বিশ্ব কি সত্যিই বিশৃঙ্খল, নাকি আমরা বুঝতে পারছি না

· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ও ইরানের মধ্যে যে এলোমেলো, অসংলগ্ন কূটনীতি চলছে, তা দেখে অনেকেরই মনে হতে পারে যে বিশ্বরাজনীতি যেন সম্পূর্ণ দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে। সবকিছু যেন বিশৃঙ্খলার ঘূর্ণিতে ঘুরছে। কিন্তু একটু দূর থেকে ঠান্ডা মাথায় তাকালে দেখা যাবে, আজকের সব বড় সংঘাত আসলে একই সূত্রে গাঁথা। উপরিভাগে যতই বিশৃঙ্খলা মনে হোক না কেন, ভেতরে-ভেতরে কাজ করছে অভিযোজন ও স্থিতিস্থাপকতার এক শক্তিশালী যুক্তি।

Visit freshyourfeel.org for more information.

আজকের বিশ্বের চারটি বড় উত্তপ্ত অঞ্চল বা সংঘাতক্ষেত্রের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এগুলোর শিকড় বহুদিনের ইতিহাসে প্রোথিত। তাই এগুলো পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল না। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক ইউক্রেন যুদ্ধ। রাশিয়ার আগ্রাসনের নির্মমতা গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছিল ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধটা নিজে নতুন কিছু নয়। ক্রেমলিনের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকেই এর জন্ম। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বহুদিন ধরেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তিনি ইউক্রেনের স্বাধীনতা বা পশ্চিমের সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক মেনে নিতে পারেন না। নব্বইয়ের দশকে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জবিগনিয়েভ ব্রেজিনস্কি সতর্ক করে বলেছিলেন, ইউক্রেন ছাড়া রাশিয়া আর সাম্রাজ্য থাকতে পারে না।

এ ভাবনার অর্থ ছিল স্পষ্ট, ইউক্রেনকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে রাশিয়া আবার শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত হতে পারে। এরপর যা কিছু ঘটেছে, সবই এই ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিকতা। এখানে বিশৃঙ্খলার তত্ত্ব বা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। এটি কেবল একটি রাষ্ট্রের সেই মানসিকতার ফল, যা নিজেকে সাম্রাজ্যোত্তর শক্তি হিসেবে মেনে নিতে রাজি নয়।

দ্বিতীয় বড় উত্তেজনার কেন্দ্র তাইওয়ান। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে বিশ্বব্যাপী বিপর্যয়ের সম্ভাবনা। কিন্তু এখানেও পরিস্থিতি নতুন নয়। কোরীয় যুদ্ধের সময়ই এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। সে সময় তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে যুক্তরাষ্ট্র তার নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যে নিয়ে আসে। চীনের নেতা মাও সে তুং প্রথমে কোরীয় যুদ্ধে জড়াতে ইতস্তত করেছিলেন, কারণ তিনি তাইওয়ান দখলের পরিকল্পনায় মনোনিবেশ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মার্কিন সপ্তম নৌবহরের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্থবির হয়ে যায়।

পঁচাত্তর বছর পরও সেই স্থবিরতা রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে তাইওয়ান নিয়ে একধরনের কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় আছে। চীন চায়, যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানাক যে তারা তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধী। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানাতে চায় না যে তাইওয়ানকে রক্ষার জন্য তারা ঠিক কী করবে। এ অস্পষ্টতা হয়তো দীর্ঘদিন থাকবে না। ট্রাম্প হয়তো তাইওয়ানকে সমর্থনের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করতে পারেন, আবার চীনও দ্বীপটিতে অবরোধ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে পারে।

ট্রাম্প-পরবর্তী বিশ্বভাঙনের পর কোন পথে বিশ্বব্যবস্থা

তবে এখনো সে পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। আর যদি হয়ও, তাতে কোনো রহস্য থাকবে না তাঁদের কাছে, যাঁরা বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ করেছেন। এর অর্থ এই নয় যে বিপদ নেই। বরং এটিই বোঝায় যে ঘটনাগুলোর পেছনে একটি যুক্তিসংগত ধারাবাহিকতা রয়েছে। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ইতিহাসবিদ ও কৌশল বিশ্লেষক মাইকেল ম্যান্ডেলবাম এক প্রবন্ধে বলেছিলেন, বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে যুদ্ধ হয়তো অতীত হয়ে যাচ্ছে। তবে তিনি দুটি সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছিলেন, যা এ ধারণাকে ভুল প্রমাণ করতে পারে—ইউক্রেন ও তাইওয়ান।

একই যুক্তি প্রযোজ্য মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত হোক বা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান সংঘাত—সব ক্ষেত্রেই ভয়াবহ পরিণতি দেখা গেছে। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো, এগুলোর অযৌক্তিকতা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়িত্ব। বহুদিন ধরেই পরিষ্কার যে পবিত্র ভূমির বিরোধ মেটাতে হলে কিছু ভূখণ্ডের বিনিময়ে স্থায়ী শান্তির পথে এগোতে হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা সে লক্ষ্য থেকে ক্রমেই দূরে সরে গেছি। সংঘাত আরও হিংস্র ও ভয়াবহ হয়েছে, কিন্তু তাতে তা অযৌক্তিক হয়ে ওঠেনি।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের শিকড়ও বহু পুরোনো। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর গড়ে ওঠা ইসলামিক প্রজাতন্ত্র শুরু থেকেই পশ্চিমবিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। তবে এ পরিস্থিতি তৈরির পেছনে পশ্চিমেরও কিছু দায় রয়েছে। মূল দ্বন্দ্বের রূপরেখা বদলায়নি; ইরান চায়, অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে, অন্যদিকে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলো সে প্রভাব কমাতে চায়।

বিশ্বকে এক ভয়ংকর শিক্ষা দিল ইরান

এ দ্বন্দ্বের মধ্যেই ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি এগিয়ে নেয়। ২০১৫ সালে বারাক ওবামার প্রশাসন একটি চুক্তির মাধ্যমে এ সমস্যার আংশিক সমাধান করে, যার ফলে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকেরা ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোয় প্রবেশাধিকার পান। তবে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমস্যা অমীমাংসিতই থেকে যায়। পরে ২০১৮ সালে ট্রাম্প সে চুক্তি বাতিল করে দেন।

এসব উদাহরণ দেখায়, যাকে আমরা সহজভাবে বিশৃঙ্খলা বলি, তা আসলে দীর্ঘদিনের ঘটনাপ্রবাহের ফল। সেসব ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা আর আগের মতো শক্তিশালী নেই। আগে যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিশ্বকে স্থিতিশীল রাখত, তা এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। এর জন্য ট্রাম্প অনেকটাই দায়ী।

তবে বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে আরও একটি বড় কারণ রয়েছে—বিশ্বনেতৃত্বের পরিবর্তন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্ষমতার একটি বড় অংশ সরে যাচ্ছে চীনের দিকে। কিন্তু এ পরিবর্তনের মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল পরিষ্কার নয়। ট্রাম্প একদিকে চীনের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজছেন, এমনকি প্রয়োজনে তাইওয়ানকে ছেড়ে দিতেও পারেন। আবার অন্যদিকে, তাঁর অনিশ্চিত স্বভাব তাঁকে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানেও নিয়ে যেতে পারে, যা চীনকে আরও উত্তেজিত করবে।

চীনও নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে না। তারা বিশ্বরাজনীতিতে বড় ভূমিকা নিতে চায়, কিন্তু সে অনুযায়ী জোট গড়ার মতো কঠিন কাজ করতে আগ্রহী নয়। ফলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা অস্থিরতা বাড়াচ্ছে। যদিও চীন মাঝেমধ্যে আন্তর্জাতিক নিয়ম ভাঙে, তবু তা খুব প্রকাশ্যে করে না; দক্ষিণ চীন সাগরের মতো কিছু ক্ষেত্র ছাড়া।

রাশিয়া ইউক্রেনে যে ব্যর্থ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, তা চীনের সমর্থন ছাড়া সম্ভব হতো না। তবে এর মানে এই নয় যে চীনের এ অবস্থান অযৌক্তিক। তারা পশ্চিমকে দুর্বল করার জন্য রাশিয়াকে সমর্থন করছে। একই যুক্তি তাদের ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

এসব সংঘাত ও অস্থিরতার মধ্যে অনেকেই মনে করছেন যে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কিন্তু বাস্তবটা একটু জটিল। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ট্রাম্পের আমদানি শুল্কনীতি বিশ্বে অনিশ্চয়তা তৈরি করলেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেমে যায়নি। বরং তা বাড়ছেই। শুধু সরবরাহ ও মূল্যশৃঙ্খলকে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে।

আমাদের কাছে বিশ্বটা আজ অস্থির বা পাগলাটে মনে হয়, কারণ আমরা তাকে বোঝার উপযুক্ত উপায় হারিয়ে ফেলেছি। তাই নতুন পথ খোঁজার আগে প্রয়োজন বিশ্বরাজনীতিকে আবার বোধগম্য করে তোলা।

  • জাকি লায়দি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈদেশিক ও নিরাপত্তা নীতির উচ্চ প্রতিনিধির সাবেক বিশেষ উপদেষ্টা ছিলেন।

    স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট; অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

Read full story at source