হাইড্রেশন ব্রেক কীভাবে ইংল্যান্ডকে বিভ্রান্ত করছে
· Prothom Alo
ফুটবলের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে এর টানা ছন্দে। একবার যদি সেই ছন্দ কেটে যায়, তবে সেরা দলটারও খেই হারাতে সময় লাগে না। এবারের বিশ্বকাপে তুমি যদি ইংল্যান্ডের খেলাগুলো নিবিড়ভাবে খেয়াল করো, দেখবে টমাস টুখেলের দল ঠিক এই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা খাচ্ছে। এর পেছনের খলনায়ক কোনো মানুষ নয়, বিশ্বকাপের বিতর্কিত হাইড্রেশন ব্রেক। মানে পানি পানের বিরতি।
১ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় আটলান্টায় নকআউট পর্বের ম্যাচে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ছিল ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো। এখন আমরা দলটিকে ডিআর কঙ্গো নামেই বেশি চিনি। কঙ্গোর কোচও হয়তো ইংল্যান্ডের বড় দুর্বলতা ধরে ফেলেছিলেন। সাত মিনিটে গোল করে এগিয়ে যায় কঙ্গো। তারপর ৭৫ মিনিট পর্যন্ত ইংল্যান্ডকে আটকে রেখেছিল আফ্রিকার এই দল। আগের ম্যাচগুলোয় দেখা গেছে, প্রথমার্ধ বা দ্বিতীয়ার্ধের মাঝপথে যখনই পানি পানের বিরতি দেওয়া হয়, ঠিক তার পরের কয়েক মিনিটে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের মনোযোগ নড়ে যায়। এল গ্রুপের প্রতিটি ম্যাচেই বিরতির পরপর প্রতিপক্ষকে চেপে বসার সুযোগ করে দিয়েছে টুখেলের দল। ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে অবশ্য শুরুতেই গোল খেয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছিল ইংল্যান্ড। কিন্তু দুর্দান্ত ডিফেন্স এবং অসাধারণ গোলকিপিং এগোতে দেয়নি ইংল্যান্ডকে।
Visit saltysenoritaaz.org for more information.
হাইড্রেশন ব্রেকে ইংল্যান্ডের এই সমস্যার শুরু কিন্তু মূল আসরে নয়। টুর্নামেন্টের আগে ফ্লোরিডার গরমে মানিয়ে নিতে বেশ কিছু প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিল ইংল্যান্ড। সেখানেও দেখা গেছে একই চিত্র। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম পানি পানের বিরতির ঠিক পরই পিকফোর্ডকে দারুণ এক সেভ করে দলকে বাঁচাতে হয়েছিল। কোস্টারিকার বিপক্ষে তো গোলরক্ষক পিকফোর্ড নিজেই একটা মারাত্মক ভুল করে বসেন। গোল থেকে ৩০ গজ দূরে দাঁড়ানো প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের পায়ে বল তুলে দিয়েছিলেন তিনি! কোস্টারিকার ফিনিশিং ভালো হলে ওখানেই বড় লজ্জায় পড়তে হতো ইংল্যান্ডকে।
আর্লিং হলান্ড কেন নরওয়ের হয়ে খেলেনক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেও একই দৃশ্য দেখা গেল। খেলাধুলাভিত্তিক ডেটা প্রতিষ্ঠান অপটার পরিসংখ্যান বলছে, প্রথম হাইড্রেশন ব্রেকের পরই লুকা মদরিচের ক্রোয়েশিয়া পুরোপুরি ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। বিরতির ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় জন স্টোনস ও নিকো ও’রাইলি নিজেদের জায়গা থেকে সামান্য সরে যাওয়ায় গোল হজম করে ইংল্যান্ড। মার্টিন বাতুরিনা অনায়াসে সমতায় ফেরান ক্রোয়েশিয়াকে। ঘানা ও পানামার বিপক্ষেও বিরতির পরপরই ইংল্যান্ডের ডিফেন্সকে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয়েছিল। তবে অনেকে বলছেন, হাইড্রেশন ব্রেক নয়, আসলে মাঠে নিজেদের মেলে ধরতে পারছেন না ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা। হ্যারি কেইন ছাড়া কেউই নামের প্রতি সুবিচার করতে পারছেন না। অথচ ইংল্যান্ড দলে তারকার অভাব নেই।
হাইড্রেশন ব্রেকেমজার ব্যাপার হলো, শুরুতে কিন্তু টুখেল এই বিরতির পক্ষেই ছিলেন। ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম যখন এই নিয়মের কড়া সমালোচনা করেছিলেন, টুখেল ভেবেছিলেন এটা তো দারুণ একটা সুযোগ! খেলোয়াড়দের সঙ্গে বাড়তি কথা বলা যাবে, ছক বদলে দেওয়া যাবে। ফুটবলকে রীতিমতো চারটি কোয়ার্টারে ভাগ করে খেলার একটা পরিকল্পনা কষেছিলেন এই জার্মান কোচ।
কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় টুখেলের মত বদলে গেছে। তিনি এখন বুঝতে পারছেন, এই বিরতি ফুটবলের আসল সৌন্দর্য কেড়ে নিচ্ছে। টুখেলের মতে, টানা খেলা হলেই মোমেন্টাম তৈরি হয়। একটু পরপর খেলা থামালে সেই ছন্দ ধরে রাখা ভীষণ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। খেলোয়াড়দের টানা লড়াইটাই ফুটবলের আসল চরিত্র, যা বারবার বিরতির কারণে নষ্ট হচ্ছে।
তুমি হয়তো ভাবতে পারো, প্রচণ্ড গরমের কারণেই তো এই বিরতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ইংল্যান্ডের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোর দিকে তাকালে অবাক হবে। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি হয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে। আর জিলেট ও মেটলাইফ স্টেডিয়ামে তো রীতিমতো বৃষ্টিতে ভিজে খেলতে হয়েছে তাঁদের! আটলান্টার যে মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে কঙ্গোর বিপক্ষে খেলেছে, সেটিও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত।
বেতন পান না কোচ, নিজেরাই খাবার কিনে খাচ্ছেন সেনেগাল দলের খেলোয়াড়েরাতাহলে এসি স্টেডিয়াম বা বৃষ্টির দিনেও কেন পানি পানের বিরতি? ফিফা বলছে, সব দলের জন্য একই রকম নিয়ম রাখতেই এই ব্যবস্থা। ফিফা দাবি করেছে এখান থেকে তাদের বাড়তি আয় নেই ঠিকই, কিন্তু সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকই এই বিরতির ফাঁকে চড়া মূল্যের বিজ্ঞাপন দেখিয়ে পকেট ভারী করছে। আর গ্যালারির দর্শকেরা? তারা প্রতিটি ম্যাচেই বিরতির সময় দুয়োধ্বনি দিয়ে নিজেদের ক্ষোভ জানাচ্ছেন।
ক্রোয়েশিয়ার জালে গোল করে ইংল্যান্ড মিডফিল্ডার জুড বেলিংহামের চিরাচরিত উদ্যাপন। পেছনে জোড়া গোল করা হ্যারি কেইন। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ‘থ্রিলার’ ম্যাচে ৪–২ গোলে জিতেছে ইংল্যান্ডইংল্যান্ড এখন ক্যানসাস সিটিতে নিজেদের বেজক্যাম্প বানিয়েছে। সেখান থেকে প্রতিটি ম্যাচের আগে-পরে বিমানে উড়ে যেতে হচ্ছে। এর মধ্যে আবার একদিন ঝড়ের কারণে অনুশীলনও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে টুখেলের কোচিং স্টাফরা মনে করছেন, ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে এটি। টুর্নামেন্টের পরিধি বেড়েছে, যোগ হয়েছে রাউন্ড অব ৩২। শিরোপা জিততে হলে একটি দলকে অন্তত ৭৫০ মিনিটের বেশি ফুটবল খেলতে হবে।
টুখেলের মতে, এখন প্রতিটি ম্যাচই যেন কোয়ার্টার ফাইনাল। এই যেমন, ব্রাজিল-জাপান বা নেদারল্যান্ডস-মরক্কোর মতো হাড্ডাহাড্ডি লড়াইগুলো ‘রাউন্ড অব ৩২’ পর্বে হয়ে যাচ্ছে! তাই এই দীর্ঘ ও কঠিন পথ পাড়ি দিতে হলে ইংল্যান্ডকে দ্রুত ওই হাইড্রেশন ব্রেকের ধাক্কা সামলে ওঠার উপায় বের করতে হবে। না হলে ওই কয়েক মিনিটের অসতর্কতাই হয়তো তাদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দেবে।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফঘানার ওঝার মন্ত্র আর হ্যারি কেইন