ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রক্সি বাহিনী কীভাবে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়াচ্ছে

· Prothom Alo

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শুক্রবার তাঁর সংক্ষিপ্ত মধ্যপ্রাচ্য সফর শেষ করেছেন। এ সময় তিনি উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে তাঁর আলোচনা নিয়ে বেশ ইতিবাচক ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করেন। ওই নেতারা ভয় পাচ্ছেন যে ইরান পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব বাড়ানোর যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা চুক্তিতে সেই সমস্যার কোনো সমাধান আসেনি।

Visit casino-promo.biz for more information.

‘তাঁরা আমাদের কাছে কিছু সুনির্দিষ্ট উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন,’ স্বীকার করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী; তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তির ক্ষেত্রে তেহরানকে শুধু তাদের পরমাণু কর্মসূচিই সীমিত করলে চলবে না। একই সঙ্গে গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকে সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনে হুতিদের সমর্থন দেওয়াও বন্ধ করতে হবে।

এদিকে বিশ্লেষক এবং পশ্চিমা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ধারণা, এই সংঘাতের পর এসব গোষ্ঠীর প্রতি ইরানের সমর্থন আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তেহরানের বর্তমান কৌশলগত চিন্তাভাবনা সেই ধারণার সঙ্গে মিলে যায়।

তাঁরা একই সঙ্গে বলেন, যেসব অনিয়মিত যোদ্ধাকে ইসরায়েল অনেকটা এবং যুক্তরাষ্ট্র কিছুটা হলেও অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে, সামনে তাদের তৎপরতা আরও বেড়ে যেতে পারে।

২০২৪ ও ২০২৫ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘর্ষে হিজবুল্লাহর ব্যাপক ক্ষতি হয়। তারপরও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র গোষ্ঠী ও প্রক্সি বাহিনীগুলোর প্রধান ভরসা হয়েই আছে এই হিজবুল্লাহ। তবে ইরানের জন্য এই সশস্ত্র ইসলামি সংগঠনটি তাদের প্রধান কৌশলগত দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। তা হলো, ইসরায়েলের সরাসরি হামলা ঠেকানো।

এরপরও তেহরান হিজবুল্লাহর প্রতি তাদের সমর্থন ধরে রেখেছে। ৪০ বছরেরও বেশি সময় আগে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সহায়তায় লেবাননে এই গোষ্ঠীটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

খান ইউনিসে ইসরায়েল–নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অস্ত্র হাতে হামাসবিরোধী একটি গোষ্ঠীর প্রধান হুসাম আল–আস্তাল। গাজা উপত্যকা, ২১ নভেম্বর, ২০২৫

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো হানিন গাদ্দার বলেন, ‘ইরানিরা বর্তমান খারাপ সময়কে সাময়িক বলে মনে করছে এবং বিশ্বাস করে হিজবুল্লাহ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে...রেভোল্যুশনারি গার্ডের জন্য এই অঞ্চলে তাদের ছায়া বাহিনীগুলো পুনর্গঠন করা এবং তাদের সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করা এখন খুবই জরুরি।’

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধবিরতিকে লেবাননেও যুদ্ধ বন্ধের ওপর নির্ভরশীল করে ইরান মূলত ইসরায়েল (কারণ, ইসরায়েল হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণ চালিয়ে যেতে আগ্রহী) ও ওয়াশিংটনের মধ্যে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।

ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গেও তেহরানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তারা সাম্প্রতিক সংঘাতের শেষ দিনগুলোতে যোগ দিয়েছিল। যদিও তারা খুব একটা ক্ষতি করতে পারেনি, তবে ইসরায়েলে হামলা চালানোর এবং লোহিত সাগর দিয়ে চলা জাহাজগুলোকে হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা ঠিকই দেখিয়েছে। তবে হুতিরা অনেকটা স্বাধীনভাবেই কাজ করে।

হানিন গাদ্দার বলেন, ‘হুতিরা অত্যন্ত কট্টরপন্থী এবং যুদ্ধের সময় তারা বেশ কাজে এসেছিল। কিন্তু তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় ইরানিদের কোনো হস্তক্ষেপ থাকে না।’

ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সমর্থন দিয়ে আসছে ইরান। সংঘাতের সময় তারা নিজেদের শক্তির জানান দিলেও কখনোই তাদের পুরো অস্ত্রভান্ডার ব্যবহার করেনি। এসব গোষ্ঠী ইরাকে মার্কিন সম্পদ ও কুয়েতকে লক্ষ্য করে হওয়া কয়েক ডজন ড্রোন এবং রকেট হামলার দায় স্বীকার করেছে। কিন্তু একযোগে মাঠে নামেনি। প্রাণঘাতী প্রতিশোধমূলক বিমান হামলা এবং ইরাকের জটিল অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাত বাড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্ক করে তুলেছে।

বৈশ্বিক রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান হরাইজন এনগেজের ইরাকি মিলিশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল নাইটস বলেন, ‘ইরান প্রত্যাশা করলেও তারা হয়তো বেশি ঝুঁকি নিতে চায় না।’

ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবহার করেছিল ইরান, যাতে কুর্দিরা সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকে। তবে বাস্তবে, কুর্দিদের যুদ্ধে না জড়ানোর পেছনে নিজস্ব কিছু কারণ ছিল।

অন্যদিকে জানুয়ারিতে ইরানের সঙ্গে সংঘাতের একেবারে শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চেষ্টা করেছিল ইরানের জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী সংগঠিত করার। এর মধ্যে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমের আরব এবং দক্ষিণ-পূর্বের বালুচ সম্প্রদায়ও ছিল। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও বর্তমানে তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষক মাইকেল মিলশটেইন বলেন, ‘(এই সম্প্রদায়গুলোর সঙ্গে) সাধারণ কিছু যোগাযোগ হয়েছিল, কিন্তু তা খুব বেশি দূর এগোয়নি।’

একইভাবে, উত্তর ইরাকের কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কৌশলও সফল হয়নি। যদিও এই দুই দেশের সঙ্গেই কুর্দিদের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে।

সাবেক ঊর্ধ্বতন কুর্দি ও মার্কিন সেনা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছিল। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সঙ্গে কয়েক হাজার হালকা অস্ত্রধারী কুর্দি যোদ্ধার উত্তর-পশ্চিম ইরানে প্রবেশ করার কথা ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমানশক্তির সুরক্ষায় এসব যোদ্ধা যত দ্রুত এবং যত দূর সম্ভব এগিয়ে যাবে। তাদের লক্ষ্য ছিল তেহরান সরকারকে অস্থিতিশীল করা এবং অন্যান্য অঞ্চলে বিদ্রোহ উসকে দেওয়া। ইরানের নিয়মিত সেনাবাহিনী ও আধা সামরিক বাহিনী এই অগ্রসরমাণ কুর্দিদের আক্রমণ ঠেকাবে বলে আশা করা হয়েছিল। ঠিক তখনই তাদের (ইরানি বাহিনী) ওপর ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা চালানো সহজ হতো।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে হুতি যোদ্ধাদের হামলার পর একটি বড় বাণিজ্যিক জাহাজে (বাল্ক ক্যারিয়ার) বিস্ফোরণের দৃশ্য

এই পরিকল্পনা সম্পর্কে সরাসরি অবগত এমন ব্যক্তিরা বলছেন, এটি ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চিন্তাভাবনায় ছিল। তবে এর সফলতার সম্ভাবনা নিয়ে ছিল মতভেদ।

এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনীর সাবেক এক উপদেষ্টা বলেন, মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত কুর্দি যোদ্ধারা ইরানকে ‘করাতের মতো চিরে ফেলতে পারত’। তবে অন্য আরেকজনের মতে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কুর্দি–অধ্যুষিত এলাকার বাইরে যাওয়াটা অসম্ভব না হলেও বেশ কঠিন হতো।

সেই মুহূর্তে, তাৎক্ষণিকভাবে মাঠে নামানোর মতো মাত্র ‘কয়েক শ’ যোদ্ধা প্রস্তুত ছিল এবং কুর্দি নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন। কারণ, মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে সিরিয়ায় তারা যুক্তরাষ্ট্রের একটি পদক্ষেপকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখেছিলেন, যখন ওয়াশিংটন এমন একটি চাপিয়ে দেওয়া চুক্তিকে সমর্থন করেছিল, যার ফলে কুর্দিদের বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসন কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের এবং কুর্দিদের সাবেক কর্মকর্তারা উভয়েই জানিয়েছেন, এই পরিকল্পনার জন্য ১২ থেকে ২৪ মাসের প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল। এই সময়ে পর্যাপ্ত যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া, অস্ত্র বিতরণ এবং কুর্দিদের মধ্যে একটি একক নেতৃত্ব (কমান্ড) তৈরি করার কথা ছিল। কিন্তু হোয়াইট হাউস ভেবেছিল এটি কিছু দিনের মধ্যেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

আরেকটি চূড়ান্ত কারণ ছিল তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের কঠোর ব্যক্তিগত আপত্তি। তাঁর কারণেই ডোনাল্ড ট্রাম্প কয়েক দিন পর নিজের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হন। ওই কয়েক দিন ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো ইরানের থানা, সেনাঘাঁটি ও সীমান্ত ফাঁড়িগুলোতে হামলা চালিয়েছিল, যাতে কুর্দি গোষ্ঠীগুলো সহজেই সেখানে আক্রমণ চালাতে পারে।

উত্তর ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের রাজধানী এরবিলের কাছে একটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের দেয়ালে এক কুর্দি যোদ্ধার ছায়া

কুর্দিদের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার পাশাপাশি ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সিরিয়ার একটি নতুন দ্রুজ সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অর্থ, তথ্য ও অস্ত্র সরবরাহ করেছে বলে জানা গেছে। গত সপ্তাহে ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা জানান, বিপদে থাকা এই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার জন্যই একটি সামরিক পরিষদ গঠন করা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিষদ তাদের অঞ্চলে নতুন সিরীয় সরকারের ক্ষমতা সুসংহত করতেও বাধা দেবে, যা পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের স্বার্থই রক্ষা করবে।

এদিকে গাজায় হামাসের বিরুদ্ধে লড়তে ইসরায়েল একের পর এক ফিলিস্তিনি মিলিশিয়া গোষ্ঠী তৈরি করেছে। ইসরায়েল গাজার ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা দখল করে আছে। এর বাইরের এলাকায় বাস করা ২৩ লাখ ফিলিস্তিনির ওপর নিয়ন্ত্রণ হামাসের হাতে।

মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে এবং অন্যান্য ‘খুবই সীমিত’ কৌশলগত দায়িত্ব পালন করেছে, তবে এর থেকে অত্যন্ত মিশ্র ফলাফল পাওয়া গেছে।

মিলশটেইন বলেন, ‘এরা কোনোভাবেই গাজার কৌশলগত অবস্থার পরিবর্তন করতে পারবে না... সাধারণ মানুষের কাছে তাদের বিন্দুমাত্র সমর্থন নেই... (তারা) কখনোই হামাসের বিকল্প হতে পারবে না।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান

ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা কমাতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়েই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করা এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা বাড়ানোর একটি চেষ্টা চলছে। স্পষ্ট ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও প্রক্সি বাহিনী ব্যবহারের লোভ থেকেই যাচ্ছে। সিরিয়া, লিবিয়া, সুদানসহ অন্যান্য জায়গায় সাম্প্রতিক ও চলমান সংঘাতগুলোতেও এগুলোর ব্যাপক ব্যবহার দেখা গেছে।

মিলশটেইন বলেন, ‘আপনি প্রক্সি বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে পারেন না। এরা কাজে দেবে না, বরং উল্টো ক্ষতি ডেকে আনে।’

Read full story at source