‘লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা’—একজীবনের দীর্ঘ সুর

· Prothom Alo

বাংলাদেশের বইয়ের জগতে সোমবার একটা চমৎকার ঘটনা ঘটেছে। প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে দেশের প্রথিতযশা সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা’।

Visit truewildgame.com for more information.

গতকাল ২৮ জুন ছিল ফেরদৌসী রহমানের ৮৫তম জন্মদিন। আর ঠিক এদিনই তাঁর হাতে বইটি তুলে দিতে প্রথমা প্রকাশনের পক্ষ থেকে আমরা গিয়ে হাজির হই শিল্পীর বাসভবনে। আমার সঙ্গী প্রথম আলোর হেড অব কালচারাল প্রোগ্রাম কবির বকুল ও প্রথম আলো ট্রাস্টের সমন্বয়ক মাহবুবা সুলতানা।

আগে থেকে জানিয়ে রাখায় আমাদের অপেক্ষা করতে হয়নি। ঘরে গিয়ে বসার সঙ্গে সঙ্গেই শিল্পী এলেন। জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে তাঁর হাতে বইটি তুলে দিলাম। তিনি বইটি দেখলেন। পাতা ওলটালেন। জানতে চাইলাম, ‘কেমন লাগছে?’ উল্টো তিনি আমাদের কাছে জানতে চাইলেন, ‘তোমাদের কেমন লাগছে?’

ফেরদৌসী রহমানের জন্মদিন বাড়িতে সেভাবে উদ্‌যাপন করা হতো না। তাঁর বড় ভাই (সাবেক প্রধান বিচারপতি) মোস্তফা কামালের (১৯৩৩-২০১৫) জন্মদিনে হইচই হতো, গান-কবিতা হতো, খাওয়াদাওয়া হতো। বাবা তাঁর মেয়ের জন্মদিন প্রথম উদ্‌যাপন করেন সেদিন, যেদিন তিনি ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ড করলেন। সারা দেশে মেয়েদের মধ্যে প্রথম। সম্মিলিত মেধাতালিকায় সপ্তম।

কেক কাটা, বেলুন-ফেস্টুন ওড়ানো—সেসবের কিছুই হয়নি সে সময়। সবাই মিলে আনন্দ করেছিলেন। হয়েছিল গানবাজনা, গল্পসল্প। ফেরদৌসী রহমানের অনেক বন্ধু গান করেছিলেন। অনুষ্ঠান চলেছিল অনেক রাত পর্যন্ত।

বাবা বেঁচে থাকতে সেই একবারই ঘটা করে ফেরদৌসী রহমানের জন্মদিন উদ্‌যাপন করা হয়েছিল। পরে তাঁকে বাবা বলেছিলেন, ‘এবার তোমার জন্মদিন উদ্‌যাপন হলো, এরপর তুমি এমন কাজ কোরো, যেন দেশের মানুষ তোমার জন্মদিন পালন করে।’

বিয়ের পর প্রতিবছর জন্মদিনে ফেরদৌসী রহমানকে উপহার দিতেন তাঁর স্বামী। এখনো তাঁর জন্মদিন ঘরোয়া আয়োজনের মধ্য দিয়েই উদ্‌যাপিত হয়।

প্রথিতযশা সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের আত্মজীবনীমূলক ‘লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা’ গ্রন্থের প্রচ্ছদ। প্রথমা প্রকাশন থেকে গতকাল সোমবার বইটি প্রকাশিত হয়েছে

বাবা বাংলা গানের কিংবদন্তি আব্বাসউদ্দীন আহমদ (১৯০১-১৯৫৯)। বাবাকেই তিনি তাঁর জীবনের গুরু মানেন। তিনিই তাঁর ওস্তাদ, স্বপ্নদ্রষ্টা ও পথপ্রদর্শক। আব্বাসউদ্দীন চেয়েছিলেন, মেয়ে আর সবার চেয়ে আলাদা হবে। তাঁর নিজস্ব পরিচয় হবে। সে স্বাবলম্বী হবে। বাংলা সংগীতকে তুলে ধরবে বিশ্বদরবারে।

বাবা ছিলেন ফেরদৌসী রহমানের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। সব কথা অকপটে বাবার সঙ্গে ভাগ করে নিতেন তিনি। আত্মজীবনীতে বারবার উঠে এসেছে তাঁর বাবার কথা। বাবা নেই, কিন্তু তিনি ফেরদৌসী রহমানের জীবনকে এমনভাবে গড়ে দিয়েছেন যে এখনো তাঁর কাছ থেকেই অনুপ্রেরণা পান। তাঁর কাছ থেকেই সাহস আর শক্তি সঞ্চয় করেন।

মা লুৎফুন্নেসা (১৯১৮-২০০৩) ছিলেন নানা গুণে গুণান্বিত। সমাজের নানা বিষয়, মেয়েদের এগিয়ে নেওয়া নিয়ে তিনি কবি সুফিয়া কামালের সঙ্গে কাজ করেছেন। মায়ের প্রভাবই ফেরদৌসী রহমানের মনকে নাড়া দিয়েছিল মেয়েদের স্বাধীনতা বা পরাধীনতা, স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা কিংবা লেখাপড়া শিখে তা কাজে লাগানোর ব্যাপারে।

ফেরদৌসী রহমান বাংলাদেশের সংস্কৃতিজগতের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তিনি গান গেয়েছেন। চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের শুরু থেকে ‘এসো গান শিখি’ নামের অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের কয়েক প্রজন্মের মানুষকে সংগীতে হাতেখড়ি দিয়েছেন। বহু শিল্পীর প্রথম গুরু তিনি। দেশের বেশ কয়েক প্রজন্মের কাছে তাঁর পরিচিতি ‘এসো গান শিখি’র ‘খালামণি’।

আমরা উঠতে যাব, এমন সময় এসে হাজির চ্যানেল আইয়ের ক্যামেরা। সঙ্গে চ্যানেলটির সহমহাব্যবস্থাপক অনন্যা রুমা এবং অভিনেতা তানভির হোসেন প্রবাল। সবার অনুরোধে সহকর্মী মাহবুবা শিল্পীকে গেয়ে শোনালেন ‘যার ছায়া পড়েছে, মনেরও আয়নাতে’। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের লেখা গানটি ফেরদৌসী রহমানেরই গাওয়া।

তারপর অনেকটা সময় পেরিয়ে গেল। সবাই মিলে নানা স্মৃতিচারণা, কেক কাটা আর ছবি তোলা হলো। ফেরদৌসী রহমানের জন্য একটা উপহার নিয়ে গিয়েছিলাম আমরা। তিনি খুব পছন্দ করলেন। জানালেন, তিনি মনে মনে এমনই একটা ছাইরঙা জামদানি শাড়ি খুঁজছিলেন।

প্রথিতযশা সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের জন্মদিনে প্রথমা প্রকাশনের পক্ষ থেকে তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়

সুন্দর একটা ফুশিয়া পাড়ের অফ-হোয়াইট রঙের শাড়ি পরে ছিলেন ফেরদৌসী রহমান। জন্মদিনের উপহার কি না—জিজ্ঞেস করি। বললেন, এটা জন্মদিনের উপহারই বটে, তবে কয়েক বছর আগের। জানালেন, শাড়িটা উপহার দিয়েছিলেন তাঁর স্বামী রেজাউর রহমান (১৯৩৮-২০২৪), তাঁর ভাষায় ‘আমার বুড়া’। তিন বছর আগে হঠাৎ এক দিনের নোটিশে তাঁকে ছেড়ে গেছেন তাঁর ‘বুড়া’। বললেন, এই বয়সে এসে নিজেকে একদম একা দেখতে পাচ্ছেন তিনি। দুই ছেলে পরিবার নিয়ে বিদেশে। মা–বাবা, ভাই-ভাবি, স্বামী—সবাই একে একে চলে গেছেন জীবনের অন্য পারে। তিনি একা একটা অ্যাপার্টমেন্টে থাকেন সহকারী নাজমাকে নিয়ে।

৮০ বছর পার করার পর প্রতিটি দিন ফেরদৌসী রহমানের কাছে ‘বোনাস’ মনে হয়। বললেন, একটা ঝলমলে রঙিন জীবন কাটিয়েছেন তিনি। আর তাই এখনকার এই একাকী জীবন নিয়ে তাঁর কোনো অভিযোগ নেই। এই একাকী জীবন নিয়ে তাঁর ভাবনা হলো, সৃষ্টিকর্তা তাঁর পরীক্ষা নিচ্ছেন। আমার সহকর্মী তাঁকে বললেন, জীবনের অন্য সব পরীক্ষার মতো এই পরীক্ষাতেও তিনি ‘ফ্লাইং কালার্স’ নিয়ে পাস করে যাবেন।

প্রথিতযশা সংগীতশিল্পী ফেরদৌসী রহমানের হাতে প্রথম আলো পত্রিকা। তাঁর ৮৫তম জন্মদিন ছিল ২৮ জুন। এদিন প্রথম আলোর শেষ পাতায় তাঁকে নিয়ে ‘গান হয়ে এলে’ শিরোনামের একটি লেখা প্রকাশিত হয়। এটি লেখেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রী ড. নাশিদ কামাল

আত্মজীবনী ‘লোকে বলে প্রেম, আমি বলি জ্বালা’ গ্রন্থে ফেরদৌসী রহমান বলেছেন, তাঁর কাছে সংগীত মানে জীবন। তিনি মনে করেন, মানুষের জীবনজুড়ে বিরাজ করে সুর ও সংগীত। গান গেয়ে, গান শুনে, সংগীতকে ভালোবেসে জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে গেছে তাঁর। তাই আজও তিনি প্রথম দিনের মতোই ভালোবাসেন সংগীতকে।

ফেরদৌসী রহমান বলেছেন, তাঁর কাছে ‘প্রেম’ মানে শুধু নারী-পুরুষের সম্পর্ক নয়। তাঁর কাছে ‘প্রেম’ হলো তাঁর সংগীত, তাঁর গান। সংগীতই তাঁর পুরো জীবন, তাঁর পুরো সত্তা আর আত্মাকে আলিঙ্গন করে রেখেছে। ‘স্যাটিসফেকশন’ বা ‘পরিতৃপ্তি’—একজন শিল্পীর জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই তৃপ্তি কিংবা অতৃপ্তিই তাঁর সংগীতজীবন পরিচালনা করে। তিনি বলেছেন, একজন শিল্পীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তাঁর সাধনা চালিয়ে যাওয়া। তাই সংগীতকে তিনি বলছেন তাঁর ‘জ্বালাও’। তাঁর এই জীবন আর সংগীত—সবকিছুই তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর আত্মজীবনীতে।

বইটি নিয়ে প্রথমা প্রকাশন আগামী ৭ জুলাই একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে রাজধানীর ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে।

Read full story at source