব পালের কাছে সে পরাজিত হয়, তবু এ ঘটনাই তার কবিয়ালজীবনের সূচনা করে। সে বুঝতে পারে, জন্ম নয় প্রতিভাই মানুষের প্রকৃত পরিচয় নির্মাণ করে।
নেতাইয়ের ব্যক্তিজীবনও বেদনাময়। স্টেশনে থাকার সময় রাজলালের শ্যালিকা ঠাকুরঝির সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। সরল ও নীরব এই বালিকা প্রতিদিন তাকে দুধ এনে দিত। ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে এক গভীর মানবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। একসময় নেতাই উপলব্ধি করে যে সে ঠাকুরঝিকে ভালোবাসে এবং ঠাকুরঝিও তাকে ভালোবাসে; কিন্তু সামাজিক বাস্তবতা তাদের মিলনকে অসম্ভব করে তোলে। কারণ, ঠাকুরঝি বিবাহিত। ফলে এই প্রেম পরিণতির মুখ দেখে না। নেতাইয়ের জীবনে এটি এক গভীর অপ্রাপ্তির বেদনা হয়ে থেকে যায়।
প্রেমের আরেকটি মাত্রা যুক্ত হয় ঝুমুর দলের আগমনের মধ্য দিয়ে। ঝুমুর দলের অন্যতম আকর্ষণ বসন। সমাজ তাকে কেবল দেহোপজীবিনী হিসেবেই দেখে; কিন্তু নেতাই তার মধ্যে খুঁজে পায় একজন শিল্পীকে, একজন মানুষকে। বসনের কণ্ঠ, নৃত্য এবং ব্যক্তিত্ব নেতাইকে আকৃষ্ট করে। তাদের সম্পর্কের মধ্যে দেহের চেয়ে মন ও শিল্পের সংযোগই অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে সমাজের নির্মম বাস্তবতা এখানেও তাদের জন্য কোনো মুক্ত পথ রাখে না। ফলে বসন ও নেতাইয়ের সম্পর্কও পূর্ণতা পায় না।
উপন্যাসে ঝুমুর দলের জীবনচিত্র অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই শিল্পীরা গান, নাচ ও অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষের বিনোদনের ব্যবস্থা করলেও সমাজ তাদের সম্মান দেয় না। দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অবজ্ঞার মধ্যে তাদের জীবন অতিবাহিত হয়। তারাশঙ্কর এসব মানুষের জীবনকে কেবল বাহ্যিকভাবে দেখেননি; তিনি তাদের অন্তর্জগৎ, অনুভূতি ও মানবিক সত্তাকেও গভীর সহানুভূতির সঙ্গে তুলে ধরেছেন।
কবি উপন্যাসে কবিগান কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি আত্মপ্রকাশের এক শক্তিশালী অস্ত্র। কবিগানের মাধ্যমে নেতাই নিজের অস্তিত্বের ঘোষণা দেয়। সে প্রমাণ করতে চায় যে প্রতিভা কোনো বিশেষ বংশ, শ্রেণি বা জাতির সম্পত্তি নয়। একজন ডোমবংশীয় যুবকও সাধনা ও প্রতিভার বলে মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারে।
নেতাই চরিত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অদম্য মনোবল। জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সে বাধা, অপমান, বঞ্চনা ও ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছে। তবু সে হার মানেনি। শিল্পের প্রতি তার গভীর নিষ্ঠা ও আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাই তাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। ফলে নেতাই কেবল একজন কবিয়াল নয়; সে হয়ে উঠেছে সংগ্রামী মানুষের প্রতীক।
সবশেষে বলা যায়, কবি উপন্যাস বাংলা কথাসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। এটি কেবল একজন কবিয়ালের জীবনকাহিনি নয়; বরং প্রান্তিক মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম, প্রেম, বেদনা ও আত্মমর্যাদার এক অনন্য শিল্পরূপ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন যে মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার জন্মে নয়, তার কর্মে; তার বংশে নয়, তার প্রতিভায়। এই মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রান্তজনের জীবনের গভীর শিল্পিত রূপায়ণই ‘কবি ’উপন্যাসকে বাংলা সাহিত্যের এক কালজয়ী সৃষ্টি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ, ঢাকা কলেজ