কলমের জোরে যেভাবে কুপোকাত হলো হ্যাকাররা
· Prothom Alo

ডিজিটাল যুগের অসীম ক্ষমতার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক চরম বিপর্যয়। প্রযুক্তির ওপর মানুষের অতি নির্ভরতা কীভাবে চোখের পলকে পুরো একটি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করাতে পারে, তার এক রোমাঞ্চকর ও অচেনা ঘটনা সম্প্রতি জানা গেছে। রোমানিয়ার স্বাস্থ্য খাতে নেমে আসা ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ সাইবার হামলা ঠেকাতে চিকিৎসকেরা বেছে নিয়েছিলেন এক আদিম, কিন্তু অমোঘ অস্ত্র—কাগজ আর কলম।
Visit turconews.click for more information.
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রোমানিয়ার ১০০টির বেশি হাসপাতালে একযোগে হ্যাকাররা হানা দেয়। বুখারেস্টের জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্রের প্রধান ড্যান চিম্পিয়ান তখন নিরুপায় হয়ে এক কঠিন, কিন্তু ঐতিহাসিক নির্দেশ জারি করেন। তারঁ ঘোষণা ছিল, সব হাসপাতাল ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে, এখনই।
সরাসরি ইন্টারনেট সংযোগ কেটে দেওয়ায় হ্যাকারদের গতি থমকে যায়। তবে এর ফলে বন্ধ হয়ে যায় হাসপাতালের ই–মেইল, ব্রাউজার এবং সব ডিজিটাল যন্ত্র। তখন রোগাক্রান্ত রোগীদের জীবন বাঁচাতে ডাক্তার ও নার্সরা দ্রুত হাতে তুলে নেন কাগজ-কলম। ঘটনার সময় বুখারেস্ট থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে বুজাউ হাসপাতালে ডিউটিতে ছিলেন সার্জন ওয়ানা গোইডেস্কু। তিনি সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, এটি বেশ অপ্রীতিকর এক অভিজ্ঞতা ছিল। কারণ, একটি আইটি রেকর্ড মানে শুধু রোগীদের তালিকা নয়; প্রত্যেক রোগীর জন্য ল্যাব টেস্ট, রেডিওলজি, ওষুধ এবং সরবরাহের হিসাব থাকে। তার সবকিছুই মুহূর্তের মধ্যে হাওয়া হয়ে গিয়েছিল।
হ্যাকাররা মূলত হিপোক্রেটিস নামক একটি বহুল ব্যবহৃত মেডিক্যাল সফটওয়্যারের মাধ্যমে পুরো দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ব্যাকমাইডাটা নামক একটি র্যানসমওয়্যার ছড়িয়ে দিয়েছিল। তারা ফাইলগুলো লক করে দিয়ে তা পুনরুদ্ধারের জন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েনে ১ লাখ ৬০ হাজার ইউরো দাবি করে। তবে রোমানিয়া সরকার হ্যাকারদের এক পয়সাও না দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। বুখারেস্টের ক্যারল ডাভিলা হাসপাতালের ভ্লাদ পাইক জানান, সিস্টেম দ্রুত মেরামত হবে না বুঝতে পেরে তাঁরা দ্রুত একটি অফলাইন পদ্ধতি তৈরি করেন। ল্যাবরেটরি থেকে পরীক্ষার রিপোর্ট কাগজে আনা শুরু হয় এবং রোগীর যত্ন যেন ব্যাহত না হয়, সে জন্য এক্সেল ও অন্যান্য অফলাইন টুল ব্যবহার করা হয়।
টানা চার দিনের যুদ্ধ শেষে বিভিন্ন হাসপাতালের আইটি টিম ব্যাকআপ ডেটা ব্যবহার করে সিস্টেমগুলো পুনরায় সচল করতে সক্ষম হয়। এই ঘটনায় কোনো রোগীর মৃত্যু বা বড় কোনো ক্ষতি হয়নি। ড্যান চিম্পিয়ান এই সাইবার হামলা প্রসঙ্গে একটি চিরন্তন সত্য মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, আপনার যত বেশি প্রযুক্তি থাকবে, আপনি যত বেশি ডিজিটালাইজড হবেন, আপনার ঝুঁকিও ততটাই বাড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআইয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সাইবার অপরাধীদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু হলো স্বাস্থ্য খাত। যুক্তরাজ্য ও আমেরিকার বড় বড় হাসপাতালেও একই ধরনের হামলা হয়েছে, যেখানে একটি হ্যাকিংয়ের কারণে রোগীর মৃত্যুর নজিরও রয়েছে। রোমানিয়ার এই কাগজ-কলম নীতি ও দ্রুত ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করার কৌশলটি এখন বিশ্বজুড়ে দুর্যোগ পরিকল্পনাকারীদের জন্য একটি আদর্শ উদাহরণ হিসেবে পড়া হচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি